জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

অগ্রগতির পথে নারী, সমতার পথে বাধা

নারী দিবস। সংগৃহীত ছবি

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। পৃথিবীর বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই দিবসটি কি কেবল ফুল, ব্যানার, আর শুভেচ্ছা বার্তার মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি এটি আমাদের সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা বৈষম্য, সহিংসতা আর অসমতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক সুযোগ হয়ে উঠবে এবং সেগুলো সমাধানেরও পথ দেখাবে?

বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে নারীরা এক অনিবার্য শক্তি। পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, এমনকি পরিবারের প্রতিদিনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও নারীদের অবদান অপরিসীম। অথচ এই দৃশ্যমানতার আড়ালে এখনও রয়ে গেছে বহু অদৃশ্য সংগ্রাম। আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অগ্রগতির এবং বৈচিত্র্যের মাত্রায় বৈষম্য রয়ে গেছে। বহু ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতির পথ এখনও দীর্ঘ এবং অনেকটাই বন্ধুর।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ লিঙ্গ সমতার সূচকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে শীর্ষ দশের মধ্যেই।

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে নারী রাষ্ট্রপ্রধান থাকার ঘটনাও বিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ। রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর এই উপস্থিতি একটি প্রতীকী শক্তি তৈরি করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশকে আলাদা করে তুলে ধরে। দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীদের আধিপত্য ছিল। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে নিকট ভবিষ্যতে হয়তো নারীদের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের এই অর্জন ধরে রাখা এবং আরও বিস্তৃত করা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। ১৯৭০-এর দশকে যেখানে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি হার ছেলেদের তুলনায় অনেক কম ছিল, সেখানে আজ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদের সমান বা কখনও বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ভর্তির হার প্রায় ৫০ শতাংশেরও বেশি। মাধ্যমিক শিক্ষায়ও ছাত্রীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষার প্রতিটি স্তরে নারীদের ব্যাপকভাবে ভালো ফলাফল অর্জনের অগ্রগতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন অনেক বিভাগেই ছাত্রীদের সংখ্যা ছেলেদের সমান কিংবা অনেক ক্ষেত্রে বেশি। এই প্রবণতা শুধু সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নারীর অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৭৫–৮০ শতাংশই নারী। এই শিল্প শুধু বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎসই নয়, বরং লক্ষ লক্ষ নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথও খুলে দিয়েছে। গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের বহু নারী শহরে এসে কাজের সুযোগ পেয়েছেন এবং তাদের উপার্জনের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে নতুন ভূমিকা তৈরি করেছেন।

এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নারীর শ্রম ও আত্মত্যাগের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায়ও উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসে নারীর শ্রমবাজারে প্রবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে এই অগ্রগতির মধ্যেও একটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ এখনও পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে মাত্র প্রায় ৪২-৪৪ শতাংশ শ্রমবাজারে অংশ নেয়, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৮০ শতাংশেরও বেশি।

এটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। শিক্ষিত নারীদের অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন না। সামাজিক বাধা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বোধ, নিরাপত্তাহীনতা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং পারিবারিক দায়িত্ব এসব কারণ তাদের সম্ভাবনাকে আটকে দেয়।

এর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীরা প্রায়ই কম মজুরি পান এবং নেতৃত্বের অবস্থানে তাদের উপস্থিতি খুবই সীমিত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মধ্য ও উচ্চ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় নারীর অংশ মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ আমরা নারীদের শিক্ষিত করছি, কিন্তু তাদের দক্ষতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছি না। এটি কেবল নারীর ক্ষতি নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতি।

বাংলাদেশের সমাজে নারীর অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হচ্ছে সহিংসতা ও বৈষম্য। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক কথায় অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই নারী ও কন্যাশিশুরা নানা ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষের মধ্যে অন্তত একটি করে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত রয়েছে। এমনকি অনেক নারীও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এই পক্ষপাতকে নিজের অজান্তেই মেনে নেন।

এই পরিসংখ্যান আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, নারীর অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা কেবল অর্থনৈতিক বা আইনি নয়; বরং সামাজিক মানসিকতা। একটি মেয়ে যখন জন্মায়, তখন থেকেই তার জীবনের সম্ভাবনাকে অনেক সময় সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। অনেক পরিবারে এখনও মনে করা হয় ছেলেরা পরিবারের ভবিষ্যৎ, আর মেয়েরা একদিন অন্যের বাড়িতে চলে যাবে। যদিও সময়ের সাথে এই প্রবণতা কমেছে, কিন্তু পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। এই ধারণা বদলানো ছাড়া প্রকৃত লিঙ্গসমতা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ নারী প্রতিদিন কাজ করেন, কিন্তু তাদের শ্রম অনেক সময় কোনো পরিসংখ্যানেই ধরা পড়ে না। ঘরের কাজ, শিশু লালন-পালন, বয়স্কদের দেখাশোনা, পারিবারিক ব্যবস্থাপনা এসব কাজ সমাজ ও অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হলেও এগুলোকে প্রায়ই “অকাজ” বলে মনে করা হয়।

গ্রামের নারীরা কৃষিকাজে অংশ নেন, হাঁস-মুরগি পালন করেন, গবাদি পশু লালন করেন এবং পরিবার চালানোর জন্য নানাভাবে অবদান রাখেন। তবুও সরকারি হিসাব-নিকাশে তাদের অনেক কাজই “অর্থনৈতিক কার্যক্রম” হিসেবে ধরা হয় না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যদি নারীদের এই অদৃশ্য শ্রম অর্থমূল্যে হিসাব করা হয়, তাহলে তা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের একটি বড় অংশের সমান হতে পারে। এই অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি দেওয়া নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস মূলত একটি মানবাধিকার আন্দোলনের ফল। নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এটি কেবল একটি নৈতিক ধারণা নয, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মৌলিক নীতি। বাংলাদেশ সংবিধানও নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের কথা ঘোষণা করেছে।

কিন্তু বাস্তবে এই সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বোধের মর্যাদাকেও সমন্বয় করে সমতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এসব শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এগুলো মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

বিশ্বব্যাপী গবেষণা দেখায়, যখন নারীরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়, তখন তার সুফল পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। নারীরা তাদের আয়ের বড় অংশ পরিবার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে যা দীর্ঘমেয়াদে মানব উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে। বাংলাদেশেও এর উদাহরণ রয়েছে। নারীর কর্মসংস্থান বাড়ার ফলে শিশুদের শিক্ষায় বিনিয়োগ বেড়েছে, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়েছে এবং দারিদ্র্য কমেছে। নারীর ক্ষমতায়ন শুধু একটি নৈতিক বা সামাজিক বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও প্রধান চালিকা শক্তি।

বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে চায়, তাহলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে তা কমাতে হবে। শিক্ষিত নারীদের জন্য নিরাপদ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতে হবে এবং সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। আইন থাকলেই হবে না; তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, সমাজের মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে বড় ভূমিকা নিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, নারীকে কেবল “সহায়তার প্রাপক” হিসেবে নয়, বরং “উন্নয়নের অংশীদার” হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে নারীরা ইতোমধ্যে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করেছে। কিন্তু প্রকৃত সমতা তখনই আসবে, যখন একটি মেয়ের জন্ম আনন্দের কারণ হবে, তার শিক্ষা বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হবে এবং তার স্বপ্নকে পরিবারের বোঝা নয় বরং সম্ভাবনা হিসেবে গণ্য করা হবে।

একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার নারীরা স্বাধীন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, ফলিত পরিসংখ্যান এবং ডেটা সায়েন্স, পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত