সাঈফ ইবনে রফিক

কসবায় বিএসএফের গুলিতে দুই যুবকের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে প্রাণ গেল মো. খাদেমুল নামে ২৫ বছরের এক বাংলাদেশি যুবকের। প্রকাশিত তথ্য বলছে, ঘটনাটি ঘটেছে গভীর রাতে, বনচৌকি বিওপি সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায়, মেইন পিলার ৯০৫/৬-এস-এর কাছে। খাদেমুল ও তার সঙ্গীরা ভারতের প্রায় ৩০০ গজ ভেতরে অবস্থান করছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এরপর ভারতের ৭৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের পাগলামারী ক্যাম্পের টহল দল তাদের লক্ষ্য করে ছররা গুলি ছোড়ে বলে অভিযোগ। আহত খাদেমুলকে রংপুরে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি জানার পর বিজিবি অনুসন্ধান শুরু করেছে, বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং পতাকা বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে। বিএসএফ প্রথমে তদন্তের আশ্বাস দিলেও পরে দায় অস্বীকার করেছে। কিন্তু এই বিবরণের ভেতরেই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি চাপা পড়ে যাচ্ছে: বিএসএফের বন্দুকের নাগালে খাদেমুলকে পাঠাল কে?
এই প্রশ্ন নিহতের প্রতি অমানবিকতা নয়। বরং এটিই মানবিক প্রশ্ন। কারণ সীমান্তে মৃত্যু কখনো একক ঘটনা নয়; এর পেছনে থাকে দারিদ্র্য, ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত অর্থনীতি, সংগঠিত দালালচক্র, স্থানীয় চোরাচালান নেটওয়ার্ক এবং কিছু অদৃশ্য মুনাফাভোগী। যারা লাভ নেয়, তারা থাকে নিরাপদ দূরত্বে। যারা ঝুঁকি নেয়, তারা হয় সীমান্তের দরিদ্র যুবক। আর যারা মরে, তাদের নাম হয়ে যায় সংবাদ শিরোনাম।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম এই জায়গাতেই বারবার ব্যর্থ হয়। সীমান্তে কেউ মারা গেলে সংবাদমাধ্যম শোক দেখায়, পরিবারের কান্না তুলে ধরে, নিহতের পরিচয় সামনে আনে, কিন্তু নেপথ্যের কাঠামো অনুসন্ধান করে না। খাদেমুল কেন গভীর রাতে সীমান্তে গেলেন? তার সঙ্গে কারা ছিল? কারা তাকে সেখানে নিয়ে গেল? ওই সীমান্ত দিয়ে কী ধরনের অবৈধ লেনদেন বা চোরাচালান চলত? স্থানীয় দালালচক্রের ভূমিকা কী? দরিদ্র যুবকদের কারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করে? এসবের উত্তর না খুঁজে শুধু মৃত্যুর আবেগ প্রচার করা ‘সীমান্ত সাংবাদিকতা’ নয়।
সীমান্ত হত্যার প্রতিটি ঘটনায় একটি দৃশ্যমান বন্দুক থাকে, কিন্তু তার আগেও থাকে অদৃশ্য হাত। বিএসএফের গুলি যদি মৃত্যুর তাৎক্ষণিক কারণ হয়, তাহলে সেই গুলির নাগালে একজন বাংলাদেশিকে পৌঁছে দেওয়া চক্রটিও দায় এড়াতে পারে না। এই চক্রের কেউ হয়তো গ্রামের পরিচিত মুখ, কেউ হয়তো সীমান্তের পুরোনো দালাল, কেউ হয়তো বড় মুনাফার মালিক, কেউ হয়তো স্থানীয় ক্ষমতার ছায়ায় নিরাপদ। খাদেমুলের মৃত্যুতে তাদের নাম সামনে আসছে না। সংবাদমাধ্যমের ব্যর্থতা এখানেই।
বাংলাদেশি মিডিয়ার একটি বড় সংকট হলো তারা সীমান্তের ঘটনাকে জাতীয় আবেগের চোখে দেখে; অপরাধ অর্থনীতির চোখে দেখে না। ফলে নিহত ব্যক্তি কখনো ‘যুবক’, কখনো ‘ছেলে’, কখনো ‘পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য’ হিসেবে হাজির হন। কিন্তু তিনি কীভাবে সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ বৃত্তে ঢুকে পড়লেন, সেটি অন্ধকারেই থেকে যায়। মানবিক পরিচয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানবিকতার নামে যদি চোরাচালান চক্রের বাস্তবতা আড়াল হয়, তাহলে সেই মানবিকতাই অপরাধচক্রের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে অবশ্যই কঠোর অবস্থান নিতে হবে। বিএসএফের গুলি, দায় অস্বীকার, তদন্ত এড়িয়ে যাওয়া এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক প্রতিবাদ অব্যাহত থাকা জরুরি। বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণ সীমান্তে এত সস্তা হতে পারে না। বিএসএফের যেকোনো প্রাণঘাতী আচরণের জবাবদিহি চাইতেই হবে। একই সঙ্গে সীমান্তের ভেতরের সত্যটিও দেখতে হবে। যে চোরাচালান চক্র সীমান্তবাসীর দারিদ্র্যকে পুঁজি করে তরুণদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়– তারাও রাষ্ট্রের শত্রু, সীমান্তবাসীর শত্রু ও মানবিকতার শত্রু।
এখানে বিজিবির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাটি জানার পর ১৫ বিজিবি লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান শুরু করেছে, বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছে; পতাকা বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে। বিজিবির স্থানীয় তথ্য, ঘটনাস্থল, আহত ব্যক্তির চিকিৎসা, ময়নাতদন্ত ও বিএসএফের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে। সীমান্তে একটি গুলি শুধু তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি দুই রাষ্ট্রের সামরিক, কূটনৈতিক ও স্থানীয় নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। তাই উত্তেজনা বাড়িয়ে নয়; তথ্য, প্রমাণ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবাদের ভিত্তিতে এগোনোই দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় আচরণ।
বিএসএফের অবস্থানও প্রশ্নের বাইরে নয়। বাংলাদেশি মিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, প্রথমে তারা তদন্তের আশ্বাস দিলেও পরে গুলি চালানোর দায় অস্বীকার করেছে। সীমান্ত হত্যার ঘটনায় অস্বীকারের সংস্কৃতি নতুন নয়। এটি বিচারহীনতাকে দীর্ঘায়িত করে এবং সীমান্তবাসীর জীবনের মূল্যকে কমিয়ে দেয়। আরও উদ্বেগজনক হলো ভারতীয় মিডিয়ার নীরবতা। বাংলাদেশের একজন যুবক সীমান্তে নিহত হলো, বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে খবরটি প্রচারিত হলো; কিন্তু ভারতের মূলধারা কিংবা ওপারের আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি গুরুত্ব পেল না। একই সীমান্তে একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত হলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম কি এতটাই নীরব থাকত?
বাংলাদেশের মিডিয়ার সরবতাও অনেক সময় নিষ্ফল। কারণ সরব হওয়া আর অনুসন্ধানী হওয়া এক জিনিস নয়। মৃতের বাড়িতে গিয়ে কান্না রেকর্ড করা সহজ; কিন্তু রাতের সীমান্ত রুট, দালালচক্র, মুনাফার ভাগ, স্থানীয় প্রভাবশালী, পণ্যের ধরন, আগের ঘটনার ধারাবাহিকতা ও ঝুঁকির অর্থনীতি অনুসন্ধান কঠিন। সীমান্ত এলাকায়ও গ্রাম্য রাজনীতি, পূর্বশত্রুতার জেরে খুন যে ঘটতে পারে, সেটাকে গণমাধ্যম আমলে নিতে দেখা যায় না। বরং গণমাধ্যম সহজ পথটি বেছে নেয়। ফলে প্রতিটি সীমান্ত হত্যার খবর প্রায় একই ছকে আটকে যায়: একজন নিহত, পরিবার শোকাহত, স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ, বিজিবি প্রতিবাদ জানিয়েছে, বিএসএফ অস্বীকার করেছে। তারপর ঘটনা চাপা পড়ে যায় নতুন ঘটনার নিচে।
এই পুনরাবৃত্তি চোরাচালান চক্রের জন্য সুবিধাজনক। কারণ তারা জানে, মৃত্যু সংবাদ হবে, আবেগ তৈরি হবে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে প্রশ্ন করা হবে, বিএসএফকে নিন্দা করা হবে; কিন্তু তাদের খোঁজ কেউ করবে না। তারা জানে, সীমান্তের দরিদ্র যুবক মরবে, কিন্তু মুনাফার মালিকের নাম পত্রিকায় আসবে না। এই নীরবতায় সীমান্তের অপরাধ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হয়।
খাদেমুলের মৃত্যু তাই শুধু একটি সীমান্ত হত্যার ঘটনা নয়। এটি বিএসএফের জবাবদিহিহীনতা, ভারতীয় মিডিয়ার নীরবতা, বাংলাদেশি মিডিয়ার অপরিপক্কতা, চোরাচালান চক্রের নিষ্ঠুরতা ও বিজিবির সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা একসঙ্গে সামনে আনে। যারা সীমান্তের মৃত্যু নিয়ে সত্যিই উদ্বিগ্ন, তাদেরকে আবেগের বাইরে গিয়ে নেপথ্যের অন্ধকারে আলো ফেলতে হবে। কারণ সীমান্তে মানুষ শুধু গুলিতে মরে না; অনেক সময় তাকে আগেই বন্দুকের নাগালে ঠেলে দেয় এক অদৃশ্য চক্র। সেই চক্রের মুখোশ খুলে দেওয়াই সীমান্ত সাংবাদিকতার নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক: সীমান্ত সাংবাদিকতা বিশ্লেষক

কসবায় বিএসএফের গুলিতে দুই যুবকের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে প্রাণ গেল মো. খাদেমুল নামে ২৫ বছরের এক বাংলাদেশি যুবকের। প্রকাশিত তথ্য বলছে, ঘটনাটি ঘটেছে গভীর রাতে, বনচৌকি বিওপি সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায়, মেইন পিলার ৯০৫/৬-এস-এর কাছে। খাদেমুল ও তার সঙ্গীরা ভারতের প্রায় ৩০০ গজ ভেতরে অবস্থান করছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এরপর ভারতের ৭৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের পাগলামারী ক্যাম্পের টহল দল তাদের লক্ষ্য করে ছররা গুলি ছোড়ে বলে অভিযোগ। আহত খাদেমুলকে রংপুরে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি জানার পর বিজিবি অনুসন্ধান শুরু করেছে, বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং পতাকা বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে। বিএসএফ প্রথমে তদন্তের আশ্বাস দিলেও পরে দায় অস্বীকার করেছে। কিন্তু এই বিবরণের ভেতরেই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি চাপা পড়ে যাচ্ছে: বিএসএফের বন্দুকের নাগালে খাদেমুলকে পাঠাল কে?
এই প্রশ্ন নিহতের প্রতি অমানবিকতা নয়। বরং এটিই মানবিক প্রশ্ন। কারণ সীমান্তে মৃত্যু কখনো একক ঘটনা নয়; এর পেছনে থাকে দারিদ্র্য, ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত অর্থনীতি, সংগঠিত দালালচক্র, স্থানীয় চোরাচালান নেটওয়ার্ক এবং কিছু অদৃশ্য মুনাফাভোগী। যারা লাভ নেয়, তারা থাকে নিরাপদ দূরত্বে। যারা ঝুঁকি নেয়, তারা হয় সীমান্তের দরিদ্র যুবক। আর যারা মরে, তাদের নাম হয়ে যায় সংবাদ শিরোনাম।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম এই জায়গাতেই বারবার ব্যর্থ হয়। সীমান্তে কেউ মারা গেলে সংবাদমাধ্যম শোক দেখায়, পরিবারের কান্না তুলে ধরে, নিহতের পরিচয় সামনে আনে, কিন্তু নেপথ্যের কাঠামো অনুসন্ধান করে না। খাদেমুল কেন গভীর রাতে সীমান্তে গেলেন? তার সঙ্গে কারা ছিল? কারা তাকে সেখানে নিয়ে গেল? ওই সীমান্ত দিয়ে কী ধরনের অবৈধ লেনদেন বা চোরাচালান চলত? স্থানীয় দালালচক্রের ভূমিকা কী? দরিদ্র যুবকদের কারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করে? এসবের উত্তর না খুঁজে শুধু মৃত্যুর আবেগ প্রচার করা ‘সীমান্ত সাংবাদিকতা’ নয়।
সীমান্ত হত্যার প্রতিটি ঘটনায় একটি দৃশ্যমান বন্দুক থাকে, কিন্তু তার আগেও থাকে অদৃশ্য হাত। বিএসএফের গুলি যদি মৃত্যুর তাৎক্ষণিক কারণ হয়, তাহলে সেই গুলির নাগালে একজন বাংলাদেশিকে পৌঁছে দেওয়া চক্রটিও দায় এড়াতে পারে না। এই চক্রের কেউ হয়তো গ্রামের পরিচিত মুখ, কেউ হয়তো সীমান্তের পুরোনো দালাল, কেউ হয়তো বড় মুনাফার মালিক, কেউ হয়তো স্থানীয় ক্ষমতার ছায়ায় নিরাপদ। খাদেমুলের মৃত্যুতে তাদের নাম সামনে আসছে না। সংবাদমাধ্যমের ব্যর্থতা এখানেই।
বাংলাদেশি মিডিয়ার একটি বড় সংকট হলো তারা সীমান্তের ঘটনাকে জাতীয় আবেগের চোখে দেখে; অপরাধ অর্থনীতির চোখে দেখে না। ফলে নিহত ব্যক্তি কখনো ‘যুবক’, কখনো ‘ছেলে’, কখনো ‘পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য’ হিসেবে হাজির হন। কিন্তু তিনি কীভাবে সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ বৃত্তে ঢুকে পড়লেন, সেটি অন্ধকারেই থেকে যায়। মানবিক পরিচয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানবিকতার নামে যদি চোরাচালান চক্রের বাস্তবতা আড়াল হয়, তাহলে সেই মানবিকতাই অপরাধচক্রের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে অবশ্যই কঠোর অবস্থান নিতে হবে। বিএসএফের গুলি, দায় অস্বীকার, তদন্ত এড়িয়ে যাওয়া এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক প্রতিবাদ অব্যাহত থাকা জরুরি। বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণ সীমান্তে এত সস্তা হতে পারে না। বিএসএফের যেকোনো প্রাণঘাতী আচরণের জবাবদিহি চাইতেই হবে। একই সঙ্গে সীমান্তের ভেতরের সত্যটিও দেখতে হবে। যে চোরাচালান চক্র সীমান্তবাসীর দারিদ্র্যকে পুঁজি করে তরুণদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়– তারাও রাষ্ট্রের শত্রু, সীমান্তবাসীর শত্রু ও মানবিকতার শত্রু।
এখানে বিজিবির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাটি জানার পর ১৫ বিজিবি লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান শুরু করেছে, বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছে; পতাকা বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে। বিজিবির স্থানীয় তথ্য, ঘটনাস্থল, আহত ব্যক্তির চিকিৎসা, ময়নাতদন্ত ও বিএসএফের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে। সীমান্তে একটি গুলি শুধু তাৎক্ষণিক আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি দুই রাষ্ট্রের সামরিক, কূটনৈতিক ও স্থানীয় নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। তাই উত্তেজনা বাড়িয়ে নয়; তথ্য, প্রমাণ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবাদের ভিত্তিতে এগোনোই দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় আচরণ।
বিএসএফের অবস্থানও প্রশ্নের বাইরে নয়। বাংলাদেশি মিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, প্রথমে তারা তদন্তের আশ্বাস দিলেও পরে গুলি চালানোর দায় অস্বীকার করেছে। সীমান্ত হত্যার ঘটনায় অস্বীকারের সংস্কৃতি নতুন নয়। এটি বিচারহীনতাকে দীর্ঘায়িত করে এবং সীমান্তবাসীর জীবনের মূল্যকে কমিয়ে দেয়। আরও উদ্বেগজনক হলো ভারতীয় মিডিয়ার নীরবতা। বাংলাদেশের একজন যুবক সীমান্তে নিহত হলো, বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে খবরটি প্রচারিত হলো; কিন্তু ভারতের মূলধারা কিংবা ওপারের আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি গুরুত্ব পেল না। একই সীমান্তে একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত হলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম কি এতটাই নীরব থাকত?
বাংলাদেশের মিডিয়ার সরবতাও অনেক সময় নিষ্ফল। কারণ সরব হওয়া আর অনুসন্ধানী হওয়া এক জিনিস নয়। মৃতের বাড়িতে গিয়ে কান্না রেকর্ড করা সহজ; কিন্তু রাতের সীমান্ত রুট, দালালচক্র, মুনাফার ভাগ, স্থানীয় প্রভাবশালী, পণ্যের ধরন, আগের ঘটনার ধারাবাহিকতা ও ঝুঁকির অর্থনীতি অনুসন্ধান কঠিন। সীমান্ত এলাকায়ও গ্রাম্য রাজনীতি, পূর্বশত্রুতার জেরে খুন যে ঘটতে পারে, সেটাকে গণমাধ্যম আমলে নিতে দেখা যায় না। বরং গণমাধ্যম সহজ পথটি বেছে নেয়। ফলে প্রতিটি সীমান্ত হত্যার খবর প্রায় একই ছকে আটকে যায়: একজন নিহত, পরিবার শোকাহত, স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ, বিজিবি প্রতিবাদ জানিয়েছে, বিএসএফ অস্বীকার করেছে। তারপর ঘটনা চাপা পড়ে যায় নতুন ঘটনার নিচে।
এই পুনরাবৃত্তি চোরাচালান চক্রের জন্য সুবিধাজনক। কারণ তারা জানে, মৃত্যু সংবাদ হবে, আবেগ তৈরি হবে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে প্রশ্ন করা হবে, বিএসএফকে নিন্দা করা হবে; কিন্তু তাদের খোঁজ কেউ করবে না। তারা জানে, সীমান্তের দরিদ্র যুবক মরবে, কিন্তু মুনাফার মালিকের নাম পত্রিকায় আসবে না। এই নীরবতায় সীমান্তের অপরাধ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হয়।
খাদেমুলের মৃত্যু তাই শুধু একটি সীমান্ত হত্যার ঘটনা নয়। এটি বিএসএফের জবাবদিহিহীনতা, ভারতীয় মিডিয়ার নীরবতা, বাংলাদেশি মিডিয়ার অপরিপক্কতা, চোরাচালান চক্রের নিষ্ঠুরতা ও বিজিবির সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা একসঙ্গে সামনে আনে। যারা সীমান্তের মৃত্যু নিয়ে সত্যিই উদ্বিগ্ন, তাদেরকে আবেগের বাইরে গিয়ে নেপথ্যের অন্ধকারে আলো ফেলতে হবে। কারণ সীমান্তে মানুষ শুধু গুলিতে মরে না; অনেক সময় তাকে আগেই বন্দুকের নাগালে ঠেলে দেয় এক অদৃশ্য চক্র। সেই চক্রের মুখোশ খুলে দেওয়াই সীমান্ত সাংবাদিকতার নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক: সীমান্ত সাংবাদিকতা বিশ্লেষক

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হতে পারে—আমেরিকার প্রতিটি অভ্যন্তরীণ সংকটকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে না দেখা। আজকের বিশ্বে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বৈশ্বিক কৌশল ক্রমেই অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠছে—এই উপলব্ধি ঢাকাকে আরও পরিশীলিত কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে উৎসাহিত করা উচিত।
২ ঘণ্টা আগে
বিকেলের রোদ তখনও পুরোপুরি নরম হয়নি। আগারগাঁওয়ে অসংখ্য মানুষের লম্বা লাইনের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। মাথায় সাদা টুপি, গায়ে ধূসর পাঞ্জাবি। চোখেমুখে যেন গত শতকের ক্লান্তি। তিনি বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। ট্রাক আসবে। টিসিবির পণ্য মিলবে।
১ দিন আগে
তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ প্রকল্পে সৌদি আরবের কৌশলগত অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে একক পশ্চিমা আধিপত্য এবং ইসরাইলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা আকাশ শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার মার্কিন নীতির কারণে রিয়াদ যে নিরাপত্ত
১ দিন আগে
বাংলাদেশ মূলত একটি বদ্বীপ, যার ধমনী ও উপশিরাজুড়ে রয়েছে শত শত জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদী। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে এ দেশের ভূখণ্ডটি উজান থেকে আসা পানির প্রবাহের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মোট ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টিই এসেছে ভারতের ওপর দিয়ে।
১ দিন আগে