সাক্ষাৎকার
হরমুজ সংকট সামনে এনেছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নটি। বাংলাদেশের কোনো কৌশলগত জ্বালানি মজুত নেই। ঘাটতি আছে মজুত সক্ষমতাতেও। যা শুধু জ্বালানি নয়, জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তার এই সমস্যাগুলো কিভাবে সমাধান করা যেতে পারে? এসব বিষয়ে কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞ রিয়ার এডমিরাল (অবসরপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ খুরশেদ আলম। স্ট্রিমের রিসার্চ ফেলো সানীউজ্জামান পাভেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো…
সানীউজ্জামান পাভেল

স্ট্রিম: হরমুজ সংকটে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি ঝুকির দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের কোনো কৌশলগত জ্বালানি মজুত নেই। এটিকে নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোন কোন দূর্বলতা আপনার বিবেচনায় এসেছে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমরা তেল রাখতে পারি মাত্র ১৩ লক্ষ টন। চার মাসের বেশি আমাদের মজুত নাই। একটা মাত্র রিফাইনারি। সেটাও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ অপরিশোধিত তেল আসছে না এবং আমরা অন্য দেশের ক্রুড এখানে রিফাইন করতে পারি না। আমাদের এই ফ্যাসিলিটিস গ্রো করে নাই। তারপরে ১১০ কিলোমিটার পাইপলাইন মহেশখালী থেকে এই রিফাইনারি পর্যন্ত। জাহাজ ওখানে আসবে, তেলটা ওই সিঙ্গেল পয়েন্ট মরিং এ দিবে, ওখান থেকে ট্যাংকে যাবে, ট্যাংক থেকে ওইটা এই রিফাইনারিতে আসবে। কিন্তু ওই সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং আজকে প্রায় দুই আড়াই বছর ধরে অপারেশনাল না। ওখানে কিন্তু দুই লক্ষ টন তেল আমরা রাখতে পারি, এই মহেশখালীতে। ট্যাংক আছে এখন খালি, কারণ এটার অপারেশন এবং মেইনটেনেন্স করার জন্য যে কন্ট্রাক্ট নিয়োগ করার কথা গত সরকারগুলো এটা করতে পারেনি।
আমাদের দেশের ভিতরে যাতে রিজার্ভটা পর্যাপ্ত পরিমাণে তার জন্য এইখানে আমরা যা করতে পারি তা হলো দেশের ব্যবহার করার জন্য মজুত, আরেকটা হলো স্ট্র্যাটেজিক। একটা যুদ্ধবিগ্রহ পরিস্থিতি বা সাগরে কোন একটা অন্যরকম পরিস্থিতি হলে তখন আমরা কি করব? কাজেই একটা রিজার্ভের ব্যবস্থা আমাদের করা দরকার।
স্ট্রিম: কৌশলগত জ্বালানি মজুত না থাকার সমস্যাটি কীভাবে সমাধান করা যেতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমরা যা কিছু উন্নয়ন করেছি এই দেশে, বেশিরভাগই কিন্তু নদীর এই পাড়ে, নদীর ওই পাড়ে কিন্তু কিছু নাই। আপনি যদি রিজার্ভ তেলের কথাও বলেন, ওই খুলনায় কিছুটা আছে খালিশপুরে, তারপরে বাঘাবাড়িতে আছে। তো ওখানে তো জাহাজই চলে না।
আমি যখন মংলা পোর্টের চেয়ারম্যান হিসেবে ছিলাম তখন এই জিনিসটা আমি বারবারই বলছিলাম যে আমরা যদি মংলা পোর্টের ইপিজেড এলাকায় একটা রিফাইনারি করি এবং এইযে আমরা কত ৬০-৭০ মাইল দূরেই তো পাইপ রেখেছি ১১০ কিলোমিটার, ওখানে যদি ১৫০ কিলোমিটার দূরে আমরা যদি একটা সিঙ্গল পয়েন্ট মুরিং করি, সেটা হলো সোয়াচ অব নো গ্রাউণ্ডে।
সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের গভীরতা সম্পর্কে আপনারা জানেন। সেখানে পানির গভীরতা কোথাও ১২০ ফুট, আবার মাত্র এক পা এগোলেই তা ১৫০০ থেকে ২০০০ ফুট হয়ে যায়। পানির গভীরতা যেখানে ২০০০ ফুট, সেখানে অনায়াসেই ২ থেকে ২.৫ লাখ টনের বড় তেলের ট্যাংকার আসতে পারবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওই এলাকায় যদি একটি ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ স্থাপন করা হয়, তবে সেখান থেকে সরাসরি বাগেরহাট বা মোংলা বন্দর পর্যন্ত তেল আনা সম্ভব হবে। এতে দেশের দুই প্রান্তেই জ্বালানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।
মোংলা বা বাগেরহাট থেকে উত্তরবঙ্গসহ সারা দেশে জ্বালানি সরবরাহ করা অনেক সহজ হবে। কারণ বর্তমানে নদীপথ, নবনির্মিত রেলপথ এবং উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা—সবই বিদ্যমান। তাই আমাদের একটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করা দরকার যে, ৫৬ বছরে আমরা মাত্র একটি রিফাইনারি পেয়েছি। এখন দ্বিতীয় আরেকটি রিফাইনারি করার উপযুক্ত সময় এসেছে।
বর্তমানে যে পাইপলাইনটি করা হয়েছে, সেটি চট্টগ্রাম অঞ্চলে না করে পশ্চিম অঞ্চলেও করা যেত। তবে চট্টগ্রামকে বেছে নেওয়ার একটি ঐতিহাসিক কারণ আছে। এক সময় বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের নিজস্ব ট্যাংকার ছিল, যা সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল এনে রিফাইনারিতে পৌঁছে দিত। কিন্তু জাহাজগুলো পুরোনো হয়ে যাওয়ায় এবং সেগুলো বিক্রি করে দেওয়ায় এক পর্যায়ে মাত্র একটি ট্যাংকার অবশিষ্ট থাকে।
সেই একটি মাত্র ট্যাংকার দিয়ে কুতুবদিয়ায় আসা বড় জাহাজ থেকে তেল খালাস করা হতো। এতে খরচ এবং লস—উভয়ই বেশি হতো। এই সমস্যা সমাধানের জন্যই ৮০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বর্তমান পাইপলাইনটি তৈরি করা হয়েছে।
তবে এই সময়ে যদি দেশের পশ্চিমাঞ্চলেও এমন একটি ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে আমাদের জ্বালানি সংরক্ষণের ক্ষমতা আরও বাড়তো। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বা যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে আমাদের অন্তত চার মাসের জ্বালানি মজুত থাকা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকলে যুদ্ধ চার মাস চললেও দেশে কোনো সমস্যা হবে না।
স্ট্রিম: জাতীয় জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের কেমন কৌশল নেওয়া উচিত?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: অনেকেই আজকাল দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির কথা বলছেন। তবে সব চুক্তি শুধু পশ্চিম দিকে বা এক দিকে করা ঠিক হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে আমরা এটি শিখলাম। অন্য উৎস থেকেও যেন তেল আনা যায়, সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির সুবিধা হলো, দুঃসময়েও সবসময় তেল পাওয়া যায়। আবার আমরা ‘স্পট পারচেজ’ বা তাৎক্ষণিক ক্রয়ের পদ্ধতিও ব্যবহার করি। এর লাভ হলো, বিশ্ববাজারে দাম কমলে সাশ্রয়ে তেল কেনা যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে দাম কমুক বা বাড়ুক, একই দাম দিতে হয়। দুই পদ্ধতিরই ভালো-মন্দ দিক আছে। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে আমরা যদি ছয় মাসের একটি কৌশলগত মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ রাখতে পারি, তবে বর্তমান সমস্যা ভবিষ্যতে কাটানো সম্ভব হবে। এমনকি ২ লাখ টনের তেলের জাহাজ রাখার ব্যবস্থা করলেও আমরা অনেকদিন চলতে পারব।
স্ট্রিম: কৌশলগত মজুত জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই ক্ষেত্রে সরকারের কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমি প্রথমে বলব সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের কথা। সেখানে পানির গভীরতা ১৫০০ থেকে ২০০০ ফুট। ফলে সেখানে আড়াই থেকে চার লাখ টনের বিশাল জাহাজও আসতে পারবে। কিন্তু কুতুবদিয়ার সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ে এই বড় জাহাজগুলো আসতে পারে না। আমরা যদি আড়াই লাখ মেট্রিক টনের তেলবাহী জাহাজ এনে পাইপলাইনের মাধ্যমে মোংলা পোর্টে তেল নিয়ে আসি, তবে খুব সুবিধা হবে। মোংলা পোর্ট এবং ইপিজেডে অনেক জায়গা খালি পড়ে আছে। বর্তমানে ইপিজেডে গ্যাস না থাকায় সাধারণ কিছু ফ্যাক্টরি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। আমরা যদি সেখানে একটি বড় রিফাইনারি করার জন্য বেসরকারি খাতকে অনুমতি দেই, তবে তা দেশের জন্য ভালো হবে। সেই রিফাইনারিতে রুশ তেলের মতো সব ধরনের তেল রিফাইন করার সক্ষমতা রাখা প্রয়োজন, যা বর্তমানে আমাদের নেই।

দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী চুক্তি এবং পশ্চিমের পাশাপাশি পূর্ব দিক থেকে (যেমন ভ্লাদিভোস্তক হয়ে) তেল আনার বিষয়গুলো বিবেচনা করে নতুন সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। এটি বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে যেকোনো দুর্যোগের সময় আমাদের স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ থাকবে। তখন মানুষকে তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করতে হবে না এবং হঠাৎ করে তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজনও হবে না। রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই এটি প্রয়োজন। বর্তমান সরকার যেহেতু এই সমস্যার ভুক্তভোগী, তাই তাদের আমলেই একটি স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভের ব্যবস্থা করা উচিত যাতে ভবিষ্যতে আর এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয়।
স্ট্রিম: জ্বালানি নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সম্পর্কটির গুরুত্ব সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমরা যদি ১৯৭১ সালের যুদ্ধ দেখি, তবে বুঝব যে আমরা দেশের ভেতরে খুব ভালো লড়াই করেছি। কিন্তু এই যুদ্ধের বড় একটি অবদান ছিল সাগরে, যা আমরা অনেকে ঠিকভাবে অনুধাবন করি না। ভারত যদি সাগরে অবরোধ না দিত, তবে পাকিস্তান থেকে জাহাজ রসদ, গোলাবারুদ বা তেল নিয়ে এখানে আসতে পারত। এই অবরোধ আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। যেকোনো সময় আমাদের ওপরও এমন অবরোধ আসতে পারে, যেমনটা বর্তমানে আমেরিকা দিচ্ছে। অবরোধ দিলে আমাদের তেল আনার বিকল্প কোনো স্থলপথ বা রুট নেই। তেল আনতে না পারলে সশস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে সব শিল্পকারখানা স্থবির হয়ে পড়বে। জেনারেটর চলবে না, বিদ্যুৎ থাকবে না। তাই রপ্তানি বাণিজ্য এবং দেশের চাকা সচল রাখতে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা আমাদের এক নম্বর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
স্ট্রিম: বাংলাদেশের কৌশলগত নিরাপত্তা ও স্বার্থ নিজেদের সমুদ্রের পাশাপাশি অনেক দূরের সমুদ্রের সঙ্গে জড়িত। এই স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় নৌবাহিনীসহ সামগ্রিক সশস্ত্র বাহিনী কী ভূমিকা রাখতে পারে এবং সরকারের কেমন কৌশল গ্রহণ করা উচিত?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমাদের এমন একটি নৌবাহিনী দরকার যারা আমাদের জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে দিতে বা নিয়ে আসতে পারবে। শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকলে সরকার এবং দেশের মানুষ শান্তিতে ও আস্থায় থাকতে পারবে। ১৯৭১ সালে সাগরে পাকিস্তানের কোনো জাহাজ না থাকায় তারা তাদের রসদ রক্ষা করতে পারেনি, যা তাদের পরাজয় নিশ্চিত করেছে।
সাগর কী হচ্ছে তা ঢাকা থেকে বোঝা কঠিন। সমুদ্রসীমা জয়ের পর আমরা 'ব্লু ইকোনমি' বা সুনীল অর্থনীতির কার্যক্রম শুরু করি। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমরাই প্রথম ব্লু ইকোনমি নিয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনার করি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সাগরের সম্পদকে দেশের কাজে লাগানো। তবে সাগরের সম্পদ কাজে লাগাতে হলে আগে তা পাহারা দিয়ে রক্ষা করতে হবে, যার জন্য নৌবাহিনী অপরিহার্য।
নৌবাহিনীর জাহাজের সংখ্যা হয়তো কম নয়, কিন্তু প্রতিপক্ষের তুলনায় সেগুলোর ফায়ার পাওয়ার বা দক্ষতা কতটুকু তা দেখতে হবে। বর্তমানে ইরান ও আমেরিকার লড়াইয়ে দেখা যাচ্ছে যে শুধু এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার দিয়ে কাজ হচ্ছে না। তাই আমাদেরও 'এসিমেট্রিক্যাল ওয়ারফেয়ার' বা অসম যুদ্ধের কৌশলে যেতে হবে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে সাগরে ব্যবহারের জন্য বড় প্ল্যাটফর্ম বা বড় জাহাজেরও প্রয়োজন আছে। অর্থাৎ আমাদের একটি মিশ্র নৌবহর থাকতে হবে।
আশির দশকে যখন আমাদের জাহাজ কম ছিল, তখন আমরা কয়েকশ থাই ও ভারতীয় ট্রলার অবৈধভাবে মাছ ধরার সময় আটক করেছিলাম। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। নৌবাহিনী প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা সাগরে পাহারা দিচ্ছে। এমনকি ঈদের দিনেও কয়েকশ লোক সাগরে দায়িত্বে থাকে। তবে আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলো আধুনিক হওয়া প্রয়োজন। ৪০ বছরের পুরনো জাহাজ চালানো যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি এতে আধুনিক প্রযুক্তিও নেই। তাই আমাদের 'ফোর্সেস গোল' এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে আমরা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও জাহাজ সংগ্রহ করতে পারি। নৌবাহিনীর সক্ষমতা এমন পর্যায়ে থাকতে হবে যেন তাদের মারণক্ষমতা বা 'টিথ পাওয়ার' প্রতিবেশীদের সমপর্যায়ের হয়।
স্ট্রিম: জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় আমাদের বন্দরগুলো কতটা সক্ষম?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: বর্তমানে মাতারবাড়ি বন্দর তৈরি হচ্ছে। এটি সফল হলে সেখানে ১৪ থেকে ১৫ মিটার, এমনকি সর্বোচ্চ ১৬ মিটার পর্যন্ত পানির গভীরতা পাওয়া যাবে। তখন সেখানে একসাথে ১২,০০০ কন্টেইনার আসতে পারবে, যেখানে বর্তমানে মাত্র ২৫০০ কন্টেইনারবাহী ছোট জাহাজ আসতে পারে। তবে পায়রা বন্দর সম্পর্কে আমি বলব যে, আমাদের স্থান নির্বাচন সঠিক হয়নি। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে গভীরতা ১০ মিটার করা হলেও তা বর্তমানে ৬ মিটারে নেমে এসেছে। এই গভীরতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ জোয়ার-ভাটার পানি সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে ভোলার পূর্ব দিকে এবং সন্দীপের পশ্চিম দিকে ভাঙন দেখা দেয়। পায়রা বন্দর এই প্রবাহের ওপর অবস্থিত হওয়ায় এখানে ময়লা বা পলি জমে যায়। এই কারণে দুইবার ড্রেজিং করার পরেও সেখানে ন্যূনতম গভীরতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এই জোয়ার-ভাটার সমস্যার কারণে ভবিষ্যতে এটি কতটা সফল হবে, তা নিয়ে অনেক সংশয় আছে।
মোংলা বন্দরে বর্তমানে ড্রেজিং চলছে এবং এখন সেখানে ছয় থেকে সাড়ে ছয় মিটার গভীরতা আছে, যা হয়তো আরও বাড়বে। আমাদের যেমন ভালো বন্দর ও ব্যবসা-বাণিজ্য দরকার, তেমনি শক্তিশালী নৌবাহিনীও প্রয়োজন। এতে আমরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাগরের সম্পদ পাহারা দিতে পারব। এই সম্পদ উত্তোলন করে দেশবাসীকে উপকৃত করার সুযোগ তৈরি হবে এবং সেখানে আমাদের অবদান রাখার সুযোগ থাকবে।

হরমুজ সংকট সামনে এনেছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নটি। বাংলাদেশের কোনো কৌশলগত জ্বালানি মজুত নেই। ঘাটতি আছে মজুত সক্ষমতাতেও। যা শুধু জ্বালানি নয়, জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তার এই সমস্যাগুলো কিভাবে সমাধান করা যেতে পারে? এসব বিষয়ে কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞ রিয়ার এডমিরাল (অবসরপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ খুরশেদ আলম। স্ট্রিমের রিসার্চ ফেলো সানীউজ্জামান পাভেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো…
স্ট্রিম: হরমুজ সংকটে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি ঝুকির দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের কোনো কৌশলগত জ্বালানি মজুত নেই। এটিকে নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোন কোন দূর্বলতা আপনার বিবেচনায় এসেছে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমরা তেল রাখতে পারি মাত্র ১৩ লক্ষ টন। চার মাসের বেশি আমাদের মজুত নাই। একটা মাত্র রিফাইনারি। সেটাও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ অপরিশোধিত তেল আসছে না এবং আমরা অন্য দেশের ক্রুড এখানে রিফাইন করতে পারি না। আমাদের এই ফ্যাসিলিটিস গ্রো করে নাই। তারপরে ১১০ কিলোমিটার পাইপলাইন মহেশখালী থেকে এই রিফাইনারি পর্যন্ত। জাহাজ ওখানে আসবে, তেলটা ওই সিঙ্গেল পয়েন্ট মরিং এ দিবে, ওখান থেকে ট্যাংকে যাবে, ট্যাংক থেকে ওইটা এই রিফাইনারিতে আসবে। কিন্তু ওই সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং আজকে প্রায় দুই আড়াই বছর ধরে অপারেশনাল না। ওখানে কিন্তু দুই লক্ষ টন তেল আমরা রাখতে পারি, এই মহেশখালীতে। ট্যাংক আছে এখন খালি, কারণ এটার অপারেশন এবং মেইনটেনেন্স করার জন্য যে কন্ট্রাক্ট নিয়োগ করার কথা গত সরকারগুলো এটা করতে পারেনি।
আমাদের দেশের ভিতরে যাতে রিজার্ভটা পর্যাপ্ত পরিমাণে তার জন্য এইখানে আমরা যা করতে পারি তা হলো দেশের ব্যবহার করার জন্য মজুত, আরেকটা হলো স্ট্র্যাটেজিক। একটা যুদ্ধবিগ্রহ পরিস্থিতি বা সাগরে কোন একটা অন্যরকম পরিস্থিতি হলে তখন আমরা কি করব? কাজেই একটা রিজার্ভের ব্যবস্থা আমাদের করা দরকার।
স্ট্রিম: কৌশলগত জ্বালানি মজুত না থাকার সমস্যাটি কীভাবে সমাধান করা যেতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমরা যা কিছু উন্নয়ন করেছি এই দেশে, বেশিরভাগই কিন্তু নদীর এই পাড়ে, নদীর ওই পাড়ে কিন্তু কিছু নাই। আপনি যদি রিজার্ভ তেলের কথাও বলেন, ওই খুলনায় কিছুটা আছে খালিশপুরে, তারপরে বাঘাবাড়িতে আছে। তো ওখানে তো জাহাজই চলে না।
আমি যখন মংলা পোর্টের চেয়ারম্যান হিসেবে ছিলাম তখন এই জিনিসটা আমি বারবারই বলছিলাম যে আমরা যদি মংলা পোর্টের ইপিজেড এলাকায় একটা রিফাইনারি করি এবং এইযে আমরা কত ৬০-৭০ মাইল দূরেই তো পাইপ রেখেছি ১১০ কিলোমিটার, ওখানে যদি ১৫০ কিলোমিটার দূরে আমরা যদি একটা সিঙ্গল পয়েন্ট মুরিং করি, সেটা হলো সোয়াচ অব নো গ্রাউণ্ডে।
সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের গভীরতা সম্পর্কে আপনারা জানেন। সেখানে পানির গভীরতা কোথাও ১২০ ফুট, আবার মাত্র এক পা এগোলেই তা ১৫০০ থেকে ২০০০ ফুট হয়ে যায়। পানির গভীরতা যেখানে ২০০০ ফুট, সেখানে অনায়াসেই ২ থেকে ২.৫ লাখ টনের বড় তেলের ট্যাংকার আসতে পারবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওই এলাকায় যদি একটি ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ স্থাপন করা হয়, তবে সেখান থেকে সরাসরি বাগেরহাট বা মোংলা বন্দর পর্যন্ত তেল আনা সম্ভব হবে। এতে দেশের দুই প্রান্তেই জ্বালানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।
মোংলা বা বাগেরহাট থেকে উত্তরবঙ্গসহ সারা দেশে জ্বালানি সরবরাহ করা অনেক সহজ হবে। কারণ বর্তমানে নদীপথ, নবনির্মিত রেলপথ এবং উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা—সবই বিদ্যমান। তাই আমাদের একটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করা দরকার যে, ৫৬ বছরে আমরা মাত্র একটি রিফাইনারি পেয়েছি। এখন দ্বিতীয় আরেকটি রিফাইনারি করার উপযুক্ত সময় এসেছে।
বর্তমানে যে পাইপলাইনটি করা হয়েছে, সেটি চট্টগ্রাম অঞ্চলে না করে পশ্চিম অঞ্চলেও করা যেত। তবে চট্টগ্রামকে বেছে নেওয়ার একটি ঐতিহাসিক কারণ আছে। এক সময় বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের নিজস্ব ট্যাংকার ছিল, যা সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল এনে রিফাইনারিতে পৌঁছে দিত। কিন্তু জাহাজগুলো পুরোনো হয়ে যাওয়ায় এবং সেগুলো বিক্রি করে দেওয়ায় এক পর্যায়ে মাত্র একটি ট্যাংকার অবশিষ্ট থাকে।
সেই একটি মাত্র ট্যাংকার দিয়ে কুতুবদিয়ায় আসা বড় জাহাজ থেকে তেল খালাস করা হতো। এতে খরচ এবং লস—উভয়ই বেশি হতো। এই সমস্যা সমাধানের জন্যই ৮০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বর্তমান পাইপলাইনটি তৈরি করা হয়েছে।
তবে এই সময়ে যদি দেশের পশ্চিমাঞ্চলেও এমন একটি ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে আমাদের জ্বালানি সংরক্ষণের ক্ষমতা আরও বাড়তো। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বা যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে আমাদের অন্তত চার মাসের জ্বালানি মজুত থাকা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকলে যুদ্ধ চার মাস চললেও দেশে কোনো সমস্যা হবে না।
স্ট্রিম: জাতীয় জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের কেমন কৌশল নেওয়া উচিত?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: অনেকেই আজকাল দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির কথা বলছেন। তবে সব চুক্তি শুধু পশ্চিম দিকে বা এক দিকে করা ঠিক হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে আমরা এটি শিখলাম। অন্য উৎস থেকেও যেন তেল আনা যায়, সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির সুবিধা হলো, দুঃসময়েও সবসময় তেল পাওয়া যায়। আবার আমরা ‘স্পট পারচেজ’ বা তাৎক্ষণিক ক্রয়ের পদ্ধতিও ব্যবহার করি। এর লাভ হলো, বিশ্ববাজারে দাম কমলে সাশ্রয়ে তেল কেনা যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে দাম কমুক বা বাড়ুক, একই দাম দিতে হয়। দুই পদ্ধতিরই ভালো-মন্দ দিক আছে। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে আমরা যদি ছয় মাসের একটি কৌশলগত মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ রাখতে পারি, তবে বর্তমান সমস্যা ভবিষ্যতে কাটানো সম্ভব হবে। এমনকি ২ লাখ টনের তেলের জাহাজ রাখার ব্যবস্থা করলেও আমরা অনেকদিন চলতে পারব।
স্ট্রিম: কৌশলগত মজুত জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই ক্ষেত্রে সরকারের কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমি প্রথমে বলব সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের কথা। সেখানে পানির গভীরতা ১৫০০ থেকে ২০০০ ফুট। ফলে সেখানে আড়াই থেকে চার লাখ টনের বিশাল জাহাজও আসতে পারবে। কিন্তু কুতুবদিয়ার সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ে এই বড় জাহাজগুলো আসতে পারে না। আমরা যদি আড়াই লাখ মেট্রিক টনের তেলবাহী জাহাজ এনে পাইপলাইনের মাধ্যমে মোংলা পোর্টে তেল নিয়ে আসি, তবে খুব সুবিধা হবে। মোংলা পোর্ট এবং ইপিজেডে অনেক জায়গা খালি পড়ে আছে। বর্তমানে ইপিজেডে গ্যাস না থাকায় সাধারণ কিছু ফ্যাক্টরি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। আমরা যদি সেখানে একটি বড় রিফাইনারি করার জন্য বেসরকারি খাতকে অনুমতি দেই, তবে তা দেশের জন্য ভালো হবে। সেই রিফাইনারিতে রুশ তেলের মতো সব ধরনের তেল রিফাইন করার সক্ষমতা রাখা প্রয়োজন, যা বর্তমানে আমাদের নেই।

দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী চুক্তি এবং পশ্চিমের পাশাপাশি পূর্ব দিক থেকে (যেমন ভ্লাদিভোস্তক হয়ে) তেল আনার বিষয়গুলো বিবেচনা করে নতুন সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। এটি বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে যেকোনো দুর্যোগের সময় আমাদের স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ থাকবে। তখন মানুষকে তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করতে হবে না এবং হঠাৎ করে তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজনও হবে না। রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই এটি প্রয়োজন। বর্তমান সরকার যেহেতু এই সমস্যার ভুক্তভোগী, তাই তাদের আমলেই একটি স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভের ব্যবস্থা করা উচিত যাতে ভবিষ্যতে আর এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয়।
স্ট্রিম: জ্বালানি নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সম্পর্কটির গুরুত্ব সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমরা যদি ১৯৭১ সালের যুদ্ধ দেখি, তবে বুঝব যে আমরা দেশের ভেতরে খুব ভালো লড়াই করেছি। কিন্তু এই যুদ্ধের বড় একটি অবদান ছিল সাগরে, যা আমরা অনেকে ঠিকভাবে অনুধাবন করি না। ভারত যদি সাগরে অবরোধ না দিত, তবে পাকিস্তান থেকে জাহাজ রসদ, গোলাবারুদ বা তেল নিয়ে এখানে আসতে পারত। এই অবরোধ আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। যেকোনো সময় আমাদের ওপরও এমন অবরোধ আসতে পারে, যেমনটা বর্তমানে আমেরিকা দিচ্ছে। অবরোধ দিলে আমাদের তেল আনার বিকল্প কোনো স্থলপথ বা রুট নেই। তেল আনতে না পারলে সশস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে সব শিল্পকারখানা স্থবির হয়ে পড়বে। জেনারেটর চলবে না, বিদ্যুৎ থাকবে না। তাই রপ্তানি বাণিজ্য এবং দেশের চাকা সচল রাখতে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা আমাদের এক নম্বর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
স্ট্রিম: বাংলাদেশের কৌশলগত নিরাপত্তা ও স্বার্থ নিজেদের সমুদ্রের পাশাপাশি অনেক দূরের সমুদ্রের সঙ্গে জড়িত। এই স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় নৌবাহিনীসহ সামগ্রিক সশস্ত্র বাহিনী কী ভূমিকা রাখতে পারে এবং সরকারের কেমন কৌশল গ্রহণ করা উচিত?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমাদের এমন একটি নৌবাহিনী দরকার যারা আমাদের জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে দিতে বা নিয়ে আসতে পারবে। শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকলে সরকার এবং দেশের মানুষ শান্তিতে ও আস্থায় থাকতে পারবে। ১৯৭১ সালে সাগরে পাকিস্তানের কোনো জাহাজ না থাকায় তারা তাদের রসদ রক্ষা করতে পারেনি, যা তাদের পরাজয় নিশ্চিত করেছে।
সাগর কী হচ্ছে তা ঢাকা থেকে বোঝা কঠিন। সমুদ্রসীমা জয়ের পর আমরা 'ব্লু ইকোনমি' বা সুনীল অর্থনীতির কার্যক্রম শুরু করি। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমরাই প্রথম ব্লু ইকোনমি নিয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনার করি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সাগরের সম্পদকে দেশের কাজে লাগানো। তবে সাগরের সম্পদ কাজে লাগাতে হলে আগে তা পাহারা দিয়ে রক্ষা করতে হবে, যার জন্য নৌবাহিনী অপরিহার্য।
নৌবাহিনীর জাহাজের সংখ্যা হয়তো কম নয়, কিন্তু প্রতিপক্ষের তুলনায় সেগুলোর ফায়ার পাওয়ার বা দক্ষতা কতটুকু তা দেখতে হবে। বর্তমানে ইরান ও আমেরিকার লড়াইয়ে দেখা যাচ্ছে যে শুধু এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার দিয়ে কাজ হচ্ছে না। তাই আমাদেরও 'এসিমেট্রিক্যাল ওয়ারফেয়ার' বা অসম যুদ্ধের কৌশলে যেতে হবে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে সাগরে ব্যবহারের জন্য বড় প্ল্যাটফর্ম বা বড় জাহাজেরও প্রয়োজন আছে। অর্থাৎ আমাদের একটি মিশ্র নৌবহর থাকতে হবে।
আশির দশকে যখন আমাদের জাহাজ কম ছিল, তখন আমরা কয়েকশ থাই ও ভারতীয় ট্রলার অবৈধভাবে মাছ ধরার সময় আটক করেছিলাম। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। নৌবাহিনী প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা সাগরে পাহারা দিচ্ছে। এমনকি ঈদের দিনেও কয়েকশ লোক সাগরে দায়িত্বে থাকে। তবে আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলো আধুনিক হওয়া প্রয়োজন। ৪০ বছরের পুরনো জাহাজ চালানো যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি এতে আধুনিক প্রযুক্তিও নেই। তাই আমাদের 'ফোর্সেস গোল' এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে আমরা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও জাহাজ সংগ্রহ করতে পারি। নৌবাহিনীর সক্ষমতা এমন পর্যায়ে থাকতে হবে যেন তাদের মারণক্ষমতা বা 'টিথ পাওয়ার' প্রতিবেশীদের সমপর্যায়ের হয়।
স্ট্রিম: জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় আমাদের বন্দরগুলো কতটা সক্ষম?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: বর্তমানে মাতারবাড়ি বন্দর তৈরি হচ্ছে। এটি সফল হলে সেখানে ১৪ থেকে ১৫ মিটার, এমনকি সর্বোচ্চ ১৬ মিটার পর্যন্ত পানির গভীরতা পাওয়া যাবে। তখন সেখানে একসাথে ১২,০০০ কন্টেইনার আসতে পারবে, যেখানে বর্তমানে মাত্র ২৫০০ কন্টেইনারবাহী ছোট জাহাজ আসতে পারে। তবে পায়রা বন্দর সম্পর্কে আমি বলব যে, আমাদের স্থান নির্বাচন সঠিক হয়নি। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে গভীরতা ১০ মিটার করা হলেও তা বর্তমানে ৬ মিটারে নেমে এসেছে। এই গভীরতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ জোয়ার-ভাটার পানি সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে ভোলার পূর্ব দিকে এবং সন্দীপের পশ্চিম দিকে ভাঙন দেখা দেয়। পায়রা বন্দর এই প্রবাহের ওপর অবস্থিত হওয়ায় এখানে ময়লা বা পলি জমে যায়। এই কারণে দুইবার ড্রেজিং করার পরেও সেখানে ন্যূনতম গভীরতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এই জোয়ার-ভাটার সমস্যার কারণে ভবিষ্যতে এটি কতটা সফল হবে, তা নিয়ে অনেক সংশয় আছে।
মোংলা বন্দরে বর্তমানে ড্রেজিং চলছে এবং এখন সেখানে ছয় থেকে সাড়ে ছয় মিটার গভীরতা আছে, যা হয়তো আরও বাড়বে। আমাদের যেমন ভালো বন্দর ও ব্যবসা-বাণিজ্য দরকার, তেমনি শক্তিশালী নৌবাহিনীও প্রয়োজন। এতে আমরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাগরের সম্পদ পাহারা দিতে পারব। এই সম্পদ উত্তোলন করে দেশবাসীকে উপকৃত করার সুযোগ তৈরি হবে এবং সেখানে আমাদের অবদান রাখার সুযোগ থাকবে।

দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিদ্যমান এই প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে সরকারের সাম্প্রতিক আরেকটি উদ্যোগ—এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
১৮ ঘণ্টা আগে
কসবায় বিএসএফের গুলিতে দুই যুবকের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে প্রাণ গেল মো. খাদেমুল নামে ২৫ বছরের এক বাংলাদেশি যুবকের। প্রকাশিত তথ্য বলছে, ঘটনাটি ঘটেছে গভীর রাতে, বনচৌকি বিওপি সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায়, মেইন পিলার ৯০৫/৬-এস-এর কাছে।
১ দিন আগে
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হতে পারে—আমেরিকার প্রতিটি অভ্যন্তরীণ সংকটকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে না দেখা। আজকের বিশ্বে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বৈশ্বিক কৌশল ক্রমেই অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠছে—এই উপলব্ধি ঢাকাকে আরও পরিশীলিত কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে উৎসাহিত করা উচিত।
১ দিন আগে
বিকেলের রোদ তখনও পুরোপুরি নরম হয়নি। আগারগাঁওয়ে অসংখ্য মানুষের লম্বা লাইনের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। মাথায় সাদা টুপি, গায়ে ধূসর পাঞ্জাবি। চোখেমুখে যেন গত শতকের ক্লান্তি। তিনি বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। ট্রাক আসবে। টিসিবির পণ্য মিলবে।
২ দিন আগে