leadT1ad

জনতার মালিকানা পুনরুদ্ধার ও গণঅভ্যুত্থান

স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানকে কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা বা ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে পাঠ করা হলে ইতিহাসের যথার্থ মূল্যায়ন হবে না। এটি ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর এই ভূখণ্ডে সংঘটিত গভীর ও ব্যাপক রাজনৈতিক আলোড়ন। প্রবীণ মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিত হওয়ার আগেই একে ‘এই মাটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। উমরের এই আগাম বিশ্লেষণ তখন রাজপথের লড়াকু জনতাকে বিপুল সাহস জুগিয়েছিল। তিনি এই মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে জনগণ ও শাসক শ্রেণির মধ্যকার চিরায়ত দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের এক চূড়ান্ত ফাটলকে নির্দেশ করেছিলেন।

জুলাই অভ্যুত্থান কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হলেও এর গর্ভে সুপ্ত ছিল রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে নতুন করে গড়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। রাজনৈতিক দর্শনের পরিভাষায় একে বলা যায় ‘কনস্টিটিউট পাওয়ার’ বা গঠনমূলক ক্ষমতার জাগরণ। এমন জাগরণ বিদ্যমান ‘কনস্টিটিউটেড পাওয়ার’ বা গঠিত ক্ষমতাকে অস্বীকার করে নিজের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে। এই অভ্যুত্থানের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি, এর বিস্তার এবং পরবর্তী বাস্তবতার বিশ্লেষণ তাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও মালিকানা বিষয়ক এক গভীর তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার দাবি রাখে।

গণঅভ্যুত্থানের এই ধারণা বা ‘রাষ্ট্র সংস্কার’-এর চিন্তাসূত্রটি হুট করে জুলাই মাসে নাজিল হয়নি। এর রয়েছে একটি দীর্ঘ তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরম্পরা।

চিন্তার মৌলিকত্বের প্রশ্নে বলা যায়, রাষ্ট্রকে ভেঙে নতুন করে গড়ার ধারণাটি বৈশ্বিক রাষ্ট্রচিন্তায় ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে লেনিন বা মাও-এর চিন্তায় এবং পরবর্তী সময়ে হানা আরেন্ড বা আন্তোনিও নেগ্রির তত্ত্বে নানাভাবে এসেছে। তবে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায়, বিশেষ করে ১৯৭২ সালের সংবিধানের কাঠামো যে আদতে একনায়কতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদের জন্মদাত্রী— এই তাত্ত্বিক আলাপটি গত দুই দশক ধরে যারা জারি রেখেছিলেন তাদের ভেতর অন্যতম হলেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলে এসেছেন যে, বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্যে জনগণের সার্বভৌমত্বের বদলে শাসকের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বীজ রোপিত আছে এবং এই কাঠামো বহাল রেখে কোনো নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তন কখনোই গণতান্ত্রিক মুক্তি আনতে পারবে না।

ফরহাদ মজহারের ‘গণসংবিধান’ বা ‘কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি’ (সংবিধান সভা) গঠনের প্রস্তাবনাই মূলত জুলাইয়ের ‘রিপাবলিক’ বা নতুন সাধারণতন্ত্র গঠনের মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে বলা যায়। অন্যদিকে, বদরুদ্দীন উমর তার আজীবনের মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায় দেখিয়েছেন যে, লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণি কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে।

উমর ও মজহার—এই দুই বিপরীত মেরুর বাংলাদেশি তাত্ত্বিক ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে হলেও একটি জায়গায় একমত ছিলেন যে, বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোটি পচা-গলা। একে সংস্কার নয়, বরং আমূল বদলে ফেলা জরুরি। এই চিন্তার স্রোতে পরবর্তী সময় যুক্ত হয়েছে হাসনাত কাইয়ুমের নেতৃত্বে ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’-এর মতো মোর্চাগুলো, যারা ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ ও ‘সংবিধান সংস্কার’ নিয়ে মাঠপর্যায়ে তাত্ত্বিক লিফলেট ও সেমিনারের মাধ্যমে একটি মধ্যবিত্ত সচেতনতা তৈরি করেছিল।

এই ভারী ও জটিল তাত্ত্বিক চিন্তাগুলো কীভাবে সাধারণ ছাত্র-জনতার স্লোগানে ও বুকের ভেতরে প্রবিষ্ট হলো, সেটিই জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায়।

এখানেই আখতার হোসেন, মাহফুজ আলম, সারোয়ার তুষার, নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, তুহিন খান কিংবা আরিফ সোহেলের মতো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মস্তিষ্ক’ বলে পরিচিত অংশটির ঐতিহাসিক কৃতিত্ব নিহিত। তাঁরা ফরহাদ মজহারের ‘সার্বভৌমত্ব’ বা বদরুদ্দীন উমরের ‘শ্রেণিসংগ্রাম’-এর কঠিন তত্ত্বগুলোকে ‘জুলাইয়ের ভাষায়’ অনুবাদ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এই অভ্যুত্থান একটি কাজ নিশ্চিত করেছে—জনগণের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছে যে, রাষ্ট্রের মালিক তারা। ‘রাজা’ বা ‘শাসক’ যে-ই হোক, তাকে জবাবদিহি করতে হবে।

মাহফুজ আলমরা অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল শুষ্ক আইনি সংস্কারের কথা বলে এমন বিশাল গণজাগরণ টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, প্রয়োজন ‘ইমোশন’ বা ‘আবেগ’-এর এক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। এখান থেকেই উঠে আসে ‘দায়’ (লায়াবিলিটি/রেসপনসিবিলিটি) ও ‘দরদ’ (এম্প্যাথি/সলিডারিটি)-এর অভিনব ধারণা।

জুলাইয়ের ন্যারেটিভে ‘দায়’ শব্দটি এসেছে রাষ্ট্রের প্রতি এবং জুলাইয়ের শহীদের প্রতি জীবিতদের অপরিশোধ্য ঋণ হিসেবে। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার চিরাচরিত ‘শাসক-শাসিত’ সম্পর্কের বিপরীতে ‘সেবক-মালিক’ সম্পর্কের দাবি তোলে। আর ‘দরদ’ শব্দটি এসেছে পরস্পরের প্রতি সংহতি হিসেবে, যা বিভাজনের রাজনীতিকে নাকচ করে দেয়।

মাহফুজ আলমরা যখন আওয়ামী লীগের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ বিপরীতে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’-এর কথা সামনে আনলেন, তখন তারা মূলত একাত্তরের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকেই পুনর্জীবিত করলেন, যা বাহাত্তরের সংবিধানে হারিয়ে গিয়েছিল। তারা বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, এই লড়াই রাষ্ট্রের মালিকানা পুনরুদ্ধারের। ফরহাদ মজহারের ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’-এর তত্ত্বটিই ছাত্রদের ভাষায় হয়ে গেল—‘রাষ্ট্র কারো বাপের না’। এই ভাষাভঙ্গি ও চিন্তার রূপান্তরই সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামতে এবং বুক পেতে গুলি নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

তবে ৫ আগস্টের পরবর্তী বাস্তবতা ও তাত্ত্বিকদের তৎপরতা বিশ্লেষণ করলে এক জটিল ও দ্বান্দ্বিক চিত্র ফুটে ওঠে। শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর যে ‘বিপ্লবী মুহূর্ত’ তৈরি হয়েছিল, তা কাজে লাগানোর প্রশ্নে তাত্ত্বিক ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে দোদুল্যমানতা লক্ষ করা গেছে।

ফরহাদ মজহার ৫ আগস্টের পর থেকেই অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন যে, পুরাতন সংবিধানের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ গ্রহণ বিপ্লবকে আইনি বৈধতা হারাবার ঝুঁকিতে ফেলবে। তাঁর মতে, এটি একটি ‘বিপ্লবী সরকার’ হওয়া উচিত ছিল, যা পুরাতন সংবিধান বাতিল ঘোষণা করে নতুন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সূচনা করবে। তিনি বারবার বলছেন, ‘বিপ্লব আইন মেনে হয় না, বিপ্লব নিজেই আইন তৈরি করে।’

ফরহাদ মজহারের এই অবস্থান থেকে দেখা যায় যে, তিনি তাঁর তাত্ত্বিক অবস্থানে অনড় এবং বর্তমান সরকারের ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা’র প্রচেষ্টাকে তিনি বিপ্লবের স্পিরিটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বা কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, বদরুদ্দীন উমর তাঁর স্বভাবসুলভ তীক্ষ্ণতায় বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনা করছেন। বিশেষ করে প্রশাসনের স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পুরোনো ক্ষমতায় ফেরার ব্যগ্রতাকে তিনি বিপ্লবের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।

মাহফুজ আলমের তৎপরতায় দেখা যাচ্ছে, তিনি জুলাইয়ের সেই ‘স্পিরিট’ বা ‘আকাঙ্ক্ষা’কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছেন বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে। তিনি চেষ্টা করছেন আমলাতন্ত্রের ‘লোহার খাঁচায়’ বসেও সেই বৈপ্লবিক চিন্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের নিজস্ব এক জড়তা আছে, যা সহজেই বিপ্লবের গতিকে শ্লথ করে দেয়। জুলাইয়ের সেই তাত্ত্বিক চিন্তার বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে— এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া কঠিন।

প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন গঠন করে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি। আগে যেখানে ‘সংবিধান’ ছিল স্পর্শাতীত এক পবিত্র দলিল, যার সমালোচনা করা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল, এখন তা ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে। এটিই চিন্তার জগতেও এক বিশাল বিজয়।

রাষ্ট্র সংস্কারের আলাপ এখন আর ড্রয়িংরুমে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন রাষ্ট্রীয় এজেন্ডা আর চায়ের দোকানের তর্কের বিষয়। কিন্তু বাস্তবতার সংকটও প্রকট। বর্তমান সরকার ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটি’-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা একটি নড়বড়ে আইনি ভিত্তি। দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনের স্থবিরতা—এই প্রাত্যহিক সংকটগুলো ‘রাষ্ট্র সংস্কার’-এর ‘মহান’ উদ্দেশ্যকে ম্লান করে দিচ্ছে।

বর্তমান অবস্থায় জুলাইয়ের সেই ‘চিন্তা’টি একটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এবং একই সঙ্গে নতুন অর্থ তৈরি করছে। প্রথমত, মাহফুজ আলম বা ছাত্র নেতাদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উপস্থাপন করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এমন প্রবণতা জুলাইয়ের মূল স্পিরিট—‘নেতাবিহীন গণজাগরণ’ বা ‘সামষ্টিক ইচ্ছা’-এর (কালেকটিভ উইল) সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক। বিপ্লব যখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায়, তখন তা নতুন কর্তৃত্ববাদের ঝুঁকি তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, ৫ আগস্টের পর যে ‘বিপ্লবী সরকার’ বা ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের আকাঙ্ক্ষা তাত্ত্বিকদের ছিল, তা পূরণ হয়নি। ফলে ‘রেভোলিউশনারি জাস্টিস’ বা বিপ্লবী বিচার সম্ভব হচ্ছে না, সবকিছু আটকে যাচ্ছে পুরাতন আইনি প্যাঁচে।

তবে চলমান বাস্তবতায় এই চিন্তাটি এখন নতুন একটি অর্থ তৈরি করছে— তা হলো ‘আধিপত্যবাদ বিরোধিতা’। ৫ আগস্টের আগে লড়াইটি ছিল দেশীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, এখন তা রূপ নিয়েছে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ বা দিল্লির প্রভাব বলয় থেকে বের হওয়ার লড়াইয়ে। জুলাইয়ের চিন্তা এখন কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক লড়াইয়েও রূপ নিয়েছে।

এই অভ্যুত্থান একটি কাজ নিশ্চিত করেছে—জনগণের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছে যে, রাষ্ট্রের মালিক তারা। ‘রাজা’ বা ‘শাসক’ যে-ই হোক, তাকে জবাবদিহি করতে হবে। জুলাইয়ের সেই ‘দায়’ ও ‘দরদ’-এর দর্শন যদি সংবিধানের পাতায় এবং প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করানো না যায়, তবে এই অভ্যুত্থানও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মতো কেবল মুখ বদলের ইতিহাস হয়ে থাকবে।

জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; রাষ্ট্র হলো নাগরিকদের পারস্পরিক ‘দরদ’ বা মমতার ওপর গড়ে ওঠা এক যৌথ খামার। এই খামারের সংস্কার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত জুলাইয়ের স্পিরিটকে ‘সফল’ বলা যাবে না, বরং একে বলতে হবে—‘চলমান সংগ্রাম’।

এই সংগ্রামে তাত্ত্বিকদের কাজ হলো সতর্ক পাহারাদারের মতো ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া, আর তরুণ নেতৃত্বের কাজ হলো সেই ভুলের ফাঁদ এড়িয়ে নতুন দিনের সূর্যকে ছিনিয়ে আনা। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বলা যায়, জুলাইয়ের জ্ঞানতত্ত্ব এখনো তার চূড়ান্ত রূপ পায়নি, এটি এখনো নির্মিত হচ্ছে রাজপথে, মানুষের মনে আর রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের প্রতিটি পদক্ষেপে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত