টিআইবির সূচক ও বিতর্ক
নুরুল হুদা সাকিব

প্রতি বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল তাদের করাপশন পারসেপশনস ইনডেক্স (সিপিআই) প্রকাশ করার পর, বাংলাদেশে প্রায় একই বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়। সরকার বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ এর কড়া সমালোচনা করে। তারা বলে, এটি কেবল ধারণাভিত্তিক সূচক, এতে দুর্নীতির বাস্তব চিত্র উঠে আসে না। তাদের মতে, খানা জরিপে যে পদ্ধতিতে এখানে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে তা সঠিক না এবং এটি পুরো দেশের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে পারে না।
সিপিআই এর ক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে কীভাবে একটি দেশের দুর্নীতির মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব?
এই সমালোচনা নতুন নয়। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরেও সিপিআইয়ের পদ্ধতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এটি আসলে কী পরিমাপ করে এবং কী পরিমাপ করে না? এর তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য; এমনকি একটি দেশের দুর্নীতিকে র্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা কতটা যৌক্তিক?
এসব সমালোচনার অনেকগুলোরই যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেটি হলো—সিপিআইয়ের পদ্ধতিতে যদি সীমাবদ্ধতা থাকেও, তাহলে কি সেটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে দুর্নীতি কম? নাকি বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের প্রকৃত দুর্নীতির মাত্রা সিপিআই যে চিত্র তুলে ধরে, তার চেয়েও অনেক গভীর ও বিস্তৃত?
এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজাই এখন বেশি জরুরি।
প্রথমেই স্বীকার করা প্রয়োজন, ‘সিপিআই’ কোনো নিখুঁত সূচক নয়। এটি সরাসরি ঘুষের হিসাব করে না, প্রতিটি দুর্নীতির ঘটনা গণনা করে না, কিংবা কোনো দেশের সরকারি দপ্তরের প্রতিটি অনিয়ম আলাদাভাবে পরিমাপও করে না। বরং এটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জরিপ, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং ব্যবসায়িক মূল্যায়নের সমন্বয়ে তৈরি একটি যৌগিক সূচক। একাধিক উৎসের তথ্য ব্যবহার এবং বহু বছরের গড় স্কোর গ্রহণের মাধ্যমে পরিমাপগত ত্রুটি কমানোর চেষ্টা করা হয়।
এই পদ্ধতি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। কেউ বলেন, এটি মূলত ‘ধারণা’ পরিমাপ করে; কেউ মনে করেন, এতে পশ্চিমা ব্যবসায়িক ও দাতাগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি বেশি প্রতিফলিত হয়; আবার অনেকে র্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। মজার বিষয় হলো, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল নিজেও কখনো দাবি করেনি যে সিপিআই দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ পরিমাপ। বরং শুরু থেকেই তারা এটিকে ‘পারসেপশনস ইনডেক্স’ হিসেবেই বর্ণনা করেছে।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের দুর্নীতির তুলনামূলক মূল্যায়নের জন্য আজও সিপিআইয়ের মতো এত বিস্তৃত, নিয়মিত এবং বহুল ব্যবহৃত অন্য কোনো সূচক নেই। বিশ্বব্যাংক বা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতো সংস্থাও শাসনব্যবস্থা, ব্যবসার পরিবেশ বা আইনের শাসন নিয়ে নানা সূচক প্রকাশ করে। কিন্তু দুর্নীতির বৈশ্বিক তুলনায় সিপিআই এখনও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং স্বীকৃত সূচক। হাজার হাজার গবেষণাপত্র, বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীরা নিয়মিত এই সূচক ব্যবহার করে। অর্থাৎ কিছু সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, বর্তমানের সব সূচকের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভালো ও নির্ভরযোগ্য।
বাংলাদেশে সিপিআইকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে, তার ওপর নির্ভর করে সূচকটির গ্রহণযোগ্যতা বদলে যায়। যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আসে, তখন বলা হয়েছিল সূচকটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পরবর্তীকালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার একই ধরনের সমালোচনার মুখে পড়লে প্রায় একই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিরোধী দল সূচককে গ্রহণ করে, সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ বিতর্কটি পদ্ধতি নিয়ে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে।
ফলে মূল প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যায়। আলোচনা হওয়ার কথা ছিল—দুর্নীতি কীভাবে কমানো যায়। কিন্তু আমরা বছরের পর বছর বিতর্ক করে চলেছি—টিআই ঠিক বলেছে কি না।
আমার গবেষণায় সরকারি কর্মকর্তা, দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা, গবেষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে একটি বিষয় প্রায় সর্বসম্মতভাবে উঠে এসেছে। তাঁদের অনেকেরই মত, বাংলাদেশে দুর্নীতি শুধু বিদ্যমান নয়; বরং গত দুই দশকে তা আরও গভীর, আরও প্রাতিষ্ঠানিক এবং আরও বিস্তৃত হয়েছে।
সাধারণ মানুষ সিপিআইয়ের স্কোর বোঝেন না। তারা বোঝেন তাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। ভূমি অফিসে সেবা নিতে গেলে কী ঘটে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে কী ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, চাকরি বা বদলির ক্ষেত্রে কী ধরনের অনিয়মের অভিযোগ শোনা যায়, টেন্ডার কীভাবে বণ্টিত হয়, ব্যাংক ঋণ কারা পায়, কোন মামলা টাকার বিনিময়ে প্রভাবিত হয়, কিংবা কোন তদন্ত চাপা পড়ে—এসবই মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। এগুলো কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা।
এখানেই আমার গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণটি সামনে আসে। অনেক সমালোচক মনে করেন, সিপিআই বাংলাদেশের দুর্নীতিকে অতিরঞ্জিত করে। কিন্তু গবেষণার ফলাফল বরং উল্টো প্রশ্ন তোলে—সিপিআই কি বাংলাদেশের দুর্নীতিকে প্রকৃতপক্ষে কম দেখাচ্ছে না?
এর কারণও স্পষ্ট। সিপিআই মূলত সরকারি খাতের দুর্নীতির ধারণা পরিমাপ করে। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের সীমারেখা প্রায়ই অস্পষ্ট। বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম, ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি, মেগা প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য, অর্থ পাচার, কর ফাঁকি, বেনামি সম্পদ কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক—এসবের বড় অংশই প্রচলিত ‘পানসেপশন সার্ভে’-এর আওতার বাইরে থেকে যায়।
আরও একটি বাস্তবতা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে সব তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। সব অভিযোগ তদন্ত পর্যন্ত পৌঁছায় না। অনেক অনুসন্ধান শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়। আবার বহু তথ্য রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আড়ালে থেকে যায়। ফলে জনসমক্ষে যে তথ্য দৃশ্যমান হয়, সেটি পুরো চিত্রের কেবল একটি অংশ মাত্র। স্বাভাবিকভাবেই যে সূচক জনসমক্ষে থাকা তথ্য, বিশেষজ্ঞ মতামত ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে, সেটিও পুরো বরফখণ্ড নয়, বরং তার দৃশ্যমান অংশটুকুই দেখতে পায়।
বাংলাদেশে দুর্নীতির প্রকৃতি গত কয়েক দশকে মৌলিকভাবে বদলে গেছে। একসময় মানুষ বিশ্বাস করত কিছু প্রতিষ্ঠান অন্তত দুর্নীতিমুক্ত। শিক্ষা বোর্ড, ডাক বিভাগ কিংবা কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি একটি ন্যূনতম আস্থা ছিল। আজ সেই বিশ্বাস আর নেই। নিয়োগ, বদলি, ভূমি প্রশাসন, লাইসেন্স, উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—প্রায় প্রতিটি খাতেই দুর্নীতির অভিযোগ এখন জনআলোচনার অংশ। অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতি আর ব্যতিক্রম নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিশে গেছে।
এই বাস্তবতায় শুধু ‘পারসেপশন’ শব্দটি নিয়ে বিতর্ক করা সমস্যার মূল জায়গাটিকে আড়াল করে। কারণ প্রশ্নটি আর সূচকের সীমাবদ্ধতার নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের জবাবদিহি, সুশাসন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার।

প্রতি বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল তাদের করাপশন পারসেপশনস ইনডেক্স (সিপিআই) প্রকাশ করার পর, বাংলাদেশে প্রায় একই বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়। সরকার বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ এর কড়া সমালোচনা করে। তারা বলে, এটি কেবল ধারণাভিত্তিক সূচক, এতে দুর্নীতির বাস্তব চিত্র উঠে আসে না। তাদের মতে, খানা জরিপে যে পদ্ধতিতে এখানে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে তা সঠিক না এবং এটি পুরো দেশের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে পারে না।
সিপিআই এর ক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে কীভাবে একটি দেশের দুর্নীতির মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব?
এই সমালোচনা নতুন নয়। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরেও সিপিআইয়ের পদ্ধতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এটি আসলে কী পরিমাপ করে এবং কী পরিমাপ করে না? এর তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য; এমনকি একটি দেশের দুর্নীতিকে র্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা কতটা যৌক্তিক?
এসব সমালোচনার অনেকগুলোরই যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেটি হলো—সিপিআইয়ের পদ্ধতিতে যদি সীমাবদ্ধতা থাকেও, তাহলে কি সেটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে দুর্নীতি কম? নাকি বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের প্রকৃত দুর্নীতির মাত্রা সিপিআই যে চিত্র তুলে ধরে, তার চেয়েও অনেক গভীর ও বিস্তৃত?
এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজাই এখন বেশি জরুরি।
প্রথমেই স্বীকার করা প্রয়োজন, ‘সিপিআই’ কোনো নিখুঁত সূচক নয়। এটি সরাসরি ঘুষের হিসাব করে না, প্রতিটি দুর্নীতির ঘটনা গণনা করে না, কিংবা কোনো দেশের সরকারি দপ্তরের প্রতিটি অনিয়ম আলাদাভাবে পরিমাপও করে না। বরং এটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জরিপ, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং ব্যবসায়িক মূল্যায়নের সমন্বয়ে তৈরি একটি যৌগিক সূচক। একাধিক উৎসের তথ্য ব্যবহার এবং বহু বছরের গড় স্কোর গ্রহণের মাধ্যমে পরিমাপগত ত্রুটি কমানোর চেষ্টা করা হয়।
এই পদ্ধতি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। কেউ বলেন, এটি মূলত ‘ধারণা’ পরিমাপ করে; কেউ মনে করেন, এতে পশ্চিমা ব্যবসায়িক ও দাতাগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি বেশি প্রতিফলিত হয়; আবার অনেকে র্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। মজার বিষয় হলো, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল নিজেও কখনো দাবি করেনি যে সিপিআই দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ পরিমাপ। বরং শুরু থেকেই তারা এটিকে ‘পারসেপশনস ইনডেক্স’ হিসেবেই বর্ণনা করেছে।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের দুর্নীতির তুলনামূলক মূল্যায়নের জন্য আজও সিপিআইয়ের মতো এত বিস্তৃত, নিয়মিত এবং বহুল ব্যবহৃত অন্য কোনো সূচক নেই। বিশ্বব্যাংক বা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতো সংস্থাও শাসনব্যবস্থা, ব্যবসার পরিবেশ বা আইনের শাসন নিয়ে নানা সূচক প্রকাশ করে। কিন্তু দুর্নীতির বৈশ্বিক তুলনায় সিপিআই এখনও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং স্বীকৃত সূচক। হাজার হাজার গবেষণাপত্র, বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীরা নিয়মিত এই সূচক ব্যবহার করে। অর্থাৎ কিছু সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, বর্তমানের সব সূচকের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভালো ও নির্ভরযোগ্য।
বাংলাদেশে সিপিআইকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে, তার ওপর নির্ভর করে সূচকটির গ্রহণযোগ্যতা বদলে যায়। যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আসে, তখন বলা হয়েছিল সূচকটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পরবর্তীকালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার একই ধরনের সমালোচনার মুখে পড়লে প্রায় একই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিরোধী দল সূচককে গ্রহণ করে, সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ বিতর্কটি পদ্ধতি নিয়ে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে।
ফলে মূল প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যায়। আলোচনা হওয়ার কথা ছিল—দুর্নীতি কীভাবে কমানো যায়। কিন্তু আমরা বছরের পর বছর বিতর্ক করে চলেছি—টিআই ঠিক বলেছে কি না।
আমার গবেষণায় সরকারি কর্মকর্তা, দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা, গবেষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে একটি বিষয় প্রায় সর্বসম্মতভাবে উঠে এসেছে। তাঁদের অনেকেরই মত, বাংলাদেশে দুর্নীতি শুধু বিদ্যমান নয়; বরং গত দুই দশকে তা আরও গভীর, আরও প্রাতিষ্ঠানিক এবং আরও বিস্তৃত হয়েছে।
সাধারণ মানুষ সিপিআইয়ের স্কোর বোঝেন না। তারা বোঝেন তাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। ভূমি অফিসে সেবা নিতে গেলে কী ঘটে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে কী ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, চাকরি বা বদলির ক্ষেত্রে কী ধরনের অনিয়মের অভিযোগ শোনা যায়, টেন্ডার কীভাবে বণ্টিত হয়, ব্যাংক ঋণ কারা পায়, কোন মামলা টাকার বিনিময়ে প্রভাবিত হয়, কিংবা কোন তদন্ত চাপা পড়ে—এসবই মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। এগুলো কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা।
এখানেই আমার গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণটি সামনে আসে। অনেক সমালোচক মনে করেন, সিপিআই বাংলাদেশের দুর্নীতিকে অতিরঞ্জিত করে। কিন্তু গবেষণার ফলাফল বরং উল্টো প্রশ্ন তোলে—সিপিআই কি বাংলাদেশের দুর্নীতিকে প্রকৃতপক্ষে কম দেখাচ্ছে না?
এর কারণও স্পষ্ট। সিপিআই মূলত সরকারি খাতের দুর্নীতির ধারণা পরিমাপ করে। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের সীমারেখা প্রায়ই অস্পষ্ট। বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম, ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি, মেগা প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য, অর্থ পাচার, কর ফাঁকি, বেনামি সম্পদ কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক—এসবের বড় অংশই প্রচলিত ‘পানসেপশন সার্ভে’-এর আওতার বাইরে থেকে যায়।
আরও একটি বাস্তবতা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে সব তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। সব অভিযোগ তদন্ত পর্যন্ত পৌঁছায় না। অনেক অনুসন্ধান শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়। আবার বহু তথ্য রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আড়ালে থেকে যায়। ফলে জনসমক্ষে যে তথ্য দৃশ্যমান হয়, সেটি পুরো চিত্রের কেবল একটি অংশ মাত্র। স্বাভাবিকভাবেই যে সূচক জনসমক্ষে থাকা তথ্য, বিশেষজ্ঞ মতামত ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে, সেটিও পুরো বরফখণ্ড নয়, বরং তার দৃশ্যমান অংশটুকুই দেখতে পায়।
বাংলাদেশে দুর্নীতির প্রকৃতি গত কয়েক দশকে মৌলিকভাবে বদলে গেছে। একসময় মানুষ বিশ্বাস করত কিছু প্রতিষ্ঠান অন্তত দুর্নীতিমুক্ত। শিক্ষা বোর্ড, ডাক বিভাগ কিংবা কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি একটি ন্যূনতম আস্থা ছিল। আজ সেই বিশ্বাস আর নেই। নিয়োগ, বদলি, ভূমি প্রশাসন, লাইসেন্স, উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—প্রায় প্রতিটি খাতেই দুর্নীতির অভিযোগ এখন জনআলোচনার অংশ। অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতি আর ব্যতিক্রম নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিশে গেছে।
এই বাস্তবতায় শুধু ‘পারসেপশন’ শব্দটি নিয়ে বিতর্ক করা সমস্যার মূল জায়গাটিকে আড়াল করে। কারণ প্রশ্নটি আর সূচকের সীমাবদ্ধতার নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের জবাবদিহি, সুশাসন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার।
.png)

হরমুজ প্রণালিতে সিঙ্গাপুরের বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’-তে রহস্যজনক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ক্ষণস্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। গত ১৫ জুন স্বাক্ষরিত ৬০ দিনের ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করে দুই পরাশক্তি এখন সরাসরি সামরিক সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি
৮ ঘণ্টা আগে
সুকুক বন্ডের প্রতি যে বিনিয়োগকারীদের বিপুল আগ্রহ রয়েছে, সর্বশেষ নিলামে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত পরিসংখ্যানেই তার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। এই বন্ডের নিলাম এর আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে আটবার। প্রতিবারই লক্ষ করা গেছে এ আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগকারীদের সমান আগ্রহ।
১১ ঘণ্টা আগে
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সরকারের প্রথম বাজেটকে ‘জীবনবান্ধব’ বলে বর্ণনা করলেও এর বাস্তবায়ন যে কঠিন, সেটা অনস্বীকার্য। জনজীবনে স্বস্তি আনতে তিনি বাজেটের কিছু কর প্রস্তাবে সংশোধনীর পরামর্শ দিয়েছেন। সেসব পরিবর্তন এনেই বাজেট পাসের ব্যবস্থা হবে, সন্দেহ নেই।
১ দিন আগে
জলবায়ু সংকট মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তর এখন বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটছে। কিন্তু এই রূপান্তরের আলোচনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—এই রূপান্তর কতটা ন্যায্য, এবং এর সুফল শেষ পর্যন্ত কারা ভোগ করবে?
১ দিন আগে