দিনবদলের ক্ষমতা আছে ককরোচ জনতা পার্টির?

অরিজিৎ লাহিড়ী
অরিজিৎ লাহিড়ী

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ১৯: ৩৯
ছবি: ইনস্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া

মিশেল দ্য সের্তো বলেছিলেন, ক্ষমতাহীন মানুষের প্রধান অস্ত্র হলো দৈনন্দিন জীবনের ভিতর ছোট ছোট প্রতিরোধ। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) সেই প্রতিরোধেরই এক ডিজিটাল রূপ। এখানে যুবসমাজ বলছে— তোমরা আমাদের অপমান করবে, আমরা সেই অপমানকেই আত্মপরিচয়ে পরিণত করব। কিন্তু এই প্রতিবাদের স্থায়িত্ব মানুষের রাজনৈতিক সংগঠনের উপর নির্ভর করছে না, করছে মেটার রেকমেন্ডেশন ইঞ্জিনের উপর। বিপ্লব যদি সার্ভার ট্রাফিকের হাতে বন্দি হয়, তবে তা রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে বাজারের আচরণকেই বেশি প্রতিফলিত করে।

তাই ভারতের জেন জি-র পছন্দের রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টি— এই বক্তব্য শুনতে যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে ততটাই অতিসরলীকরণ। বরং বলা ভালো, এটি রাজনৈতিক সমর্থনের চেয়ে ডিজিটাল হতাশার এক ব্যঙ্গাত্মক বহিঃপ্রকাশ। আজকের ভারতীয় যুবসমাজ কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শের চেয়ে বেশি বাস করে অ্যালগরিদমের ভিতরে। তারা প্রতিবাদ করছে ঠিকই, কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা এখন আর রাজপথের মিছিল নয়; বরং মিম, রিল ও স্যাটায়ার।

সম্প্রতি ককরোচ জনতা পার্টি সামাজিক মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের অনুসরণকারীর সংখ্যা ২১ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই আন্দোলনের সূত্রপাত মূলত একটি বিতর্কিত মন্তব্য থেকে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত কিছু বেকার যুবককে ‘ককরোচ’ বা আরশোলার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সেই অপমানকেই উল্টে নিজেদের প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছে দেশের যুবসমাজের একাংশ।

এই আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা অভিজিৎ দীপকে হয়তো ভারতের রাজনীতির চেনা গতিপথ এক ধাক্কায় বদলে দিতে পারবেন না। কিন্তু তিনি একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছেন— রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই এখন আর শুধু সংসদ ভবন, দলীয় কার্যালয় কিংবা সংবাদমাধ্যমের স্টুডিওর ভিতরে সীমাবদ্ধ নেই। এই লড়াই এখন পুরোদমে চলছে স্মার্টফোনের পর্দার ভিতরে। মতাদর্শের চেয়েও এখন দ্রুত ছড়ায় মিম; বড় বড় নেতার বক্তৃতার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে ছোট একটি রিল ভিডিও। এমনকী আজকের দিনে রাজনৈতিক বিতর্কগুলি অনেক সময় তৈরি হয় সামাজিক মাধ্যমের কমেন্ট সেকশনে। অভিজিৎ দীপকও তাই রাজনীতিকে রাজপথে নামানোর আগে অ্যালগরিদমের ভিতরে প্রবেশ করিয়েছেন।

ঠিক এখানেই প্রশ্ন ওঠে— সামাজিক মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয় হওয়া কি সত্যিই রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সমার্থক?

এর সহজ উত্তর— না।

ইন্টারনেটের রাজনীতিতে আজ যা হ্যাশট্যাগ বিপ্লব, কাল সেটাই আরেকটি পুরনো ট্রেন্ড। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির সাফল্য মূলত এই সময়ের যুবসমাজের মানসিক অবস্থাকে ধরতে পেরেছে। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, পরীক্ষায় দুর্নীতি, রাজনৈতিক ক্লান্তি এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তরুণদের মধ্যে একধরনের ডিজিটাল বিদ্রূপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই বিদ্রূপ আর রাজনৈতিক বিকল্প কখনও এক জিনিস নয়।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আসলে ভারতের বর্তমান যুবসমাজের গভীর হতাশা, ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতার এক ডিজিটাল প্রতীক মাত্র। এই প্রজন্ম রাগান্বিত, কিন্তু তারা সংগঠিত নয়। তারা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন, কিন্তু মতাদর্শগতভাবে চরম বিভ্রান্ত। তারা তীব্র প্রতিবাদী, কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা ও গতি অনেক সময় স্মার্টফোনের স্ক্রিনের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাস্তবে পৌঁছয় না।

বোদ্রিয়ার (ব্যদ্রিয়া) বলেছিলেন, সমাজে বাস্তবতার চেয়ে বাস্তবতার প্রতিরূপ বা সিম্যুলেশন অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ককরোচ জনতা পার্টি সেই প্রতিরূপেরই এক বড় উদাহরণ। এখানে রাজনীতি কোনো বাস্তব পরিবর্তনের প্রকল্প নয়; বরং তা হলো যুবসমাজের হতাশার এক নান্দনিক উপস্থাপনা। এর ফলে প্রতিবাদও এখন স্রেফ ‘কনটেন্ট’ আর তরুণদের ক্ষোভও একধরনের ‘এনগেজমেন্ট মেট্রিক’।

এই প্রজন্ম একাধারে বিদ্রোহী এবং ভীষণ বাস্তববাদী। তারা একদিকে রাষ্ট্রকে গালি দেয়, আবার অন্যদিকে সরকারি চাকরির পরীক্ষার ফর্মও পূরণ করে। তারা দক্ষিণপন্থা এবং পুঁজিবাদের কড়া সমালোচনা করে, কিন্তু সেই বক্তব্যটাই রেকর্ড করে দামি স্মার্টফোনের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে। জেন জি-র ভিতরের এই দ্বৈততা বা দুই বিপরীতমুখী আচরণ বুঝতে না পারলে আজকের তরুণদের চেনা সম্ভব নয়।

দার্শনিক স্লাভয় জিজেক বহু আগেই বলেছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদ প্রতিবাদকেও পণ্যে পরিণত করে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আসলে সেই ভোগ্য প্রতিবাদেরই প্রতীক। এই ভার্চুয়াল দলের নির্দিষ্ট লোগো আছে, স্লোগান আছে, ভিজ্যুয়াল এসথেটিক আছে; কিন্তু একটি রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো সুসংহত নীতি কিংবা রাজনৈতিক সংগঠন নেই।

এখানে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— ভারতের জেন জি আদতে একরৈখিক নয়। মেট্রো শহরের উচ্চ-মধ্যবিত্ত ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী এবং প্রত্যন্ত ছোট শহরের চাকরিপ্রার্থী যুবকের রাজনৈতিক চাহিদা ও লড়াই কখনও এক নয়। এই প্রজন্মের কেউ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, কেউ সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে, কেউ আবার নিছক প্রতিষ্ঠানবিরোধী মানসিকতায় ভাসছে। ফলে দেশের সমস্ত জেন জি এই সিজেপি-র সমর্থক— এমন ধারণা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি ডিজিটাল অতিরঞ্জন এবং অতিসরলীকরণ মাত্র।

আসলে এই ‘আরশোলা’ প্রতীকটির মধ্যেই বর্তমান সময়ের গভীর সামাজিক ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে। আরশোলা এমন এক প্রাণী, যাকে মানবসভ্যতা তীব্র ঘৃণা করে, কিন্তু শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সে টিকে থাকে। ভারতের এক বিপুল সংখ্যক বেকার ও হতাশ যুবক আজ নিজেদের ঠিক তেমনই মনে করছে— ব্যবস্থার কাছে তারা অবাঞ্ছিত, অথচ বেঁচে থাকার তাগিদে টিকে থাকতে বাধ্য। ঠিক এই কারণেই তারা এই আরশোলা প্রতীকের সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারছে।

কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, শুধুমাত্র টিকে থাকা কখনও কোনো রাজনৈতিক দর্শন হতে পারে না। একটি রাষ্ট্র গড়তে প্রয়োজন হয় প্রতিষ্ঠান, সুসংহত অর্থনীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চুক্তি। মিম দিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু মিম দিয়ে দেশের অর্থনীতি বা প্রশাসন চালানো যায় না।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আসলে ভারতের বর্তমান যুবসমাজের গভীর হতাশা, ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতার এক ডিজিটাল প্রতীক মাত্র। এই প্রজন্ম রাগান্বিত, কিন্তু তারা সংগঠিত নয়। তারা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন, কিন্তু মতাদর্শগতভাবে চরম বিভ্রান্ত। তারা তীব্র প্রতিবাদী, কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা ও গতি অনেক সময় স্মার্টফোনের স্ক্রিনের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাস্তবে পৌঁছয় না।

আজকের যুবরাজনীতি তাই এক অদ্ভুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে, যেখানে বিপ্লব শুরু হয় ফোনের নোটিফিকেশন দিয়ে, আর তা শেষ হয় ‘স্কিপ অ্যাড’ বাটনে। কিন্তু ইতিহাসে পৃথিবীর কোনো দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন কখনও শুধুমাত্র সামাজিক মাধ্যমের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ দিয়ে আসেনি। শেষ পর্যন্ত মিম ও ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসতে হলে রাস্তায় নামতে হয়, শক্ত সংগঠনই গড়তে হয়।

  • অরিজিৎ লাহিড়ী: ভারতীয় লেখক

সম্পর্কিত