
আজ থেকে প্রায় সাড়ে ছয় শতাব্দী আগে, ১৪০১ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকের কথা। বিশ্বকাঁপানো বিজয়ী তৈমুর লং এর বাহিনী তখন সিরিয়ার প্রাচীন শহর দামেস্ক অবরোধ করে রেখেছে। শহরের ভেতরে আটকা পড়েছেন মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন। একপর্যায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, শহরের প্রাচীর বেয়ে দড়ি ধরে নিচে নেমে তিনি সরাসরি হাজির হন তৈমুরের তাঁবুতে।
ইতিহাসের অন্যতম ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে হওয়া সেই দীর্ঘ সংলাপে এই দুই মহামতি আলোচনা করেছিলেন সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, সভ্যতার নিয়তি আর মানব সমাজের মনস্তত্ত্ব নিয়ে। এটি কেবল একজন পণ্ডিত ও একজন যুদ্ধবাজের সাক্ষাৎকার ছিল না; বরং তা ছিল সভ্যতা ও পাশবিক শক্তি, প্রজ্ঞা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রশিল্প ও আধিপত্যবাদের মধ্যকার এক শাশ্বত দ্বন্দ্বের প্রতীক। দামেস্কের সেই প্রাচীরের বাইরে তৈমুরের সঙ্গে সাক্ষাতের ছয় শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও, ইবনে খালদুনের সেই দূরদর্শী সতর্কবাণী আজও এক নির্মম সত্য হয়ে ইতিহাসের পাতায় প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
ইবনে খালদুন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'মুকাদ্দিমা'-য় একটি ধারণার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন—'আসাবিয়্যাহ'। সহজ বাংলায় যাকে বলা যায় সামাজিক সংহতি, গোষ্ঠীগত ঐক্য বা যৌথ জাতীয় চেতনা।
ইবনে খালদুনের মতে, কোনো জাতি যখন নতুন একটি রাষ্ট্র বা সভ্যতা গড়ে তোলে, তখন তাদের মধ্যে এই 'আসাবিয়্যাহ' বা ত্যাগের মানসিকতা ও ঐক্য থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সভ্যতার ভিত্তি মূলত টিকে থাকে এই নৈতিক সংহতি, যৌথ লক্ষ্য, সুশৃঙ্খল নেতৃত্ব এবং সামাজিক একাত্মতার ওপর। এই সামাজিক সংহতি ছাড়া, এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রও একসময় ভেতর থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে ফাঁপা হয়ে পতনের মুখে পড়ে যায়। প্রাচীর ভেঙে পড়ার বহু আগেই তাদের অভ্যন্তরীণ সংহতি বিনষ্ট হতে শুরু করে।
আজকের বাংলাদেশ যদিও কোনো সাম্রাজ্য নয়, তবে এটি এমন এক জাতি যা বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিকভাবে দেশটি যথেষ্ট স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। কৌশলগতভাবে, এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে। জনমিতির দিক থেকেও এর রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। তা সত্ত্বেও, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেশটিতে এমন সব উপসর্গ ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে, যা ইবনে খালদুন দেখামাত্রই ‘সভ্যতার ক্লান্তি বা অবসাদ’ হিসেবে শনাক্ত করতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো বাংলাদেশের সামাজিক সংহতির ক্রমাগত বিভাজন এবং অবক্ষয়।
ত্যাগ, যৌথ সংগ্রাম এবং অভিন্ন নিয়তির এক শক্তিশালী চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। ১৯৭১ সালের চেতনা কেবল ভূখণ্ডগত স্বাধীনতাই ছিল না, বরং তা ছিল জনগণের মধ্যকার এক গভীর আবেগীয় ও নৈতিক সংহতির বহিঃপ্রকাশ। সেই সংহতিই ছিল এই দেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ। তবে সময়ের ব্যবধানে, আমাদের রাজনীতি ক্রমশ জাতীয় পরিচয়কে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করেছে। যৌথ উদ্দেশ্যকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে, বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রায়শই বিভাজন, আবেগীয় উসকানি এবং চিরস্থায়ী সংঘাতকে পুরস্কৃত করছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, ঐতিহাসিক আখ্যান এবং সামাজিক ক্ষেত্র যদি উপদলীয় কোন্দলের অধীন হয়ে পড়ে, তবে কোনো জাতি কৌশলগতভাবে শক্তিশালী থাকতে পারে না।
ইবনে খালদুন সতর্ক করেছিলেন যে, শাসক শ্রেণি প্রায়শই শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু করে, কিন্তু ধীরে ধীরে তারা অহংকার, বিলাসিতা, আত্মরক্ষা এবং সাধারণ নাগরিকদের থেকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ধাবিত হয়। রাজনৈতিক এলিটরা যখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মগ্ন হয়ে পড়ে, তখন অর্থপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনার জায়গাটি দখল করে নেয় প্রতীকী জাতীয়তাবাদ। স্লোগানগুলো তীব্রতর হতে থাকে, অথচ এর আড়ালে প্রতিষ্ঠানগুলো নিঃশব্দে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই বিপদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা আদর্শের একক বিষয় নয়; এটি কাঠামোগত।
আজকের বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ গঠনমূলক হওয়ার চেয়ে ক্রমশ প্রদর্শনসর্বস্ব হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজনৈতিক আনুগত্য প্রায়শই যোগ্যতা, সততা বা কৌশলগত দূরদর্শিতার পরিবর্তে সস্তা আবেগীয় তীব্রতা দিয়ে পরিমাপ করা হয়। জনবক্তৃতা বা পাবলিক ডিসকোর্সগুলো এখন প্রজ্ঞার চেয়ে ক্ষোভকে বেশি উদ্বুদ্ধ করে। বর্তমানের 'ভাইরাল সংস্কৃতি' এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার যুগে আমরা প্রজ্ঞার চেয়ে আবেগকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সংযম ও বুদ্ধিবৃত্তিক গাম্ভীর্যকে হ্রাস করে মানুষের আদিম ও সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত সাংঘর্ষিক মানসিকতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং ক্রমশ অস্তিত্বের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাজনীতি যখন প্রতিশোধ, সন্দেহ এবং মানসিক ক্লান্তির এক অন্তহীন চক্রে পরিণত হয়, তখন কোনো দেশ টেকসইভাবে প্রগতি অর্জন করতে পারে না। তৈমুর লং-এর মতো পরাক্রমশালী শাসকের সামনে দাঁড়িয়েও ইবনে খালদুন যে সত্য উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন, তার পেছনে ছিল গভীর নৈতিক সাহস ও প্রজ্ঞা। আজ আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সেই প্রজ্ঞার বড় অভাব। আমরা সংকটের গভীরে না গিয়ে উপরিভাগের চটকদার স্লোগানে মেতে উঠতে ভালোবাসি। ইতিহাস সাক্ষী, শুধু স্লোগান দিয়ে সীমান্ত রক্ষা যেমন করা যায়না, তেমনি ভেতরের পচন থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা যায় না।
একটি রাষ্ট্র বা সমাজ কতটা শক্তিশালী, তা পরিমাপের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো তার নাগরিকদের এবং বিশেষ করে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের 'নৈতিক গাম্ভীর্য' বা নৈতিক শক্তি। সমাজ থেকে যখন সততা, জবাবদিহিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ উঠে যায়, তখন সেখানে আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সামাজিক কুসংস্কার যখন একটা সমাজকে গ্রাস করে, তখন বুঝতে হবে সেই জাতির নৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেছে। ইবনে খালদুন ঠিক এই জায়গার ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক করেছিলেন। নৈতিক অবক্ষয় ঘটলে বাহ্যিক কোনো শত্রু ছাড়াই একটি সভ্যতা ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে।
বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের অন্যতম জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি। বঙ্গোপসাগর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতায় কৌশলগতভাবে কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং অন্যান্য পরাশক্তি সমূহকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্রতর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যয়, তথ্যযুদ্ধ, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, জলবায়ুগত দুর্বলতা এবং জনমিতির চাপ বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। এমন একটি চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে, জাতীয় সংহতি কেবল একটি নৈতিক গুণই নয়, বরং একটি পরম কৌশলগত অপরিহার্যতা।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে, সভ্যতাগুলো যখন ক্লান্তির মধ্য দিয়ে যায়, তখন তারা নিজেরা তা খুব কমই উপলব্ধি করতে পারে। তারা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণশক্তি এবং সামাজিক বিশ্বাস হারাতে হারাতে কেবল প্রতীকী বিজয় উদযাপনে মগ্ন থাকে। পতন প্রায়শই সামরিক পরাজয় দিয়ে শুরু হয় না, বরং শুরু হয় অহংকার, অসহিষ্ণুতা এবং রাজনৈতিক আত্মপূজার স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে।
অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশের জাতীয় শক্তির বিভিন্ন উপাদান রয়েছে: স্থিতিস্থাপক জনসংখ্যা, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা, সাংস্কৃতিক প্রাণশক্তি, অদম্য যুবশক্তি এবং দেশপ্রেমিক সামরিক বাহিনী ইত্যাদি। তবে এই উপাদানগুলি কেবল তখনই স্থায়ী জাতীয় শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে, যদি দেশটিতে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটে যার মূল ভিত্তি জনগণের বিভাজন বা স্থায়ী মেরূকরণ নয়; বরং সংযম, যোগ্যতা, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ যৌথ উদ্দেশ্য।
তাই আজ প্রায় ছয় শতাব্দী পরে এসেও আমাদের ঘরের দরজায় সেই একই প্রশ্ন কড়া নাড়ছে—আমরা কি সেই বন্ধনগুলোকে শক্তিশালী করছি যা জাতিকে টিকিয়ে রাখে, নাকি আমরা কেবল সেই ক্ষোভ ও আবেগকে তীব্র করছি যা আমাদের বিভক্ত করে?
ইবনে খালদুনের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা এখানেই যে, তিনি ক্ষমতা থেকে নৈতিকতাকে কিংবা রাজনীতি থেকে সামাজিক সংহতিকে বিচ্ছিন্ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। স্লোগানের অভাবে কোনো জাতি ধ্বংস হয় না; তারা তখনই ধ্বংসের মুখে পড়ে, যখন তারা সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জাতীয় সংহতি, যৌথ প্রজ্ঞা এবং নৈতিক গাম্ভীর্য হারিয়ে ফেলে। নয়ত, ইতিহাসের নির্মম পাতাগুলো সংশ্লিষ্ট কাউকেই ক্ষমা করবে না।
কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)
.png)

পুরাকালে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির এক মহাদুর্যোগপূর্ণ রাতে যমুনার দুই পাড়ে জন্ম নেয় দুই ভিন্ন মায়ের দুই সন্তান—কৃষ্ণ ও যোগমায়া। মথুরার কারাগারে দেবকীর কোলে শ্রীকৃষ্ণ, আর ওপারে গোকুলে যশোদার ঘরে যোগমায়া। আজ তাঁদের জন্মদিন।
৭ ঘণ্টা আগে
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর ধারণায় আবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান। তাই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে আলোচিত– বাংলাদেশে
১ দিন আগে
বায়োগ্যাস প্লান্ট—বর্জ্যকে প্রথমে শক্তিতে এবং শেষ পর্যন্ত খাবারে রূপান্তর করার এক অসাধারণ প্রক্রিয়া। একইসঙ্গে এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মৎস্য চাষ, প্রাণিসম্পদ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে এক সুতোয় গেঁথেছে।
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগাতে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়বে। আর সেখানেই নতুন অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে—যা বেতন বৃদ্ধির দুর্নীতিবিরোধী যুক্তিকেই শেষ পর্যন্ত দুর্বল করে দিতে পারে।
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬