ফুটনোট - পর্ব ১০২

মার্কিন-বাংলাদেশ শুল্ক চুক্তি বিতর্ক: কিন্তু সেদিনের বিকল্প কী ছিল?

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

অবশেষে সংসদে এমন একজন কথা বলার মানুষ পাওয়া গেল, যিনি মার্কিন-বাংলাদেশ শুল্ক চুক্তির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছেন। এজন্য সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

এই চুক্তি নিয়ে লেখার জন্য আমি হয়তো সবচেয়ে নিরপেক্ষ ব্যক্তি নই, সে বিষয়ে আমি সচেতন। মেঘালয়ার উইকেন্ডার ফেস্টিভ্যালের স্লোগান ধার করে বলতে চাই, ‘I was there’। হয়তো আলোচনার টেবিলে সরাসরি উপস্থিত ছিলাম না, কিন্তু ছিলাম তার খুব কাছেই।

দায়িত্ব ছাড়ার পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিটি নীতির রক্ষাকর্তা হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। সরকারগুলো, এমনকি অসাধারণ পরিস্থিতিতে পরিচালিত সুনিয়তসম্পন্ন সরকারগুলোও ভুল করে থাকে। সেইসব ভুলের সৎ ও গঠনমূলক পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু গঠনমূলক পর্যালোচনা আর সামাজিক মাধ্যমে বিচার এক জিনিস নয়। আমার আশঙ্কা, আমরা বিতর্কের জায়গা থেকে বের হয়ে ‘ভুল তথ্য’ (মিস ইনফরমেশন) এবং অপতথ্যের (ডিস ইনফরমেশন) রাজ্যে প্রবেশ করছি।

আসুন, সেদিনের প্রকৃত বাস্তবতা একবার স্মরণ করা যাক। সময়টা এপ্রিল, ২০২৫। ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭% পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। দেশের চল্লিশ লক্ষ পোশাকশ্রমিক এক ভয়াবহ বাণিজ্য সংকটের মুখোমুখি। সপ্তাহ গড়াচ্ছে, আর ক্রেতাদের আস্থা কমে আসছে। এর মধ্যেই ভিয়েতনাম ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেছে, কম্বোডিয়াও আলোচনার টেবিলে। আঞ্চলিক প্রতিযোগীরা যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে থাকবে, নাকি পিছিয়ে পড়বে—সারা বিশ্ব তা পর্যবেক্ষণ করছে। সেই সংকটময় মুহূর্তে, দলীয় কাঠামোর সুবিধা এবং দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার বিলাসিতা ছাড়াই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছিল। আজকের সমালোচকরা হয় সেই কঠিন পরিস্থিতি ভুলে গেছেন, অথবা সচেতনভাবেই বিস্মৃত হতে চাইছেন।

চুক্তিতে একটি সুস্পষ্ট ‘এক্সিট ক্লজ’ বা বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে মাত্র ৬০ দিনের নোটিশে চুক্তি বাতিল করতে পারবে। অর্থাৎ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভবিষ্যৎ কোনো সংসদকে এই চুক্তির বেড়াজালে বেঁধে রাখেনি।

এখন সমালোচনার কিছু দিক খতিয়ে দেখা যাক। সিপিডি এই চুক্তিকে ‘অত্যন্ত বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। কিন্তু মূল আপত্তির জায়গাটা হলো, বলা হচ্ছে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই চুক্তি করার ‘ম্যান্ডেট’ ছিল না। এই যুক্তি তোলার সময় আমরা আবারও ভুলে যাচ্ছি, কোন পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে এই সরকার দেশের হাল ধরেছিল। ‘দেশের সাংবিধানিকভাবে আদর্শ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করা উচিত ছিল’—এই যুক্তি সেমিনার কক্ষে শুনতে ভালো লাগতে পারে, কিন্তু যেখানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের ভাগ্য ঝুলছে, সেই বাস্তবতার মাঠে এটি অচল।

উপরন্তু, চুক্তিতে একটি সুস্পষ্ট ‘এক্সিট ক্লজ’ বা বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে মাত্র ৬০ দিনের নোটিশে চুক্তি বাতিল করতে পারবে। অর্থাৎ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভবিষ্যৎ কোনো সংসদকে এই চুক্তির বেড়াজালে বেঁধে রাখেনি। যদি চুক্তিটি এতই সমস্যাজনক হয়, তবে আজই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে এটি বাতিলের দাবি জানানো হচ্ছে না কেন?

চুক্তি আলোচনায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি নিজেই বলেছেন, “চুক্তিতে প্রবেশ এবং প্রস্থান ধারা রয়েছে এবং সরকার ইচ্ছা করলে এটি পর্যালোচনা করতে পারে।”

বিকেএমইএ-র মোহাম্মদ হাতেম চুক্তির অসামঞ্জস্যতা নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ৬,৭১০টি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধার বিপরীতে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ১,৬৩৮টি পণ্যের জন্য। এটি একটি ন্যায্য পর্যবেক্ষণ এবং পর্যালোচনার দাবি রাখে। কিন্তু যা বলা হচ্ছে না, তা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের ওই ৬,৭১০টি পণ্যের একটি বড় অংশ, যেমন: গম, সয়া বা এলএনজি, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন উৎস থেকে বিশ্ববাজার দরেই আমদানি করছিল। এই চুক্তিটি দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতাকে বিসর্জন দেয়নি, বরং আগে থেকে চলমান একটি ক্রয় প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে মাত্র।

সেই সংকটময় মুহূর্তে, দলীয় কাঠামোর সুবিধা এবং দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার বিলাসিতা ছাড়াই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছিল। আজকের সমালোচকরা হয় সেই কঠিন পরিস্থিতি ভুলে গেছেন, অথবা সচেতনভাবেই বিস্মৃত হতে চাইছেন।

এবার আসি ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কথায়। আমি, আমার বাবা-মা, আমরা বহু বছর ধরে মুগ্ধ হয়ে তাঁর বিশ্লেষণ শুনেছি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আমার স্পষ্ট মনে আছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রথম পদক্ষেপ ছিল তাঁরই দেওয়া শ্বেতপত্র প্রকাশ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সরকারের প্রথম যোগদানেও তিনি সঙ্গী ছিলেন।

তিনি নিজেই এর অংশ ছিল। তারপর কী হলো? স্যার কেন এই বাণিজ্য চুক্তিকে হরমুজ প্রণালির অবরোধের চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন, তা আমার বোধগম্য নয়। এর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যাও কেউ দিচ্ছেন না। চুক্তিটি বাংলাদেশকে ছাড়ের মূল্যে রাশিয়ার তেল কেনার সুযোগ সীমিত করেছে, এটা সত্য। কিন্তু বাংলাদেশ তো আগে থেকেই নীতিগতভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলছিল। অর্থাৎ, যে সীমাবদ্ধতা আগে থেকেই বাস্তবে বিদ্যমান ছিল, তাকেই কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।

আঠারো মাস সরকারে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, কথা বলা খুব সহজ, বিশেষ করে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে। আর ‘সব দোষ ইউনূসের’—এই আখ্যান তো বহু বছরের পুরোনো, না হয় আরও কিছুদিন চলুক। আমি বলছি না যে চুক্তিটি নিখুঁত। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে, ড. ইউনূস ‘দেশ বেঁচে দিয়েছেন’, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়—এর চেয়ে ভালো বিকল্প তখন কী ছিল? সেই উত্তরটি অন্তত কেউ দিক।

আসুন, এই নতুন বাংলাদেশে আমরা যেকোনো আলোচনার ক্ষেত্রে ‘কনটেক্সট’ বা প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিই। কেবল ‘কে’ বা ‘কী’ নয়, বরং ‘কেন’, ‘কখন’, ‘কোথায়’ এবং ‘কীভাবে’—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও খুঁজি।

অপূর্ব জাহাঙ্গীর: সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত