leadT1ad

এনসিপির প্রার্থী নিয়ে তৃণমূল জামায়াতে অসন্তোষ

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩: ৪৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে চূড়ান্ত ২৫৩ আসনের ৩০টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এসব আসনে প্রার্থী নিয়ে জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ।

সামাজিক মাধ্যমেও জামায়াত-শিবিরের তৃণমূলের নেতাকর্মী এনসিপি নেতাদের নামে নানা ‘নেতিবাচক’ তথ্য ও মন্তব্য ছড়াচ্ছেন। সমঝোতায় এনসিপিকে ৩০ আসন দেওয়া হলেও অনেক জায়গায় দলটির প্রার্থীদের মানতে নারাজ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। ঢাকা-১৯, নরসিংদী-২, লক্ষ্মীপুর-১ সহ বেশকিছু আসনে এই সমস্যা দেখা গেছে।

জামায়াত-শিবিরে অসন্তোষ

এনসিপির ডায়াস্পোরা এলায়েন্সের দিলশানা পারুল ঢাকা-১৯ আসনে নিজেকে ১০ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে প্রচার করছেন। স্থানীয়ভাবে সাভারের বাসিন্দা হলেও অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী দিলশানা ফিরে এসে পেয়েছেন মনোনয়ন। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী আফজাল হোসাইন। যিনি এখনো নিজেকে প্রত্যাহার করেননি।

সাভার উপজেলার জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী দিলশানা পারুলের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। ঢাকা জেলা উত্তরের ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি আলমগীর হোসাইন রাকিব দিলশানা পারুলের ব্যাপারে ফেসবুকে লেখেন, ‘ঢাকা-১৯ আসনের প্রার্থী ও এনসিপির নেত্রী দিলশানা পারুল শাহবাগী আদর্শে বিশ্বাসী, ইসলামবিদ্বেষী এবং এলজিবিটি মতাদর্শের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। এসব অবস্থান আমাদের আদর্শ ও বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। শাহবাগ আন্দোলনের কারণেই আমাদের বহু শীর্ষ নেতৃত্বকে হারাতে হয়েছে, যা আজও আমাদের জন্য এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা। সেই শাহবাগী গোষ্ঠীই ফ্যাসিবাদের অন্যতম সহায়ক শক্তি ছিল। এমন একটি মতাদর্শের সঙ্গে কোনো আপস করা সম্ভব নয়। এ ধরনের আপস হলে তা হবে আত্মঘাতী এবং আমাদের আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।’

শিবিরের এই নেতার পোস্টে সাভার পেশাজীবী থানা জামায়াতের সেক্রেটারি সোহেল প্রিন্স মন্তব্য করেন, ‘এই প্রার্থী চেঞ্জ করা সময়ের দাবি। একে রাখা মানে নিশ্চিত পরাজয় মেনে নেওয়া। এনসিপির উচিত দাঁড়িপাল্লাকে সমর্থন দিয়ে তাদের প্রার্থীকে প্রত্যাহার করা।’

এদিকে, ১৯ জানুয়ারি সাভারের বাইপাইল এলাকায় ‘জুলাইযোদ্ধা’ ব্যানারে দিলশানা পারুলের মনোনয়ন প্রত্যাহার দাবিতে এক মানববন্ধন হয়। বক্তারা দিলশানার মনোনয়ন প্রত্যাহারের দাবি জানান। মানববন্ধনের প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গলবার নিজের ফেসবুকে দিলশানা লেখেন, ‘প্রিয় বাইপালের মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা, আমি দিলশানা পারুল ১০ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী, আমি আমার নমিনেশন উইথড্র করব না। বরং আমি আপনাদের দোয়া চাই।’

নরসিংদী-২ (পলাশ, নরসিংদী সদরের একাংশ) আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন আমজাদ হোসাইন। একই আসনে এনসিপির পক্ষে মনোনয়ন দাখিল করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম সারোয়ার, যিনি সারোয়ার তুষার নামে পরিচিত। এনসিপির চূড়ান্ত মনোনীত ৩০টি আসনের মধ্যে তুষারের আসনও একটি।

স্থানীয় জামায়াত নেতা মাসুম বিল্লাহ সোহান তাঁর ফেসবুকে লেখেন, ‘নরসিংদী-২ আসনে সারোয়ার তুষার থাকলে বয়কট করলাম নির্বাচন।’ তিনি সারোয়ার তুষার ও এনসিপির সাবেক এক নেত্রীর প্রসঙ্গে আরেকটি পোস্টও শেয়ার করেন।

নরসিংদী-২ আসনের অধীনে পাঁচদোনা ইউনিয়নের ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মারুফ বিল্লাহ ফেসবুকে লেখেন, ‘নরসিংদী-২ আসনে যোগ্য প্রার্থী মাওলানা আমজাদ হোসেন ভাইয়ের বিকল্প নাই। অন্য কাউকে দিলে উক্ত নির্বাচন প্রত্যাহার করলাম।’

স্ট্রিম কোলাজ
স্ট্রিম কোলাজ

লক্ষ্মীপুর-১ আসনে এনসিপির হয়ে নির্বাচন করছেন মাহবুব আলম। সদ্য পদত্যাগ করা ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বড় ভাই তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনসিপির এই আসন নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা দল হিসেবে এনসিপির বিরোধিতা নয় বরং প্রার্থী মাহবুব আলমকে মেনে নিতে নারাজ।

অবশ্য এই আসনে মঙ্গলবার নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন জামায়াতের নাজমুল হাসান। লক্ষ্মীপুর-১ আসনের ভোটার ও শিবির কর্মী রাজিব হাসান ফেসবুকে লেখেন, ‘আমি, আমার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন এই নির্বাচনে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকব। তবে গণভোটে ‍হ্যাঁ বলুন।’

তৃণমূলে কেন এই ক্ষোভ

এনসিপির প্রার্থীদের প্রতি স্থানীয় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীর ক্ষোভের ব্যাপারে সমর্থকেরা বলছেন, দল হিসেবে এনসিপির বিরোধিতা তারা করছেন না বরং প্রার্থীদের নিয়েই যত আপত্তি।

লক্ষ্মীপুর-১ আসনের অন্তর্গত ৩ নম্বর ভাদুর ইউনিয়নের জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী আজ (মঙ্গলবার) মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। এনসিপি দল নিয়ে আমাদের সমস্যা নেই, এই দলের অনেকেই আমাদের পছন্দ। কিন্তু লক্ষ্মীপুর-১ আসনে যাঁকে প্রার্থী করেছেন, তাঁর ব্যাপারে নেতাকর্মীরা কিছুটা নাখোশ।’

কেন নাখোশ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে প্রার্থী করা হয়েছে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ভাই মাহবুব আলমকে। সে কখনোই এলাকায় আসেন না। এলাকার মানুষ তাকে চিনেই না। এ ছাড়া বেশ কিছুদিন আগে মাহফুজ আলম আমাদের সংগঠনের ব্যাপারে অনেক আজেবাজে মন্তব্য করেছেন। সব মিলে আমাদের নেতাকর্মী কিছুটা ক্ষিপ্ত।’

১০ দলীয় ঐক্য যদি মাহবুব আলমকে সমর্থন জানায়, তাহলে তাঁকে সমর্থন করবেন কিনা– প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের আমাদের সংগঠনের সিদ্ধান্ত মেনে নেব। তবে এখনো আমাদের প্রতি কোনো নির্দেশনা আসেনি।’

নরসিংদী-২ আসনেও একই কারণে এনসিপি প্রার্থীর ওপর ক্ষিপ্ত স্থানীয় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী। ওই আসনের পাঁচদোন ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বায়তুলমাল সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ সোহান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত আমজাদ ভাইকেই চেয়েছিলাম। আজ উনি যেন প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করেন, সে জন্য তাঁকে আটকে পর্যন্ত রেখেছিলাম। কিন্তু জোটের সিদ্ধান্ত মানতে গিয়ে তাঁকে প্রত্যাহার করে নিতে হলো।’

অন্য কেউ প্রার্থী হলে ভোট বয়কট করার ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় এই জামায়াত নেতা। তিনি বলেন, ‘অন্য কেউ প্রার্থী হলে আমরা সেটা মেনে নিতে পারব না। সারোয়ার তুষারের পক্ষ হয়ে আমাদের কাজ করা সম্ভব না। এত মাস দাঁড়িপাল্লার হয়ে গণসংযোগ করে এসেছি আমরা। হুট করে অন্য কারও পক্ষে কাজ করা সম্ভব না।’

প্রার্থীরা কী বলছেন

নেতাকর্মীর আচরণে অসন্তুষ্ট এনসিপি প্রার্থীরাও। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেক দূরত্ব রয়েছে। রয়েছে অসহযোগিতাপূর্ণ আচরণও।

দিলশানা পারুল স্ট্রিমকে বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে জোটের প্রার্থীরা কিছুটা অসহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করছেন। আমি সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি, আশা করি সমাধান হয়ে যাবে।’

কেন অসহযোগিতাপূর্ণ মনে হচ্ছে– প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীর যোগাযোগের অভাব রয়েছে, বোঝাপোড়ারও ঝামেলাও থাকতে পারে।’

এ ব্যাপারে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নরসিংদী-২ আসনের ১০ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী সারোয়ার তুষারকে ফোন দিলেও রিসিভ হয়নি। তবে জামায়াত-শিবিরের স্থানীয় নেতাকর্মীর আচরণকে অসহযোগিতা না বরং তাদের কষ্টের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের ঐক্যের প্রার্থী মাহবুব আলম। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘তাঁরা নিজেদের প্রার্থীর পেছনে দীর্ঘ সময় কাজ করছেন, এখন জোটের সিদ্ধান্ত মানতে অন্যকে সমর্থন দেওয়া লাগছে। স্বাভাবিকভাবে এটা কষ্টের। সে জন্য তারা সেই কষ্টের বহিঃপ্রকাশ করতেই পারেন। তবে এটা তাদের সেক্রিফাইস।’

মাহবুব আলম আশা করেন, ‘জামায়াত একটি সুশৃঙ্খল দল। তারা দলের নেতাদের কমান্ড মেনে চলে। আশা করছি, আমরা এখন একসঙ্গে কাজ করতে পারব।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত