সুবর্ণা ঠাকুরকে মনোনয়ন: বিএনপি কী বার্তা দিতে চাইছে

স্ট্রিম গ্রাফিক

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এখন ‘পরিচয়ের রাজনীতি’ গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। এমন সময় বাংলাদেশের সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেলেন সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর। সেই সঙ্গে সেই পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। বিএনপির এই পদক্ষেপ কি মতুয়া সম্প্রদায়কে সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস? না কি তা দলের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল এগিয়ে নেওয়ার একটি ‘প্রতীকী’ কৌশল মাত্র?

পরিচয়ের রাজনীতি প্রায়ই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সমর্থন আদায়, প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা আর ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহৃত হয়। বিএনপির এই পদক্ষেপকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পুনর্গঠনের এক বৃহত্তর কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে তাকে রেডক্লিফ লাইনের ওপারেও একটি পরিকল্পিত বার্তা দেওয়ার চেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মতুয়া কারা

মতুয়া আন্দোলন ঊনবিংশ শতাব্দীতে হরিচাঁদ ঠাকুর-এর হাত ধরে শুরু হয়। পরে পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর এই আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেন। এর মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু সমাজের চতুর্বর্ণের বাইরের নমশূদ্র জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

মতুয়া সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা বর্ণপ্রথার বিরোধিতা করে এবং সকল মানুষের সমান অধিকারে বিশ্বাস করে। তারা জটিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে ভক্তি, নামসংকীর্তন এবং মানবসেবাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক সচেতনতা এবং আত্মমর্যাদার ব্যাপারে সচেতন করার ওপরও তারা জোর দেয়। নমশুদ্র সমাজের নারীশিক্ষা ও সমাজসংস্কারেও তাদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে মতুয়াদের ভূমিকা একসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা নমশূদ্রদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগঠিত হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়। ব্রিটিশ আমলে তারা প্রতিনিধিত্বমূলক ভোটের দাবি তোলে এবং তা আদায়ে সক্ষমও হয়।

অবিভক্ত বাংলায় অনেক নমশূদ্র নেতা, বিশেষ করে জোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট করে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের আধিপত্যের বিরোধিতা করেন। দেশভাগের সময় তারা পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল, কারণ তারা আশা করেছিল নতুন রাষ্ট্রে তারা বেশি অধিকার পাবে। কিন্তু পরে সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিপীড়নের কারণে অনেক মতুয়া পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় তিন কোটি মতুয়ার বসবাস।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদীয়া ও পূর্ব বর্ধমানে মতুয়ারা ‘কিংমেকার’ বা ভাগ্যনির্ধারকের ভূমিকা পালন করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তফসিলিদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৬৯টি। এর মধ্যে অন্তত ৩০টি আসনে মতুয়াদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। লোকসভা নির্বাচনে বনগাঁ, বারাসাত, বসিরহাট, ব্যারাকপুর এবং নদিয়া জেলার রানাঘাট ও কৃষ্ণনগর আসনে জয়ের ব্যবধান গড়ে দেয় মতুয়া ভোট।

বাংলাদেশে গোপালগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনেই মতুয়ারা একই রকম প্রভাবশালী। এ ছাড়া বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং যশোরের অভয়নগর, কেশবপুর ও মণিরামপুরেও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে হরিচাঁদ ঠাকুরের পারিবারিক উত্তরসূরি সুবর্ণা শিকদার ঠাকুরের মনোনয়ন মতুয়া সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সংসদে এই প্রথম মতুয়া প্রতিনিধি।

এর আগে বিএনপি বাগেরহাট-৪ ও বাগেরহাট-২ আসন থেকে যথাক্রমে মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্য জোটের সভাপতি সোমনাথ দে এবং সাধারণ সম্পাদক কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলকে মনোনয়ন দিয়েছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সুবর্ণা ঠাকুর গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁরা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।

হিসেব কষা রাজনৈতিক চাল

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে একটি ধারণা প্রচলিত যে, হিন্দু ভোটার এবং মতুয়ারা আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য ‘ভোট ব্যাংক’। বিএনপি এবার সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে চায়।

সুবর্ণা ঠাকুরের মনোনয়ন ইঙ্গিত দেয় যে, বিএনপি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছে। এটি কেবল একটি প্রতীকী পদক্ষেপ নয়। এটি দেশের ভেতরে সংখ্যালঘু রাজনীতির সমীকরণ বদলে দেওয়া আর সীমান্তের ওপারে নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তনের এক বৃহত্তর প্রচেষ্টা।

সুবর্ণা ঠাকুর ওড়াকান্দির প্রভাবশালী ঠাকুরবাড়ির বউ। পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরনগরের মতুয়া মহাসংঘের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক যোগাযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁকে মনোনয়ন দিয়ে বিএনপি এই বার্তা দিতে চাচ্ছে যে, বাংলাদেশের হিন্দুরা কেবল আওয়ামী লীগকেই সমর্থন করে—এমন ধারণা আর সত্য নয়।

স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপচারিতায় পশ্চিমবঙ্গের ডায়মন্ড হারবার উইমেন ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনিন্দিতা ঘোষাল বিএনপির এ পদক্ষেপকে একটি ‘কৌশলগত মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তাঁর মতে, ‘সংরক্ষিত নারী সংসদীয় আসনে বিএনপির সুবর্ণা ঠাকুরের মনোনয়ন একটি কৌশলগত ‘মাস্টারস্ট্রোক’, যা র‍্যাডক্লিফ লাইনের ওপারে ‘মতুয়া ফ্যাক্টর’-কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। মতুয়া মহাসংঘ এবং ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়ির সাথে গভীর সম্পর্কযুক্ত এমন একজনকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে—যিনি উল্লেখযোগ্যভাবে গোপালগঞ্জের বর্তমানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের একজন কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন—বিএনপি কার্যকরভাবে এই ধারণাটি ভেঙে দিচ্ছে যে বাংলাদেশের হিন্দুরা একচেটিয়াভাবে আওয়ামী লীগের অনুগত ভোট ব্যাংক।

তাঁর মতে এ পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয় যে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রশাসন হিন্দু নেতৃত্বকে ক্ষমতার অংশ করতে আগ্রহী। রক্ষণশীল অবস্থান থেকে সরে এসে বিদেশনীতির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয়ের রাজনীতির দিকে যাত্রার ইঙ্গিত এটি। তিনি আরও মনে করেন, ভারতে বিএনপির ‘সংখ্যালঘু-বিদ্বেষী’ ভাবমূর্তি কাটাতেও এই পদক্ষেপ সহায়ক হতে পারে।

প্রতীকী রাজনীতির সীমাবদ্ধতা

তবে বাংলাদেশের মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিক্রিয়া বেশ সতর্ক। বাংলাদেশ মতুয়া মহাসংঘের মহাসচিব গোপাল সাধু ঠাকুর বলেন, সুবর্ণার উত্থান ইতিবাচক হলেও এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যার সমাধান নয়।

স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপকালে গোপাল সাধু ঠাকুর সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিনের দাবির কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষা ও অর্পিত সম্পত্তি আইনের জটিলতা নিরসন, যথাযথ হিন্দু বিবাহ আইন প্রণয়ন, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন এবং হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মদিনে সরকারি ছুটি ঘোষণা।

তিনি বলেন, ‘এক বা দুজনকে মনোনয়ন দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুনির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন’।

গোপাল সাধু ঠাকুর আরও উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগ মতুয়া ও হিন্দু সম্প্রদায়কে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করলেও দাবি পূরণ করেনি।

তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আমাদের দাবিগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তারা সেগুলো বাস্তবায়ন করেনি’। মতুয়া মহাসংঘের মহাসচিব মনে করেন, বিএনপির বর্তমান জনপ্রিয়তা হিন্দুদের সঙ্গে একটি স্থায়ী সম্পর্ক তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এটি তখনই সম্ভব হবে যদি তারা স্বচ্ছ শাসন ও কল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে এই সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগী হয়। অন্যথায়, বিএনপির প্রতি এই সমর্থন দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে এর প্রভাব

সীমান্তের ওপারে পশ্চিমবঙ্গেও এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদীয়ার মতো জেলাগুলোতে সাম্প্রতিক নির্বাচনে মতুয়া ভোট বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিজেপি গত কয়েক বছর ধরে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) সামনে রেখে মতুয়াদের সমর্থন নিজেদের পকেটে পুরতে সক্ষম হয়েছে। তবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক বিশ্বজিৎ প্রসাদ তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, গাইঘাটা ও বনগাঁর মতো শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোতেও বিজেপির এই সমর্থনে ফাটল ধরছে। মতুয়াদের মধ্যে নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্ক কাজ করছে।

তাঁর মতে, সম্প্রতি ঠাকুরবাড়ি সফরের সময় বাগদা বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী সোমা ঠাকুর স্বীকার করেন যে, নির্বাচনের আগে বাদ পড়া নামগুলো পুনরায় তালিকাভুক্ত করা বাস্তবসম্মত নয়। বিশ্বজিতের মতে এর ফলে বিজেপি তার একনিষ্ঠ ভোটব্যাংক হারাতে পারে। এর উল্লেখযোগ্য একটি কারণ হচ্ছে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারের এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় মতুয়া কার্ডকে বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি।

বাংলাদেশের সুবর্ণা ঠাকুরের এই উত্থান নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছে। এটি প্রমাণ করে যে মতুয়া নেতৃত্ব এখন আর নির্দিষ্ট কোনো দল বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

অনিন্দিতা ঘোষালের মতে, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে, বিএনপির এ পদক্ষেপ উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়ার মতো জেলাগুলোর মতুয়া সম্প্রদায়ের কাছে একটি সুপরিকল্পিত সংকেত; এটি ইঙ্গিত দেয় যে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি প্রশাসন হিন্দু নেতৃত্বকে ক্ষমতার অংশীদার করতে ইচ্ছুক।

আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তনশীল চিত্র

সুবর্ণা ঠাকুরের মনোনয়ন আঞ্চলিক রাজনীতিতে মতুয়াদের অবস্থানের একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন। বিএনপির জন্য এটি আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোট ব্যাংকে আঘাত হানার একটি চেষ্টা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক দল হিসেবে তুলে ধরার প্রয়াস।

তবে এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে বিএনপির পরবর্তী কর্মকাণ্ডের ওপর। তারা যদি সত্যিই সংখ্যালঘু স্বার্থ রক্ষায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়, তবে একটি দীর্ঘস্থায়ী আস্থার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। অন্যথায়, একে কেবল পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির একটি ‘প্রতীকী চাল’ হিসেবেই দেখা হবে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত