ড. মো. শামছুল আলম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন বা ই-বুকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম, অর্জন, অগ্রগতি ও পরিসংখ্যানসম্বলিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে আছে প্রথম ছয় মাসের চ্যালেঞ্জ, আছে সাফল্যের সামগ্রিক চিত্র। আছে আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনাও।
তথ্যভিত্তিক অর্জনচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই ইতোমধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে কতগুলো কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে কিংবা কতগুলো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে তার সংখ্যাগত হিসাব দিয়ে সরকারকে বিচার করা যথেষ্ট নয়। বরং প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্যেও প্রতিশ্রুতিকে কতটা বাস্তব কর্মে রূপ দেওয়া গেছে, জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের কতটা কার্যকর সংযোগ তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যতের জন্য কতটা টেকসই ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে সেগুলোও মূল্যায়ন করা জরুরি।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই মূল্যায়ন আরও জটিল। কারণ সীমিত সম্পদের বিপরীতে জনগণের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনের পরিধি ক্রমাগত বিস্তৃত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সক্ষমতা পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা সুসংহত করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরি এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ নিয়েই বর্তমান সরকারকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে।
এসব সংকটের মধ্যেও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে ধীরে ধীরে বাস্তব কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার যে ধারাবাহিক প্রয়াস দেখা গেছে, সেটিই এই সময়পর্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। আমার দৃষ্টিতে, সরকারের প্রথম ১৮০ দিন মূলত প্রতিশ্রুতিকে কর্মে এবং জনগণের প্রত্যাশাকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সেই নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টারই একটি প্রাথমিক প্রতিচ্ছবি।
মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য ‘থ্রি-আর’ কৌশল গ্রহণ করেছে। ঘোষিত হয়েছে ‘জীবনবান্ধব বাজেট’। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে নীতিকে যুক্ত করার চেষ্টা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের অর্থায়ন সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার চারটি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, মিরসরাইয়ে জাপানি বিনিয়োগ এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো উদ্যোগগুলোকে শুধু অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এগুলো নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের একেকটি সম্ভাব্য কেন্দ্র।
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে গৃহীত উদ্যোগগুলোও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। নিম্নআয় ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড ইত্যাদির মত উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি নারীমুক্তি ও নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির যেই বিষয়গুলো এতদিন পরিকল্পনাতে ছিল, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তা আজ বাস্তবায়নের পথে। বিশেষ করে নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষাকে যুক্ত করা গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও ফলপ্রসূ হবে তাতে সন্দেহ নেই।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের টেকসই অগ্রযাত্রার পেছনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জনস্বাস্থ্য সংকট। রোগ-শোক ও মহামারি যুগের পর যুগ বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে। সরকার এসব সংকট মোকাবেলায় বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা প্রশংসার দাবি রাখে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ সেবাকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই নারী। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি হবে, অন্যদিকে তেমনি নারীর কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। আবার, আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।
পাশাপাশি দেশের সব ৫১ শয্যার উপজেলা হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজ করবে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতেও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া, ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামোর পরিকল্পনা, ই-হেলথ্ কার্ড চালুর উদ্যোগ ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করার বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
একইভাবে, পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয়। নগর পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ করতে ‘পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা’ পরিকল্পনার আওতায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও সবুজায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগের প্রথম ধাপে ২০২৬ সালে ৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ৬ মাসে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৪৩ দশমিক ২৫ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের বিষয়টিও সরকারি কর্মকৌশলে গুরুত্ব পেয়েছে। আবার, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে খাদ্য অপচয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা ও কোল্ড স্টোরেজ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও সরকারের অর্জন মাইলফলক। গতানুগতিকতার বাইরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা এবং দীর্ঘদিনের জটিলতার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে। একইভাবে চীন সফরে ২১টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা এবং অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয়ে অগ্রগতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। পাশাপাশি, তারেক রহমানের কূটনৈতিক তৎপরতায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অবস্থান দৃশ্যমান হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, যা বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো শিক্ষা। আজকের শিক্ষাব্যবস্থাই নির্ধারণ করবে আগামী বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান। সবচেয়ে আশার বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে দেখছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা এবং জাতীয় আয়ের তুলনায় শিক্ষা ব্যয় ২ শতাংশে উন্নীত করা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর জোর দেওয়া, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর অংশীদারিত্ব, ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রোগ্রামিং ও যোগাযোগ দক্ষতার মতো ভবিষ্যৎ দক্ষতাকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সবসময়ই এসব উদ্যোগের গুরুত্ব অনুধাবন করি। বস্তুত, বাংলাদেশের মানবসম্পদের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করবে এই নীতিগুলো কতটা বাস্তব ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।
তবে অর্জনের এই চিত্রকে আত্মতুষ্টির কারণ বানানোর কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রথম কাজ হলো সংকট সামাল দেওয়া, আর পরবর্তী কাজ হলো সংকটের স্থায়ী সমাধান তৈরি করা। এর মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। শিল্প, কৃষি, নগরজীবন এবং বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। ফলে গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনিশ্চয়তা যেন অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত না করে, সে জন্য স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল প্রয়োজন। দেশের সমুদ্রসীমার ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই অনুসন্ধান কার্যক্রমকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
আবার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত। সম্প্রতি লক্ষ্য করছি, বিরোধী দলগুলো যৌক্তিক কারণ ছাড়াও শুধু বিরোধিতার স্বার্থে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। বিভিন্নভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার হুমকিও দিচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সকল রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির অধিকার গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে একই সঙ্গে সহিংসতা, জনজীবনে অচলাবস্থা, সম্পদ ধ্বংস কিংবা ভয়ভীতি সৃষ্টির মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এজন্য বিরোধী দলগুলোকে অবশ্যই সহযোগিতার মনোভাব রাখতে হবে এবং সরকারকে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সুরক্ষিত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
তবে আগামীর পথচলায় কিছু নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জের প্রতিও সরকারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়। এই দলগুলোর নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের সহিংসতা, নাশকতা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড যাতে জননিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করতে না পারে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে আগাম সতর্ক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
একই সঙ্গে সরকারকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা উগ্রবাদী সংগঠনের সম্ভাব্য তৎপরতা সম্পর্কে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে উদ্বেগের বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা নজরদারি, সাইবার জগতে পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত তৎপরতা আরও কার্যকর করতে হবে। তবে প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে আইনানুগ, প্রমাণনির্ভর ও নাগরিক অধিকারসম্মত, যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও অক্ষুণ্ন থাকে।
স্বীকার করতেই হবে, মাত্র ছয় মাসের মধ্যে বিএনপি সরকার যে অগ্রগতি দেখিয়েছে তা বিস্ময়কর। তবে আমাদের সামনে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, কী ধরনের প্রবৃদ্ধি আমরা চাই? এমন প্রবৃদ্ধি, যা কর্মসংস্থান তৈরি করবে, আঞ্চলিক বৈষম্য কমাবে, নারী ও তরুণদের অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত করবে এবং দেশের উৎপাদনক্ষমতা বাড়াবে। এ জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য এখনও সীমিত কয়েকটি বাজার ও পণ্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং এশীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীরতর সংযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, এলডিসি পরবর্তী বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি আরও সক্রিয় ও বহুমুখী হওয়ার বিকল্প নেই।
আমি বিশ্বাস করি, অর্জনকে ধরে রাখতে হলে চ্যালেঞ্জকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। চ্যালেঞ্জগুলোকে আগাম শনাক্ত করে তা কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন শুধু সড়ক, বিদ্যুৎ, শিল্প বা প্রবৃদ্ধির সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, সুযোগ এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা। এজন্য আমার বিবেচনায়, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো প্রথম পর্যায়ের অর্জনকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে রূপ দেওয়া এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের অগ্রযাত্রাকে আরও কৌশলগত করা।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তব কর্মে রূপ দেওয়ার যে প্রয়াস শুরু হয়েছে, তা যদি জ্বালানি নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দক্ষ মানবসম্পদ, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সুশাসনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে এই অগ্রযাত্রা সাময়িক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শীঘ্রই তা হয়ে উঠবে একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন বা ই-বুকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম, অর্জন, অগ্রগতি ও পরিসংখ্যানসম্বলিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে আছে প্রথম ছয় মাসের চ্যালেঞ্জ, আছে সাফল্যের সামগ্রিক চিত্র। আছে আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনাও।
তথ্যভিত্তিক অর্জনচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই ইতোমধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে কতগুলো কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে কিংবা কতগুলো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে তার সংখ্যাগত হিসাব দিয়ে সরকারকে বিচার করা যথেষ্ট নয়। বরং প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্যেও প্রতিশ্রুতিকে কতটা বাস্তব কর্মে রূপ দেওয়া গেছে, জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের কতটা কার্যকর সংযোগ তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যতের জন্য কতটা টেকসই ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে সেগুলোও মূল্যায়ন করা জরুরি।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই মূল্যায়ন আরও জটিল। কারণ সীমিত সম্পদের বিপরীতে জনগণের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনের পরিধি ক্রমাগত বিস্তৃত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সক্ষমতা পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা সুসংহত করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরি এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ নিয়েই বর্তমান সরকারকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে।
এসব সংকটের মধ্যেও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে ধীরে ধীরে বাস্তব কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার যে ধারাবাহিক প্রয়াস দেখা গেছে, সেটিই এই সময়পর্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। আমার দৃষ্টিতে, সরকারের প্রথম ১৮০ দিন মূলত প্রতিশ্রুতিকে কর্মে এবং জনগণের প্রত্যাশাকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সেই নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টারই একটি প্রাথমিক প্রতিচ্ছবি।
মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য ‘থ্রি-আর’ কৌশল গ্রহণ করেছে। ঘোষিত হয়েছে ‘জীবনবান্ধব বাজেট’। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে নীতিকে যুক্ত করার চেষ্টা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের অর্থায়ন সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার চারটি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, মিরসরাইয়ে জাপানি বিনিয়োগ এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো উদ্যোগগুলোকে শুধু অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এগুলো নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের একেকটি সম্ভাব্য কেন্দ্র।
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে গৃহীত উদ্যোগগুলোও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। নিম্নআয় ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড ইত্যাদির মত উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি নারীমুক্তি ও নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির যেই বিষয়গুলো এতদিন পরিকল্পনাতে ছিল, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তা আজ বাস্তবায়নের পথে। বিশেষ করে নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষাকে যুক্ত করা গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও ফলপ্রসূ হবে তাতে সন্দেহ নেই।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের টেকসই অগ্রযাত্রার পেছনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জনস্বাস্থ্য সংকট। রোগ-শোক ও মহামারি যুগের পর যুগ বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে। সরকার এসব সংকট মোকাবেলায় বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা প্রশংসার দাবি রাখে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ সেবাকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই নারী। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি হবে, অন্যদিকে তেমনি নারীর কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। আবার, আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।
পাশাপাশি দেশের সব ৫১ শয্যার উপজেলা হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজ করবে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতেও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া, ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামোর পরিকল্পনা, ই-হেলথ্ কার্ড চালুর উদ্যোগ ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করার বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
একইভাবে, পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয়। নগর পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ করতে ‘পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা’ পরিকল্পনার আওতায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও সবুজায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগের প্রথম ধাপে ২০২৬ সালে ৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ৬ মাসে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৪৩ দশমিক ২৫ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের বিষয়টিও সরকারি কর্মকৌশলে গুরুত্ব পেয়েছে। আবার, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে খাদ্য অপচয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা ও কোল্ড স্টোরেজ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও সরকারের অর্জন মাইলফলক। গতানুগতিকতার বাইরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা এবং দীর্ঘদিনের জটিলতার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে। একইভাবে চীন সফরে ২১টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা এবং অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয়ে অগ্রগতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। পাশাপাশি, তারেক রহমানের কূটনৈতিক তৎপরতায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অবস্থান দৃশ্যমান হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, যা বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো শিক্ষা। আজকের শিক্ষাব্যবস্থাই নির্ধারণ করবে আগামী বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান। সবচেয়ে আশার বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে দেখছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করা এবং জাতীয় আয়ের তুলনায় শিক্ষা ব্যয় ২ শতাংশে উন্নীত করা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর জোর দেওয়া, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর অংশীদারিত্ব, ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রোগ্রামিং ও যোগাযোগ দক্ষতার মতো ভবিষ্যৎ দক্ষতাকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সবসময়ই এসব উদ্যোগের গুরুত্ব অনুধাবন করি। বস্তুত, বাংলাদেশের মানবসম্পদের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করবে এই নীতিগুলো কতটা বাস্তব ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।
তবে অর্জনের এই চিত্রকে আত্মতুষ্টির কারণ বানানোর কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রথম কাজ হলো সংকট সামাল দেওয়া, আর পরবর্তী কাজ হলো সংকটের স্থায়ী সমাধান তৈরি করা। এর মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। শিল্প, কৃষি, নগরজীবন এবং বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। ফলে গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনিশ্চয়তা যেন অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত না করে, সে জন্য স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল প্রয়োজন। দেশের সমুদ্রসীমার ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই অনুসন্ধান কার্যক্রমকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
আবার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত। সম্প্রতি লক্ষ্য করছি, বিরোধী দলগুলো যৌক্তিক কারণ ছাড়াও শুধু বিরোধিতার স্বার্থে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। বিভিন্নভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার হুমকিও দিচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সকল রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির অধিকার গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে একই সঙ্গে সহিংসতা, জনজীবনে অচলাবস্থা, সম্পদ ধ্বংস কিংবা ভয়ভীতি সৃষ্টির মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এজন্য বিরোধী দলগুলোকে অবশ্যই সহযোগিতার মনোভাব রাখতে হবে এবং সরকারকে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সুরক্ষিত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
তবে আগামীর পথচলায় কিছু নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জের প্রতিও সরকারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়। এই দলগুলোর নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের সহিংসতা, নাশকতা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড যাতে জননিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করতে না পারে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে আগাম সতর্ক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
একই সঙ্গে সরকারকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা উগ্রবাদী সংগঠনের সম্ভাব্য তৎপরতা সম্পর্কে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে উদ্বেগের বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা নজরদারি, সাইবার জগতে পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত তৎপরতা আরও কার্যকর করতে হবে। তবে প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে আইনানুগ, প্রমাণনির্ভর ও নাগরিক অধিকারসম্মত, যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও অক্ষুণ্ন থাকে।
স্বীকার করতেই হবে, মাত্র ছয় মাসের মধ্যে বিএনপি সরকার যে অগ্রগতি দেখিয়েছে তা বিস্ময়কর। তবে আমাদের সামনে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, কী ধরনের প্রবৃদ্ধি আমরা চাই? এমন প্রবৃদ্ধি, যা কর্মসংস্থান তৈরি করবে, আঞ্চলিক বৈষম্য কমাবে, নারী ও তরুণদের অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত করবে এবং দেশের উৎপাদনক্ষমতা বাড়াবে। এ জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য এখনও সীমিত কয়েকটি বাজার ও পণ্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং এশীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীরতর সংযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, এলডিসি পরবর্তী বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি আরও সক্রিয় ও বহুমুখী হওয়ার বিকল্প নেই।
আমি বিশ্বাস করি, অর্জনকে ধরে রাখতে হলে চ্যালেঞ্জকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। চ্যালেঞ্জগুলোকে আগাম শনাক্ত করে তা কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন শুধু সড়ক, বিদ্যুৎ, শিল্প বা প্রবৃদ্ধির সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, সুযোগ এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা। এজন্য আমার বিবেচনায়, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো প্রথম পর্যায়ের অর্জনকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে রূপ দেওয়া এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের অগ্রযাত্রাকে আরও কৌশলগত করা।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তব কর্মে রূপ দেওয়ার যে প্রয়াস শুরু হয়েছে, তা যদি জ্বালানি নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দক্ষ মানবসম্পদ, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সুশাসনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে এই অগ্রযাত্রা সাময়িক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শীঘ্রই তা হয়ে উঠবে একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি।
.png)

জঙ্গি ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের অস্বীকারের সংস্কৃতি যেমন আছে। প্রতিপক্ষ দমনে জঙ্গি কার্ড ব্যবহারের অভিযোগও বেশ পুরোনো। এরকম সব কারণে কখনোই প্রকৃত অর্থে জঙ্গি নির্মূল করা যায়নি। বরং জঙ্গিরা নানা ফর্মে সমাজের নানা পরিসরে মিশেছিল। এখনও আছে। কেউ একদিনে জঙ্গি হয়ে ওঠে
১ ঘণ্টা আগে
চুক্তির আসল উদ্দেশ্য যদি মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতা বাড়ানো হয়, তবে তা শুধু স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও বড়। এমন একটি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে যেকোনো মুসলিম দেশ বাইরের শত্রুর অবৈধ হামলার শিকার হলে সাহায্য পায়।