বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পে ঈদ উপলক্ষে ছুটির মেয়াদ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালে দুই ঈদে ছাপা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি মোট ১০ দিন। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে—দীর্ঘ সময় পত্রিকা বন্ধ থাকলে পাঠকের সঙ্গে সংবাদপত্রের সম্পর্ক কি দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং তারা কি আরও বেশি করে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের দিকে ঝুঁকে যায়? গণযোগাযোগের ‘কর্ষণ তত্ত্ব’ ও ‘ব্যবহার ও তুষ্টি তত্ত্ব’- এর আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও নিউ মিডিয়া গবেষক রাজীব নন্দী।
রাজীব নন্দী

ঈদের সময় পত্রিকা পাঁচ-ছয় দিন বন্ধ থাকায় কি পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক সত্যিই আলগা হয়ে যাচ্ছে—এমন প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। পত্রিকা ছয় দিন বন্ধ, পাঠক কি ইতিমধ্যে আরো বেশি ‘ডিজিটাল এলাকা’য় চলে গেছে? এই বিরতি কি কেবল সাময়িক ছুটি, নাকি দীর্ঘমেয়াদে পাঠকের অভ্যাস, আগ্রহ ও আনুগত্যে স্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত? জেন-জির ভাষায় বললে, ঈদের পাঁচ দিনের এই নীরবতা কি শুধু একটা ‘সিচুয়েশনশিপ ব্রেক’—নাকি এই গ্যাপে নিউজপেপার আর রিডারের মধ্যে ইমোশনাল কানেকশনটাই আস্তে আস্তে ‘ডিলিট’ হয়ে গেল? অনেকেরই মনে হতে পারে, সম্পর্কটা আর আগের মতো নেই—পুরোটাই যেন একরকম ‘ঘোস্টিং’-এর মতো হয়ে গেছে।
শকুন্তলা–দুষ্মন্তের কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সম্পর্ক টিকে থাকে নিয়মিত উপস্থিতি আর যোগাযোগে; দীর্ঘ অনুপস্থিতি হলে সেই টান ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। সংবাদপত্র ও পাঠকের সম্পর্কও ঠিক তেমনই—প্রতিদিনের উপস্থিতির ভেতরেই এই কানেকশন গড়ে ওঠে। কিন্তু ঈদের ছুটিতে যখন টানা পাঁচ বা ছয় দিন সংবাদপত্র অনুপস্থিত থাকে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটা কি শুধু একটা সাময়িক বিরতি, নাকি পাঠকের অভ্যাস আর আনুগত্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের শুরু?
বাংলাদেশে সংবাদপত্র শিল্পে ঈদ উপলক্ষে ছুটির মেয়াদ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের ঈদুল আজহায় নোয়াব ২৬ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ৫ দিনের ছুটি ঘোষণা করায় ২৭ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত টানা ৫ দিন দেশে কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। একই বছর ঈদুল ফিতরেও ২০ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৫ দিন সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ ছিল। এর আগে ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় নোয়াবের ঘোষিত ৫ দিনের ছুটির কারণে ৬ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত টানা ৫ দিন সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। ওই বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৫ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত টানা ১০ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে সরকার ছুটি ৫ দিনে বাড়ালেও নোয়াব তা অনুসরণ না করায় ৩০ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৩ দিন সংবাদপত্র বন্ধ ছিল। একই সময়ে সংবাদপত্র শ্রমিক সংগঠনগুলো সরকারি ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৫ দিনের ছুটির দাবি জানিয়েছিল।
২০২৪ সালে ঈদুল ফিতর ও বাংলা নববর্ষের ছুটি কাছাকাছি হওয়ায় নোয়াব ৯ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৬ দিনের বিশেষ ছুটি ঘোষণা করে। এর ফলে ১০ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৬ দিন দেশে কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি, যা স্বাধীনতার পর সংবাদপত্র শিল্পে দীর্ঘতম ছুটিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। অপরদিকে ২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী ১৬ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত ৩ দিনের ছুটি অনুমোদিত হয় এবং ১৭ থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ ছিল। ফলে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সংবাদপত্রে ঈদকালীন ছুটির মেয়াদ ৩ দিন থেকে বেড়ে ৫ ও ৬ দিনে উন্নীত হয়েছে, যা সংবাদপত্র শিল্পের কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী সংবাদপাঠ এখন ক্রমশ ‘প্লাটফর্ম ডিপেন্ডেন্ট’ ও অভ্যাসভিত্তিক আচরণে পরিণত হচ্ছে, যেখানে ধারাবাহিক উপস্থিতি ভাঙলে পাঠকের আনুগত্য দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। রয়টার্স ইনস্টিটিউট-এর ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৪ দেখায় যে বিশ্বব্যাপী সংবাদ গ্রহণ এখন আর নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যম-কেন্দ্রিক নয়, বরং ইউটিউব, টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে পড়ছে, যা ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমের প্রতি নিয়মিত ট্রাফিক ও অভ্যাসকে দুর্বল করছে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে ‘নিউজ এভয়েডেন্স’ বা সংবাদ এড়িয়ে চলার প্রবণতা বাড়ছে, যা পাঠকের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ততার ভিত্তিকে আরও ভঙ্গুর করে তুলছে। Nieman Lab (২০২৪) বিশ্লেষণেও দেখা যায়, বিভিন্ন বাজারে সংবাদ ব্যবহারের ধরন দ্রুত ‘প্লাটফর্ম রিসেট’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা একাধিক ডিজিটাল নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ছে এবং একক সংবাদ ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য কমে যাচ্ছে। একই ধরনের প্রবণতা পিউ রিসার্চ সেন্টার-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, যেখানে দেখা যায় সংবাদ গ্রহণ ক্রমশ সোশ্যাল মিডিয়া ও শর্ট-ভিডিও প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হচ্ছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। এসব গবেষণার সামগ্রিক ইঙ্গিত হলো—সংবাদপাঠের অভ্যাস এখন স্থির নয়; বরং ধারাবাহিক উপস্থিতি ও প্ল্যাটফর্ম-নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে দীর্ঘ বিরতি বা অনুপস্থিতি পাঠকের অভ্যাসে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ সাংবাদিক কামাল আহমেদ ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘সংবাদপত্র কেন নিজেদের অপ্রয়োজনীয় করে ফেলছে’ শীর্ষক কলামে ঈদের ছুটিতে দীর্ঘ সময় ধরে সংবাদপত্র বন্ধ রাখার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। কামাল আহমেদ তাঁর লেখায় দীর্ঘ ছুটির কারণে সংবাদপত্রের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঈদ ও নববর্ষ মিলিয়ে যখন টানা ছয় দিন পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ থাকে, তখন পাঠকদের মনে এই ধারণার জন্ম হওয়া স্বাভাবিক যে— একটি দেশ যদি টানা ছয় দিন সংবাদপত্র ছাড়া চলতে পারে, তবে বছরের বাকি দিনগুলোতেও এর কোনো প্রয়োজন নেই। মালিকপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত সংবাদপত্রকে পাঠকের কাছে ক্রমান্বয়ে অপ্রাসঙ্গিক এবং অপ্রয়োজনীয় করে তুলছে, যা এই শিল্পের জন্য এক ধরনের আত্মঘাতী পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের ছাপা কাগজের ক্ষয়িষ্ণু ঐতিহ্যের বিপরীতে দেশে এখন হু হু করে বেড়েছে অনলাইন ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব মানুষের তথ্য পাওয়ার গতি বাড়ালেও, কেড়ে নিয়েছে যৌথভাবে খবর পড়ার এবং তা নিয়ে মুখোমুখি আলোচনার সেই মানবিক ও সামাজিক আনন্দ। তথ্যপ্রযুক্তির এই জোয়ারে পাঠক এমনিতেই অনলাইনের দিকে ঝুঁকছেন, তার ওপর ছাপা কাগজের এমন দীর্ঘ অনুপস্থিতি পাঠকদের মনস্তত্ত্বে ডিজিটাল নির্ভরশীলতাকে স্থায়ী রূপ দেয়।
কামাল আহমেদের লেখাটি প্রকাশের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই সংবাদপত্র শিল্পে ঈদের ছুটিতে দীর্ঘ সময় প্রকাশনা বন্ধ রাখার প্রবণতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ সময়ে চারটি ঈদে সংবাদপত্র টানা কয়েক দিন প্রকাশিত হয়নি। তাই ঈদকালীন দীর্ঘ ছুটির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে কামাল আহমেদের উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগুলোর পাশাপাশি বর্তমান ডিজিটাল ও গণমাধ্যম বাস্তবতায় আরও কিছু নতুন যুক্তিও সামনে আনা প্রয়োজন।
ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে টানা পাঁচ–ছয় দিন সংবাদপত্র বন্ধ থাকলে বড় ব্র্যান্ডগুলোর ঈদ-পরবর্তী ক্যাম্পেইন বাজেট দ্রুত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে (ফেসবুক, ইউটিউব, অনলাইন পোর্টাল) সরে যায়, ফলে প্রিন্ট মিডিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে—যা একবার ডিজিটালে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর হলে ফিরিয়ে আনা কঠিন। একই সঙ্গে, সংবাদপত্রকে “ইতিহাসের প্রথম খসড়া” বলা হয়; তাই টানা কয়েক দিন পত্রিকা প্রকাশ না হলে সেই সময়ের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত ইতিহাসে শূন্যতা তৈরি হয়, কারণ অনলাইন কনটেন্টের মতো প্রিন্ট আর্কাইভ একইভাবে স্থায়ী ও সংগঠিতভাবে সংরক্ষিত হয় না। পাশাপাশি, এই দীর্ঘ বিরতিতে মূলধারার সংবাদপত্রের অনুপস্থিতি গুজব ও ভুয়া খবর ছড়ানোর সুযোগ বাড়িয়ে দেয়, কারণ পত্রিকার কঠোর যাচাই-বাছাইভিত্তিক তথ্যপ্রবাহ না থাকায় সোশ্যাল মিডিয়ায় অপতথ্য দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং সাধারণ পাঠক বিভ্রান্তির ঝুঁকিতে পড়ে।
কামাল আহমেদ প্রশ্ন তুলেছিলেন- ‘পাঠক যদি এখন ভাবেন যে একটা দেশ যদি ৬ দিন পত্রিকা ছাড়া চলতে পারে, তাহলে ৩৬৫ দিন চলতে পারবে না কেন? পাঠকের অভ্যাস বদলে ফেলার সুযোগ দেওয়া কি সংবাদপত্রশিল্পের জন্য আত্মঘাতী হয়ে গেল না?’ এই যৌক্তিক প্রশ্নটি সংবাদপত্রশিল্পের জন্য কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং এটি এই শিল্পের অস্তিত্বের গভীরতম মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক সংকটকে উন্মোচিত করে।
ধ্রুপদী যোগাযোগবিদ্যার মানবিক যোগাযোগ বা হিউম্যান কমিউনিকেশনের প্রেক্ষিত থেকে গণযোগাযোগের 'কাল্টিভেশন থিওরি' এবং ‘ইউজেস অ্যান্ড গ্র্যাটিফিকেশন’ তত্ত্ব দিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংবাদপত্র কেবল তথ্য সরবরাহের মাধ্যম নয়, বরং এটি পাঠকের দৈনন্দিন মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা পূরণ এবং এক ধরণের সামাজিক বাস্তবতা বা বিশ্বাসের জগৎ গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদী হাতিয়ার। মানুষ যখন প্রতিদিন সকালে একটি নির্দিষ্ট অভ্যাসের মধ্য দিয়ে পত্রিকা পড়ে, তখন গণমাধ্যমের সাথে তার একটি নিবিড় মানসিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি হয়, যা তাকে সামাজিক একাকীত্ব থেকে মুক্তি দেয় এবং চিন্তার খোরাক জোগায়। কিন্তু ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে যখন এই ধারাবাহিকতায় বড় ধরণের ছেদ পড়ে, তখন ‘ইউজেস অ্যান্ড গ্র্যাটিফিকেশন’ তত্ত্ব অনুযায়ী পাঠক তার তথ্যের ও মানসিক তৃপ্তির ক্ষুধা মেটাতে বাধ্য হয়ে বিকল্প ও যান্ত্রিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে, দীর্ঘদিনের লালিত ‘কাল্টিভেশন’ বা অভ্যাসটি ভেঙে যায় এবং গণমাধ্যমের সাথে মানুষের যে মানবিক ও আত্মিক সংযোগ বা ‘ইমোশনাল বন্ড’ ছিল, তা মনস্তাত্ত্বিকভাবে চিরতরে শিথিল হয়ে পড়ে—যা প্রকারান্তরে এই মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তাকেই পাঠকের মনে পুরোপুরি মুছে দেয়।
বাঙালি পরিবারে সকালের সংবাদপত্র কেবল একজনের পড়ার বস্তু ছিল না, এটি ছিল পারিবারিক যোগাযোগের একটি অন্যতম অনন্য সেতু। বাবা পত্রিকা পড়ছেন, পাশ থেকে মা বা সন্তান কোনো একটি বিশেষ খবর নিয়ে আলোচনা করছেন—এই চেনা দৃশ্যটি আমাদের চিরকালীন পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ। তবে বর্তমান বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল সমাজ ব্যবস্থার দ্রুত রূপান্তর, অনলাইন সাংবাদিকতার ব্যাপক বিকাশ এবং অ্যান্ড্রয়েড ফোনের সহজলভ্যতার কারণে ছাপা কাগজের সেই চিরায়ত আবেদন আজ ফুরিয়ে এসেছে। এক সময়ের দৃশ্যমান ও প্রাণবন্ত সেই পারিবারিক আলোচনাগুলো এখন হারিয়ে যাচ্ছে স্ক্রিনের আড়ালে। ফলে, বাংলাদেশেও বহু দাপুটে সংবাদপত্র আজ পুরাতন জমিদার বাড়ির মতো এক ক্ষয়িষ্ণু ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে, যা টিকে থাকার শেষ লড়াইটুকু করছে।
ছাপা পত্রিকার একটি বড় সৌন্দর্য হলো এর ‘সেরেন্ডিপিটি’ বা অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো কিছু খুঁজে পাওয়া। পাঠক হয়তো খেলার খবর পড়তে গিয়ে হঠাৎ একটি চমৎকার সাহিত্য পাতা বা সম্পাদকীয় কলামের মুখোমুখি হন, যা তাঁর চিন্তার জগতকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু টানা ছয় দিন পত্রিকা বন্ধ থাকায় পাঠক যখন পুরোপুরি সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন তিনি বন্দি হয়ে যান ক্ষতিকর ডিজিটাল ‘অ্যালগরিদম’ ও ‘ইকো চেম্বারের’ খাঁচায়। ফেসবুক বা ইউটিউব তাঁকে কেবল তা-ই দেখায়, যা তিনি দেখতে চান। সংবাদপত্র নিজের অনুপস্থিতির মাধ্যমে পাঠককে এই মুক্তচিন্তা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে এবং তাদের মনস্তত্ত্বকে একটি যান্ত্রিক চক্রের মধ্যে বন্দি করার সুযোগ করে দিচ্ছে—যা পুরো সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য এক বড় ধাক্কা।
একটি সংবাদপত্র এবং তার নিয়মিত পাঠকের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে একটি অলিখিত ‘সামাজিক চুক্তি’ বা বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পাঠক নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে কেবল কাগজ কেনেন না, তিনি প্রতিদিন সকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তথ্যের নিশ্চয়তা কেনেন। উৎসবের দিনে যখন জীবনের গতি কিছুটা ধীর হয়, তখন পাঠকের এই তথ্যের ক্ষুধা ও মানসিক তৃষ্ণা আরও বাড়ে। ঠিক এই সময়ে টানা ছয় দিন পরিষেবা বন্ধ রাখা সেই অলিখিত চুক্তির চরম লঙ্ঘন। মনস্তাত্ত্বিকভাবে পাঠক তখন নিজেকে ‘উপেক্ষিত’ ও ‘পরিত্যক্ত’ বোধ করেন। এই অবহেলার অভিমান থেকেই পাঠকের মনে তীব্র উদাসীনতার জন্ম হয়, যা তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে যে—‘যদি ছয় দিন তোমায় ছাড়া বাঁচা যায়, তবে পুরো বছর কেন নয়?’
ছাপা সংবাদপত্রের এই বর্তমান সংকটটি যেন সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ চলচ্চিত্রের সেই অহংকারী অথচ ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের করুণ পরিণতির এক জীবন্ত রূপক। নতুন যুগের উদীয়মান ব্যবসায়ী মহিম গাঙ্গুলির আধুনিক জলসাঘরের আলোর ঝলকানি আর মোটরগাড়ির গতির কাছে বিশ্বম্ভর রায় যেভাবে তাঁর হাতি, ঘোড়া আর পুরনো আভিজাত্য নিয়ে হেরে যাচ্ছিলেন, ঠিক একইভাবে আজ অনলাইন পোর্টাল আর অ্যান্ড্রয়েড ফোনের তীব্র গতির কাছে মার খাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ছাপা কাগজ। বিশ্বম্ভর রায় যেমন বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নিজের শেষ সম্বলটুকু বিলিয়ে এক রাতের জন্য তাঁর জলসাঘরকে কৃত্রিম জৌলুসে রাঙিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত অন্ধকারের অতলে হারিয়ে গিয়েছিলেন; আমাদের সংবাদপত্র মালিকেরাও তেমনি ঈদের ছুটিতে টানা ছয় দিন কাগজ বন্ধ রাখার মতো এক অবাস্তব ও সেকেলে আভিজাত্যের অহংকারে বুঁদ হয়ে আছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন না যে, এই দীর্ঘ নীরবতার মাধ্যমে তাঁরা আসলে তাঁদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ‘জলসাঘর’টির বাতি নিজ হাতেই নিভিয়ে দিচ্ছেন, যার শূন্যস্থান হু হু করে দখল করে নিচ্ছে নতুন যুগের ডিজিটাল মহিম গাঙ্গুলিরা।
ঈদের পাঁচ দিন পত্রিকা বন্ধ থাকার পর সাতদিনের মাথায় আবার পাতা উল্টে দেখলে মনে হয়—এই কানেকশনটা কি সত্যিই দুই দিকের ছিল, নাকি আমরা এতদিন শুধু একাই ইনভেস্ট করে গেছি? নাকি উল্টোদিকে কেউ ছিলই না—শুধু আমরা ছিলাম, আর সম্পর্কটা ছিল একদম সিঙ্গেল-সাইডেড ক্রাশ?
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক।

ঈদের সময় পত্রিকা পাঁচ-ছয় দিন বন্ধ থাকায় কি পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক সত্যিই আলগা হয়ে যাচ্ছে—এমন প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। পত্রিকা ছয় দিন বন্ধ, পাঠক কি ইতিমধ্যে আরো বেশি ‘ডিজিটাল এলাকা’য় চলে গেছে? এই বিরতি কি কেবল সাময়িক ছুটি, নাকি দীর্ঘমেয়াদে পাঠকের অভ্যাস, আগ্রহ ও আনুগত্যে স্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত? জেন-জির ভাষায় বললে, ঈদের পাঁচ দিনের এই নীরবতা কি শুধু একটা ‘সিচুয়েশনশিপ ব্রেক’—নাকি এই গ্যাপে নিউজপেপার আর রিডারের মধ্যে ইমোশনাল কানেকশনটাই আস্তে আস্তে ‘ডিলিট’ হয়ে গেল? অনেকেরই মনে হতে পারে, সম্পর্কটা আর আগের মতো নেই—পুরোটাই যেন একরকম ‘ঘোস্টিং’-এর মতো হয়ে গেছে।
শকুন্তলা–দুষ্মন্তের কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সম্পর্ক টিকে থাকে নিয়মিত উপস্থিতি আর যোগাযোগে; দীর্ঘ অনুপস্থিতি হলে সেই টান ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। সংবাদপত্র ও পাঠকের সম্পর্কও ঠিক তেমনই—প্রতিদিনের উপস্থিতির ভেতরেই এই কানেকশন গড়ে ওঠে। কিন্তু ঈদের ছুটিতে যখন টানা পাঁচ বা ছয় দিন সংবাদপত্র অনুপস্থিত থাকে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটা কি শুধু একটা সাময়িক বিরতি, নাকি পাঠকের অভ্যাস আর আনুগত্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের শুরু?
বাংলাদেশে সংবাদপত্র শিল্পে ঈদ উপলক্ষে ছুটির মেয়াদ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৬ সালের ঈদুল আজহায় নোয়াব ২৬ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ৫ দিনের ছুটি ঘোষণা করায় ২৭ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত টানা ৫ দিন দেশে কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। একই বছর ঈদুল ফিতরেও ২০ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৫ দিন সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ ছিল। এর আগে ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় নোয়াবের ঘোষিত ৫ দিনের ছুটির কারণে ৬ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত টানা ৫ দিন সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। ওই বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৫ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত টানা ১০ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে সরকার ছুটি ৫ দিনে বাড়ালেও নোয়াব তা অনুসরণ না করায় ৩০ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৩ দিন সংবাদপত্র বন্ধ ছিল। একই সময়ে সংবাদপত্র শ্রমিক সংগঠনগুলো সরকারি ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৫ দিনের ছুটির দাবি জানিয়েছিল।
২০২৪ সালে ঈদুল ফিতর ও বাংলা নববর্ষের ছুটি কাছাকাছি হওয়ায় নোয়াব ৯ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৬ দিনের বিশেষ ছুটি ঘোষণা করে। এর ফলে ১০ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৬ দিন দেশে কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি, যা স্বাধীনতার পর সংবাদপত্র শিল্পে দীর্ঘতম ছুটিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। অপরদিকে ২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী ১৬ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত ৩ দিনের ছুটি অনুমোদিত হয় এবং ১৭ থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ ছিল। ফলে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে সংবাদপত্রে ঈদকালীন ছুটির মেয়াদ ৩ দিন থেকে বেড়ে ৫ ও ৬ দিনে উন্নীত হয়েছে, যা সংবাদপত্র শিল্পের কর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী সংবাদপাঠ এখন ক্রমশ ‘প্লাটফর্ম ডিপেন্ডেন্ট’ ও অভ্যাসভিত্তিক আচরণে পরিণত হচ্ছে, যেখানে ধারাবাহিক উপস্থিতি ভাঙলে পাঠকের আনুগত্য দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। রয়টার্স ইনস্টিটিউট-এর ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৪ দেখায় যে বিশ্বব্যাপী সংবাদ গ্রহণ এখন আর নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যম-কেন্দ্রিক নয়, বরং ইউটিউব, টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে পড়ছে, যা ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমের প্রতি নিয়মিত ট্রাফিক ও অভ্যাসকে দুর্বল করছে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে ‘নিউজ এভয়েডেন্স’ বা সংবাদ এড়িয়ে চলার প্রবণতা বাড়ছে, যা পাঠকের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ততার ভিত্তিকে আরও ভঙ্গুর করে তুলছে। Nieman Lab (২০২৪) বিশ্লেষণেও দেখা যায়, বিভিন্ন বাজারে সংবাদ ব্যবহারের ধরন দ্রুত ‘প্লাটফর্ম রিসেট’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা একাধিক ডিজিটাল নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ছে এবং একক সংবাদ ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য কমে যাচ্ছে। একই ধরনের প্রবণতা পিউ রিসার্চ সেন্টার-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, যেখানে দেখা যায় সংবাদ গ্রহণ ক্রমশ সোশ্যাল মিডিয়া ও শর্ট-ভিডিও প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হচ্ছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। এসব গবেষণার সামগ্রিক ইঙ্গিত হলো—সংবাদপাঠের অভ্যাস এখন স্থির নয়; বরং ধারাবাহিক উপস্থিতি ও প্ল্যাটফর্ম-নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে দীর্ঘ বিরতি বা অনুপস্থিতি পাঠকের অভ্যাসে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ সাংবাদিক কামাল আহমেদ ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘সংবাদপত্র কেন নিজেদের অপ্রয়োজনীয় করে ফেলছে’ শীর্ষক কলামে ঈদের ছুটিতে দীর্ঘ সময় ধরে সংবাদপত্র বন্ধ রাখার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। কামাল আহমেদ তাঁর লেখায় দীর্ঘ ছুটির কারণে সংবাদপত্রের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঈদ ও নববর্ষ মিলিয়ে যখন টানা ছয় দিন পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ থাকে, তখন পাঠকদের মনে এই ধারণার জন্ম হওয়া স্বাভাবিক যে— একটি দেশ যদি টানা ছয় দিন সংবাদপত্র ছাড়া চলতে পারে, তবে বছরের বাকি দিনগুলোতেও এর কোনো প্রয়োজন নেই। মালিকপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত সংবাদপত্রকে পাঠকের কাছে ক্রমান্বয়ে অপ্রাসঙ্গিক এবং অপ্রয়োজনীয় করে তুলছে, যা এই শিল্পের জন্য এক ধরনের আত্মঘাতী পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের ছাপা কাগজের ক্ষয়িষ্ণু ঐতিহ্যের বিপরীতে দেশে এখন হু হু করে বেড়েছে অনলাইন ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব মানুষের তথ্য পাওয়ার গতি বাড়ালেও, কেড়ে নিয়েছে যৌথভাবে খবর পড়ার এবং তা নিয়ে মুখোমুখি আলোচনার সেই মানবিক ও সামাজিক আনন্দ। তথ্যপ্রযুক্তির এই জোয়ারে পাঠক এমনিতেই অনলাইনের দিকে ঝুঁকছেন, তার ওপর ছাপা কাগজের এমন দীর্ঘ অনুপস্থিতি পাঠকদের মনস্তত্ত্বে ডিজিটাল নির্ভরশীলতাকে স্থায়ী রূপ দেয়।
কামাল আহমেদের লেখাটি প্রকাশের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই সংবাদপত্র শিল্পে ঈদের ছুটিতে দীর্ঘ সময় প্রকাশনা বন্ধ রাখার প্রবণতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ সময়ে চারটি ঈদে সংবাদপত্র টানা কয়েক দিন প্রকাশিত হয়নি। তাই ঈদকালীন দীর্ঘ ছুটির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে কামাল আহমেদের উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগুলোর পাশাপাশি বর্তমান ডিজিটাল ও গণমাধ্যম বাস্তবতায় আরও কিছু নতুন যুক্তিও সামনে আনা প্রয়োজন।
ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে টানা পাঁচ–ছয় দিন সংবাদপত্র বন্ধ থাকলে বড় ব্র্যান্ডগুলোর ঈদ-পরবর্তী ক্যাম্পেইন বাজেট দ্রুত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে (ফেসবুক, ইউটিউব, অনলাইন পোর্টাল) সরে যায়, ফলে প্রিন্ট মিডিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে—যা একবার ডিজিটালে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর হলে ফিরিয়ে আনা কঠিন। একই সঙ্গে, সংবাদপত্রকে “ইতিহাসের প্রথম খসড়া” বলা হয়; তাই টানা কয়েক দিন পত্রিকা প্রকাশ না হলে সেই সময়ের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত ইতিহাসে শূন্যতা তৈরি হয়, কারণ অনলাইন কনটেন্টের মতো প্রিন্ট আর্কাইভ একইভাবে স্থায়ী ও সংগঠিতভাবে সংরক্ষিত হয় না। পাশাপাশি, এই দীর্ঘ বিরতিতে মূলধারার সংবাদপত্রের অনুপস্থিতি গুজব ও ভুয়া খবর ছড়ানোর সুযোগ বাড়িয়ে দেয়, কারণ পত্রিকার কঠোর যাচাই-বাছাইভিত্তিক তথ্যপ্রবাহ না থাকায় সোশ্যাল মিডিয়ায় অপতথ্য দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং সাধারণ পাঠক বিভ্রান্তির ঝুঁকিতে পড়ে।
কামাল আহমেদ প্রশ্ন তুলেছিলেন- ‘পাঠক যদি এখন ভাবেন যে একটা দেশ যদি ৬ দিন পত্রিকা ছাড়া চলতে পারে, তাহলে ৩৬৫ দিন চলতে পারবে না কেন? পাঠকের অভ্যাস বদলে ফেলার সুযোগ দেওয়া কি সংবাদপত্রশিল্পের জন্য আত্মঘাতী হয়ে গেল না?’ এই যৌক্তিক প্রশ্নটি সংবাদপত্রশিল্পের জন্য কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং এটি এই শিল্পের অস্তিত্বের গভীরতম মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক সংকটকে উন্মোচিত করে।
ধ্রুপদী যোগাযোগবিদ্যার মানবিক যোগাযোগ বা হিউম্যান কমিউনিকেশনের প্রেক্ষিত থেকে গণযোগাযোগের 'কাল্টিভেশন থিওরি' এবং ‘ইউজেস অ্যান্ড গ্র্যাটিফিকেশন’ তত্ত্ব দিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংবাদপত্র কেবল তথ্য সরবরাহের মাধ্যম নয়, বরং এটি পাঠকের দৈনন্দিন মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা পূরণ এবং এক ধরণের সামাজিক বাস্তবতা বা বিশ্বাসের জগৎ গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদী হাতিয়ার। মানুষ যখন প্রতিদিন সকালে একটি নির্দিষ্ট অভ্যাসের মধ্য দিয়ে পত্রিকা পড়ে, তখন গণমাধ্যমের সাথে তার একটি নিবিড় মানসিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি হয়, যা তাকে সামাজিক একাকীত্ব থেকে মুক্তি দেয় এবং চিন্তার খোরাক জোগায়। কিন্তু ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে যখন এই ধারাবাহিকতায় বড় ধরণের ছেদ পড়ে, তখন ‘ইউজেস অ্যান্ড গ্র্যাটিফিকেশন’ তত্ত্ব অনুযায়ী পাঠক তার তথ্যের ও মানসিক তৃপ্তির ক্ষুধা মেটাতে বাধ্য হয়ে বিকল্প ও যান্ত্রিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে, দীর্ঘদিনের লালিত ‘কাল্টিভেশন’ বা অভ্যাসটি ভেঙে যায় এবং গণমাধ্যমের সাথে মানুষের যে মানবিক ও আত্মিক সংযোগ বা ‘ইমোশনাল বন্ড’ ছিল, তা মনস্তাত্ত্বিকভাবে চিরতরে শিথিল হয়ে পড়ে—যা প্রকারান্তরে এই মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তাকেই পাঠকের মনে পুরোপুরি মুছে দেয়।
বাঙালি পরিবারে সকালের সংবাদপত্র কেবল একজনের পড়ার বস্তু ছিল না, এটি ছিল পারিবারিক যোগাযোগের একটি অন্যতম অনন্য সেতু। বাবা পত্রিকা পড়ছেন, পাশ থেকে মা বা সন্তান কোনো একটি বিশেষ খবর নিয়ে আলোচনা করছেন—এই চেনা দৃশ্যটি আমাদের চিরকালীন পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ। তবে বর্তমান বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল সমাজ ব্যবস্থার দ্রুত রূপান্তর, অনলাইন সাংবাদিকতার ব্যাপক বিকাশ এবং অ্যান্ড্রয়েড ফোনের সহজলভ্যতার কারণে ছাপা কাগজের সেই চিরায়ত আবেদন আজ ফুরিয়ে এসেছে। এক সময়ের দৃশ্যমান ও প্রাণবন্ত সেই পারিবারিক আলোচনাগুলো এখন হারিয়ে যাচ্ছে স্ক্রিনের আড়ালে। ফলে, বাংলাদেশেও বহু দাপুটে সংবাদপত্র আজ পুরাতন জমিদার বাড়ির মতো এক ক্ষয়িষ্ণু ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে, যা টিকে থাকার শেষ লড়াইটুকু করছে।
ছাপা পত্রিকার একটি বড় সৌন্দর্য হলো এর ‘সেরেন্ডিপিটি’ বা অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো কিছু খুঁজে পাওয়া। পাঠক হয়তো খেলার খবর পড়তে গিয়ে হঠাৎ একটি চমৎকার সাহিত্য পাতা বা সম্পাদকীয় কলামের মুখোমুখি হন, যা তাঁর চিন্তার জগতকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু টানা ছয় দিন পত্রিকা বন্ধ থাকায় পাঠক যখন পুরোপুরি সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন তিনি বন্দি হয়ে যান ক্ষতিকর ডিজিটাল ‘অ্যালগরিদম’ ও ‘ইকো চেম্বারের’ খাঁচায়। ফেসবুক বা ইউটিউব তাঁকে কেবল তা-ই দেখায়, যা তিনি দেখতে চান। সংবাদপত্র নিজের অনুপস্থিতির মাধ্যমে পাঠককে এই মুক্তচিন্তা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে এবং তাদের মনস্তত্ত্বকে একটি যান্ত্রিক চক্রের মধ্যে বন্দি করার সুযোগ করে দিচ্ছে—যা পুরো সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য এক বড় ধাক্কা।
একটি সংবাদপত্র এবং তার নিয়মিত পাঠকের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে একটি অলিখিত ‘সামাজিক চুক্তি’ বা বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পাঠক নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে কেবল কাগজ কেনেন না, তিনি প্রতিদিন সকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তথ্যের নিশ্চয়তা কেনেন। উৎসবের দিনে যখন জীবনের গতি কিছুটা ধীর হয়, তখন পাঠকের এই তথ্যের ক্ষুধা ও মানসিক তৃষ্ণা আরও বাড়ে। ঠিক এই সময়ে টানা ছয় দিন পরিষেবা বন্ধ রাখা সেই অলিখিত চুক্তির চরম লঙ্ঘন। মনস্তাত্ত্বিকভাবে পাঠক তখন নিজেকে ‘উপেক্ষিত’ ও ‘পরিত্যক্ত’ বোধ করেন। এই অবহেলার অভিমান থেকেই পাঠকের মনে তীব্র উদাসীনতার জন্ম হয়, যা তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে যে—‘যদি ছয় দিন তোমায় ছাড়া বাঁচা যায়, তবে পুরো বছর কেন নয়?’
ছাপা সংবাদপত্রের এই বর্তমান সংকটটি যেন সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ চলচ্চিত্রের সেই অহংকারী অথচ ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের করুণ পরিণতির এক জীবন্ত রূপক। নতুন যুগের উদীয়মান ব্যবসায়ী মহিম গাঙ্গুলির আধুনিক জলসাঘরের আলোর ঝলকানি আর মোটরগাড়ির গতির কাছে বিশ্বম্ভর রায় যেভাবে তাঁর হাতি, ঘোড়া আর পুরনো আভিজাত্য নিয়ে হেরে যাচ্ছিলেন, ঠিক একইভাবে আজ অনলাইন পোর্টাল আর অ্যান্ড্রয়েড ফোনের তীব্র গতির কাছে মার খাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ছাপা কাগজ। বিশ্বম্ভর রায় যেমন বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নিজের শেষ সম্বলটুকু বিলিয়ে এক রাতের জন্য তাঁর জলসাঘরকে কৃত্রিম জৌলুসে রাঙিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত অন্ধকারের অতলে হারিয়ে গিয়েছিলেন; আমাদের সংবাদপত্র মালিকেরাও তেমনি ঈদের ছুটিতে টানা ছয় দিন কাগজ বন্ধ রাখার মতো এক অবাস্তব ও সেকেলে আভিজাত্যের অহংকারে বুঁদ হয়ে আছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন না যে, এই দীর্ঘ নীরবতার মাধ্যমে তাঁরা আসলে তাঁদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ‘জলসাঘর’টির বাতি নিজ হাতেই নিভিয়ে দিচ্ছেন, যার শূন্যস্থান হু হু করে দখল করে নিচ্ছে নতুন যুগের ডিজিটাল মহিম গাঙ্গুলিরা।
ঈদের পাঁচ দিন পত্রিকা বন্ধ থাকার পর সাতদিনের মাথায় আবার পাতা উল্টে দেখলে মনে হয়—এই কানেকশনটা কি সত্যিই দুই দিকের ছিল, নাকি আমরা এতদিন শুধু একাই ইনভেস্ট করে গেছি? নাকি উল্টোদিকে কেউ ছিলই না—শুধু আমরা ছিলাম, আর সম্পর্কটা ছিল একদম সিঙ্গেল-সাইডেড ক্রাশ?
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক।

দেশে অকটেন, পেট্রল এবং কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এর আগে গত এপ্রিলেও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছিল সরকার। স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন জাগে, এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর কতটা পড়ছে?
২ ঘণ্টা আগে
বিকেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হকের এই সাক্ষাৎকারে দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যবসার পরিবেশ ও আসন্ন বাজেটের চ্যালেঞ্জগুলো উঠে এসেছে। সংকটকালীন সময়ে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পদক্ষেপে তিনি আশাবাদী। তবে অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও করের বোঝা নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
২ ঘণ্টা আগে
মানুষের মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের স্বার্থেই তাঁর কাজ ও আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। তাঁর দুটি ক্যাসেট আছে, এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গানগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁর জীবন নিয়ে আরও লেখা প্রকাশ করা জরুরি। এগুলো করতে হবে যাতে বর্তমান প্রজন্ম এই আপসহীন গণশিল্পীর জীবন থেকে...
১৭ ঘণ্টা আগে
পশু কোরবানি এবার কিছুটা কম হলেও দেশজুড়ে কম চামড়া উৎপন্ন হয়নি। তবে শেষতক কী পরিমাণ চামড়া হাতে আসবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেল।
২০ ঘণ্টা আগে