সুমন সুবহান

২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে (১২-১৫ মে) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সম্মেলনটি কেবল গত বছরের দক্ষিণ কোরিয়া চুক্তির ধারাবাহিকতা ছিল না, বরং তা ছিল একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে নাটকীয় ভূ-রাজনৈতিক পরীক্ষার মঞ্চ।
২০২৫ সালের তীব্র বাণিজ্য যুদ্ধের পর দুই পরাশক্তি যখন শুল্ক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধবিরতির নতুন বিন্যাস খুঁজছিল, ঠিক তখনই ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং ওয়াশিংটন-তেহরান প্রত্যক্ষ সংঘাত পুরো দৃশ্যপটকে পাল্টে দেয়। পারস্য উপসাগরে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের কঠোর নৌ-অবরোধের জবাবে তেহরান কর্তৃক বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধের ঘোষণা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নজিরবিহীন কম্পন সৃষ্টি করে।
মে মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এবং সমুদ্রতলের সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্ক ধ্বংসের হুমকি পশ্চিমা লজিস্টিকস ও ডিজিটাল ফাইন্যান্সকে সম্পূর্ণ পঙ্গুত্বের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। ঠিক এই পটভূমিতে ট্রাম্পের বেইজিং পৌঁছানোর মাত্র এক সপ্তাহ আগে (৬ মে) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির চীন সফর এবং বেইজিংয়ের কাছ থেকে বিআরআই ও ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় একটি শক্তিশালী ‘কূটনৈতিক ঢাল’ অর্জন ওয়াশিংটনের হিসাব-নিকাশ আরও জটিল করে তোলে। ফলশ্রুতিতে মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র মূল্যস্ফীতি ও গ্যালন প্রতি গ্যাসের দাম ৫ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছানোর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ মাথায় নিয়ে ট্রাম্প যখন শি জিনপিংয়ের মুখোমুখি হন, তখন তার মূল এজেন্ডা ছিল চীনের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা।
অন্যদিকে চীন তার বিশাল কৌশলগত তেলের রিজার্ভ এবং রাশিয়ার সঙ্গে সাইবেরিয়ান পাইপলাইন সংযোগের কারণে এই সংকট আমেরিকার চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়তার সঙ্গে সামাল দিয়ে জ্বালানি ভূ-রাজনীতিতে একচেটিয়া ‘আপার হ্যান্ড’ বা সুবিধাজনক অবস্থান ভোগ করছিল।
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধের এই ঘটনাটি কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি সমকালীন বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়া এক নজিরবিহীন ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকম্প। ট্রাম্প-শি সম্মেলনের ঠিক আগমুহূর্তে তেলের বাজারের এই তীব্র অস্থিরতা ওয়াশিংটনের ওপর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ যেমন বাড়িয়ে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি বেইজিংয়ের দরকষাকষির শক্তিকে এনে দিয়েছিল এক কৌশলগত সুবিধা।
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান এই জলপথটি আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তী রুটে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ট্রানজিট সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে, যা বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ। এই অচলাবস্থার কারণে চীনের দৈনিক প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেল এবং ভারতের প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির উৎপাদন চেইনকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। সংকটের আগুনে ঘি ঢেলে মে মাসের শুরুতেই মার্কিন ৫ম নৌবহর পারস্য উপসাগরে অতিরিক্ত রণতরী মোতায়েন করে ইরানের বন্দর আব্বাস এবং চাবাহার পোর্টের ওপর পূর্ণাঙ্গ নৌ-অবরোধ কার্যকর করে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল তেল সরবরাহ বন্ধই হয়নি, বরং আন্তর্জাতিক শিপিং ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম এক লাফে প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়ে গিয়ে বৈশ্বিক লজিস্টিকস খাতকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেয়। ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইনগুলো দিয়ে মোট ঘাটতির মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সামাল দেওয়া সম্ভব হওয়ায় বিশ্ববাজার এক দীর্ঘমেয়াদি এবং অপরিবর্তনীয় জ্বালানি সংকটের মুখে পতিত হয়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের পর মে মাসের শুরুতেই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১১৪ ডলার এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের মূল্য ১০৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা প্রাক-যুদ্ধ পরিস্থিতির তুলনায় প্রায় ৯৪ শতাংশ বেশি এবং ২০০৮ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল জরুরি কৌশলগত তেল রিজার্ভ অবমুক্ত করার ঘোষণা দিলেও তা বাজারের আতঙ্ক কমাতে ব্যর্থ হয়।
একই সময়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নীতিমালার অধীনে মার্কিন প্রশাসন রাশিয়ার উরালস ক্রুডের ওপর থেকে আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে বিকল্প সরবরাহের চেষ্টা করে, কিন্তু লজিস্টিকস জটিলতার কারণে তা বাজারে তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনতে পারেনি। ফলে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসেও ডব্লিউটিআই ক্রুড প্রতি ব্যারেল ১০২ ডলারের ওপরেই স্থির থাকে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যালন প্রতি গ্যাসের দাম রেকর্ড ৫ দশমিক ৫০ ডলারে উন্নীত করে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। চীনের তেল শোধনাগারগুলো এই সংকটের মাঝেও রাশিয়ার কাছ থেকে ডিসকাউন্টে তেল কিনে নিজেদের রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখায় তারা অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকার চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ঠিক এই নজিরবিহীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও তীব্র অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপ মাথায় নিয়েই ট্রাম্প বেইজিংয়ে পা রাখেন, যেখানে তার মূল ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্যই ছিল চীনের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা, যেন বেইজিং তেহরানকে তাদের বিআরআই ফান্ডিং বন্ধের হুমকি দিয়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য করে।
ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক সাত দিন আগে, ৬ মে ২০২৬ তারিখে তেহরানের প্রধান কূটনীতিকের বেইজিং মিশনটি ছিল একটি অত্যন্ত নিখুঁত ও সময়োপযোগী ভূ-রাজনৈতিক চাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ এবং অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে ইরান যখন কোণঠাসা, তখন বেইজিংয়ের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি বিশ্বমঞ্চে চীনের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানে ওয়াশিংটনের একক আধিপত্যের দিন শেষ এবং চীনের মধ্যস্থতা বা সম্মতি ছাড়া এই অঞ্চলের কোনো স্থায়ী সমীকরণ সম্ভব নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘গ্র্যান্ড বার্গেন’ বা কোনো গোপন বাণিজ্য চুক্তির দরকষাকষিতে চীন যাতে ইরানকে একতরফাভাবে কোণঠাসা না করে, সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তেহরান এই কৌশলগত কূটনৈতিক মিশন পরিচালনা করে। ইরানের মূল লক্ষ্য ছিল চীনের বিশাল জ্বালানি বাজারের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ এবং বিআরআই প্রকল্পের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বেইজিংয়ের কাছ থেকে একটি শক্তিশালী ‘কূটনৈতিক ঢাল’ আদায় করা।
মার্কিন নৌ-অবরোধের মুখে ইরান ভালো করেই জানত যে, ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপকে রুখে দেওয়ার মতো একমাত্র বৈশ্বিক আর্থিক ও রাজনৈতিক লিভারেজ রয়েছে কেবল চীনের হাতেই। একই সঙ্গে, তেহরান চীনের নীতিনির্ধারকদের এই বার্তা দিতে সক্ষম হয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিরোধ অক্ষ ভেঙে পড়লে এই অঞ্চলে মার্কিন একক আধিপত্য পুনরুজ্জীবিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে চীনের নিজস্ব বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের নীতিকে সরাসরি আঘাত করবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে বেইজিং স্পষ্ট করে দেয় যে, মার্কিন চাপের মুখে তারা তেহরানের সাথে ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ৪০০ বিলিয়ন ডলারের ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প থেকে সরে আসবে না। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই অত্যন্ত সুকৌশলে মার্কিন একতরফা অর্থনৈতিক অবরোধের তীব্র বিরোধিতা করে ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি বেইজিংয়ের রাজনৈতিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন, যা তেহরানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়।
তবে এই ‘কূটনৈতিক ঢাল’ দেওয়ার পাশাপাশি চীন অত্যন্ত বাস্তববাদী ও কঠোর অবস্থানও প্রদর্শন করেছে; ওয়াং ই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা চীনের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের জন্য এক বিরাট হুমকি।
চীনের সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পারস্য উপসাগরের তেলের ওপর তাদের যে গভীর নির্ভরতা, তা কোনোভাবেই ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না—এই বার্তাটি ইরানকে শক্তভাবে দেওয়া হয়। বেইজিং তেহরানকে সাফ জানিয়ে দেয় যে, চীন মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের বিরোধী হলেও তারা হরমুজ প্রণালিতে অবিলম্বে ‘নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ এবং একটি টেকসই যুদ্ধবিরতির পক্ষে। চীন এখানে নিখুঁত ভারসাম্য নীতি বজায় রেখেছে; তারা একদিকে যেমন ইরানকে আমেরিকার হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতি সচল রাখতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য তেহরানের ওপর পর্দার আড়ালে কার্যকর কূটনৈতিক চাপও বজায় রেখেছে।
১৪ মে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি ছিল মূলত দুই পরাশক্তির নিজ নিজ বৈশ্বিক এজেন্ডা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের এক জটিল দ্বৈরথ। ওয়াশিংটন যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার পাশাপাশি মার্কিন বাণিজ্য সম্প্রসারণকে তাদের মূল এজেন্ডা করেছিল, বেইজিং তখন অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে তাইওয়ান ইস্যুকে তাদের অলঙ্ঘনীয় ‘রেডলাইন’ হিসেবে সামনে এনে ট্রাম্প প্রশাসনকে শুরুতেই এক মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলে দেয়।
ইরান ও হরমুজ সংকটের তীব্রতা বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে—এই অভিন্ন উদ্বেগের জায়গায় দুই নেতাই একমত হলেও, সেই সংকট সমাধানের পথ এবং কৌশলগত সমীকরণে উভয়ের মধ্যকার মেরুকরণ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও গভীর। শেষ পর্যন্ত এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি প্রমাণ করেছে যে, বিশ্বশান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই পরাশক্তি এক টেবিলে বসলেও, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একক আধিপত্য বনাম চীনের বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুদূরপ্রসারী দ্বন্দ্বটি অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।
হোয়াইট হাউস এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উভয়েরই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং আকাশচুম্বী তেলের দাম কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়, বরং তা বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সরাসরি পরিপন্থী। দুই পরাশক্তিই এই বিষয়ে একমত হয়েছে যে, ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের সংযোগস্থলে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল দ্রুত ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি, কারণ হরমুজের অচলাবস্থা কেবল পশ্চিমা বিশ্ব নয়, চীনের বিশাল জ্বালানি সরবরাহকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে।
এর পাশাপাশি, দুই নেতা লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলের সমুদ্রতলের সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন, যা বর্তমান বিশ্বের ডিজিটাল ফাইন্যান্স ও ইন্টারনেট যোগাযোগের মূল লাইফলাইন। বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়া এবং সাইবার ও সামুদ্রিক অবকাঠামো ধ্বংসের মতো অপতৎপরতা যেকোনো মূল্যে রোধ করতে হবে—এই অভিন্ন উদ্বেগ থেকে দুই পরাশক্তি সংকটকালীন একটি গোপন ‘হটলাইন’ বা বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখতে সম্মত হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে দুই পরাশক্তি কিছু বিষয়ে একমত হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনীতি এবং সংকট সমাধানের মূল পন্থায় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে এক গভীর ও অলঙ্ঘনীয় ফাটল দৃশ্যমান হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে ইরানের ওপর ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা সর্বোচ্চ চাপের নীতি পুনর্ব্যক্ত করে আরও কঠোর সামরিক অবরোধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে তেহরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে বদ্ধপরিকর, বেইজিং তখন এর তীব্র বিরোধিতা করে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সমাধান এবং অবিলম্বে শর্তহীন যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
চীন খুব স্পষ্টভাবে ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দিয়েছে যে, একতরফা সামরিক শক্তিপ্রয়োগ কিংবা অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল কখনো কোনো রাজনৈতিক সংকটের টেকসই সমাধান আনতে পারে না, বরং তা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও অনিয়ন্ত্রিত করে তুলবে। অমিলের এই রূপটি আরও বড় আকার ধারণ করেছে চীনের প্রস্তাবিত ‘নতুন যুদ্ধোত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো’ নিয়ে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিজস্ব নেতৃত্ব ও চীনের মধ্যস্থতায় একটি বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা বলয় গড়ার কথা বলা হয়েছে। বেইজিংয়ের এই কৌশলগত প্রস্তাবটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা মার্কিন একক সামরিক আধিপত্য, ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি এবং পেট্রোডলারের একচেটিয়া প্রভাবকে সরাসরি ও প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছোড়ে।
ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি বসার ক্ষেত্রে শি জিনপিং স্পষ্টতই একটি সুবিধাজনক বা ‘আপার হ্যান্ড’ অবস্থানে ছিলেন, যার মূল ভিত্তি ছিল চীনের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্থিতিস্থাপকতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এবং রেকর্ড পরিমাণ তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নিজ দেশে চরম রাজনৈতিক চাপের মুখে ছিল, বেইজিং তখন তার কৌশলগত দূরদর্শিতার ফল ভোগ করছিল।
চীন তাদের বিশাল ও গোপন ‘কৌশলগত তেলের রিজার্ভ’ এবং রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে সরাসরি সংযুক্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধের এই বৈশ্বিক ধাক্কা আমেরিকার চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়তার সাথে সামাল দিতে পেরেছে। চীনের এই শক্তিশালী অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসগুলো ট্রাম্পের চরম বাণিজ্য ও শুল্ক হুমকির বিরুদ্ধে শি জিনপিংয়ের দরকষাকষির ক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সফরে বেইজিংকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন যেন চীন তাদের অর্থনৈতিক লিভারেজ ব্যবহার করে ইরানকে বৈশ্বিক একাকিত্ব ও আর্থিক দেউলিয়াত্বের ভয় দেখায় এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য করে।
কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রেসক্রিপশনের কাছে নতি স্বীকার না করে চীন ইরানের ওপর কোনো ধরনের একতরফা চাপ সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়। বেইজিং ওয়াশিংটনকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও ভূ-রাজনীতির চাবিকাঠি এখন আর এককভাবে হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণে নেই, বরং বেইজিং এখন বিশ্ববাজারের সরবরাহ ও কূটনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণের প্রধান চালিকাশক্তি।
বিপুল সংখ্যক শীর্ষস্থানীয় মার্কিন সিইও (যার মধ্যে অ্যাপল, এনভিডিয়া ও টেসলার প্রধানরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন) নিয়ে ট্রাম্পের এই বেইজিং সফরটি চীনের সাথে একটি ‘বিজনেস-ফার্স্ট’ বা বাণিজ্য-কেন্দ্রিক বাস্তবসম্মত সম্পর্ক সচল রাখার ক্ষেত্রে বরফ গলাতে কিছুটা সফল হলেও, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইরান ইস্যুতে কোনো স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক ব্রেকথ্রু আনতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে চীনের গভীর কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড কাঠামোর সুদূরপ্রসারী স্বার্থের কারণে বেইজিং তেহরানকে ওয়াশিংটনের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সম্পূর্ণ ত্যাগ করেনি। তবে বর্তমান এই তীব্র সংকটের মাঝেও সরাসরি সামরিক দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে দুই পরাশক্তি যেভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একটি প্রাথমিক বোঝাপড়া তৈরি করেছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই জ্বালানি সংকট ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্যকে এক নতুন মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে পেট্রোডলারের একচেটিয়া আধিপত্য ক্রমান্বয়ে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বলয়ের কাছে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
আগামী দিনগুলোতে যদি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘হটলাইন’ যোগাযোগ হরমুজ প্রণালিকে আংশিকভাবেও উন্মুক্ত করতে সফল হয়, তবে তা বৈশ্বিক লজিস্টিকস খাতের জন্য স্বস্তি আনবে; অন্যথায়, চীনের এই ‘আপার হ্যান্ড’ অবস্থান এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে তার একতরফা সামরিক রণকৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। ট্রাম্প-শি সম্মেলনটি কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি না হলেও, এটি একবিংশ শতাব্দীর দুই প্রধান পরাশক্তির মধ্যে নিজ নিজ স্বার্থ ও অবস্থান ধরে রেখে এক চরম বৈশ্বিক উত্তেজনার মুখে দ্বিপাক্ষিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নতুন রূপরেখা তৈরি করেছে।

২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে (১২-১৫ মে) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সম্মেলনটি কেবল গত বছরের দক্ষিণ কোরিয়া চুক্তির ধারাবাহিকতা ছিল না, বরং তা ছিল একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে নাটকীয় ভূ-রাজনৈতিক পরীক্ষার মঞ্চ।
২০২৫ সালের তীব্র বাণিজ্য যুদ্ধের পর দুই পরাশক্তি যখন শুল্ক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধবিরতির নতুন বিন্যাস খুঁজছিল, ঠিক তখনই ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং ওয়াশিংটন-তেহরান প্রত্যক্ষ সংঘাত পুরো দৃশ্যপটকে পাল্টে দেয়। পারস্য উপসাগরে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের কঠোর নৌ-অবরোধের জবাবে তেহরান কর্তৃক বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধের ঘোষণা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নজিরবিহীন কম্পন সৃষ্টি করে।
মে মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এবং সমুদ্রতলের সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্ক ধ্বংসের হুমকি পশ্চিমা লজিস্টিকস ও ডিজিটাল ফাইন্যান্সকে সম্পূর্ণ পঙ্গুত্বের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। ঠিক এই পটভূমিতে ট্রাম্পের বেইজিং পৌঁছানোর মাত্র এক সপ্তাহ আগে (৬ মে) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির চীন সফর এবং বেইজিংয়ের কাছ থেকে বিআরআই ও ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় একটি শক্তিশালী ‘কূটনৈতিক ঢাল’ অর্জন ওয়াশিংটনের হিসাব-নিকাশ আরও জটিল করে তোলে। ফলশ্রুতিতে মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র মূল্যস্ফীতি ও গ্যালন প্রতি গ্যাসের দাম ৫ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছানোর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ মাথায় নিয়ে ট্রাম্প যখন শি জিনপিংয়ের মুখোমুখি হন, তখন তার মূল এজেন্ডা ছিল চীনের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা।
অন্যদিকে চীন তার বিশাল কৌশলগত তেলের রিজার্ভ এবং রাশিয়ার সঙ্গে সাইবেরিয়ান পাইপলাইন সংযোগের কারণে এই সংকট আমেরিকার চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়তার সঙ্গে সামাল দিয়ে জ্বালানি ভূ-রাজনীতিতে একচেটিয়া ‘আপার হ্যান্ড’ বা সুবিধাজনক অবস্থান ভোগ করছিল।
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধের এই ঘটনাটি কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি সমকালীন বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়া এক নজিরবিহীন ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকম্প। ট্রাম্প-শি সম্মেলনের ঠিক আগমুহূর্তে তেলের বাজারের এই তীব্র অস্থিরতা ওয়াশিংটনের ওপর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ যেমন বাড়িয়ে দিয়েছিল, ঠিক তেমনি বেইজিংয়ের দরকষাকষির শক্তিকে এনে দিয়েছিল এক কৌশলগত সুবিধা।
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান এই জলপথটি আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তী রুটে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ট্রানজিট সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে, যা বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ। এই অচলাবস্থার কারণে চীনের দৈনিক প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেল এবং ভারতের প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির উৎপাদন চেইনকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। সংকটের আগুনে ঘি ঢেলে মে মাসের শুরুতেই মার্কিন ৫ম নৌবহর পারস্য উপসাগরে অতিরিক্ত রণতরী মোতায়েন করে ইরানের বন্দর আব্বাস এবং চাবাহার পোর্টের ওপর পূর্ণাঙ্গ নৌ-অবরোধ কার্যকর করে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল তেল সরবরাহ বন্ধই হয়নি, বরং আন্তর্জাতিক শিপিং ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম এক লাফে প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়ে গিয়ে বৈশ্বিক লজিস্টিকস খাতকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেয়। ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইনগুলো দিয়ে মোট ঘাটতির মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সামাল দেওয়া সম্ভব হওয়ায় বিশ্ববাজার এক দীর্ঘমেয়াদি এবং অপরিবর্তনীয় জ্বালানি সংকটের মুখে পতিত হয়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের পর মে মাসের শুরুতেই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১১৪ ডলার এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের মূল্য ১০৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা প্রাক-যুদ্ধ পরিস্থিতির তুলনায় প্রায় ৯৪ শতাংশ বেশি এবং ২০০৮ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল জরুরি কৌশলগত তেল রিজার্ভ অবমুক্ত করার ঘোষণা দিলেও তা বাজারের আতঙ্ক কমাতে ব্যর্থ হয়।
একই সময়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নীতিমালার অধীনে মার্কিন প্রশাসন রাশিয়ার উরালস ক্রুডের ওপর থেকে আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে বিকল্প সরবরাহের চেষ্টা করে, কিন্তু লজিস্টিকস জটিলতার কারণে তা বাজারে তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনতে পারেনি। ফলে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসেও ডব্লিউটিআই ক্রুড প্রতি ব্যারেল ১০২ ডলারের ওপরেই স্থির থাকে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যালন প্রতি গ্যাসের দাম রেকর্ড ৫ দশমিক ৫০ ডলারে উন্নীত করে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। চীনের তেল শোধনাগারগুলো এই সংকটের মাঝেও রাশিয়ার কাছ থেকে ডিসকাউন্টে তেল কিনে নিজেদের রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখায় তারা অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকার চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। ঠিক এই নজিরবিহীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও তীব্র অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপ মাথায় নিয়েই ট্রাম্প বেইজিংয়ে পা রাখেন, যেখানে তার মূল ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্যই ছিল চীনের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা, যেন বেইজিং তেহরানকে তাদের বিআরআই ফান্ডিং বন্ধের হুমকি দিয়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য করে।
ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক সাত দিন আগে, ৬ মে ২০২৬ তারিখে তেহরানের প্রধান কূটনীতিকের বেইজিং মিশনটি ছিল একটি অত্যন্ত নিখুঁত ও সময়োপযোগী ভূ-রাজনৈতিক চাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ এবং অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে ইরান যখন কোণঠাসা, তখন বেইজিংয়ের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি বিশ্বমঞ্চে চীনের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানে ওয়াশিংটনের একক আধিপত্যের দিন শেষ এবং চীনের মধ্যস্থতা বা সম্মতি ছাড়া এই অঞ্চলের কোনো স্থায়ী সমীকরণ সম্ভব নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘গ্র্যান্ড বার্গেন’ বা কোনো গোপন বাণিজ্য চুক্তির দরকষাকষিতে চীন যাতে ইরানকে একতরফাভাবে কোণঠাসা না করে, সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তেহরান এই কৌশলগত কূটনৈতিক মিশন পরিচালনা করে। ইরানের মূল লক্ষ্য ছিল চীনের বিশাল জ্বালানি বাজারের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ এবং বিআরআই প্রকল্পের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বেইজিংয়ের কাছ থেকে একটি শক্তিশালী ‘কূটনৈতিক ঢাল’ আদায় করা।
মার্কিন নৌ-অবরোধের মুখে ইরান ভালো করেই জানত যে, ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপকে রুখে দেওয়ার মতো একমাত্র বৈশ্বিক আর্থিক ও রাজনৈতিক লিভারেজ রয়েছে কেবল চীনের হাতেই। একই সঙ্গে, তেহরান চীনের নীতিনির্ধারকদের এই বার্তা দিতে সক্ষম হয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিরোধ অক্ষ ভেঙে পড়লে এই অঞ্চলে মার্কিন একক আধিপত্য পুনরুজ্জীবিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে চীনের নিজস্ব বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের নীতিকে সরাসরি আঘাত করবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে বেইজিং স্পষ্ট করে দেয় যে, মার্কিন চাপের মুখে তারা তেহরানের সাথে ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ৪০০ বিলিয়ন ডলারের ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প থেকে সরে আসবে না। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই অত্যন্ত সুকৌশলে মার্কিন একতরফা অর্থনৈতিক অবরোধের তীব্র বিরোধিতা করে ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি বেইজিংয়ের রাজনৈতিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন, যা তেহরানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়।
তবে এই ‘কূটনৈতিক ঢাল’ দেওয়ার পাশাপাশি চীন অত্যন্ত বাস্তববাদী ও কঠোর অবস্থানও প্রদর্শন করেছে; ওয়াং ই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা চীনের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের জন্য এক বিরাট হুমকি।
চীনের সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পারস্য উপসাগরের তেলের ওপর তাদের যে গভীর নির্ভরতা, তা কোনোভাবেই ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না—এই বার্তাটি ইরানকে শক্তভাবে দেওয়া হয়। বেইজিং তেহরানকে সাফ জানিয়ে দেয় যে, চীন মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের বিরোধী হলেও তারা হরমুজ প্রণালিতে অবিলম্বে ‘নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ এবং একটি টেকসই যুদ্ধবিরতির পক্ষে। চীন এখানে নিখুঁত ভারসাম্য নীতি বজায় রেখেছে; তারা একদিকে যেমন ইরানকে আমেরিকার হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতি সচল রাখতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য তেহরানের ওপর পর্দার আড়ালে কার্যকর কূটনৈতিক চাপও বজায় রেখেছে।
১৪ মে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি ছিল মূলত দুই পরাশক্তির নিজ নিজ বৈশ্বিক এজেন্ডা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের এক জটিল দ্বৈরথ। ওয়াশিংটন যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার পাশাপাশি মার্কিন বাণিজ্য সম্প্রসারণকে তাদের মূল এজেন্ডা করেছিল, বেইজিং তখন অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে তাইওয়ান ইস্যুকে তাদের অলঙ্ঘনীয় ‘রেডলাইন’ হিসেবে সামনে এনে ট্রাম্প প্রশাসনকে শুরুতেই এক মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলে দেয়।
ইরান ও হরমুজ সংকটের তীব্রতা বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে—এই অভিন্ন উদ্বেগের জায়গায় দুই নেতাই একমত হলেও, সেই সংকট সমাধানের পথ এবং কৌশলগত সমীকরণে উভয়ের মধ্যকার মেরুকরণ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও গভীর। শেষ পর্যন্ত এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি প্রমাণ করেছে যে, বিশ্বশান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই পরাশক্তি এক টেবিলে বসলেও, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একক আধিপত্য বনাম চীনের বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুদূরপ্রসারী দ্বন্দ্বটি অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।
হোয়াইট হাউস এবং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উভয়েরই আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং আকাশচুম্বী তেলের দাম কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়, বরং তা বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সরাসরি পরিপন্থী। দুই পরাশক্তিই এই বিষয়ে একমত হয়েছে যে, ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের সংযোগস্থলে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল দ্রুত ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি, কারণ হরমুজের অচলাবস্থা কেবল পশ্চিমা বিশ্ব নয়, চীনের বিশাল জ্বালানি সরবরাহকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে।
এর পাশাপাশি, দুই নেতা লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলের সমুদ্রতলের সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন, যা বর্তমান বিশ্বের ডিজিটাল ফাইন্যান্স ও ইন্টারনেট যোগাযোগের মূল লাইফলাইন। বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়া এবং সাইবার ও সামুদ্রিক অবকাঠামো ধ্বংসের মতো অপতৎপরতা যেকোনো মূল্যে রোধ করতে হবে—এই অভিন্ন উদ্বেগ থেকে দুই পরাশক্তি সংকটকালীন একটি গোপন ‘হটলাইন’ বা বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখতে সম্মত হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে দুই পরাশক্তি কিছু বিষয়ে একমত হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনীতি এবং সংকট সমাধানের মূল পন্থায় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে এক গভীর ও অলঙ্ঘনীয় ফাটল দৃশ্যমান হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে ইরানের ওপর ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা সর্বোচ্চ চাপের নীতি পুনর্ব্যক্ত করে আরও কঠোর সামরিক অবরোধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে তেহরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে বদ্ধপরিকর, বেইজিং তখন এর তীব্র বিরোধিতা করে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সমাধান এবং অবিলম্বে শর্তহীন যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
চীন খুব স্পষ্টভাবে ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দিয়েছে যে, একতরফা সামরিক শক্তিপ্রয়োগ কিংবা অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল কখনো কোনো রাজনৈতিক সংকটের টেকসই সমাধান আনতে পারে না, বরং তা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও অনিয়ন্ত্রিত করে তুলবে। অমিলের এই রূপটি আরও বড় আকার ধারণ করেছে চীনের প্রস্তাবিত ‘নতুন যুদ্ধোত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো’ নিয়ে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিজস্ব নেতৃত্ব ও চীনের মধ্যস্থতায় একটি বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা বলয় গড়ার কথা বলা হয়েছে। বেইজিংয়ের এই কৌশলগত প্রস্তাবটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা মার্কিন একক সামরিক আধিপত্য, ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি এবং পেট্রোডলারের একচেটিয়া প্রভাবকে সরাসরি ও প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছোড়ে।
ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি বসার ক্ষেত্রে শি জিনপিং স্পষ্টতই একটি সুবিধাজনক বা ‘আপার হ্যান্ড’ অবস্থানে ছিলেন, যার মূল ভিত্তি ছিল চীনের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্থিতিস্থাপকতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এবং রেকর্ড পরিমাণ তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে নিজ দেশে চরম রাজনৈতিক চাপের মুখে ছিল, বেইজিং তখন তার কৌশলগত দূরদর্শিতার ফল ভোগ করছিল।
চীন তাদের বিশাল ও গোপন ‘কৌশলগত তেলের রিজার্ভ’ এবং রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে সরাসরি সংযুক্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধের এই বৈশ্বিক ধাক্কা আমেরিকার চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়তার সাথে সামাল দিতে পেরেছে। চীনের এই শক্তিশালী অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসগুলো ট্রাম্পের চরম বাণিজ্য ও শুল্ক হুমকির বিরুদ্ধে শি জিনপিংয়ের দরকষাকষির ক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সফরে বেইজিংকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন যেন চীন তাদের অর্থনৈতিক লিভারেজ ব্যবহার করে ইরানকে বৈশ্বিক একাকিত্ব ও আর্থিক দেউলিয়াত্বের ভয় দেখায় এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য করে।
কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রেসক্রিপশনের কাছে নতি স্বীকার না করে চীন ইরানের ওপর কোনো ধরনের একতরফা চাপ সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়। বেইজিং ওয়াশিংটনকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও ভূ-রাজনীতির চাবিকাঠি এখন আর এককভাবে হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণে নেই, বরং বেইজিং এখন বিশ্ববাজারের সরবরাহ ও কূটনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণের প্রধান চালিকাশক্তি।
বিপুল সংখ্যক শীর্ষস্থানীয় মার্কিন সিইও (যার মধ্যে অ্যাপল, এনভিডিয়া ও টেসলার প্রধানরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন) নিয়ে ট্রাম্পের এই বেইজিং সফরটি চীনের সাথে একটি ‘বিজনেস-ফার্স্ট’ বা বাণিজ্য-কেন্দ্রিক বাস্তবসম্মত সম্পর্ক সচল রাখার ক্ষেত্রে বরফ গলাতে কিছুটা সফল হলেও, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইরান ইস্যুতে কোনো স্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক ব্রেকথ্রু আনতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে চীনের গভীর কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড কাঠামোর সুদূরপ্রসারী স্বার্থের কারণে বেইজিং তেহরানকে ওয়াশিংটনের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সম্পূর্ণ ত্যাগ করেনি। তবে বর্তমান এই তীব্র সংকটের মাঝেও সরাসরি সামরিক দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে দুই পরাশক্তি যেভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একটি প্রাথমিক বোঝাপড়া তৈরি করেছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই জ্বালানি সংকট ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্যকে এক নতুন মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে পেট্রোডলারের একচেটিয়া আধিপত্য ক্রমান্বয়ে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বলয়ের কাছে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
আগামী দিনগুলোতে যদি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘হটলাইন’ যোগাযোগ হরমুজ প্রণালিকে আংশিকভাবেও উন্মুক্ত করতে সফল হয়, তবে তা বৈশ্বিক লজিস্টিকস খাতের জন্য স্বস্তি আনবে; অন্যথায়, চীনের এই ‘আপার হ্যান্ড’ অবস্থান এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে তার একতরফা সামরিক রণকৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। ট্রাম্প-শি সম্মেলনটি কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি না হলেও, এটি একবিংশ শতাব্দীর দুই প্রধান পরাশক্তির মধ্যে নিজ নিজ স্বার্থ ও অবস্থান ধরে রেখে এক চরম বৈশ্বিক উত্তেজনার মুখে দ্বিপাক্ষিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নতুন রূপরেখা তৈরি করেছে।

দেশের অধিকাংশ কৃষক-উৎপাদকের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। পণ্য আছে, দক্ষ হাতও আছে, কিন্তু বাজারে পৌঁছানোর কার্যকর পথ নেই। সেই পথ তৈরির লক্ষ্য নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নেতৃত্ব এবার সামনে এনেছে ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট বা ওভিওপি উদ্যোগ।
১৯ মিনিট আগে
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়কালটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক প্রলয়ঙ্কারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যেখানে ইসরায়েল-আমেরিকার সরাসরি ইরান অভিমুখে সামরিক অভিযান বিশ্বব্যবস্থাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
১ দিন আগে
চুক্তিতে একটি সুস্পষ্ট ‘এক্সিট ক্লজ’ বা বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে মাত্র ৬০ দিনের নোটিশে চুক্তি বাতিল করতে পারবে। অর্থাৎ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভবিষ্যৎ কোনো সংসদকে এই চুক্তির বেড়াজালে বেঁধে রাখেনি।
১ দিন আগে
সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখার জন্য একটি সরকারকে কতটা সময় দেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর যখন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, তখনও প্রশ্নটা সামনে আসে। এর নিষ্পত্তি একেকজন একেকভাবে করেছিলেন। তবে দেশের সাধারণ মানুষ যেকোনো সরকারের মনোভাব বুঝতে চায় তার দায়িত্ব গ্রহণের দিন থ
১ দিন আগে