এনসিপিতে তুঙ্গে ভাঙা-গড়ার খেলা, শঙ্কা তৃণমূলে

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬, ২৩: ০৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বে থাকা তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) বইছে মিশ্র হাওয়া। একদিকে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একের পর এক যোগ দিচ্ছেন আলোচিত ও পরিচিত মুখ। অন্যদিকে দল ছাড়ছেন তৃণমূলের নেতাকর্মী।

সবশেষ জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য গড়ায় এনসিপি ছাড়ার হিড়িক লেগেছিল। ওই সময় কেন্দ্র ও তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী দলটি ছাড়েন। তবে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। বেশ কয়েকজন আলোচিত ব্যক্তিত্ব ঘটা করে যোগ দিয়েছেন সংসদে বিরোধীদলীয় ঐক্যে থাকা দলটিতে।

গত ১৯ এপ্রিল রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশের’ (আপ বাংলাদেশ) শীর্ষ তিন নেতা—আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, মুখপাত্র শাহরিন ইরা ও প্রধান সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত এনসিপিতে যোগ দেন। তাদের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মটির অন্তত ৩০ সক্রিয় কর্মীও এনসিপির পতাকা তলে আসেন।

ওই সময় আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশ গড়তে চেয়েছি, বর্তমানে সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের মধ্যে কিছুটা হতাশা দেখা যাচ্ছে। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতেই আমরা এনসিপিতে যুক্ত হয়েছি।’

এরপর ২৪ এপ্রিল বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা পরিচিত মুখ ইসহাক সরকার, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবাল (ফ্লোরা), কনটেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফি এবং রেলের অনিয়ম নিয়ে আন্দোলনকারী মহিউদ্দিন রনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলটিতে যুক্ত হন।

এ ছাড়া ৫ মে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ড. মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান এবং ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহর সপ্তম বংশধর আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইনও দলটিতে নাম লেখান। এনসিপি বলছে, জুলাই আন্দোলনের আহতদের একটি বড় অংশও তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এনসিপির দরজা সবার জন্য খোলা জানিয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সাবেক রাজনৈতিক পরিচয় তাদের কাছে মুখ্য নয়। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল বা শিবির—যে পরিচয়ই থাকুক না কেন, গণহত্যার সমর্থনকারী না হলে এনসিপিতে সবার জায়গা হবে।

তবে কেন্দ্রের বিপরীতে চিত্র এনসিপির তৃণমূলে। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে নেতাকর্মীরা গণহারে পদত্যাগ করে ভিড়ছেন বিএনপি ও গণসংহতি আন্দোলনের মতো দলে।

গত ৫ মে রাঙামাটিতে এনসিপির সাবেক ৩৫ নেতাকর্মী গণসংহতি আন্দোলনে যোগ দেন। তাদের নেতৃত্ব দেওয়া এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব উজ্জ্বল চাকমা অভিযোগ করেন, এনসিপি তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এ কারণে তারা বিকল্প পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

খাগড়াছড়িতেও দেখা গেছে একই চিত্র। সংসদ নির্বাচনের আগে এখানে এনসিপির ১৯ পদধারী নেতাসহ প্রায় তিন শতাধিক কর্মী বিএনপিতে যোগ দেন। এনসিপি ছাড়েন জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব ত্রিপুরা, যুগ্ম সদস্যসচিব আবদুর রহমান সায়াদের মতো নেতারা। তাঁদের মতে, মাঠপর্যায়ে এনসিপির চেয়ে বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি অনেক বেশি শক্তিশালী।

কিছু জেলায় মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার তথ্যও এসেছে। তৃণমূলে এনসিপিতে যোগ দেওয়ার তথ্যও কম।

অবশ্য তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দল ছাড়ার এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন না এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব তাহসিন রিয়াজ। তাঁর মতে, এগুলো ‘বিচ্ছিন্ন’ ও ‘নগণ্য’ ঘটনা। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘যে তুলনায় লোক রিক্রুট হচ্ছে, সে তুলনায় এটি নগণ্য। আমাদের কাছে কেবল খাগড়াছড়ি বা রাঙামাটির নিউজ আছে, কিন্তু এর বাইরে চট্টগ্রাম বা রাজশাহীতে যে বিপুল মানুষ যুক্ত হচ্ছে, তা আপনারা দেখছেন না।’

তাহসিন রিয়াজ বলেন, দল নতুন হওয়ায় কিছু মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে কাজের অমিল হতে পারে, যা থেকে তারা দল ছাড়তে পারেন। তিনি ভাষ্য, ‘সংখ্যাটা নিউজ করার মতো বড় নয়। যদি ২০টি জেলা থেকে মানুষ কমত, তবে আমরা চিন্তিত হতাম। কিন্তু আমাদের রিক্রুটমেন্ট হাই প্রসেসে চলছে।’

এদিকে আলোচিতদের যোগ দেওয়ার বিষয়টি এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও ভিন্ন মত দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম। তার মতে, এনসিপি এখন ‘দলছুট’ নেতাদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

ড. শামসুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে দল বদল একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এনসিপিতে যারা যোগ দিচ্ছেন, তারা জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এমনকি এনসিপি এক সময় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল, এখন রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাদেরই দলে টানছে। এটি একটি আদর্শিক স্ববিরোধিতা।’

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বের হয়ে যাওয়া শুভ লক্ষণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত