সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান প্রয়োজন

জামালপুরে সাত বছরের মেয়েশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মেঝেতে পুঁতে রাখা হয়েছে। গাজীপুরে মাদ্রাসাশিক্ষক কিশোর শিক্ষার্থীকে বিবস্ত্র করে কঞ্চি দিয়ে পিটিয়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়েছেন। কুমিল্লায় মসজিদের মাইকে ‘ডাকাত’ ঘোষণা দিয়ে এক ব্যক্তিকে স্ত্রী-সন্তানের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ফরিদপুরে আড়াই মাসের ব্যবধানে একই পরিবারের দুজনকে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে। ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে যে ভয়াবহ সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তার নাম সামাজিক অপরাধ বেড়ে যাওয়া।
কেন সামাজিক অপরাধ বেড়ে গেল, তার কারণ অনুসন্ধান করা দরকার। সংকটের মূলে যেতে না পারলে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা দিয়ে এর সমাধান হবে বলে মনে হয় না।
অপরাধবিজ্ঞানীরা বলে আসছেন, সামাজিক অপরাধ সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের ব্যারোমিটার। বিশ্বের সবচেয়ে কম অপরাধপ্রবণ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও জাপান। এসব দেশের সাধারণ বৈশিষ্ট্য শক্তিশালী অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা জাল ও আইনের পক্ষপাতহীন, কার্যকর প্রয়োগ।
অন্যদিকে, সর্বাধিক অপরাধপ্রবণ দেশগুলোর প্রায় সবই দারিদ্র্য ও অস্থিরতায় জর্জরিত। যেমন, পাপুয়া নিউগিনি, জ্যামাইকা, গিনি, আফগানিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, হন্ডুরাস। বাংলাদেশ এই ধারার বাইরে নয়।
গত কয়েক বছরে করোনার ধাক্কা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া গণঅভ্যুত্থানের পর বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। অব্যাহত মূল্যস্ফীতিতে সংসারের ভার বইতে গিয়ে সিংহভাগ মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন। এদিকে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনী এখনো পূর্ণ কার্যকারিতায় ফিরতে পারেনি। বাহিনীটিতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারও হয়নি। এসব শূন্যতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। মাদকাসক্তি থেকে উদ্ভূত অপরাধ, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, পারিবারিক সহিংসতা—সবকিছুর পেছনেই হতাশা বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের পেছনেও মাদকাসক্তি, নৈতিক অবক্ষয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি কাজ করছে বলেই অনুমান।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অপরাধবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতি নিয়ে কতটা কাজ করছেন? সরকারেরই বা পরিকল্পনা কী? কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিলেই অপরাধ কমবে না। এর মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিত কৌশল নির্ধারণ করা আশু প্রয়োজন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলেও অপরাধীকে নিরুৎসাহিত করা যাবে না। জামালপুরে শিশুটিকে যিনি ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন, তিনি হয়তো ভেবেছিলেন -- লাশ লুকিয়ে রাখলে পার পাওয়া যাবে। গাজীপুরের মাদ্রাসাশিক্ষক মনে করতেন, শিক্ষার্থীকে নির্মম নির্যাতন করলেও ঘটনা জানাজানি হবে না। পার পেয়ে যাওয়ার ধারণাই অপরাধের সবচেয়ে বড় ইন্ধন।
সামাজিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো, একটি অপরাধ আরেকটি অপরাধ ডেকে আনে। যে সমাজে ছোট অপরাধের শাস্তি হয় না, সেখানে বড় অপরাধও ঠেকানো কঠিন।
অপরাধ দমনে প্রতিরোধমূলক কৌশলও দরকার। এর জন্য তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করা চাই। প্রথমত, অর্থনীতি চাঙা করে কর্মসংস্থান বাড়ানো ও দ্রব্যমূল্য জনসাধারণের নাগালে আনা। অর্থনৈতিক হতাশাই অপরাধের সবচেয়ে উর্বর মাটি। দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীতে সংস্কার আনা এবং তাদের কার্যকরভাবে মাঠে নামানো, যাতে মামলা না নিয়ে জিডি করানোর প্রবণতা বন্ধ হয়। তৃতীয়ত, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। কারণ বিলম্বিত বিচার কার্যত বিচারহীনতার শামিল।
একটি শিশু পরিচিতজনের বাড়িতে খেলতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। এর চেয়ে বড় সামাজিক বিপদের সংকেত আর কী হতে পারে? এটি উপেক্ষার সুযোগ নেই।
.png)

-7c29dd-256x144.webp)
