সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখার জন্য একটি সরকারকে কতটা সময় দেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর যখন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, তখনও প্রশ্নটা সামনে আসে। এর নিষ্পত্তি একেকজন একেকভাবে করেছিলেন। তবে দেশের সাধারণ মানুষ যেকোনো সরকারের মনোভাব বুঝতে চায় তার দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে। কোন পরিস্থিতিতে সরকারটি দায়িত্ব নিচ্ছে, সেটিও তারা মূল্যায়ন করে থাকে। এতে রাজনৈতিক পক্ষপাতও থাকে বৈকি।
অন্তর্বর্তী সরকার বেশি করে সক্রিয় হয়েছিল রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে। এর অংশ হিসেবে তারা মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সংস্কার আলোচনায় দীর্ঘ সময় ব্যয় করে। এতে জাতীয় নির্বাচনও বিলম্বিত হয়। নির্বাচনে মাঠে থাকা প্রধান দল বিএনপি জয়ী হয়েছে—ধারণা অনুযায়ী। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর সংস্কার প্রশ্নে অগ্রগতির বদলে নতুন করে মতভেদ বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রগতির প্রত্যাশাও ফিকে হয়ে এসেছে। এজন্য ক্ষমতাসীন দল অভিযুক্ত হয়েছে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে।
সামনে বাজেট অধিবেশন। এতে প্রস্তাবিত বাজেট ঘিরেই বেশি আলোচনা হওয়ার কথা। নতুন সরকারের প্রথম বাজেটটি কেমন হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ এবং সচেতন মানুষের আগ্রহের বিষয়। বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলের কাছে বাজেটের কোন দিকগুলো কতটা গুরুত্ব পাবে, তাও দেখতে চাইব আমরা। অন্তর্বর্তী শাসনামলে অর্থনৈতিক সংস্কার গুরুত্ব পায়নি কেন, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা মেলেনি। তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেটে এনবিআরসহ অর্থনীতি সংক্রান্ত সংস্কারের আলোচিত দিকগুলো কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিও দেখার বিষয়।
গত তিন মাসে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে ক্ষমতাসীনরা অবস্থান স্পষ্ট করতে পেরেছেন বলা যাবে না। অভিযোগ বরং জোরালো হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করলেও এবং এর আগে ৩১ দফায় সংস্কার বিষয়ে নিজেদের প্রতিশ্রুতি জাতির সামনে আনলেও তারা রাজনীতি ও দেশ পরিচালনায় ‘পুরনো মডেল’ অনুসরণ করতে চাইছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একটা ‘রেজিম চেঞ্জ’ হিসেবেই নিয়েছেন বলে মনে হবে—যদি আগামী তিন মাসের মতো সময়ে তারা সংস্কার প্রশ্নে অবস্থান সুস্পষ্ট না করেন। ছয় মাস সময়কে সাধারণত সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ ধরা হয়। তবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে জনপ্রত্যাশা ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করায় এ সময়টা হয়তো কমে আসে। ব্যাপক মানুষের প্রত্যাশা থাকে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি গুণগত পরিবর্তন অর্জনের। সেই পথ রুদ্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, সেটি ক্ষমতাসীনদেরই নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কারের যেসব প্রশ্নে অন্যান্য দলের সঙ্গে বিএনপি একমত—অন্তত সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে কমিয়ে আনতে পারে হতাশা।
গণঅভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী শাসনামলে রাজনীতি ও সমাজে বিভাজন আরও বেড়েছে; যদিও জনগণের বিরাট অংশে বিভিন্ন জাতীয় প্রশ্নে সংহতিও কম অর্জিত হয়নি। এখন রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে যতটা সম্ভব সংস্কার এগিয়ে নেওয়া গেলে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত এবং সেটি ধরে আরও এগিয়ে যাওয়া যাবে। তবে যেকোনো সংস্কারের ফল দৃশ্যমান হতে কিছু সময় লেগে যায়। বিপ্লবাত্মক কায়দায় সংস্কারে এগোনোর ফল অনেক সময় খারাপও হয়ে থাকে। সাংবিধানিক সংস্কারের মোটামুটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর নেপালে তো গণঅভ্যুত্থানও হতে দেখা গেল। তার আগে শ্রীলঙ্কায় একটি নির্বাচিত সরকারকে বিদায় নিতে হয় জনতার ক্রোধের বিস্ফোরণের মুখে। এর নেপথ্যে ছিল ভ্রান্ত নীতি ও রাষ্ট্রীয় অনাচারে মানুষের দুর্গতি; হতাশা ও অনিশ্চয়তায় পূর্ণ জীবন।
সত্যি বলতে, কোনো হানিমুন পিরিয়ড পাচ্ছে না সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিরিয়াস মুখাবয়বে বোঝা যায়, শুরু থেকে কী কঠিন হচ্ছে তার সরকারের পথ চলা। মাঝে বৈরি হয়ে ওঠা প্রতিবেশি ভারত থেকেও তাকে ‘জ্বালানি সহায়তা’ নিতে হচ্ছে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করে। মাথার ওপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে সম্পাদিত শুল্ক চুক্তির ঝক্কি। তাতে নাকি আবার সম্মতি ছিল বিএনপি, জামায়াত উভয়ের!
নির্বাচিত সরকার এসে গেলেই ব্যাপক মানুষের প্রত্যাশা পূরণের ব্যবস্থা হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা কিন্তু কোথাও পাওয়া যায়নি। গণতান্ত্রিক নির্বাচন যেন জবাবদিহিপূর্ণ শাসন নিশ্চিত করতে পারে, সেটিই বড় কথা। জনগণের অধিকারের প্রতি সম্মান, তার সত্যিকারের চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও সম্পদ বিনিয়োজিত করার প্রয়াস ছাড়া কোনো সরকার নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করতে পারে না। রাষ্ট্র সংস্কার থেকে নিয়ে নিত্যদিনের কাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচিত সরকারকেও এটা মনে রাখতে হবে।
নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারেক রহমান সরকারকে অবশ্য উদ্যোগী দেখা গেছে মেয়াদের শুরু থেকে। সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে নতুন একাধিক কর্মসূচি যুক্ত করেছে সরকার, যদিও তার আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তীব্রভাবে রয়েছে। এ সংকট আরও বেড়েছে কর-জিডিপি অনুপাত নিকট অতীতে আরও নিচে নেমে যাওয়ায়। তারেক রহমান সরকার চলতি অর্থবছরের ৫০ শতাংশেরও কম সময়ে দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। এই সময়ে বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে সহায়তায় আরও বেশি ব্যয়ের পরিকল্পনা দুঃসাহসী বলেই বিবেচিত হবে, বিশেষত যখন নতুন একটি সরকারের পক্ষে রাজস্ব আহরণ আরও কঠিন। আসছে বাজেটে কর হার অথবা করের আওতা বাড়ানো কোনোটাই সহজ হবে না—যদিও বলা হয়ে থাকে, অপ্রিয় পদক্ষেপ জরুরি হলে মেয়াদের শুরুতেই সেটা নেওয়া ভালো।
বছরের পর বছর চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি হালে নতুন করে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয়। নতুন সরকারের তিন-চার মাসের মধ্যে যে বোরো ফসল হাতে আসছে, তাতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রভাব কী—এর সদুত্তর পেতে কিছুটা সময় লাগবে। ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে গিয়েই মূলত জ্বালানির দাম বাড়াতে হয় সরকারকে। তখন অনেকে বলতে লাগলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দ্রুততার সঙ্গে জ্বালানির দাম সমন্বয় করাটাই ছিল ভালো। তবে সরকার স্পষ্টতই চায়নি, কমে আসা মূল্যস্ফীতি তারা দায়িত্ব নিতে না নিতেই বাড়ুক। এখন বোরো মার খেয়ে খাদ্য নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কী করবে সরকার? দায়িত্ব নিয়েই তাদের রমজান ও ঈদের সময়টা ‘ম্যানেজ’ করতে হয়েছিল। সংসদ ও সরকারে অধিকাংশ সদস্যই নবীন; কিন্তু সে কারণে জনগণ তার প্রত্যাশা কর্তন করবে না। সামনে আরেকটি ঈদ। সে উপলক্ষে নিশ্চিতভাবে বাড়বে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ; বর্ধিত লেনদেনে চাঙা হবে অর্থনীতি। কিন্তু সেটি স্থায়ী হবে না শিল্পসহ প্রধান খাতগুলোয় বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে। ‘মেগা প্রজেক্ট’ নেওয়া হবে না বলেও সরকার পদ্মা ব্যারাজ বানাবে বলে স্থির করেছে একনেকে। এর জন্য যত অর্থই লাগুক, তা অবশ্য জোগাতে হবে ধাপে ধাপে। বিভিন্ন কার্ড ঘিরে নেওয়া কর্মসূচিরও বাস্তবায়ন হবে পুরো মেয়াদজুড়ে। তাতে ব্যয়ের চাপ বেশি অনুভূত হবে না—যদি রাজস্ব ক্রমে বাড়াতে এবং ঋণনির্ভরতা কমাতে পারে সরকার।
গত তিন মাসেই এক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভর্তুকি বাড়াতে হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনাও কি সহসা বাস্তবায়ন করবে সরকার? না করলেও এ খাতে ভর্তুকি বাড়ার কারণ আছে। আসছে বাজেটে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার রূপরেখা উপস্থাপন কঠিন হবে অর্থমন্ত্রীর পক্ষে। যে প্রশাসন দিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হয়, তাতে কিন্তু কোনো সংস্কার হয়নি এত বড় গণঅভ্যুত্থানের পরেও। প্রশ্নবিদ্ধ এ খাতের জন্য উল্টো নতুন পে স্কেল দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেটার বাস্তবায়ন কি করতে পারবে তারেক রহমান সরকার—যখন বেসরকারি খাতে চলছে কাজ আর উপযুক্ত মজুরির জন্য হাহাকার?
সরকারি চাকরিতে প্রবেশে অন্যায্য কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি থেকেই হয়েছিল গণঅভ্যুত্থান; যে পথ বেয়ে বিএনপি আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়। একের পর এক সাজানো নির্বাচন করে জেঁকে বসা হাসিনা সরকারকে কোনোমতেই হটানো যাচ্ছিল না। আমরা আশা করে আছি, ভবিষ্যতে কখনও ওইরকম হতবুদ্ধিকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে না—যেহেতু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সবাই একমত। সংস্কারের তালিকায় রয়েছে; আদালতের রায়েও ফিরে এসেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। ন্যূনতম এসব সংস্কারের কাজ এখন সেরে ফেলতে হবে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে।
সামনে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সেটি অবশ্য হবে তারেক রহমান সরকারের অধীনেই। নিরপেক্ষভাবে এ নির্বাচন সম্পন্নে কোনো প্রশ্ন রাখা যাবে না। সরকার ছয়-সাত মাসে কতটা সুষ্ঠুভাবে দেশ চালাল; কতখানি প্রতিশ্রুতির স্বাক্ষর রাখতে পারল, সে বিষয়ে জনমতের এক ধরনের প্রতিফলন থাকবে স্থানীয় নির্বাচনে। লোকের অবশ্য এ বিবেচনাও থাকে, সরকারটি তো আরও ক’বছর ক্ষমতায় থাকবে!
বিএনপি বড় দল; ক্ষমতায় ফিরে আসার পর দল আরও বড় হয়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয় নির্বাচনে ‘বিদ্রোহ’ করে দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা হয়তো আরও বাড়বে। বাড়তে পারে সহিংসতা। জাতীয় নির্বাচন সহিংসতামুক্ত হওয়ায় সহিংসতা অন্তত নিয়ন্ত্রণে থাকার প্রত্যাশা বাড়বে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। এরই মধ্যে পুলিশকে সক্রিয় করে আইনশৃঙ্খলার একটা উল্লেখযোগ্য উন্নতিও দৃশ্যমান করতে হবে। মব সহিংসতা কিন্তু পুরো বিদায় নেয়নি। মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতেও। এসব ঘটনার তদন্তে অগ্রগতি দৃশ্যমান হতে দেখা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী শাসনামলের অপঘটনাগুলোর তদন্ত আর বিচারও তো চলমান রাখতে হবে। সেই সরকারের খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত কিংবা গাফিলতিতে হামে শিশুদের করুণ মৃত্যুর ঘটনা প্রতিদিন আঘাত করছে মানুষকে। তারেক রহমান সরকার চেষ্টা করছে না, তা নয়। কিন্তু বিদ্যমান স্বাস্থ্য অবকাঠামোয় আর দ্রুততার সঙ্গে নেওয়া প্রস্তুতিতে পরিস্থিতির অবনতি রোধ করা যাচ্ছে না।
সত্যি বলতে, কোনো হানিমুন পিরিয়ড পাচ্ছে না সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিরিয়াস মুখাবয়বে বোঝা যায়, শুরু থেকে কী কঠিন হচ্ছে তার সরকারের পথ চলা। মাঝে বৈরি হয়ে ওঠা প্রতিবেশি ভারত থেকেও তাকে ‘জ্বালানি সহায়তা’ নিতে হচ্ছে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করে। মাথার ওপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে সম্পাদিত শুল্ক চুক্তির ঝক্কি। তাতে নাকি আবার সম্মতি ছিল বিএনপি, জামায়াত উভয়ের! গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নের এজেন্ডা আছে নিকটেই। এরই মধ্যে পালিত হলো ‘৫০তম ফারাক্কা লংমার্চ দিবস’। মওলানা ভাসানীকে নতুন করে স্মরণ করলাম আমরা। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি নিয়েছে তারেক রহমান সরকারও। আমরা দেখতে চাইব, বাংলাদেশকে রক্ষায় এবং এর বিকাশে কতখানি ‘ইনক্লুসিভ’ হয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার।
লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক