ইনবক্সের বাইরে-৬

সিটি গোল্ডের জীবন, হাম ও সস্তা সময়ের রাষ্ট্র

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ১৬: ৫০
গ্রাফিক: তুফায়েল আহমদ

বিকেলের রোদ তখনও পুরোপুরি নরম হয়নি। আগারগাঁওয়ে অসংখ্য মানুষের লম্বা লাইনের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। মাথায় সাদা টুপি, গায়ে ধূসর পাঞ্জাবি। চোখেমুখে যেন গত শতকের ক্লান্তি। তিনি বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। ট্রাক আসবে। টিসিবির পণ্য মিলবে। একটু কম দামে চাল, ডাল, তেল পাওয়া যাবে। এই আশাতেই দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর।

কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাচা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন?

‘আড়াই ঘণ্টা তো হইবই।’

‘এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন?’

বৃদ্ধ মানুষটা মৃদু হাসলেন—‘বাবা, গরিব মানুষের সময়ের দাম কেডা দেয়? আমরা তো দাঁড়াইয়াই থাহি।’

এমন নিষ্ঠুর সত্য কানও সহ্য করতে পারে না। না শোনার ভান করে অন্যমনস্কভাবে অন্যদিকে তাকালাম। চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে যে কাজে এসেছিলাম, সেই কাজের দিকে ছুটলাম।

কিন্তু মাথার ভেতর থেকে বৃদ্ধের রোদে পোড়া মুখ, শূন্য দৃষ্টি সরল না। এই রাষ্ট্রে সম্ভবত সবচেয়ে সস্তা জিনিস গরিব মানুষের সময়। রাষ্ট্র ধরে নেয়, গরিবেরা অপেক্ষা করবেই। লাইনে দাঁড়াবে। রোদে পুড়বে। ধাক্কা খাবে। তারপরও কৃতজ্ঞ থাকবে।

পরে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানলাম, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির দেরিতে আসার কারণে টিসিবির লাইনে বৃদ্ধ মানুষদের আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে!

ঘটনা গত মঙ্গলবারের (১৩ মে)। ওই একই দিনের আরেক খবরে দেখলাম, মিরপুরে ট্রাক সময়মতো না আসায় শত শত মানুষ রোদের মধ্যে অনিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে থেকেছে। পরে ট্রাক এলে শুরু হয়েছে হুড়োহুড়ি। কেউ ঝুলে পড়েছে চলন্ত ট্রাকে, কেউ কনুই দিয়ে ঠেলে জায়গা করে নিয়েছে।

ব্রিটিশ দার্শনিক থমাস হবস বলেছিলেন, রাষ্ট্র গঠনের আগে মানুষের জীবন ছিল ‘সলিটারি, পুওর, ন্যাস্টি অ্যান্ড শর্ট।’ অর্থাৎ নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, জঘন্য ও ক্ষণস্থায়ী। সেই অবস্থা থেকে কতটা এগোলো মানুষ? কথা ছিল, রাষ্ট্র আমাদের সুসভ্য করবে। রাষ্ট্র কি তার কথা রাখতে পেরেছে?

যদি পারত, তাহলে মানুষ পণ্য কেনার জন্য চলন্ত ট্রাকে ঝুলে পড়ত না। কোনো বৃদ্ধ মানুষকে আড়াই ঘণ্টা টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। সস্তা পণ্যের ট্রাক কখন আসবে, তার জন্য অনিশ্চয়তার প্রহর গুনতে হতো না।

চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের কাজ শেষ করে ফুটপাত ধরে হাঁটছি। রিকশা পাচ্ছি না। তীব্র গরমে হাঁপিয়ে উঠে কিছুক্ষণ পরই ফুটপাতের এক চায়ের দোকানে বসতে বাধ্য হলাম।

নানা বয়সী চার-পাঁচজন মানুষ বসে আছে।

দোকানদারকে চা দিতে বলে তাদের গল্পে কান পাতলাম। হালকা হলুদ রঙের ফতুয়া পরা মাথায় টাকওয়ালা ভদ্রলোক বলছেন, ‘হাম নয়, আমার ধারণা, নতুন কোনো ভাইরাস এসেছে দেশে। ডাক্তারেরা ধরতে পারতেছে না। হামে কি এত বাচ্চা মরে না কি? কইলেই হইল?’

তাঁর কথায় সায় দিলেন চেক শার্ট পরা ভদ্রলোক—‘আমগো আর হাম হয় নাই? ছুডুবেলায় ব্যাকটির হাম হইছিল। কই, কেউ মরি নাই তো?’

ঠিক তখনই ‘মামা চা লন’ বলে কাপ এগিয়ে দিলো দোকানি। তার হাত থেকে চা নিতে গিয়ে চোখ পড়ল দোকানের ভেতরে উঁচু তাকে রাখা টেলিভিশনের পর্দায়। সেখানে পিঁপড়ার সারির মতো স্ক্রল যাচ্ছে—‘হাম ও উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৪০৯।’

আমাদের সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলো আজ কোথায় দাঁড়িয়ে? তারা রোদের মধ্যে টিসিবির লাইনে, হাসপাতালের বারান্দায়, গুজবের আতঙ্কে অথবা কোনো অন্ধকার গ্রামের ঘরে, যেখানে পরদিন সকালে পুলিশ এসে মরদেহ গুনে যায়।

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ে চুমুক দিলাম। চেক শার্ট আর হলুদ ফতুয়া গল্প করেই যাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন কুচকুচে কালো রঙের টি-শার্ট পরা এক যুবক। অবশ্য গল্পের টপিক পাল্টে গেছে তাদের।

কালো টি-শার্ট হতাশ গলায় বলছেন, ‘দ্যাশটার হইলোটা কী! তুচ্ছ কারণে মানুষকে খুন করা হচ্ছে।’

কৌতূহল নিয়ে তার দিকে তাকালাম। তিনি আগ্রহী শ্রোতা পেয়ে প্রবল উৎসাহে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, শুনছেন তো গাজীপুরের ঘটনাটা? ৪৬ বছর বয়সী এক নারীকে মাইরা ফেলছে, কারণ খুনিরা ভাবছিল, তার কাছে সোনার গয়না আছে। পরে বিক্রি করতে গিয়া দেখে, ওগুলো সোনা নয়, সব ‘সিটি গোল্ড’!

আমি তাঁর গল্পের সুগ্রীব দোসর হলাম। মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, কয়েক মাস আগে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে এমন একটা ঘটনা ঘটেছে ভাই। পরকীয়া সম্পর্কের ভুল সন্দেহে এক কিশোরকে হত্যা করা হয়েছে।

কালো টি-শার্ট মনে হয় আরও উৎসাহ পেলেন। তিনি জোর গলায় বলতে শুরু করলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ ভাই। কালিয়াকৈরে গরু চুরির অভিযোগে তিনজনকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। আবার কাপাসিয়ায় এই তো দুই দিন আগে একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে এক নারী, তাঁর তিন মেয়ে ও এক ভাইয়ের মরদেহ।

টেকো মাথার হলুদ ফতুয়া বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বললেন, এই খবরগুলো আলাদা। কিন্তু রোগের উপসর্গ এক। সমাজের বুকে অস্থিরতার পঙ্ক জমেছে। বুঝেছেন?

ভদ্রলোকের কথা সত্য। যখন রাষ্ট্র মানুষের ন্যূনতম নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নিত্যপণ্যের বাজার কিংবা বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা তৈরি করতে পারে না, তখন মানুষ ধীরে ধীরে আইনের জায়গায় গুজবকে বসায়, নীতির জায়গায় প্রতিশোধকে বসায়, আর মানবিকতার জায়গায় বসায় ভয়কে।

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো বলেছিলেন, পাওয়ার ইজ এভরিহোয়ার… বিকজ ইট কামস ফ্রম এভরিহোয়ার। অর্থাৎ সহজভাবে বললে, ক্ষমতা শুধু সংসদে থাকে না; ক্ষমতা মানুষের আচরণ, ভয় আর শরীরের ভেতরেও বাস করে।

আমাদের সমাজে এখন সেই ভয়টাই যেন সবচেয়ে বড় শাসক। মানুষ জানে না হাসপাতালে ওষুধ পাবে কি না, বাজারে ন্যায্যমূল্যে চাল পাবে কি না, কিংবা রাতে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে কি না।

তাই মানুষ ক্রমে আরও রুক্ষ হয়ে উঠছে। আরও সন্দেহপ্রবণ, আরও অস্থির হয়ে উঠছে।

ঢাকার সন্ধ্যা দ্রুত নামে। নিয়ন আলো জ্বলে ওঠে। অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেল, বাস, মানুষের চিৎকার আর কোলাহলের শব্দ প্রখর হতে থাকে। সেই শব্দের ভেতরেই হয়তো কোথাও আবার একটা টিসিবির ট্রাক থামছে। মানুষ দৌড়ে যাচ্ছে। কেউ লাইনে দাঁড়াচ্ছে। কেউ ধাক্কা দিচ্ছে। কেউ মনে মনে হিসাব কষছে—আজ তেল কিনতে পারলে কাল মাছ কিনতে পারব তো!

মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, একটি জাতির মহত্ত্ব বোঝা যায় সে তার দুর্বলতম মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার মাধ্যমে।

আমাদের সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলো আজ কোথায় দাঁড়িয়ে? তারা রোদের মধ্যে টিসিবির লাইনে, হাসপাতালের বারান্দায়, গুজবের আতঙ্কে অথবা কোনো অন্ধকার গ্রামের ঘরে, যেখানে পরদিন সকালে পুলিশ এসে মরদেহ গুনে যায়।

আমরা উন্নয়নের অনেক গল্প শুনি। মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন ইত্যাদি। কিন্তু যে দেশে বৃদ্ধ মানুষকে সস্তা তেল কেনার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যে দেশে মানুষ সন্দেহের বশে মানুষ পিটিয়ে মারে, যে দেশে চলন্ত ট্রাকে ঝুলে পড়ে খাদ্য কিনতে হয়, সেই দেশের এসব উন্নয়ন আসলে কী অর্থ বহন করে?

প্রশ্নটা সমবেত চা-পিপাসুদের কাছে করার ইচ্ছে হলো না। চায়ের দাম মিটিয়ে আলগোছে উঠে পড়ি।

রাত আরও ঘন হয়ে আসে। শহরের বাতিগুলো দূর থেকে সুন্দর লাগে। শুধু কাছে গেলে দেখা যায়, সেই আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে ধীরে ধীরে কী পরিমাণ ক্লান্তি জমে আছে।

  • মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

সম্পর্কিত