বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির গল্প হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং রপ্তানি খাতের সাফল্য—এসব মিলিয়ে একধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল যে, অর্থনীতির ভিত্তি যথেষ্ট শক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে গত তিন-চার বছর ধরে প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি সেই আত্মবিশ্বাসকে নতুন করে যাচাই করার সময় এনে দিয়েছে।
প্রবৃদ্ধির গতি কমছে, দারিদ্র্য আবার বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠেছে, আর ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট এই পরিবর্তনগুলোকে শুধু চিহ্নিতই করেনি, বরং সামনে থাকা ঝুঁকিগুলোকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
প্রবৃদ্ধির ধীরগতি: একটি সতর্কতা-সংকেত
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা আগের পূর্বাভাস (৪ দশমিক ৬ শতাংশ) থেকেও কম। গত তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে আসছে, যা একটি ধারাবাহিক প্রবণতায় রূপ নিয়েছে।
এই ধীরগতির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ প্রথমবারের মতো প্রায় ৩৫ বছরের মধ্যে সংকুচিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। কারণ, বিনিয়োগই নতুন উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি।
একই সঙ্গে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদাও চাপের মুখে পড়ছে। যদিও রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা ভোগব্যয় ধরে রেখেছে, তবুও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর হয়ে পড়েছে।
দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতি: বাস্তবতার কঠিন দিক
অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হলো—মানুষের জীবনযাত্রার মান। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।
মূল্যস্ফীতি ২০২৬ অর্থবছরে গড়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তব আয় কমে গেছে। বিশেষ করে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংক আগে ধারণা করেছিল, ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ লাখে।
এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বোঝায় যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আর আগের মতো মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
শ্রমবাজার: প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলছে না
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। গত এক দশকে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে, কিন্তু সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৫ লাখ চাকরি। এর মধ্যে বেশিরভাগই কম উৎপাদনশীল কৃষিখাতে।
আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো নারী শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কমে যাওয়া। ২০২২ সালে যেখানে এই হার ছিল ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ, তা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দিক থেকেও একটি বড় ধাক্কা।
ব্যাংক খাত: গভীর ঝুঁকির ইঙ্গিত
বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখন একটি বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে।
একই সঙ্গে প্রায় ২২টি ব্যাংক, যাদের হাতে মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক রয়েছে, তারা পর্যাপ্ত মূলধন ধরে রাখতে পারছে না। তাদের গড় মূলধন পর্যাপ্ততার হার মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন ১০ শতাংশ।
এই পরিস্থিতি শুধু ব্যাংক খাতের জন্য নয়, পুরো অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিনিয়োগে অর্থায়ন কমিয়ে দেয় এবং আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে।
রাজস্ব ও আর্থিক সক্ষমতা: সীমাবদ্ধতার বাস্তবতা
বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ দীর্ঘদিন ধরেই একটি দুর্বল দিক। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে ৭ শতাংশের নিচে, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
অন্যদিকে, কর ছাড়ের পরিমাণ প্রায় জিডিপির ৬ দশমিক ৫ শতাংশের সমান। অর্থাৎ, যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা যেত, তার বড় অংশ বিভিন্ন ছাড়ের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যয় পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। বেতন, ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের মতো স্থায়ী ব্যয় বাড়তে থাকায় উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে, জ্বালানির আমদানি ব্যয় বাড়ছে, রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, রপ্তানি বাজারে চাপ বাড়ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মার্চ মাসে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা কমে প্রায় ৫০ হাজারে নেমে এসেছে, যেখানে সাধারণত এটি থাকে ১ লাখ ১০ হাজারের কাছাকাছি।
যদিও বিনিময় হার কিছুটা নমনীয় করা এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক খাতে সাময়িক স্বস্তি এসেছে, তবুও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
ব্যবসার পরিবেশ: প্রবৃদ্ধির বড় বাধা
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা এখনো জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের সময়ের ১৩ শতাংশ পর্যন্ত শুধু নিয়ম মেনে চলতেই ব্যয় হয়। কিছু অঞ্চলে এটি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
ফলে যারা বেশি সময় প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করে, তারা নতুন কর্মী নিয়োগে প্রায় ২০ শতাংশ কম আগ্রহী। এই বাস্তবতা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—দুটোকেই বাধাগ্রস্ত করছে।
সংস্কারের প্রশ্ন: এখন না হলে কবে?
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংকের বার্তাটি পরিষ্কার—তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার একসঙ্গে এগোতে হবে।
স্বল্পমেয়াদে প্রয়োজন—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাত স্থিতিশীল করা, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা।
মধ্যমেয়াদে প্রয়োজন—রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী করা, ব্যাংক খাত সংস্কার, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা, দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
সিদ্ধান্তের সময় এখনই
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে ধীরগতি ও অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে রয়েছে সংস্কারের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা। অর্থনীতির এই চাপ নতুন নয়, কিন্তু এখন এটি উপেক্ষা করার মতো অবস্থায় নেই।
প্রশ্নটি তাই সরল—বাংলাদেশ কি প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে দ্রুত এগোবে, নাকি বিলম্বের ঝুঁকি নেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দশকে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।
লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক