চালের উৎপাদন কমতে দেওয়া যাবে না

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে চাল উৎপাদন সাড়ে সাত লাখ টন কমে যেতে পারে বলে জানিয়েছে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)। তাদের পূর্বাভাসকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয় বলেই সেটা খবর হয়েছে। আউশ উত্তোলন শেষে আমন মৌসুম চলছে এখন। এরপর কৃষকরা শুরু করবে প্রধান চাল উৎপাদন মৌসুম বোরোর প্রস্তুতি। ইউএসডিএ বলছে, প্রতি মৌসুমেই চালের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
চাল আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য এবং এর উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিভিন্ন খাদ্যপণ্য ব্যাপকভাবে আমদানি করতে হলেও চালে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ বলেই মনে করা হয়। এটা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকেও জোরালো করেছে। কখনো কখনো কিছু চাল আমদানি করতে হয় না, তা অবশ্য নয়। অন্তর্বর্তী শাসনামলেও চাল আমদানিতে যেতে হয়েছিল। অতি সতর্কতার চাপে বেশি পরিমাণে চাল তখন আনা হয় বলে অনেকের ধারণা। সেই কারণে চালের বাজার স্থিতিশীল বলে মনে করেন তারা। আউশ উত্তোলনের পর নওগাঁর মতো কোনো কোনো অঞ্চল থেকে ধান-চালের দাম কমে যাওয়ার খবরও মিলছে। তাতে অনেকে মনে করতে পারেন, আউশের উৎপাদন কম হয়নি। আমদানিকৃত চাল বেশি পরিমাণে বাজারে থেকে যাওয়ার কারণেও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ভোক্তাদের জন্য ইতিবাচক হলেও ধান-চাল উৎপাদকদের জন্য পরিস্থিতিটা হতাশার। এটা কাটাতে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ আউশ মৌসুমেও ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান পরিচালনা করে এর দাম ধরে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন সরকারকে।
এ অবস্থায় ইউএসডিএ চাল উৎপাদন কমে যাওয়ার যে শংকার কথা বলেছে, সেটাকেও হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। ধানের আবাদি জমিও কমেছে বলে তাদের পর্যবেক্ষণ। বাংলাদেশের কৃষি বিভাগ কী বলে, সেটাও দেখতে হবে। ধান-চালের উৎপাদন কমার মতো পরিস্থিতি থাকলে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে বৈকি। উপযুক্ত দাম না পাওয়ার কারণে ধানচাষ কমছে কিনা, সেটা দেখাও জরুরি। বিকল্প ফসল আবাদের প্রবণতা বাড়ছে বৈকি। বন্যা, অতিবৃষ্টিতে আউশের কিছু ক্ষতি হয়েছে বলেই জানা যায়। এতে আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ারও খবর মিলেছিল। সারে যে সংকটের খবর মিলছে– ‘মজুত সন্তোষজনক’ বলে সেটা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত দামে সার আমদানির পরও কৃষক তা সময়মতো না পেলে সেটা দুর্ভাগ্যজনক।
বোরো মৌসুমে সার অনেক বেশি লাগবে। সেচের চাহিদাও বাড়বে অনেক। চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট তত দিনে কী রূপ নেয়; তার সঙ্গে বোরো মৌসুমকে সফল করার সম্পর্ক রয়েছে। সেচে ডিজেলের চাহিদাও বাড়বে তখন। যুদ্ধের জটিলতায় জ্বালানি তেলের দাম নতুন করে বাড়ছে। এটা শান্ত হয়ে না এলে অতিরিক্ত ভর্তুকি জুগিয়ে হলেও কৃষিতে উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বীজ সংকটও হতে দেওয়া যাবে না। তার আগে অবশ্য আমন মৌসুমে বিরাজমান সংকটের জায়গাগুলোয় বেশি করে দৃষ্টি দিতে হবে।
সরকার দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের ব্যবস্থা করেছে। তাতে ১২ লাখ কৃষক উপকৃত। তাদের কাছে কৃষি উপকরণসহ বিভিন্ন সহায়তা সহজে পৌঁছে দিতে ‘কৃষক কার্ড’ কার্যক্রমও শুরু হতে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি উৎপাদিত কৃষিপণ্যের লাভজনক দাম নিশ্চিত করতে হবে। নইলে কৃষিকাজেই আগ্রহ হারাবে কৃষক। বিশেষত ধানসহ প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন নিরুৎসাহিত হতে দেওয়া যাবে না। তিন মৌসুমে সাড়ে সাত লাখ টন চাল উৎপাদন কম হলে নতুন করে এর আমদানিতে যেতে হবে। অস্থির বিশ্ব পরিস্থিতিতে সেটা কঠিন হতে পারে। বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের উৎপাদন, সরবরাহ আর দাম বৃদ্ধির প্রবণতাও লক্ষণীয়। এ অবস্থায় অন্যান্য জরুরি পণ্যের পাশাপাশি চালও আমদানি করতে হলে সেটা রিজার্ভে চাপ সৃষ্টিসহ অভ্যন্তরীণ বাজারকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
.png)
-7c29dd-256x144.webp)


