আমীন আল রশীদ

স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিগুলোতে সংসদ সদস্যদের প্রভাব ও ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত বিষয়। উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারি, হাট-বাজার ও ঘাটের ইজারা, এমনকি স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তির সালিশ ব্যবস্থাতেও প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের সংশ্লিষ্টতা লক্ষ করা যায়। স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও তাঁদের পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠজনদের অংশগ্রহণ দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র কিংবা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মতো পদে আত্মীয়স্বজন বা রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অবস্থান অনেক এলাকাতেই আলোচিত বাস্তবতা। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো না কোনোভাবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে ধারণা করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিদ্যমান এই প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে সরকারের সাম্প্রতিক আরেকটি উদ্যোগ—এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সরকার জনগণের সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠান ও প্রতিনিধির কাছে পৌঁছানো একজন প্রান্তিক মানুষের পক্ষে বেশ কঠিন। কিন্তু তিনি তাঁর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা মেম্বারের কাছে যেতে পারেন। আবার স্থানীয় সরকারে যারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন, তারা সংশ্লিষ্ট কমিউনিটিরই মানুষ। তাদের বাপ-দাদার ঠিকুজি মানুষের জানা থাকে। সংসদ সদস্যরা ঢাকায় থাকেন। অনেক সময় এমনও অনেকে এমপি হয়ে যান, যাদেরকে ভোটের আগে ভোটাররা সেভাবে চিনতও না। দল কোনো না কোনো বিবেচনায় তাদেরকে মনোনয়ন দিয়েছে। টাকার গরমেও অনেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে যান। এসব বিবেচনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার জনপ্রতিনিধিদের অনেক বেশি জনঘনিষ্ঠ হতে হয়। কারণ তাদেরকে এলাকায় বসেই মানুষের কাজ করতে হয়।
স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। গ্রামীণ স্থানীয় সরকার, যার আওতায় রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ। আর নগর স্থানীয় সরকার, যার আওতায় রয়েছে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হবে।
সংবিধানের ইংরেজি ভার্সনে অবশ্য লেখা হয়েছে ‘লোকাল গভর্নমেন্ট’, যার বাংলা হওয়া উচিত ছিল স্থানীয় সরকার। বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠান বলা হয়। কিন্তু গভর্নমেন্ট-এর বাংলা কেন শাসন হলো, সেটা বড় প্রশ্ন। গভর্ন করার একটা অর্থ শাসন করা এটা ঠিক। কিন্তু গভর্নমেন্ট-এর বাংলা হিসেবে ‘সরকার’ই উপযুক্ত। অনেকে মনে করেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই জনগণকে শাসন করার যে মানসিকতা ও প্রবণতা হয়েছে, অর্থাৎ জনগণের ভোটে নির্বাচিত লোকেরাই যে ভোটের পরে সেই জনগণের শাসক হয়ে ওঠেন—সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ তারই প্রতিফলন। তবে এটা অন্য তর্ক। আসা যাক এমপি সাহেবদের প্রসঙ্গে।
গত মাসের শেষদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে জানান, উপজেলা পরিষদগুলোতে এখন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্যদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বিশেষ ‘পরিদর্শন কক্ষ’ প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রীর পরামর্শক্রমে এরইমধ্যে এ সংক্রান্ত সরকারি আদেশ বা জিও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) বরাবর জারি করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, উপজেলা পরিষদের নতুন বা পুরাতন কমপ্লেক্স ভবনের দ্বিতীয় তলায় যেখানে যে অবস্থা রয়েছে, সেখানেই অ্যাটাচড বাথরুম ও উন্নতমানের আসবাবপত্রসহ সংসদ সদস্যদের বসার জন্য একটি কক্ষ রেডি করে দেওয়া হবে। বিধিমালা অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের নামে সরাসরি কক্ষ বরাদ্দের সুযোগ না থাকায় এই কক্ষটির নাম হবে ‘পরিদর্শন কক্ষ’। এখানে বসে এমপিরা তাদের প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ ও সময় ব্যয় করার সুযোগ পাবেন। শুধু তাই নয়, কোনো সংসদ সদস্যের নির্বাচনি এলাকায় যদি একাধিক উপজেলা থাকে, তাহলে প্রতিটি উপজেলাতেই তার জন্য এমন অফিস বা পরিদর্শন কক্ষের ব্যবস্থা থাকবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে দলের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরাও বিপুল উৎসাহে টেবিল চাপড়িয়ে স্বাগত জানান। দেখা যাচ্ছে, এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা সরকারি ও বিরোধী—উভয় দলকেই খুশি করেছে।
প্রশ্ন হলো, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে এমপি সাহেবের জন্য কক্ষ থাকতে হবে কেন? সংসদ সদস্যরা আইনপ্রণেতা। তাদের কাজ জাতীয় সংসদে। তারা দেশের মানুষের জন্য আইন ও নীতি তৈরি করবেন। গণবিরোধী নীতি বাতিল করবেন। সেজন্য সংসদে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক করবেন। উপজেলা পর্যায়ে তার কী কাজ—এটা বেশ পুরোনো প্রশ্ন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমপি সাহেবরা নিজেদেরকে শুধুমাত্র সংসদ ভবনের চারদেয়ালে সীমাবদ্ধ রেখে শুধুমাত্র আইন ও নীতি প্রণয়নে আটকে রাখতে চান না। তারা স্থানীয় পর্যায়ের সকল উন্নয়নকাজের তদারকি শুধু নয়, নিজেরাই সকল উন্নয়নকাজ করতে চান। সকল রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, ভবন নির্মাণ থেকে শুরু সরকারের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে যেসব জায়গায়, সবখানেই এমপি সাহেব কিংবা তার আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় নেতারা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকতে চান। তারা কেন রাষ্ট্রে সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকতে চান, সেই প্রশ্নের উত্তর সকলের জানা। অর্থাৎ এমপি মানে যে আইনপ্রণেতা এবং তিনি শুধু জাতীয় সংসদেই থাকবেন বা তার উপজেলা পর্যায়ে অফিসের প্রয়োজন নেই—এই ধারণার সঙ্গে এমপি সাহেবরা একমত নন। নন বলেই সংসদে দাঁড়িয়ে তারা দেশের আইন ও নীতি নিয়ে যত কথা বলেন, তার চেয়ে বেশি কথা বলেন নিজেদের এলাকা রাস্তাঘাট, সেতু ও ভবন নির্মাণ ইস্যুতে।
এমতাবস্থায় আলোচনায় এসেছে, জেলায় যেহেতু জেলা প্রশাসকের অফিস আছে, পৌর মেয়র এমনকি ইউপি চেয়ারম্যানেরও কার্যালয় আছে, তাহলে সকলের ‘মুরুব্বি’ এমপি সাহেবের অফিস কোথায়? আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্নটা নিরীহ। কিন্তু এই নিরীহ প্রশ্নের ভেতরে রয়েছে স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠাগুলোকে ধ্বংস করা তথা তৃণমূল পর্যায়ে দলীয়করণকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের এক গভীর পরিকল্পনা।
এমনিতেই যেখানে স্থানীয় পর্যায়ের সকল কাজে এমপি এবং তার লোকদেরই প্রাধান্য ও খবরদারি, সেখানে উপজেলা কমপ্লেক্সে তার জন্য একটা আলাদা অফিস মানেই হলো পুরো উপজেলা কমপ্লেক্সটাই এমপির কার্যালয়ে পরিণত হবে। সারাক্ষণ এমপি সাহেবের লোকেরাই সেখানে দৌড়ঝাঁপ করবে। সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এমপি সাহেব যখন ঢাকায় থাকবেন, তখন তার লোকেরাই ওই অফিসের হর্তাকর্তা হয়ে ঠিকাদারি কাজের বিলিবণ্টন থেকে শুরু সালিশ পর্যন্ত সবই সেখানে বসে করবেন। উপজেলা প্রশাসনের অন্যান্য যেসব কাজ ইউএনওর মাধ্যমে নির্বাহ হয়—সেখানে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। উপেজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে মূলত একটি দ্বৈত শাসন চালু হবে। প্রশাসনের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের বিরোধ বা মানসিক দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হবে। সামগ্রিকভাবে নাগরিকদের সেবা ব্যাহত হবে।
প্রশ্ন হলো, নির্বাচনি এলাকায় তাহলে এমপি সাহেবের একটা অফিস থাকার প্রয়োজন নেই? উত্তর হলো, এতদিন তারা কোথায় অফিস করেছেন? এমপি সাহেব যখন এলাকায় থাকেন, তখন বাড়ির একটা অংশই মূলত অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খুব ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলাদেশে যারা বিগত দিনে এমপি হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই ধনিক শ্রেণির। ফলে এমপি সাহেবের বাড়িটা আলাদাভাবেই চিহ্নিত। সুতরাং হঠাৎ করে উপজেলা পর্যায়ে তাদের অফিসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল কেন? যদি সতিই নির্বাচনি এলাকায় কোনো এমপির বাড়ি বা নিজস্ব অফিস না থাকে, সেক্ষেত্রে সেটি ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করে সরকার তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু গণহারে প্রত্যেকের জন্য উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে অফিস তৈরির মানেই হলো পুরো কমপ্লেক্সটাই এমপির অফিসে পরিণত হবে।
তবে সরকার যদি সত্যিই মনে করে যে, নির্বাচনি এলাকায় এমপিদের অফিস থাকা প্রয়োজন, তাহলে সেটি উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে নয়, বরং অন্য কোথাও আলাদা অফিস করে দিতে পারে। কিন্তু সেটিরও প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ আইনত স্থানীয় পর্যায়ে এমপি সাহেবের কোনো কাজ থাকার কথা নয়। যদি তাই হয় তাহলে আর স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানের কোনো প্রয়োজন নেই। তিনশো এমপির জন্য শত শত উপজেলা কমপ্লেক্সে নতুন অফিস বানানো হবে। সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জন সংসদ সদস্যও একই দাবি জানাবেন বা যৌক্তিক কারণে তাদের জন্যও অফিস বানাতে হবে। তাদের অফিসগুলো কোথায় হবে?
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বলে আসছে যে, তারা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। সাধারণ মানুষও জানে যে, দেশের অর্থনীতি এখন একটা সংকটকাল পার করছে। এরকম বাস্তবতায় সারা দেশের উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে এমপিদের জন্য অফিস বানাতে গিয়ে যে বিপুল অর্থ খরচ হবে, সেই টাকা কে দেবে বা কোথা থেকে আসবে?
টাকা যেখান থেকেই আসুক, পুরো সিদ্ধান্তটিই স্থানীয় সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সংঘাত আরও বাড়িয়ে স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করবে কিনা; জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব বাড়াবে কিনা—সেটি সরকারের বিবেচনা করা দরকার।

স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিগুলোতে সংসদ সদস্যদের প্রভাব ও ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত বিষয়। উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারি, হাট-বাজার ও ঘাটের ইজারা, এমনকি স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তির সালিশ ব্যবস্থাতেও প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের সংশ্লিষ্টতা লক্ষ করা যায়। স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও তাঁদের পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠজনদের অংশগ্রহণ দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র কিংবা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মতো পদে আত্মীয়স্বজন বা রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অবস্থান অনেক এলাকাতেই আলোচিত বাস্তবতা। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো না কোনোভাবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে ধারণা করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিদ্যমান এই প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে সরকারের সাম্প্রতিক আরেকটি উদ্যোগ—এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সরকার জনগণের সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠান ও প্রতিনিধির কাছে পৌঁছানো একজন প্রান্তিক মানুষের পক্ষে বেশ কঠিন। কিন্তু তিনি তাঁর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা মেম্বারের কাছে যেতে পারেন। আবার স্থানীয় সরকারে যারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন, তারা সংশ্লিষ্ট কমিউনিটিরই মানুষ। তাদের বাপ-দাদার ঠিকুজি মানুষের জানা থাকে। সংসদ সদস্যরা ঢাকায় থাকেন। অনেক সময় এমনও অনেকে এমপি হয়ে যান, যাদেরকে ভোটের আগে ভোটাররা সেভাবে চিনতও না। দল কোনো না কোনো বিবেচনায় তাদেরকে মনোনয়ন দিয়েছে। টাকার গরমেও অনেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে যান। এসব বিবেচনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার জনপ্রতিনিধিদের অনেক বেশি জনঘনিষ্ঠ হতে হয়। কারণ তাদেরকে এলাকায় বসেই মানুষের কাজ করতে হয়।
স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। গ্রামীণ স্থানীয় সরকার, যার আওতায় রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ। আর নগর স্থানীয় সরকার, যার আওতায় রয়েছে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হবে।
সংবিধানের ইংরেজি ভার্সনে অবশ্য লেখা হয়েছে ‘লোকাল গভর্নমেন্ট’, যার বাংলা হওয়া উচিত ছিল স্থানীয় সরকার। বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠান বলা হয়। কিন্তু গভর্নমেন্ট-এর বাংলা কেন শাসন হলো, সেটা বড় প্রশ্ন। গভর্ন করার একটা অর্থ শাসন করা এটা ঠিক। কিন্তু গভর্নমেন্ট-এর বাংলা হিসেবে ‘সরকার’ই উপযুক্ত। অনেকে মনে করেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই জনগণকে শাসন করার যে মানসিকতা ও প্রবণতা হয়েছে, অর্থাৎ জনগণের ভোটে নির্বাচিত লোকেরাই যে ভোটের পরে সেই জনগণের শাসক হয়ে ওঠেন—সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ তারই প্রতিফলন। তবে এটা অন্য তর্ক। আসা যাক এমপি সাহেবদের প্রসঙ্গে।
গত মাসের শেষদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে জানান, উপজেলা পরিষদগুলোতে এখন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্যদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বিশেষ ‘পরিদর্শন কক্ষ’ প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রীর পরামর্শক্রমে এরইমধ্যে এ সংক্রান্ত সরকারি আদেশ বা জিও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) বরাবর জারি করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, উপজেলা পরিষদের নতুন বা পুরাতন কমপ্লেক্স ভবনের দ্বিতীয় তলায় যেখানে যে অবস্থা রয়েছে, সেখানেই অ্যাটাচড বাথরুম ও উন্নতমানের আসবাবপত্রসহ সংসদ সদস্যদের বসার জন্য একটি কক্ষ রেডি করে দেওয়া হবে। বিধিমালা অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের নামে সরাসরি কক্ষ বরাদ্দের সুযোগ না থাকায় এই কক্ষটির নাম হবে ‘পরিদর্শন কক্ষ’। এখানে বসে এমপিরা তাদের প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ ও সময় ব্যয় করার সুযোগ পাবেন। শুধু তাই নয়, কোনো সংসদ সদস্যের নির্বাচনি এলাকায় যদি একাধিক উপজেলা থাকে, তাহলে প্রতিটি উপজেলাতেই তার জন্য এমন অফিস বা পরিদর্শন কক্ষের ব্যবস্থা থাকবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে দলের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরাও বিপুল উৎসাহে টেবিল চাপড়িয়ে স্বাগত জানান। দেখা যাচ্ছে, এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা সরকারি ও বিরোধী—উভয় দলকেই খুশি করেছে।
প্রশ্ন হলো, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে এমপি সাহেবের জন্য কক্ষ থাকতে হবে কেন? সংসদ সদস্যরা আইনপ্রণেতা। তাদের কাজ জাতীয় সংসদে। তারা দেশের মানুষের জন্য আইন ও নীতি তৈরি করবেন। গণবিরোধী নীতি বাতিল করবেন। সেজন্য সংসদে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক করবেন। উপজেলা পর্যায়ে তার কী কাজ—এটা বেশ পুরোনো প্রশ্ন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমপি সাহেবরা নিজেদেরকে শুধুমাত্র সংসদ ভবনের চারদেয়ালে সীমাবদ্ধ রেখে শুধুমাত্র আইন ও নীতি প্রণয়নে আটকে রাখতে চান না। তারা স্থানীয় পর্যায়ের সকল উন্নয়নকাজের তদারকি শুধু নয়, নিজেরাই সকল উন্নয়নকাজ করতে চান। সকল রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, ভবন নির্মাণ থেকে শুরু সরকারের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে যেসব জায়গায়, সবখানেই এমপি সাহেব কিংবা তার আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় নেতারা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকতে চান। তারা কেন রাষ্ট্রে সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকতে চান, সেই প্রশ্নের উত্তর সকলের জানা। অর্থাৎ এমপি মানে যে আইনপ্রণেতা এবং তিনি শুধু জাতীয় সংসদেই থাকবেন বা তার উপজেলা পর্যায়ে অফিসের প্রয়োজন নেই—এই ধারণার সঙ্গে এমপি সাহেবরা একমত নন। নন বলেই সংসদে দাঁড়িয়ে তারা দেশের আইন ও নীতি নিয়ে যত কথা বলেন, তার চেয়ে বেশি কথা বলেন নিজেদের এলাকা রাস্তাঘাট, সেতু ও ভবন নির্মাণ ইস্যুতে।
এমতাবস্থায় আলোচনায় এসেছে, জেলায় যেহেতু জেলা প্রশাসকের অফিস আছে, পৌর মেয়র এমনকি ইউপি চেয়ারম্যানেরও কার্যালয় আছে, তাহলে সকলের ‘মুরুব্বি’ এমপি সাহেবের অফিস কোথায়? আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্নটা নিরীহ। কিন্তু এই নিরীহ প্রশ্নের ভেতরে রয়েছে স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠাগুলোকে ধ্বংস করা তথা তৃণমূল পর্যায়ে দলীয়করণকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের এক গভীর পরিকল্পনা।
এমনিতেই যেখানে স্থানীয় পর্যায়ের সকল কাজে এমপি এবং তার লোকদেরই প্রাধান্য ও খবরদারি, সেখানে উপজেলা কমপ্লেক্সে তার জন্য একটা আলাদা অফিস মানেই হলো পুরো উপজেলা কমপ্লেক্সটাই এমপির কার্যালয়ে পরিণত হবে। সারাক্ষণ এমপি সাহেবের লোকেরাই সেখানে দৌড়ঝাঁপ করবে। সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এমপি সাহেব যখন ঢাকায় থাকবেন, তখন তার লোকেরাই ওই অফিসের হর্তাকর্তা হয়ে ঠিকাদারি কাজের বিলিবণ্টন থেকে শুরু সালিশ পর্যন্ত সবই সেখানে বসে করবেন। উপজেলা প্রশাসনের অন্যান্য যেসব কাজ ইউএনওর মাধ্যমে নির্বাহ হয়—সেখানে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। উপেজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে মূলত একটি দ্বৈত শাসন চালু হবে। প্রশাসনের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের বিরোধ বা মানসিক দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হবে। সামগ্রিকভাবে নাগরিকদের সেবা ব্যাহত হবে।
প্রশ্ন হলো, নির্বাচনি এলাকায় তাহলে এমপি সাহেবের একটা অফিস থাকার প্রয়োজন নেই? উত্তর হলো, এতদিন তারা কোথায় অফিস করেছেন? এমপি সাহেব যখন এলাকায় থাকেন, তখন বাড়ির একটা অংশই মূলত অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খুব ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলাদেশে যারা বিগত দিনে এমপি হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই ধনিক শ্রেণির। ফলে এমপি সাহেবের বাড়িটা আলাদাভাবেই চিহ্নিত। সুতরাং হঠাৎ করে উপজেলা পর্যায়ে তাদের অফিসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল কেন? যদি সতিই নির্বাচনি এলাকায় কোনো এমপির বাড়ি বা নিজস্ব অফিস না থাকে, সেক্ষেত্রে সেটি ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করে সরকার তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু গণহারে প্রত্যেকের জন্য উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে অফিস তৈরির মানেই হলো পুরো কমপ্লেক্সটাই এমপির অফিসে পরিণত হবে।
তবে সরকার যদি সত্যিই মনে করে যে, নির্বাচনি এলাকায় এমপিদের অফিস থাকা প্রয়োজন, তাহলে সেটি উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে নয়, বরং অন্য কোথাও আলাদা অফিস করে দিতে পারে। কিন্তু সেটিরও প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ আইনত স্থানীয় পর্যায়ে এমপি সাহেবের কোনো কাজ থাকার কথা নয়। যদি তাই হয় তাহলে আর স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানের কোনো প্রয়োজন নেই। তিনশো এমপির জন্য শত শত উপজেলা কমপ্লেক্সে নতুন অফিস বানানো হবে। সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জন সংসদ সদস্যও একই দাবি জানাবেন বা যৌক্তিক কারণে তাদের জন্যও অফিস বানাতে হবে। তাদের অফিসগুলো কোথায় হবে?
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বলে আসছে যে, তারা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। সাধারণ মানুষও জানে যে, দেশের অর্থনীতি এখন একটা সংকটকাল পার করছে। এরকম বাস্তবতায় সারা দেশের উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে এমপিদের জন্য অফিস বানাতে গিয়ে যে বিপুল অর্থ খরচ হবে, সেই টাকা কে দেবে বা কোথা থেকে আসবে?
টাকা যেখান থেকেই আসুক, পুরো সিদ্ধান্তটিই স্থানীয় সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সংঘাত আরও বাড়িয়ে স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করবে কিনা; জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব বাড়াবে কিনা—সেটি সরকারের বিবেচনা করা দরকার।

ভারত যদি সাগরে অবরোধ না দিত, তবে পাকিস্তান থেকে জাহাজ রসদ, গোলাবারুদ বা তেল নিয়ে এখানে আসতে পারত। এই অবরোধ আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। যেকোনো সময় আমাদের ওপরও এমন অবরোধ আসতে পারে, যেমনটা বর্তমানে আমেরিকা দিচ্ছে। অবরোধ দিলে আমাদের তেল আনার বিকল্প কোনো স্থলপথ বা রুট নেই।
১৫ ঘণ্টা আগে
কসবায় বিএসএফের গুলিতে দুই যুবকের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে প্রাণ গেল মো. খাদেমুল নামে ২৫ বছরের এক বাংলাদেশি যুবকের। প্রকাশিত তথ্য বলছে, ঘটনাটি ঘটেছে গভীর রাতে, বনচৌকি বিওপি সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায়, মেইন পিলার ৯০৫/৬-এস-এর কাছে।
১ দিন আগে
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হতে পারে—আমেরিকার প্রতিটি অভ্যন্তরীণ সংকটকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে না দেখা। আজকের বিশ্বে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বৈশ্বিক কৌশল ক্রমেই অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠছে—এই উপলব্ধি ঢাকাকে আরও পরিশীলিত কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে উৎসাহিত করা উচিত।
১ দিন আগে
বিকেলের রোদ তখনও পুরোপুরি নরম হয়নি। আগারগাঁওয়ে অসংখ্য মানুষের লম্বা লাইনের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। মাথায় সাদা টুপি, গায়ে ধূসর পাঞ্জাবি। চোখেমুখে যেন গত শতকের ক্লান্তি। তিনি বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। ট্রাক আসবে। টিসিবির পণ্য মিলবে।
২ দিন আগে