শুধু টিকাই কি হাম মোকাবিলার স্থায়ী সমাধান

লেখা:
লেখা:
ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ১৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

মার্চ ২০২৬। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের (আইডিএইচ) করিডোরে শিশুদের কান্না। শয্যার অভাবে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়েই চিকিৎসা নিচ্ছে শিশুরা। এই হাসপাতালে মাত্র তিন মাসেই ভর্তি হয়েছে ৫৬০ জন হামের রোগী, যেখানে পুরো ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৯ জন। সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি সন্দেহজনক রোগী এবং অন্তত ৩৮ শিশুর মৃত্যুর খবর বেরিয়েছি পত্রিকায়। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে এমন এক সত্য লুকিয়ে আছে, যা না বুঝলে কেবল টিকাদান কর্মসূচি (ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন) দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

সন্দেহজনক বনাম নিশ্চিত রোগী: সংখ্যার বিভ্রম

প্রথমেই যে প্রশ্নটি জরুরি তা হলো—রিপোর্ট হওয়া কতজন রোগী আসলে হামে আক্রান্ত? চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর দুটি ভিন্ন সংজ্ঞা আছে। ‘সন্দেহজনক রোগী’ হলো সেই শিশু, যার শরীরে জ্বর, ফুসকুড়ি এবং কাশি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ আছে, কিন্তু ল্যাবরেটরি পরীক্ষা হয়নি। ‘নিশ্চিত রোগী’ হলো কেবল তারাই, যাদের রক্তে আইজিএম অ্যান্টিবডি বা পিসিআর পরীক্ষায় হামের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

এবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে তাকানো যাক। সেখানে ২৮০ জন সন্দেহজনক রোগীর মধ্যে নিশ্চিত আক্রান্ত মাত্র ২৮ জন—অর্থাৎ মাত্র ১০ শতাংশ। সিলেটেও ৩০ জন সন্দেহজনকের বিপরীতে নিশ্চিত রোগী মাত্র ৪ জন। আরও বিভ্রান্তিকর তথ্য হলো, ২০২৩ সালে সারা দেশে ৭ হাজার ৬১টি সন্দেহজনক নমুনার পরীক্ষায় আইজিএম পজিটিভ ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মানে হলো, অনেক ক্ষেত্রে রুবেলা, রোজাওলা বা ডেঙ্গুর রোগী হামের তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে পরীক্ষাগারের সক্ষমতার অভাবে অনেক প্রকৃত হামের রোগী গণনার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। তাই স্রেফ সংখ্যা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে সঠিক প্রতিকারে গুরুত্ব দিতে হবে।

এবারের প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে আতঙ্কজনক দিক হলো, ৫-৬ মাস বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে, যারা এখনো টিকার বয়সেই পৌঁছায়নি। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে ৫ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুরা, যাদের মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শেষ হয়ে গেছে কিন্তু টিকার বয়স হয়নি। এছাড়া ৯ মাস থেকে ২ বছর বয়সী শিশু যারা টিকা পায়নি বা দ্বিতীয় ডোজ বাদ পড়েছে এবং যেকোনো বয়সের অপুষ্ট শিশু হামের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

মায়ের ইমিউনিটি: মূল সমস্যার শিকড়

শিশু জন্মের পর মায়ের দুধ ও গর্ভস্থ সংযোগের মাধ্যমে হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা বা অ্যান্টিবডি পায়। কিন্তু ১১টি দেশে ২ হাজার ৮৪৫ শিশুর ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, ৬ মাসের আগেই অধিকাংশ দেশে ৫০ শতাংশের কম শিশুর শরীরে সেই সুরক্ষা টেকে। বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৫ মাস বয়সেই ৬৭ শতাংশ শিশুর শরীরে কার্যকর মাতৃ-অ্যান্টিবডি থাকে না। এর কারণ—বাল্যবিবাহের ফলে মায়ের অপরিপক্ক ইমিউন সিস্টেম, ঘন ঘন সন্তান ধারণ ও দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি। এ সমস্যার সমাধান এককভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়, বরং সব বিভাগের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

শিশুর শরীরে জ্বর, লাল ফুসকুড়ি ও চোখ লাল হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে বাড়িতে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। জ্বর শুরু হলে প্যারাসিটামল ও পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। ডাবের পানি ও লেবুর শরবতের মতো তরল খাবার খাওয়াতে হবে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখা জরুরি। চোখ পরিষ্কার পানি দিয়ে মুছতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ‘এ’ ড্রপ দিতে হবে। মায়ের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে। এটিই সবচেয়ে ভালো ইমিউন বুস্টার।

ভ্যাকসিনের পাশাপাশি পুষ্টি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন এ, যেমন মিষ্টিকুমড়া, গাজর, পালংশাক ও ডিমের কুসুম থাকা প্রয়োজন। ভিটামিন সি, যেমন পেয়ারা, লেবু, আমলকী ও টমেটো থাকা দরকার। এছাড়া জিঙ্ক ও প্রোটিনের জন্য ডাল, বাদাম, মাছ, মাংস ও ডিম খেতে হবে।

এখনই যা করতে হবে

প্রাদুর্ভাবের সময় হাসপাতালই সংক্রমণের উৎস হয়ে উঠতে পারে। তাই হামের রোগীদের অবশ্যই আলাদা ওয়ার্ডে রাখা এবং শয্যার মাঝে অন্তত তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন নিশ্চিত করতে হবে, কারণ হামের ভাইরাস বদ্ধ ঘরে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত ভেসে থাকতে পারে। স্বাস্থ্যকর্মীদের অবশ্যই এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং রোগী ভর্তির আগেই সন্দেহভাজন রোগীকে আলাদা করতে হবে।

সুস্থ শিশুদের জন্য স্কুলে মাস্ক পরা হামের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা দেয় না। এর চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো—জ্বর বা ফুসকুড়ি থাকা শিশুকে স্কুলে না পাঠানো, শ্রেণিকক্ষের জানালা খোলা রাখা এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস করা। তবে আক্রান্ত শিশুকে ক্লিনিকে নেওয়ার সময় মাস্ক পরানো উচিত।

এছাড়া সরকারি উদ্যোগে এখনই ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বাড়ানো, ৬ মাস বয়স থেকে জরুরি টিকা ক্যাম্পেইন ও ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টেশন নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থার মধ্যে বাল্যবিবাহ রোধ, জন্মবিরতিকালীন ব্যবধান নিশ্চিত করা, মাতৃপুষ্টি এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবির যৌক্তিক সমাধান করে টিকা কার্যক্রম নিয়মিত করা জরুরি।

হাম প্রাদুর্ভাব ২০২৬: কী বলছে পরিসংখ্যান

২০২৬ সালের এই হাম প্রাদুর্ভাবের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও বৈপরীত্য—উভয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়েছে এবং গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩৮টি শিশুর। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই বছরের প্রথম তিন মাসে ৫৬০ জন শিশু ভর্তি হয়েছে, যেখানে সংক্রমণের হার অবিশ্বাস্যভাবে ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল ভিন্ন কথা বলছে; যেমন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ২৮০ জন সন্দেহজনক শিশুর মধ্যে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে মাত্র ২৮ জনের শরীরে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সিলেট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য, যেখানে দেখা যাচ্ছে ৫-৬ মাস বয়সী শিশুরাও এখন আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ ২০২৩ সালে জাতীয় নজরদারি বা সারভেইল্যান্সে আইজিএম পজিটিভ হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানগুলোই প্রমাণ করে যে, কেবল সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে নয়, বরং সঠিক রোগ নির্ণয় ও সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমেই এই বিপৎসংকেত মোকাবিলা করতে হবে।

হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। ভ্যাকসিন এই মুহূর্তে প্রধান হাতিয়ার হলেও পুষ্টি সচেতনতা, মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং সামাজিক কারণগুলো সমাধান না করলে এ সংকট বারবার ফিরে আসবে। সংখ্যা গুনে আতঙ্কিত না হয়ে কারণ বুঝে সমাধানের পথে হাঁটাই এখন সময়ের দাবি।

লেখক: এপিডেমিওলজিস্ট ও হেলথ পলিসি বিশেষজ্ঞ

সম্পর্কিত