গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধা-১ আসন। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই জনপদে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র হলেও এবার এই আসনে সরাসরি লড়াইয়ে নামছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির প্রার্থী খন্দকার জিয়াউল ইসলাম জিয়ার বিপরীতে মাঠে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাজেদুর রহমান মাজেদ।
একটি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সিংহভাগই চরাঞ্চল। প্রতি বছর তিস্তার করাল গ্রাসে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি ও ফসল হারান। এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক এবং কয়েক লাখ মানুষ আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত।
স্থানীয় ভোটারদের অভিযোগ, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও এই অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ভোটার ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকেই দেখছি নদী ভাঙনে মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরা ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে আর কথা রাখেন না।’
আরেক ভোটার ইমরুল ইসলাম বলেন, ‘বিগত তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টি ‘‘ভাই ভাই’’ খেলা খেলেছে। এবার সুষ্ঠু ভোট হলে মানুষ যোগ্য প্রার্থী বেছে নেবে।’
দীর্ঘদিন সাংগঠনিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও বর্তমানে বিএনপির ভোট ব্যাংক বাড়ছে বলে দাবি স্থানীয় নেতাদের। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক গোলাম আযম সরকার বলেন, ‘মানুষ ১৭ বছর ভোট দিতে পারেনি। আমাদের নেতা-কর্মীরা জুলুমের শিকার হয়েছে। এবার সাধারণ মানুষ ধানের শীষকে বিজয়ী করতে প্রস্তুত।’
অন্যদিকে, সুন্দরগঞ্জকে ‘জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটি’ হিসেবে দাবি করে দলটির প্রার্থী অধ্যাপক মাজেদুর রহমান মাজেদ বলেন, ‘আমি এই উপজেলার চেয়ারম্যান ছিলাম। এর আগে দুইবার এমপি প্রার্থী হলেও রাতের ভোটের কারণে মানুষ আমাকে ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচিত হলে আমি মানুষের খাদেম হয়ে কাজ করতে চাই।’
তরুণ ভোটার সাইফুল ইসলাম হিরুন মনে করেন, এবার তরুণেরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে চরাঞ্চলের বঞ্চনার অবসান ঘটাবে। যে প্রার্থী নদী ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে, তাকেই তরুণেরা ভোট দেবে।
গাইবান্ধা-১ আসনের ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময়। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত টানা তিনবার এবং ১৯৯৬ সালের জুনেও জাতীয় পার্টি জয়ী হয়। ২০০১ সালে জামায়াতের মাওলানা আব্দুল আজিজ নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে মহাজোটের আব্দুল কাদের খান (জাতীয় পার্টি) জয়লাভ করেন। ২০১৪ ও ২০১৭ (উপ-নির্বাচন) সালে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও এমপিদের মৃত্যুতে আসনটি বারবার শূন্য হয়। ২০১৮ সালের উপ-নির্বাচন ও সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির শামীম হায়দার পাটোয়ারী জয়ী হন। তবে ২০২৪ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল্লাহ নাহিদ নিগারের কাছে পরাজিত হন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৯ হাজার ১১১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৭ হাজার ৫৭৪ জন, নারী ২ লাখ ১১ হাজার ৫৩৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩ জন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে ধানের শীষ না কি দাঁড়িপাল্লা—কাকে বেছে নেয় সুন্দরগঞ্জের মানুষ, সেটিই এখন দেখার বিষয়।