সুকঠিন লক্ষ্য অর্জনে প্রয়াসী মুদ্রানীতি

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ১৯: ২৫
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

নতুন বাজেট পাসের দিন আগামী ছয় মাসের জন্য নতুন মুদ্রানীতিও ঘোষিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এটি করে থাকে প্রধানত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সরকার ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর বাস্তবায়ন সহজ করতে। নির্দিষ্ট সময়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কেমন থাকবে, তারও লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয় মুদ্রানীতিতে।

বেসরকারি খাত প্রবৃদ্ধি অর্জনে চালকের ভূমিকায় থাকায় সবারই জানার আগ্রহ, এতে ঋণপ্রবাহ কতটা বাড়বে। এ মুহূর্তে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। আগের মুদ্রানীতিতে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, তা অর্জিত হয়নি বলে নতুন মুদ্রানীতিতে সেটা আরও কমানো হয়েছে। এটাকে সঙ্গতিপূর্ণ বলা গেলেও এ লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা যাবে কিনা, প্রশ্ন রয়েছে। নতুন সরকার বড় ঘাটতি বাজেট নেওয়ায় তাকে ব্যাংকঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে বৈকি। সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাই ভাবার কিছু নেই। রাজস্ব আহরণ হতাশাজনক হলে কিংবা উন্নয়ন সহযোগীরা কম সহায়তা জোগালে সরকারের ঋণ গ্রহণ আরও বাড়বে।

সমস্যা হলো, এটা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বেশি সহায়ক হবে না। এ কারণেই হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, বাজেটে ধরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে নতুন অর্থবছরে। তবে মূল্যস্ফীতিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করায় বোঝা যাচ্ছে, সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে সিরিয়াস। সেজন্য তারা সাবেক গভর্নর আমলে বাড়িয়ে তোলা নীতি সুদহার ১০ শতাংশেই ধরে রেখেছেন। ব্যাংক ঋণের সুদে এর প্রভাব থাকবে বৈকি।

নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর হতাশাজনক বিনিয়োগ পরিস্থিতি থেকে বেরোতে সুদের হার কমানোর প্রয়াস গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তবে দ্রুতই ইরান যুদ্ধ ঘিরে উদ্ভূত জ্বালানি সংকটে মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়ায় তিনি আর সেই প্রশ্নে অটল থাকেননি। মূল্যস্ফীতির বাড়ন্ত অবস্থায় কম সুদে অর্থ সরবরাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতি তো আরও বাড়ার কথা। প্রশ্ন হলো, এটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে আবার কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে। অথচ এটা বাড়ানো বর্তমান সরকারের বড় অঙ্গীকার। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এটা জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। সার্বিক পরিস্থিতিতেও এটা জরুরি। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ যে বেশি নেওয়া যাচ্ছে, তা নয়। ইরান যুদ্ধ এ ক্ষেত্রটাকেও প্রতিকূল করে তুলেছে।

এমন পরিস্থিতি অনুধাবন করেই বাংলাদেশ ব্যাংক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা কর্মসূচি নিয়েছে। বন্ধ প্রতিষ্ঠান খুলতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন এর দৃষ্টান্ত। এটির অপব্যবহারের শংকাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এতে চালু প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক আবার চাইছে আমানত ও ঋণের সুদের পার্থক্য বা ‘স্প্রেড’ কমিয়ে নির্দিষ্ট করে দিতে। তাতে ব্যাংকের মুনাফার সুযোগ কমলেও ঋণের সুদ হয়তো কিছুটা কমানো যাবে। বিশেষ ছাড়ে আটকে থাকা ঋণ ব্যাংকে ফিরিয়ে তাদের ঋণদান ক্ষমতা বাড়িয়ে বেসরকারি খাতে সহজে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধিরও উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে প্রবৃদ্ধি কমে গেলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা থেকে বেরোতেই আসলে এসব কিছুর আয়োজন। প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সঙ্গে আবার মূল্যস্ফীতি কমানো—এমন লক্ষ্য অর্জন সুকঠিন। দুর্ভাগ্যবশত, সেই কাজেই নিয়োজিত হতে হচ্ছে সরকারকে। সেই লক্ষ্যেই গৃহীত হয়েছে বাজেট এবং একই ধারায় ঘোষিত হয়েছে মুদ্রানীতি। এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনে মাসিক পর্যালোচনা করে পরিবর্তিত নীতিকৌশলও নেওয়া যেতে পারে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত