সন্ধ্যা নামার ঠিক আগমুহূর্তে কারওয়ান বাজারের জটলাটা চোখে পড়ল। ফুটপাতের ওপর চায়ের দোকান। সামনে কাঠের বেঞ্চ। সেখানেই একদল মানুষের জটলা।
বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে দেখলাম, জনাপাঁচেক মানুষ একটা স্মার্টফোনের ওপর ঝুঁকে আছে। সবার চোখে এক ধরনের আদিম উত্তেজনা। ফোনের স্ক্রিনে একটা ভিডিও চলছে—কোনো এক জায়গায় শিশু ধর্ষণের খবর। জটলার ভেতরের ছাইরঙা টি-শার্ট পরা লোকটা দাঁত কিড়মিড় করে বলল, ‘মামা, এডিরে ধইরা মাঝরাস্তায় পিটায়া মারা দরকার। লাইভ করা দরকার!’
খেয়াল করে দেখলাম, জটলার প্রতিটি মানুষ ক্ষোভে কাঁপছে। একই সঙ্গে, ঘৃণা প্রকাশের পাশাপাশি তারা যেন ভিডিওর বীভৎসতাটুকুও গোগ্রাসে গিলছে। তাদের চোখের মনিতে এক ধরনের ‘ভয়েরিস্টিক’বা পরসুখভোগী কৌতূহল। অপরাধকে তারা ঘৃণা করছে ঠিকই, কিন্তু সেই অপরাধের দৃশ্যগুলো তাদের ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনারও জন্ম দিচ্ছে।
মনে পড়ল ফরাসি চিন্তক গাই দেবোর্ডের কথা। তাঁর ‘সোসাইটি অব দ্য স্পেক্টাকল’ বইয়ে তিনি বলেছিলেন, আধুনিক সমাজে বাস্তব ঘটনাও একসময় স্রেফ প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।
আমাদের ডিজিটাল যুগে ন্যায়বিচারের দাবিও কি তবে এক ধরনের ‘এন্টারটেইনিং ব্লাডস্পোর্ট’ হয়ে উঠছে? রোমানরা যেমন গ্যালারিতে বসে গ্ল্যাডিয়েটরদের রক্তাক্ত লড়াই দেখে বিনোদন খুঁজত, আমরাও যেন ক্রমশ গ্যালারিতে বসা সেই দর্শকে পরিণত হচ্ছি! একদিকে গ্যালারিতে বসে ধর্ষণ উপভোগ করছি, অন্যদিকে আমরাই অপরাধীকে ফুলের মালা দিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনছি, ফেসবুকে ফাঁসি চাই, বিচার চাই, জনতাল আদালত চাই বলে মেকি আওয়াজ তুলছি।
মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ভার্চু সিগন্যালিং’। সামাজিক মাধ্যমে একটা কড়া স্ট্যাটাস দিয়ে আমরা মূলত নিজের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চাই। আমরা চাই সবাই দেখুক, আমরা কতটা সংবেদনশীল। কিন্তু এই সংবেদনশীলতা যখন ‘ক্রাউড সাইকোলজির’ বা জনতার উন্মাদনার খপ্পরে পড়ে, তখন তা আর বিচার থাকে না; হয়ে ওঠে এক বীভৎস পারফরম্যান্স।
ভাবতে ভাবতে একটি বাস এসে পড়ল। লাফিয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে। ভাগ্য এতই সুপ্রসন্ন যে, এক ভদ্রলোকের পাশে বসার সিটও পেলাম।
ভদ্রলোক স্মার্টফোনের ইউটিউবে কোনো একটি টিভি চ্যানেলের খবর দেখছিলেন। হেডফোনের বালাই নেই। লাউড স্পিকারেই দেখছিলেন। সব শোনা যাচ্ছে। কানে এল খবরের শব্দগুলো। সেখানে অপরাধের বর্ণনা এমনভাবে দেওয়া হচ্ছে যেন কোনো ক্রাইম থ্রিলার।
রফিক ভাই আমার আহ্বান শুনলেন কি না, বোঝা গেল না। তাঁর দৃষ্টি পথের ওপর রিকশা যাত্রীদের ঝগড়ায়। তিনি আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, ‘দ্যাখছেননি কারবার। কী করতাছে এরা? হাত থাকতে মুখে কী, কন তো?’
মিডিয়া জানে, ভয় আর যৌনতা হলো সবচেয়ে লাভজনক পণ্য। তাই তারা ধর্ষণের খবর ক্লিক আর শেয়ারের সংখ্যা দিয়ে মাপে। ভিকটিমের প্রাইভেসি, সাংবাদিকতার নৈতিকতা—এসব কোনো মুখ্য বিষয় নয়। ফলে মিডিয়ার কাছে ভিকটিম আর রক্ত-মাংসের মানুষ থাকছে না, হয়ে যাচ্ছে অ্যালগরিদমের খাদ্য।
বিষণ্ন মন নিয়ে গাড়ি থেকে আসাদগেটে নামলাম। এখান থেকে আরেকটি বাস অথবা রিকশায় ঘরে ফিরতে হবে। বাসের নাম-নিশানা নেই। গুটি কয়েক রিকশা ঘিরে একপাল যাত্রী কাড়াকাড়ি করছে।
‘আমি আগে ডাকছি, আমি আগে ডাকছি। এই ভাই, আপনি লাফ দিয়া উইঠা পড়লেন ক্যান?’
‘উঠছি তো কী হইছে? আমি কি ভাড়া দিমু না?
‘তয় আমি কি ভাড়া দিমু না? আমিও তো দিমু? আপনি মাঝখান থিকা উইঠা পড়লেন ক্যান?’
ঝগড়া চলছে। ঘরে ফিরতে গিয়ে প্রতিদিন এসব সংগ্রাম দেখি। ক্লান্ত লাগে বড্ড।
হতাশ হয়ে ফুটপাতের চায়ের দোকানে বসলাম। চা দোকানি রফিক; পূর্ব-পরিচিত। প্রায়ই এখানে চা পান করি।
‘রফিক ভাই, চা দিয়েন এক কাপ।’
রফিক ভাই আমার আহ্বান শুনলেন কি না, বোঝা গেল না। তাঁর দৃষ্টি পথের ওপর রিকশা যাত্রীদের ঝগড়ায়। তিনি আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, ‘দ্যাখছেননি কারবার। কী করতাছে এরা? হাত থাকতে মুখে কী, কন তো?’
রফিক মূলত মারামারি দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। এই যে মানুষের তীব্র আক্রোশ, এর পেছনে হয়তো এক গভীর অর্থনৈতিক হাহাকারও আছে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি আর রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার হওয়া মানুষ যখন কোথাও কথা বলতে পারে না, তখন এই জাতীয় অপরাধগুলো তাদের জন্য ‘কালেক্টিভ র্যাগ’ বা সামষ্টিক ক্ষোভ প্রকাশের আউটলেট হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ নিজের সব ব্যর্থতা আর হতাশা এক ব্যক্তির ওপর কেন্দ্রীভূত করে তাকে ‘দানব’ বানায় এবং তাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খেয়ে সাময়িক শান্তি পায়। এতে কাঠামোগত সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যায়।
রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে আরও করুণ। যখন বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের ভরসা তলানিতে গিয়ে ঠেকে, তখন মানুষ দ্রুত প্রতিশোধ চায়। রাষ্ট্রও অনেক সময় জনতার এই রক্তপিপাসাকে ব্যবহার করে। বিচারহীনতার দায় ঢাকার জন্য কঠোর শাস্তির মুলা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এতে তো ন্যায়বিচার হয় না। প্রতিশোধমূলক রাজনীতির জয় হয়।
অন্ধকার আরও গাঢ় হচ্ছে। আসাদগেটের শোরগোল ছাপিয়ে বাসের হর্ন কানে আসছে। বাসে উঠতে উঠতে ভাবলাম, একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কী? শুধুই অপরাধীর শাস্তি দেওয়া নাকি জনতার ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাতেও?
প্রশ্নটা বাসের জানালার বাইরে ঝাপসা হয়ে আসা নিয়ন আলোর মতো দুলতে থাকল। সন্ধ্যার এলোমেলো হাওয়ায় এক ধরনের হাহাকার মিশে গেল।
- মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক