হামি সাইলো ফিল্ড থেকে তাকলামাকান: চীনের মরুভূমিতে গোপন সামরিক শহর

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ১৪: ১৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে পর্দার আড়ালের সামরিক প্রস্তুতি ও মহাপ্রস্তুতির গোপন নকশাগুলো প্রায়শই আধুনিক কৃত্রিম উপগ্রহ বা হাই-রেজোলিউশন স্যাটেলাইটের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। সম্প্রতি চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং ও গানসু প্রদেশের মরুভূমি অঞ্চলের কিছু উপগ্রহ-চিত্র আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

রয়টার্সসহ শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং বৈশ্বিক সামরিক গবেষণা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেইজিং মরুভূমির বুকে এক সুবিশাল, নিশ্ছিদ্র ও অত্যন্ত অত্যাধুনিক সামরিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যা মূলত একটি ‘গোপন সামরিক শহর’।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, মরুভূমির বুকে চীনের এই বিশাল প্রতিরক্ষা ও কমান্ড নেটওয়ার্কের স্কেল বা ব্যাপ্তি এতটাই নজিরবিহীন যে, রাশিয়া বা আমেরিকার মতো পরমাণু পরাশক্তিদের ইতিহাসেও এর আগে এমন সমকক্ষ ও নিখুঁত অবকাঠামো দেখা যায়নি। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিনজিয়াংয়ের এই মরূদ্যানের ভেতরের মহাপ্রস্তুতি কোনো আকস্মিক প্রতিরক্ষা মহড়া নয়, বরং বেইজিং অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও সুনির্দিষ্ট রণকৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এক সম্ভাব্য মহাযুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ছক কষছে।

এই গোপন সামরিক শহরের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে প্রধানত দুটি প্রধান কৌশলগত স্তম্ভের ওপর, যার একটি প্রতিরক্ষামূলক এবং অন্যটি চরম আক্রমণাত্মক। প্রথমত, হামি মরুভূমির প্রায় ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাটির নিচে অন্তত ১১০টি আন্তঃমহাদেশীয় পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো (আইসিএমবি বাঙ্কার), নতুন ৮০টি মোবাইল লঞ্চ প্যাড এবং ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্কে যুক্ত দুটি বিশাল অষ্টভুজাকার কমান্ড সেন্টারের মাধ্যমে চীন একটি পরমাণু রক্ষাকবচ তৈরি করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য ‘ফার্স্ট স্ট্রাইক’ বা আকস্মিক পরমাণু হামলা থেকে নিজেদের অত্যাধুনিক ডিএফ-৪১ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে অক্ষত রাখা, যেন বেইজিং তার ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতি বজায় রেখেও আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পাল্টা আঘাত নিশ্চিত করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, এই প্রতিরক্ষামূলক বেষ্টনী থেকে কিছুটা দূরে তাকলামাকান মরুভূমির বালিয়ারির বুকে চীন গড়ে তুলেছে মার্কিন নৌবাহিনীকে সাগরেই পঙ্গু করে দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য ও গোপন ‘টার্গেট রেঞ্জ’। সেখানে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারের হুবহু সচল রেল-মাউন্টেড রেপ্লিকা বানিয়ে চীন মূলত তাদের দূরপাল্লার ‘ক্যারিয়ার কিলার’ অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক মিসাইলের নিখুঁত পরীক্ষা চালাচ্ছে। তাইওয়ান সংকটকে কেন্দ্র করে আমেরিকার প্রবেশাধিকার বন্ধ করার ‘এ-টু/ডি-টু’ কৌশল এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পেন্টাগনের হিসাব মতে ১ হাজারের বেশি পরমাণু ওয়ারহেড সুরক্ষিতভাবে পরিচালনা করার সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান নিয়েই তৈরি হয়েছে চীনের এই মরুভূমির গোপন শহর।

পরমাণু সুরক্ষাকবচ এবং ‘কাউন্টার-স্ট্রাইক’ ক্ষমতা বৃদ্ধি: হামি সাইলো ফিল্ড

চীনের জিনজিয়াং মরুভূমির প্রায় ৮০০ বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত ‘হামি সাইলো ফিল্ড’ মূলত বেইজিংয়ের পরমাণু আত্মরক্ষা ও পাল্টা আঘাতের এক দুর্ভেদ্য সুরক্ষাকবচ। এখানে মাটির নিচে অন্তত ১১০টি আন্তঃমহাদেশীয় পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো ছাড়াও সম্প্রতি ৮০টিরও বেশি মোবাইল লঞ্চ প্যাড এবং ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্কে যুক্ত দুটি বিশাল অষ্টভুজাকার ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। বেইজিং মূলত আশঙ্কা করে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনো তাদের ওপর আকস্মিক আঘাত হানে, তবে যেন মাটির নিচের অত্যাধুনিক ডিএফ-৪১ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সম্পূর্ণ অক্ষত থাকে। এতে তারা পাল্টা পরমাণু হামলা চালাতে পারবে।

নতুন অবকাঠামোর বিন্যাস ও মোবাইল লঞ্চ প্যাড

স্যাটেলাইট চিত্রে উন্মোচিত চীনের এই নতুন অবকাঠামোগত বিন্যাসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো মরুভূমির বুকে গড়ে তোলা ৮০টিরও বেশি নতুন সমতল লঞ্চ প্যাড। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সুনির্দিষ্ট দূরত্বে তৈরি এই কংক্রিটের প্যাডগুলো মূলত চাকাযুক্ত মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যান এবং অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সহজে স্থানান্তরযোগ্য এই মোবাইল লঞ্চারগুলো বেইজিংয়ের পরমাণু শক্তি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার কৌশলগত গতিশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ফলে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট বা গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে যেকোনো স্থান থেকে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা চীনের জন্য অনেক সহজ হবে।

অষ্টভুজাকার গোপন ঘাঁটি ও নিখুঁত কমান্ড সেন্টার

হামি মরুভূমির গভীরে আবিষ্কৃত দুটি বিশাল আকৃতির অষ্টভুজাকার সামরিক কমপ্লেক্স চীনের এই গোপন শহরের সবচেয়ে রহস্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ভারী সামরিক যান পার্কিং, সুরক্ষিত সেনা আবাসন এবং মাটির নিচে মজবুত বাঙ্কারের সুবিধা সম্বলিত এই ঘাঁটিগুলো মূলত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ। সবচেয়ে কৌশলগত বিষয় হলো, এই কমপ্লেক্সগুলো অত্যাধুনিক ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্ক ক্যাবলের মাধ্যমে সরাসরি মূল ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো ফিল্ডের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা জ্যামিং প্রযুক্তিকে ব্যর্থ করে দিয়ে এই ঘাঁটিগুলো যুদ্ধকালীন নিখুঁত ও নিরাপদ 'কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল' সেন্টার হিসেবে কাজ করতে পারবে।

কৌশলগত উদ্দেশ্য ও সেকেন্ড-স্ট্রাইক ক্ষমতা

চীনের অফিশিয়াল পরমাণু নীতি হলো ‘নো ফার্স্ট ইউজ’—অর্থাৎ, বেইজিং নিজে থেকে আগে কোনো দেশের ওপর পরমাণু হামলা চালাবে না। তবে তাদের মূল কৌশলগত ভয় হলো, ওয়াশিংটন যদি কখনো আকস্মিকভাবে চীনের ওপর প্রথম আঘাত হানে, তবে যেন তাদের পরমাণু সক্ষমতা এক ঝটকায় ধ্বংস হয়ে না যায়। আর এই আশঙ্কা থেকেই হামি মরুভূমির বুকে এই সুবিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল গ্রিড ও বাঙ্কার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।

মার্কিন নৌবাহিনীকে ধ্বংস করার মহড়া: তাকলামাকান মরুভূমি

জিনজিয়াংয়ের বিপজ্জনক তাকলামাকান মরুভূমির বুকে চীন গড়ে তুলেছে মার্কিন নৌবাহিনীকে মোকাবিলার এক অত্যন্ত গোপন ও আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র। এখানে কৃত্রিম উপগ্রহচিত্রে আমেরিকার সবচেয়ে আধুনিক বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারের হুবহু সচল রেপ্লিকা বা নকল কাঠামো পাওয়া গেছে। এই নকল জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বেইজিং মূলত তাদের দূরপাল্লার ‘ক্যারিয়ার কিলার’ অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক মিসাইলদিয়ে সাগরে চলমান মার্কিন রণতরী নিখুঁতভাবে ধ্বংস করার চূড়ান্ত যুদ্ধকালীন মহড়া চালাচ্ছে।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজের হুবহু নকল ও সচল রেপ্লিকা

স্যাটেলাইট ইমেজে উন্মোচিত তাকলামাকান মরুভূমির সবচেয়ে চমকপ্রদ ও উদ্বেগজনক দিক হলো মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর নিখুঁত ও হুবহু নকল কাঠামো। চীন এই ধূসর বালুর ওপর আমেরিকার সবচেয়ে অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড, শক্তিশালী গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং এমনকি সুদূর গুয়াম দ্বীপে অবস্থিত কৌশলগত মার্কিন বিমান ঘাঁটির রেপ্লিকা তৈরি করে রেখেছে। ওয়াশিংটনকে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় ফেলেছে এই নকল যুদ্ধজাহাজগুলোর নিচে স্থাপন করা বিশেষ রেললাইন ব্যবস্থা। এই রেললাইনের ওপর বসানোর কারণে মরুভূমির বুকেই জাহাজগুলোকে সাগরের চলমান বা গতিশীল রণতরীর মতো সচল করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে বেইজিং মূলত অত্যন্ত বাস্তবসম্মত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তৈরি করে তাদের দূরপাল্লার নিখুঁত নিশানা পরীক্ষা করছে।

কৌশলগত উদ্দেশ্য ও ‘ক্যারিয়ার কিলার’ পরীক্ষা

তাকলামাকান মরুভূমিতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের এই সচল নকল আলোগুলো তৈরির পেছনে বেইজিংয়ের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য হলো সেগুলোকে নিখুঁত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করা। চীন মূলত তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দূরপাল্লার অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলোর কার্যকারিতা বাস্তব ক্ষেত্রে যাচাই করতে চায়। আন্তর্জাতিক সামরিক মহলে এই বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ‘ক্যারিয়ার কিলার’ বা বিমানবাহী রণতরী ধ্বংসকারী হিসেবে অত্যন্ত পরিচিত। এই সচল রেপ্লিকাগুলোর ওপর আঘাত হানার মাধ্যমে বেইজিং নিশ্চিত হতে চায় যে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সাগরে চলমান মার্কিন রণতরীগুলোকে কত দ্রুত ও নিখুঁতভাবে ধ্বংস করা সম্ভব। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো তাইওয়ান প্রণালী বা দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর একচেটিয়া আধিপত্যকে সম্পূর্ণ অচল ও প্রতিহত করা।

বেইজিং আসলে কিসের প্রস্তুতি নিচ্ছে?

মরুভূমির এই জোড়া অবকাঠামো স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, বেইজিং মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এক সম্ভাব্য মহাযুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর আওতায় তাইওয়ান সংকটে মার্কিন রণতরীর প্রবেশ ঠেকাতে তাকলামাকানে ‘এ-টু/ডি-টু’কৌশলের চূড়ান্ত ছক কষা হচ্ছে। একই সাথে, ২০৩০ সালের মধ্যে পেন্টাগনের হিসাব মতে ১ হাজারের বেশি পরমাণু ওয়ারহেড সুরক্ষিতভাবে পরিচালনার জন্য এই ফাইবার-অপ্টিক কমান্ড নেটওয়ার্ককে বেইজিং তাদের দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান হিসেবে ব্যবহার করছে।

তাইওয়ান সংকট ও এটু/এডি কৌশল

তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যদি অদূর ভবিষ্যতে আমেরিকার সাথে চীনের সরাসরি সামরিক সংঘাত বাঁধে, তবে মার্কিন নৌবাহিনীকে প্রতিহত করাই বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য। আমেরিকার শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরীগুলো যেন কোনোভাবেই দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ান প্রণালীতে প্রবেশ করতে না পারে—সেই লক্ষ্যে চীন ‘এন্টি-অ্যাক্সেস/অ্যারিয়া ডিনায়াল’ বা এটু/এডি কৌশল অবলম্বন করছে। তাকলামাকান মরুভূমির এই গোপন ঘাঁটিটি মূলত সেই প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল বা রণকৌশল সফলভাবে কার্যকর করারই একটি চূড়ান্ত ছক। এই মরু-অবকাঠামোতে মার্কিন রণতরীর নিখুঁত রেপ্লিকার ওপর দূরপাল্লার মিসাইল হামলা চালিয়ে বেইজিং নিশ্চিত করছে যেন প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন নৌবহরকে শুরুতেই পঙ্গু করে দেওয়া যায়।

২০৩০ সালের পরমাণু লক্ষ্যমাত্রা ও বেইজিংয়ের মাস্টারপ্ল্যান

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের আনুষ্ঠানিক হিসাব মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের সক্রিয় পরমাণু ওয়ারহেডের সংখ্যা ১ হাজার অতিক্রম করতে যাচ্ছে। হুট করে বেড়ে যাওয়া এই বিশাল পরমাণু অস্ত্রাগারকে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়ে পরিচালনা করা বেইজিংয়ের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই লক্ষ্যেই জিনজিয়াংয়ের মরুভূমির বুকে শত শত আন্ডারগ্রাউন্ড সাইলো এবং সুরক্ষিত ফাইবার-অপ্টিক কমান্ড নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের সাইবার বা ইলেকট্রনিক হামলা এড়াতে সক্ষম এই অফলাইন যোগাযোগ ব্যবস্থা চীনের পরমাণু কমান্ডকে করবে সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র। সংক্ষেপে, মরুভূমির এই নতুন অবকাঠামো মূলত সেই ক্রমবর্ধমান পরমাণু শক্তিকে অত্যন্ত সুরক্ষিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বেইজিংয়ের একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান।

হামি সাইলো ফিল্ডের অভেদ্য আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রিড এবং তাকলামাকান মরুভূমির আধুনিক টার্গেট রেঞ্জের এই জোড়া অবকাঠামো মূলত একবিংশ শতাব্দীতে চীনের বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার চূড়ান্ত অভিযাত্রাকেই নির্দেশ করে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গম মরুভূমির বুকে গড়ে তোলা বেইজিংয়ের এই বিশাল প্রতিরক্ষা ও সুনিপুণ কমান্ড নেটওয়ার্কের স্কেল বা ব্যাপ্তি এতটাই নজিরবিহীন যে, রাশিয়া বা আমেরিকার মতো পরমাণু পরাশক্তিদের ইতিহাসেও এর আগে এমন সমকক্ষ ও নিশ্ছিদ্র পরিকাঠামো দেখা যায়নি।

চীনের এই ধূসর বালুর বুকে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা ‘গোপন সামরিক শহর’ প্রমাণ করে, বেইজিং এখন শুধু নিজের সুরক্ষাই নিশ্চিত করছে না, বরং ওয়াশিংটনের একচেটিয়া সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ মানচিত্র নতুন করে আঁকতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত