খাদ্য কূটনীতি/ব্রিকসের অতিথিদের পাতে নেই মাছ-মাংস, কী কী খাওয়ালেন মোদি

গত শনিবার ভারতের নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে আগত অতিথিদের জন্য নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। নৈশভোজের পুরো মেনুতে ছিল নিরামিষ খাবার। মেনুতে থাকা ১০টির বেশি পদের তালিকায় কোথাও মাছ-মাংসের দেখা নেই।
এ নিয়ে বেশ তীর্যক মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসের নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, বিজেপি নেতারা জোর করে খাবার নিয়ে তাদের এজেন্ডা অতিথিদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছেন। আবার বিজেপি নেতাদের মত, তাঁরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবারকে প্রাদান্য দিয়েই এই মেনু সাজিয়েছেন।
এ যেন বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের পাশাপাশি খাবারের টেবিলেও চলছে ‘খাদ্য কূটনীতি’।
নৈশভোজের মেনুতে কী কী ছিল
খাবারের তালিকায় ১০টির বেশি পদ ছিল। নৈশভোজের তালিকায় শুরুতেই ছিল ‘খান্ডভি মিল-ফয়’। গুজরাটি খান্ডভিকে নতুনভাবে সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এই পদ। এতে সরিষা, নারকেল ও কারিপাতার ফোড়ন দেওয়া হয়। সঙ্গে ছিল কেশর-আম, মাইক্রোগ্রিনস ও দইয়ের ড্রেসিং। আরেকটি স্টার্টার ‘খুম্ব গালৌটি’। মাশরুম দিয়ে তৈরি এই কাবাব ছিল প্যান-গ্রিল করা। এর সঙ্গে পুদিনার ছোট ছোট বল ও শিরমাল রুটি দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

মূল খাবারে ছিল পনির লাবাবদার, গুচ্ছি মারমিক। এই পদে ব্যবহার করা হয়েছে হিমালয়ের মোরেল মাশরুম ও অ্যাসপারাগাস। সঙ্গে ছিল জাফরান, কিশমিশ ও মামরা বাদাম। দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের প্রতিনিধিত্ব করেছে ‘ক্যারট বিন পরিয়াল’। দক্ষিণ ভারতীয় মসলা, নারকেল তেল ও কোরানো নারকেল দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। এর সঙ্গে ছিল থাক্কালি বেলে সাগরু। টমেটো, কারিপাতা ও তুর ডাল দিয়ে তৈরি এই পদটি ছিল হালকা ঝোলের মতো। এ ছাড়া মেনুতে ছিল মিলেট পোলাও, বিটরুট রায়তা এবং বিভিন্ন ধরনের ভারতীয় রুটি।
নৈশভোজের মিষ্টান্নে ছিল পুরোনো দিল্লির স্বাদ। এখানে পরিবেশন করা হয় ওল্ড দিল্লি ফ্রুট ক্রিম উইথ জিলাপি, সঙ্গে শাহতুত ফিরনি। দুধ ও চাল দিয়ে ধীরে রান্না করা এই ফিরনির ওপর তুঁত ফল ও সোনার পাত দেওয়া হয়। ভারতীয় খাবারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বাদের কিছু পদও রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ছিল পেনে আল পোমোদোরো এ পানা এবং বেকড ভেজিটেবল অ গ্রাতাঁ। ছিল পার্ল মিলেটের একটি পদ। এর সঙ্গে হ্যারিকট বিন, চার্ড পেপার ও সাইট্রাস-পার্সলে ড্রেসিং, পাপড় ও সালাদও ছিল।
নিরামিষ মেনু নিয়ে সমালোচনার সোশ্যাল মিডিয়ায়
নরেন্দ্র মোদি আয়োজিত নৈশভোজ নিয়ে সমালোচনাও কম হচ্ছে না। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী রোববার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে নাশতায় আমন্ত্রণ জানান। এরপর নিজের এক্স একাউন্টে তিনি লেখেন, ‘রেকর্ডের জন্য: ভারতের ৮০ শতাংশ মানুষ আমিষভোজী। ভারতীয় আমিষ খাবার সুস্বাদু। যেমন আমার বোন (কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা ভাদ্রা)-এর রান্না ছোলে ভাটুরেও সুস্বাদু।’
-070144.jpeg)
কংগ্রেস সাংসদ পবন খেরাও এক্সে লেখেন, ‘ভারতের মানুষের ওপর নিজেদের খাবারের পছন্দ চাপিয়ে দেওয়ার বিজেপির অভ্যাস এমনিতেই সমস্যাজনক। এবার তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের ওপরও নিজেদের পছন্দ চাপিয়ে দিয়েছে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘ভারত সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় খাবারের দেশ। এখানে বিশ্বের অন্যতম সেরা আমিষ খাবার রয়েছে, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ পছন্দ করেন ও উপভোগ করেন। তাহলে মোদি সরকার ভারতের সংস্কৃতির এই অংশ কেন লুকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিল? যে বৈচিত্র্য ভারতকে ভারত করে তুলেছে, সরকার কি সেই বৈচিত্র্য নিয়েই লজ্জিত?’
আবার, পবন খেরার বক্তব্যের জবাবে সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, ‘আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে কংগ্রেস ব্রিকস দেশগুলোর নেতাদের জন্য পরিবেশন করা খাবারের মেনু নিয়েও রাজনীতি করছে। আমাদের অতিথিরা স্বাদ ও পুষ্টির বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ভারতীয় নিরামিষ খাবার উপভোগ করেছেন। এতে বিভিন্ন অঞ্চলের রান্নার ঐতিহ্যও তুলে ধরা হয়েছে।’
এদিকে ভারতের সাবেক সাংসদ ও অবসরপ্রাপ্ত আমলা জহর সরকার বিষয়টি তুলনা করেছেন ২০১০ সালের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের সঙ্গে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে জহর সরকার ফেসবুকে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট ওবামা ও তাঁর প্রতিনিধিদলের জন্য যে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন, তার একটি কপি আমি দিচ্ছি। তখন অতিথিদের প্রায় সবাই আমিষভোজী ছিলেন। তাই খাবারে দারুণ সব নিরামিষ খাবারের সঙ্গে ছিল ঐতিহ্যবাহী আমিষ পদও রাখা হয়েছিল।’
জহর সরকার আরও লেখেন, ‘মোদির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি, চীনের শি জিনপিং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স মোদির নিরামিষ নৈশভোজে অংশ নেননি। কী লজ্জা! আর মোদি ১২ বছর ধরে এটি করে আসছেন। শুধু তাঁর সমর্থক নিরামিষভোজীদের খুশি করতে গিয়ে বিদেশি অতিথিদের বিরক্ত করছেন।’

তবে অতিথিরা কেন নৈশভোজে অংশ নেননি এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও এক্সে লেখেন, ‘আমি কি খারাপ সাংসদ হব, যদি আমি ব্রিকসের নেতাদের এই মেনু বাদ দিতে বলি এবং দায়িত্বরত লোকদের ‘করিমস হোটেল’ থেকে কিছু বরাহ কাবাব নিয়ে আসতে বলি?’
এআইএমআইএমের মুখপাত্র ও মহারাষ্ট্রের বিধায়ক ওয়ারিস পাঠানও নিরামিষ মেনু নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি লেখেন, ‘আপনি নিরামিষভোজন প্রচার করতে চান, করুন। কিন্তু ভারতের খাবারের সংস্কৃতিকে শুধু নিরামিষ মেনুর মধ্যে সীমাবদ্ধ করবেন না। আমাদের উচিত ছিল তাঁদের সামনে ভারতের খাবারের পুরো স্বাদ তুলে ধরা। মাটন মসালা ফ্রাই, হায়দরাবাদি বিরিয়ানি, তন্দুরি চিকেন, বাটার চিকেন, গোয়ান ফিশ কারি এবং এ ধরনের আরও বিখ্যাত ভারতীয় খাবার। বিশ্বকে বলা উচিত, ভারতের বৈচিত্র্য শুধু ভাষা ও সংস্কৃতিতে নয়। আমাদের খাবারের থালাতেও রয়েছে।’
‘ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ মেনু’ তৈরিতে সময় লেগেছে তিন থেকে ছয় মাস
ব্রিকস সম্মেলনের নৈশভোজের বাইরে দিল্লির বিভিন্ন হোটেলেও বিদেশি অতিথিদের জন্য ছিল বিশেষ আয়োজন। নয়াদিল্লির তাজমহল হোটেলে এই আয়োজনের নেতৃত্ব দিয়েছেন নির্বাহী শেফ কৌশিক মিশ্র।
শেফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো মেনু তৈরি করতে প্রায় তিন থেকে ছয় মাস গবেষণা করা হয়েছে। কোন দেশের অতিথি কী ধরনের খাবার পছন্দ করেন বা অপছন্দ করেন, সেটিও খেয়াল রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, এই আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো ভারতীয় এবং অতিথিদের পছন্দ অনুযায়ী দুই ধরনের খাবারই যেন প্রতিনিধিরা উপভোগ করতে পারেন।
তাজমহল হোটেলে রুমে খাবার দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ মেনু’। ব্রিকস সম্মেলনের প্রথম দিনের সরকারি নৈশভোজের মতো এই মেনু পুরোপুরি নিরামিষ নয়। এতে অতিথিদের পছন্দের খাবারের পাশাপাশি ভারতের ঐতিহ্যবাহী খাবারও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নাল্লি নিহারি এবং বাদাম দিয়ে পেপার ফ্রাইসহ আরও কয়েকটি পদ।
অতিথিদের জন্য তাজমহল হোটেলে ভারতের মানচিত্রও তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলের স্থানীয় খাবারের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। মুরুক্কু ও কাজু মিঠাইয়ের মতো খাবার রয়েছে এই আয়োজনে। প্রতিটি খাবারের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে এর পরিচয় ও গুরুত্বের ব্যাখ্যা। এ ছাড়া অতিথিদের রুমে খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে নানা ধরনের উপহারও।
তাজমহল হোটেলের পাশাপাশি অন্যান্য হোটেলও অতিথিদের জন্য আলাদা আয়োজন করেছে। যেমন ‘দ্য লীলা প্যালেস’ তৈরি করেছে গোলাপ, জাফরান ও এলাচ দিয়ে খাওয়ার উপযোগী পদ্মফুল। ‘দ্য ললিত’ ভারতীয় খাবারের সঙ্গে জাপানি ও চীনা স্বাদের সমন্বয় করেছে। ‘আইটিসি মৌরিয়া’ রুশ অতিথিদের জন্য তৈরি করেছে চকোলেটের মাত্রিওশকা পুতুল ও মস্কোর আকাশরেখা। ‘শেরাটন নয়াদিল্লি’ মিসরের প্রেসিডেন্টের জন্য তৈরি করেছে সোনালি চকোলেট পিরামিড।
মজার ব্যাপার হলো, খাবারের পাশাপাশি অতিথিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে রেসিপির বইও।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি, টেলিগ্রাফ
.png)

-7c29dd-256x144.webp)






