মাহিসুন রাশ্তি

সালটা ২০২১। ঘরের স্পিকারে ফুল ভলিউমে দোজা ক্যাটের ‘বস বিচ’ বাজতেছে । আয়নার সামনে দাঁড়ায়ে আমার বোন চোখে গাঢ় কাজল, আর ঠোঁটে হাই পিগমেন্টেড কালো লিপস্টিক দিয়ে সাজগোজ করছে। মা একবার রুমে উঁকি দিয়ে খুবই বিরক্ত স্বরে জিজ্ঞেস বললেন, ‘ঠোঁট কেন কালা হবে?’
বোনের কথা হইলো, ‘অনেক হইছে সুইট গার্ল ইমেজ। এই সোসাইটিতে এখন থেকে সারভাইভ করতে হইলে আমাদের Baddie (ব্যাডি) হইতে হবে!’

আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ব্যাডি হইতে হইলে কি লিপস্টিক কালোই হইতে হবে?’
বোন আমার ভ্রু কুঁচকায়ে এক গাল হাইসা বলল, ‘হায় রে বেকুব! ব্যাডি মানে তো কেবল ডার্ক শেডের লিপস্টিক না, ব্যাডি হইলো একটা স্টেটমেন্ট। তুই লাল পরবি নাকি কালো, সেটা কথা না, তুই কনফিডেন্সটা কীভাবে ক্যারি করবি, সেটাই এখন আসল আর্ট!’
কিন্তু স্টেটমেন্টটা আসলে কী? কীভাবে একজন সাকসেসফুল ব্যাডি হয়ে নিজের রুলস নিজে লিখবেন? আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এই দিনে চলেন ‘ব্যাডি’ নিয়া আলাপ করি।
ব্যাডি (Baddie) কী

ফেসবুক বা রেডিট স্ক্রল করলেই "How I pulled my baddie!" কিংবা লাল চুলের কোনো মেয়েকে দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেলেদের সেই চিরন্তন আকুতি, "Step on me, Mommy!" টাইপ মিম আপনার চোখে পড়ার কথা।

এইসব মিম দেখেই দয়া করে ধরে নিয়েন না যে একদম হট, গথিক সাজ, চোখে চশমা, আর লাল চুলের কাউকে বোধহয় ব্যাডি বলে। আবার ডার্ক লিপস্টিক দেখে এটাকে কোনো স্যাটানিক কাল্টও মনে কইরেন না, যেহেতু উইচ হান্টের দিন শেষ।
তাইলে ব্যাডি মানে কী? ব্যাডি শব্দটা এমন এক কালচারাল আর্কিটাইপ যা সেলফ কনফিডেন্ট, সেলফ রিলায়েন্ট এবং নিজের প্রেজেন্স এর প্রতি সচেতন এমন উইমেন কন্সেপ্টের সাথে কানেক্টেড।
মূলত “Boss Bitch” টার্ম থেকেই এর উৎপত্তি।
ব্যাডি হবার জন্য চেহারা ইজ ভেরি সেকেন্ডারি থিংস! একজন ব্যাডিরে সংজ্ঞায়িত করতে পারে কেবল তার এটিটিউড; তার আনফিল্টার্ড কনফিডেন্স, ভিজিবিলিটি আর নিজের উপস্থাপনাকে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। সুন্দর সাজগোজ এই অ্যাস্থেটিক্সের একটা পার্ট হইতে পারে, কিন্তু ব্যাডি হইবার মূল বিষয়টা হইল অওনিং ইউর ফ্রিডম এন্ড কনফিডেন্স!

এই আইডিয়াটা মূলত ব্ল্যাক ফেমিনিস্ট ডিজিটাল কালচার থেকে উইঠা আসছে, যেখানে নারীরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের লুক, স্টাইল আর প্রেজেন্সকে একটা পাওয়ার হিসেবে তুইলা ধরেন। এই কনটেক্সটে প্রকাশ্য আত্ম-উপস্থাপনাকে প্যাট্রিয়ার্কাল এক্সপেকটেশনের সাথে খাপ খাওয়ানোর বিষয় হিসেবে না দেইখা নিজস্ব এজেন্সি এস্টাবলিশের ওয়ে হিসেবে দেখা হয়।
যেমন ধরেন হার্লি কুইন ক্যারেক্টারটা। তার স্টাইল,মেকআপ, রেবেলিয়াস ফেমিনিনিটি আর ফিয়ারলেস কনফিডেন্স ক্যারেক্টারটারে একজন গ্লোবাল ব্যাডি আইকন হিসেবে এস্টাব্লিশ করছে। আজকাল ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো অনলাইন প্লাটফর্মগুলায় তাকালেই দেখবেন, মেয়েরা তাদের ফেমিনিনিটিরে স্রেফ ঘরোয়া সাজে আটকায় না রেখে, একদম কনফিডেন্সের সাথে সবার সামনে একটা পাওয়ারফুল পারফরম্যান্স হিসেবে তুলে ধরতেছেন।
মোরালিটির গোলকধাঁধা: ব্যাডি যখন শাহবাগী
তবে এই ব্যাডি অ্যাস্থেটিক্স যখন গ্লোবালি ছড়ায়ে পড়ে, তখন ডিফারেন্ট কালচারাল কন্টেক্সটে এর মিনিং বদলায় যাইতে পারে। বাংলাদেশে ব্যাডি ক্যারেক্টারটা রিলেটিভলি কনজারভেটিভ সোশ্যাল স্ট্রাকচারের সাথে ক্ল্যাশ করে, আবার অনেক সময় এর ভেতরেও অবস্থান করে। ফলে এইটা প্রায়ই একটা ডুয়াল সিম্বলে পরিণত হয়! একদিকে মডার্ন নারীদের সেলফ কনফিডেন্স আর সেলফ রিলায়েন্সের প্রতীক এবং অন্যদিকে নারীর প্রকাশ্য ভিজিবিলিটি নিয়া তথাকথিত মোরাল কনসার্ন এর প্যারা।
কীভাবে?
বাংলাদেশে ব্যাডির মিনিং শুধু তার স্টাইল স্টেটমেন্টে আটকায় থাকে না; সে পুরাপুরি পলিটিক্যাল ও কালচারাল অর্থে আইডেন্টিফাইড হয়া পড়ে। যেমন ধরেন, রাইট উইঙ্গারদের প্রিয় থুক্কু সবার প্রিয় মোনামি ম্যাম। তিনি কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দলের কাছে নাম্বার ওয়ান ব্যাডি। যদিও তার চলাফেরা বা পোশাকের সাথে সেই পলিটিক্যাল মোরাল গ্রাউন্ডের বিন্দুমাত্র মিল নাই, তাও তাদের এজেন্ডা সার্ভ করায় তিনি তাদের চোখে ১০০/১০০ ব্যাডি খেতাব নিয়ে চলেন!
অপরদিকে, অন্য একটা দলের জন্য তিনি হয়তো ‘গুপ্ত’ কিংবা দুই চোখের বিষ। এখন ধরেন ঘটনা উল্টায় দিলাম! মোনামি ম্যাম একদিন সকালে উইঠা ডিসিশন নিলেন তিনি আর রাইট উইঙ্গারদের সাপোর্ট দেবেন না, তখন হয়তো তিনি রাতারাতি হয়া উঠবেন ‘শাহবাগী’!
এখন ধরেন, শাহবাগীরা তো আসলেই ব্যাডি, কিন্তু এ দেশে এই ব্যাডি হওয়ার সবচেয়ে বড় গালি হইলো শাহবাগী। এই ডুয়েলিটিতে আমরা তৈরি করি দুইটা ফর্ম ! নারীকে ব্যাডি বলে সেলিব্রেট করা, আবার সেই একই নারীকে ‘শাহবাগী’ ট্যাগ দিয়ে অপমান করা। নারী একইসঙ্গে এইখানে প্রব্লেমেটিক আবার ব্যাডি হিসেবেও প্রেজেন্টেড হইতে পারেন, কারণ ব্যাডির কনসেপ্টটা আদতে কারো কাছেই ক্লিয়ার না।
অনেক তরুণীর কাছে ব্যাডি পরিচয়টা নিজের এজেন্সি বা ক্ষমতা প্রকাশের একটা ওয়ে। নিজের ছবি ও আইডেন্টিটি কন্ট্রোল করার ফ্রিডম, প্রকাশ্যে কথা বলার অধিকার এবং লজ্জা নয় বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের বডিকে অওন করার ক্ষমতা। কিন্তু একই সঙ্গে, কনজারভেটিভ বা মেল ডমিনেটেড অনলাইন স্পেসে এই একই চরিত্রকে প্রায়ই মোরাল ডিগ্রেডেশনের সাইন হিসেবে দেখা হয়। সেখানে শাহবাগীর মতো শব্দ সারকাস্টিক্যালি ব্যবহার করা হয়, যেন এমন নারীদের ওপর লিবারেল ফেমিনিজম বা ওয়েস্টার্ন ইনফ্লুয়েন্সের তকমা সেঁটে দেওয়া যায়।
পলিটিক্যাল আইডেন্টিটির চেয়ে এই শব্দটা আসলে ব্যবহার হয় এমন নারীদের কন্ট্রোল করার টুল হিসেবে, যারা ভিজিবল এবং কনফিডেন্ট। এইভাবেই একই নারী একদিকে কারো কাছে ইনস্পিরেশনের সিম্বল হয়ে ওঠেন, আবার অন্যদের কাছে হয়ে ওঠেন সোশ্যাল থ্রেট।
বিয়ের জন্য লক্ষ্মী মেয়ে, লাইকের জন্য ব্যাডি: দ্য মডার্ন হিপোক্রেসি

এই ডুয়ালিটি আসলে নতুন কিছু না। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে সাইকোঅ্যানালিস্ট সিগমুন্ড ফ্রয়েড এমনই এক বিভাজনের কথা বলছিলেন, যা পরে ‘ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স’ নামে পরিচিতি পায়। ফ্রয়েড লক্ষ্য করছিলেন যে, কিছু পুরুষ মানসিকভাবে নারীদেরকে দুইটা বিপরীত ক্যাটাগরিতে ভাগ কইরা দেখে। একদিকে রেসপেক্টেবল নারী, যারে ভালোবাসা ও বিয়ার জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়; আরেকদিকে সেক্সুয়াল অ্যাট্রাকশনের নারী, যারে কামনা করা হয় কিন্তু ওইভাবে রেসপেক্ট দেওয়া হয় না।
এই ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে ইমোশন আর সেক্সুয়াল অ্যাট্রাকশন একদম আলাদা হয়ে যায়। ফ্রয়েডের মতে, এমন পুরুষদের কাছে একই মানুষের মধ্যে লাভ আর ডিজায়াররে এক করা প্রায় অসম্ভব হইয়া উঠে। আধুনিক ব্যাডি ক্যারেক্টারটা ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক ফাটলের মধ্যেই এন্ট্রি নেয়। এভারেজ বাংলাদেশি ব্যাডা মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন ব্যাডির নান্দনিকতা এনজয় করতে পারেন, তার পোস্টে লাইক দিতে পারেন, তার কনফিডেন্সকে আকর্ষণীয় মনে করতে পারেন। কিন্তু যখনই ইস্যুটা সোশ্যাল এক্সেপটেন্স, বিয়ে বা সম্মানজনক কোন আইডেন্টিটির দিকে যায়, তখনই সেই একই নারীকে একদম ভিন্ন চোখে জাজ করা শুরু করেন।
এর ফলে একটা চেনা সোশ্যাল ন্যারেটিভ তৈরি হয়। “ভালো মেয়ে” মানেই বিয়ার জন্য আইডিয়াল পার্টনার, আর বেশি ভিজিবল বা কনফিডেন্ট নারী মানেই এমন কেউ, যাকে দূর থিকা ফ্যান্টাসাইজ করা যায় বা সমালোচনা করা যায়। তাই একই নারী এক কন্টেক্সটে আধুনিক ও এমপাওয়ারড হিসেবে প্রশংসিত হন, আবার অন্য কন্টেক্সটে তাকেই ‘ওভার’ বা ‘নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ’ হিসেবে ট্যাগ দেওয়া হয়।
ঠিক এই কারণেই দেখবেন, নারীকে কথায় কথায় “মা” আর “বোন” বলে ডেকেই সম্মান দেওয়ার চেষ্টা চলে। আমাদের মা, আমাদের বোন... যেন এর বাইরে নারীর আর কোনো রোম্যান্টিক বা পাওয়ারফুল ভূমিকা থাকতে পারে না। মা-বোন হলেই একমাত্র নারীরা এ দেশে নিরাপদ এবং সম্মানযোগ্য।
এভাবেই ব্যাডি চরিত্রটা সমসাময়িক বাংলাদেশি জেন্ডার-কালচারের এক গভীর দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়া আসে। একদিকে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ভিজিবিলিটি, কনফিডেন্স আর পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংরে উসকায় দিচ্ছে; অন্যদিকে সমাজের ভেতর এখনও ‘শালীনতা’ আর ‘কন্ট্রোল’ এর পুরানা প্রত্যাশাগুলাই নারীদের মূল্যায়নের প্যারামিটার হিসেবে কাজ করতেছে। ফলে তৈরি হইতেছে এক স্থায়ী ডাবল স্ট্যান্ডার্ড । অনলাইনে মুক্ত নারীত্বের ফ্যান্টাসি আমরা এনজয় করলেও, রিয়েল লাইফে আজও সেই ‘সংযত ও নিয়ন্ত্রিত’ নারীত্বকেই আমরা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড মাইনা বইসা আছি।
কী, এতো ডুয়ালিটিতে মাথা ঘুরায়?

আমারও ঘুরায়। তখনি মাথায় খেলে রবীন্দ্রনাথের সেই লাইন— “তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি”।
তাই এতো ডুয়ালিটি গুণার টাইম নাই। আপনি ডার্ক লিপস্টিক পরেন আর নাই পরেন, আপনার স্টেটমেন্টটাই আসল। যতক্ষণ আপনি আপনার নিজের গল্পের প্রোটাগনিস্ট, সমাজ আপনারে কোন বাক্সে আটকালো তাতে কিচ্ছু যায় আসে না।
আজকের এই দিনে, পপ স্ট্রিমের পক্ষ থেকে আমাদের সকল অরিজিনাল ব্যাডিদের জানাই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের কড়া শুভেচ্ছা! ডিয়ার ব্যাডিজ, স্টে বোল্ড এন্ড স্টে ভিজিবল!

সালটা ২০২১। ঘরের স্পিকারে ফুল ভলিউমে দোজা ক্যাটের ‘বস বিচ’ বাজতেছে । আয়নার সামনে দাঁড়ায়ে আমার বোন চোখে গাঢ় কাজল, আর ঠোঁটে হাই পিগমেন্টেড কালো লিপস্টিক দিয়ে সাজগোজ করছে। মা একবার রুমে উঁকি দিয়ে খুবই বিরক্ত স্বরে জিজ্ঞেস বললেন, ‘ঠোঁট কেন কালা হবে?’
বোনের কথা হইলো, ‘অনেক হইছে সুইট গার্ল ইমেজ। এই সোসাইটিতে এখন থেকে সারভাইভ করতে হইলে আমাদের Baddie (ব্যাডি) হইতে হবে!’

আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ব্যাডি হইতে হইলে কি লিপস্টিক কালোই হইতে হবে?’
বোন আমার ভ্রু কুঁচকায়ে এক গাল হাইসা বলল, ‘হায় রে বেকুব! ব্যাডি মানে তো কেবল ডার্ক শেডের লিপস্টিক না, ব্যাডি হইলো একটা স্টেটমেন্ট। তুই লাল পরবি নাকি কালো, সেটা কথা না, তুই কনফিডেন্সটা কীভাবে ক্যারি করবি, সেটাই এখন আসল আর্ট!’
কিন্তু স্টেটমেন্টটা আসলে কী? কীভাবে একজন সাকসেসফুল ব্যাডি হয়ে নিজের রুলস নিজে লিখবেন? আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এই দিনে চলেন ‘ব্যাডি’ নিয়া আলাপ করি।
ব্যাডি (Baddie) কী

ফেসবুক বা রেডিট স্ক্রল করলেই "How I pulled my baddie!" কিংবা লাল চুলের কোনো মেয়েকে দেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেলেদের সেই চিরন্তন আকুতি, "Step on me, Mommy!" টাইপ মিম আপনার চোখে পড়ার কথা।

এইসব মিম দেখেই দয়া করে ধরে নিয়েন না যে একদম হট, গথিক সাজ, চোখে চশমা, আর লাল চুলের কাউকে বোধহয় ব্যাডি বলে। আবার ডার্ক লিপস্টিক দেখে এটাকে কোনো স্যাটানিক কাল্টও মনে কইরেন না, যেহেতু উইচ হান্টের দিন শেষ।
তাইলে ব্যাডি মানে কী? ব্যাডি শব্দটা এমন এক কালচারাল আর্কিটাইপ যা সেলফ কনফিডেন্ট, সেলফ রিলায়েন্ট এবং নিজের প্রেজেন্স এর প্রতি সচেতন এমন উইমেন কন্সেপ্টের সাথে কানেক্টেড।
মূলত “Boss Bitch” টার্ম থেকেই এর উৎপত্তি।
ব্যাডি হবার জন্য চেহারা ইজ ভেরি সেকেন্ডারি থিংস! একজন ব্যাডিরে সংজ্ঞায়িত করতে পারে কেবল তার এটিটিউড; তার আনফিল্টার্ড কনফিডেন্স, ভিজিবিলিটি আর নিজের উপস্থাপনাকে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। সুন্দর সাজগোজ এই অ্যাস্থেটিক্সের একটা পার্ট হইতে পারে, কিন্তু ব্যাডি হইবার মূল বিষয়টা হইল অওনিং ইউর ফ্রিডম এন্ড কনফিডেন্স!

এই আইডিয়াটা মূলত ব্ল্যাক ফেমিনিস্ট ডিজিটাল কালচার থেকে উইঠা আসছে, যেখানে নারীরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে নিজেদের লুক, স্টাইল আর প্রেজেন্সকে একটা পাওয়ার হিসেবে তুইলা ধরেন। এই কনটেক্সটে প্রকাশ্য আত্ম-উপস্থাপনাকে প্যাট্রিয়ার্কাল এক্সপেকটেশনের সাথে খাপ খাওয়ানোর বিষয় হিসেবে না দেইখা নিজস্ব এজেন্সি এস্টাবলিশের ওয়ে হিসেবে দেখা হয়।
যেমন ধরেন হার্লি কুইন ক্যারেক্টারটা। তার স্টাইল,মেকআপ, রেবেলিয়াস ফেমিনিনিটি আর ফিয়ারলেস কনফিডেন্স ক্যারেক্টারটারে একজন গ্লোবাল ব্যাডি আইকন হিসেবে এস্টাব্লিশ করছে। আজকাল ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো অনলাইন প্লাটফর্মগুলায় তাকালেই দেখবেন, মেয়েরা তাদের ফেমিনিনিটিরে স্রেফ ঘরোয়া সাজে আটকায় না রেখে, একদম কনফিডেন্সের সাথে সবার সামনে একটা পাওয়ারফুল পারফরম্যান্স হিসেবে তুলে ধরতেছেন।
মোরালিটির গোলকধাঁধা: ব্যাডি যখন শাহবাগী
তবে এই ব্যাডি অ্যাস্থেটিক্স যখন গ্লোবালি ছড়ায়ে পড়ে, তখন ডিফারেন্ট কালচারাল কন্টেক্সটে এর মিনিং বদলায় যাইতে পারে। বাংলাদেশে ব্যাডি ক্যারেক্টারটা রিলেটিভলি কনজারভেটিভ সোশ্যাল স্ট্রাকচারের সাথে ক্ল্যাশ করে, আবার অনেক সময় এর ভেতরেও অবস্থান করে। ফলে এইটা প্রায়ই একটা ডুয়াল সিম্বলে পরিণত হয়! একদিকে মডার্ন নারীদের সেলফ কনফিডেন্স আর সেলফ রিলায়েন্সের প্রতীক এবং অন্যদিকে নারীর প্রকাশ্য ভিজিবিলিটি নিয়া তথাকথিত মোরাল কনসার্ন এর প্যারা।
কীভাবে?
বাংলাদেশে ব্যাডির মিনিং শুধু তার স্টাইল স্টেটমেন্টে আটকায় থাকে না; সে পুরাপুরি পলিটিক্যাল ও কালচারাল অর্থে আইডেন্টিফাইড হয়া পড়ে। যেমন ধরেন, রাইট উইঙ্গারদের প্রিয় থুক্কু সবার প্রিয় মোনামি ম্যাম। তিনি কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দলের কাছে নাম্বার ওয়ান ব্যাডি। যদিও তার চলাফেরা বা পোশাকের সাথে সেই পলিটিক্যাল মোরাল গ্রাউন্ডের বিন্দুমাত্র মিল নাই, তাও তাদের এজেন্ডা সার্ভ করায় তিনি তাদের চোখে ১০০/১০০ ব্যাডি খেতাব নিয়ে চলেন!
অপরদিকে, অন্য একটা দলের জন্য তিনি হয়তো ‘গুপ্ত’ কিংবা দুই চোখের বিষ। এখন ধরেন ঘটনা উল্টায় দিলাম! মোনামি ম্যাম একদিন সকালে উইঠা ডিসিশন নিলেন তিনি আর রাইট উইঙ্গারদের সাপোর্ট দেবেন না, তখন হয়তো তিনি রাতারাতি হয়া উঠবেন ‘শাহবাগী’!
এখন ধরেন, শাহবাগীরা তো আসলেই ব্যাডি, কিন্তু এ দেশে এই ব্যাডি হওয়ার সবচেয়ে বড় গালি হইলো শাহবাগী। এই ডুয়েলিটিতে আমরা তৈরি করি দুইটা ফর্ম ! নারীকে ব্যাডি বলে সেলিব্রেট করা, আবার সেই একই নারীকে ‘শাহবাগী’ ট্যাগ দিয়ে অপমান করা। নারী একইসঙ্গে এইখানে প্রব্লেমেটিক আবার ব্যাডি হিসেবেও প্রেজেন্টেড হইতে পারেন, কারণ ব্যাডির কনসেপ্টটা আদতে কারো কাছেই ক্লিয়ার না।
অনেক তরুণীর কাছে ব্যাডি পরিচয়টা নিজের এজেন্সি বা ক্ষমতা প্রকাশের একটা ওয়ে। নিজের ছবি ও আইডেন্টিটি কন্ট্রোল করার ফ্রিডম, প্রকাশ্যে কথা বলার অধিকার এবং লজ্জা নয় বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের বডিকে অওন করার ক্ষমতা। কিন্তু একই সঙ্গে, কনজারভেটিভ বা মেল ডমিনেটেড অনলাইন স্পেসে এই একই চরিত্রকে প্রায়ই মোরাল ডিগ্রেডেশনের সাইন হিসেবে দেখা হয়। সেখানে শাহবাগীর মতো শব্দ সারকাস্টিক্যালি ব্যবহার করা হয়, যেন এমন নারীদের ওপর লিবারেল ফেমিনিজম বা ওয়েস্টার্ন ইনফ্লুয়েন্সের তকমা সেঁটে দেওয়া যায়।
পলিটিক্যাল আইডেন্টিটির চেয়ে এই শব্দটা আসলে ব্যবহার হয় এমন নারীদের কন্ট্রোল করার টুল হিসেবে, যারা ভিজিবল এবং কনফিডেন্ট। এইভাবেই একই নারী একদিকে কারো কাছে ইনস্পিরেশনের সিম্বল হয়ে ওঠেন, আবার অন্যদের কাছে হয়ে ওঠেন সোশ্যাল থ্রেট।
বিয়ের জন্য লক্ষ্মী মেয়ে, লাইকের জন্য ব্যাডি: দ্য মডার্ন হিপোক্রেসি

এই ডুয়ালিটি আসলে নতুন কিছু না। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে সাইকোঅ্যানালিস্ট সিগমুন্ড ফ্রয়েড এমনই এক বিভাজনের কথা বলছিলেন, যা পরে ‘ম্যাডোনা-হোর কমপ্লেক্স’ নামে পরিচিতি পায়। ফ্রয়েড লক্ষ্য করছিলেন যে, কিছু পুরুষ মানসিকভাবে নারীদেরকে দুইটা বিপরীত ক্যাটাগরিতে ভাগ কইরা দেখে। একদিকে রেসপেক্টেবল নারী, যারে ভালোবাসা ও বিয়ার জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়; আরেকদিকে সেক্সুয়াল অ্যাট্রাকশনের নারী, যারে কামনা করা হয় কিন্তু ওইভাবে রেসপেক্ট দেওয়া হয় না।
এই ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে ইমোশন আর সেক্সুয়াল অ্যাট্রাকশন একদম আলাদা হয়ে যায়। ফ্রয়েডের মতে, এমন পুরুষদের কাছে একই মানুষের মধ্যে লাভ আর ডিজায়াররে এক করা প্রায় অসম্ভব হইয়া উঠে। আধুনিক ব্যাডি ক্যারেক্টারটা ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক ফাটলের মধ্যেই এন্ট্রি নেয়। এভারেজ বাংলাদেশি ব্যাডা মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন ব্যাডির নান্দনিকতা এনজয় করতে পারেন, তার পোস্টে লাইক দিতে পারেন, তার কনফিডেন্সকে আকর্ষণীয় মনে করতে পারেন। কিন্তু যখনই ইস্যুটা সোশ্যাল এক্সেপটেন্স, বিয়ে বা সম্মানজনক কোন আইডেন্টিটির দিকে যায়, তখনই সেই একই নারীকে একদম ভিন্ন চোখে জাজ করা শুরু করেন।
এর ফলে একটা চেনা সোশ্যাল ন্যারেটিভ তৈরি হয়। “ভালো মেয়ে” মানেই বিয়ার জন্য আইডিয়াল পার্টনার, আর বেশি ভিজিবল বা কনফিডেন্ট নারী মানেই এমন কেউ, যাকে দূর থিকা ফ্যান্টাসাইজ করা যায় বা সমালোচনা করা যায়। তাই একই নারী এক কন্টেক্সটে আধুনিক ও এমপাওয়ারড হিসেবে প্রশংসিত হন, আবার অন্য কন্টেক্সটে তাকেই ‘ওভার’ বা ‘নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ’ হিসেবে ট্যাগ দেওয়া হয়।
ঠিক এই কারণেই দেখবেন, নারীকে কথায় কথায় “মা” আর “বোন” বলে ডেকেই সম্মান দেওয়ার চেষ্টা চলে। আমাদের মা, আমাদের বোন... যেন এর বাইরে নারীর আর কোনো রোম্যান্টিক বা পাওয়ারফুল ভূমিকা থাকতে পারে না। মা-বোন হলেই একমাত্র নারীরা এ দেশে নিরাপদ এবং সম্মানযোগ্য।
এভাবেই ব্যাডি চরিত্রটা সমসাময়িক বাংলাদেশি জেন্ডার-কালচারের এক গভীর দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়া আসে। একদিকে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ভিজিবিলিটি, কনফিডেন্স আর পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংরে উসকায় দিচ্ছে; অন্যদিকে সমাজের ভেতর এখনও ‘শালীনতা’ আর ‘কন্ট্রোল’ এর পুরানা প্রত্যাশাগুলাই নারীদের মূল্যায়নের প্যারামিটার হিসেবে কাজ করতেছে। ফলে তৈরি হইতেছে এক স্থায়ী ডাবল স্ট্যান্ডার্ড । অনলাইনে মুক্ত নারীত্বের ফ্যান্টাসি আমরা এনজয় করলেও, রিয়েল লাইফে আজও সেই ‘সংযত ও নিয়ন্ত্রিত’ নারীত্বকেই আমরা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড মাইনা বইসা আছি।
কী, এতো ডুয়ালিটিতে মাথা ঘুরায়?

আমারও ঘুরায়। তখনি মাথায় খেলে রবীন্দ্রনাথের সেই লাইন— “তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি”।
তাই এতো ডুয়ালিটি গুণার টাইম নাই। আপনি ডার্ক লিপস্টিক পরেন আর নাই পরেন, আপনার স্টেটমেন্টটাই আসল। যতক্ষণ আপনি আপনার নিজের গল্পের প্রোটাগনিস্ট, সমাজ আপনারে কোন বাক্সে আটকালো তাতে কিচ্ছু যায় আসে না।
আজকের এই দিনে, পপ স্ট্রিমের পক্ষ থেকে আমাদের সকল অরিজিনাল ব্যাডিদের জানাই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের কড়া শুভেচ্ছা! ডিয়ার ব্যাডিজ, স্টে বোল্ড এন্ড স্টে ভিজিবল!

মাহবুব-এ-খোদা। দেওয়ানবাগী পীর হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত হওয়ার অনেক আগে এটিই ছিল তার নাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের হিস্ট্রিতে তার এন্ট্রিটা কোনোভাবেই অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সাথে তার কানেকশনের পেছনে ছিল দীর্ঘ পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিজম আর কড়া দেশপ্রেমের দুর্দান্ত স্টোরিলাইন।
৪ দিন আগে
আপনার কি কখনো মনে হইছে বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতন একটা ঘটনা, যেটা বাংলাদেশের সব মানুষকে একছাতার নিচে এনেছিল, তার ঠিক দুই বছর পরে আমরা সবাই আর একছাতার নিচে নাই? বরং কয়েকটা ছাতার নিচে দাঁড়ায়ে বর্তমান বাংলাদেশ একটা ‘নিখিল বাংলা কালচারাল ওয়ার সমিতি’তে পরিণত হয়েছে।
৬ দিন আগে
আপনার কি নতুন কোনো জায়গায় ইন্সটাগ্রামওয়ার্দি ছবি তোলার জন্য মন খাঁ খাঁ করছে? এদিকে কফিশপ বা রেস্টুরেন্টে যাওয়ার বাজেট নেই, পার্কে গেলে পুলিশ দ্বারা ‘মাদকাসক্ত’ ট্যাগ ও মার খাওয়ার ভয়, আর রিসোর্টে যেতে চাইলে নির্ঘাত কিডনি বেচার পরিস্থিতি?
৮ দিন আগে
ফেসবুক বা ইনস্টা স্ক্রল করলেই ইদানীং কিছু উইয়ার্ড রিল সামনে আসতেছে। যে সবজি বা ফলের পাতে থাকার কথা, তারা এখন স্ক্রিনে আইসা রীতিমতো তুইতোকারি করতেছে! করলা, শসা, আদা বা লেবু আপনার দিকে আঙুল তুইলা বলতেছে সে আপনার শরীরের কী কী উপকার করে, আর আপনি তারে অবহেলা কইরা কী কী ভুল করতেছেন।
১০ দিন আগে