রমজান এলে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মুসলমানরা যেন এক অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা হয়ে যায়। রোজা, তারাবি, কোরআন তেলাওয়াত—এসব ইবাদতের মধ্য দিয়েই তারা এই পবিত্র মাসকে স্বাগত জানায়। কিন্তু রমজান শুধু ইবাদতের মাসই নয়; এটি মুসলিম বিশ্বের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনেরও এক অনন্য সময়।
বিভিন্ন দেশে রমজানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন কিছু প্রথা। কোথাও রঙিন লণ্ঠনে সেজে ওঠে শহর, কোথাও সেহরির আগে ঢোল বাজিয়ে মানুষকে জাগানো হয়, আবার কোথাও শিশুরা গান গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মিষ্টি সংগ্রহ করে। এসব প্রথা শুধু আনন্দই দেয় না, বরং মুসলিম সমাজের পারস্পরিক বন্ধন ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।
মিশরের ফানুসের আলো
রমজান এলেই মিশরের রাস্তাঘাট যেন রঙিন আলোয় ভরে ওঠে। শহরের অলিগলি, দোকানপাট ও ঘরবাড়ির সামনে ঝুলে থাকে নানা রঙের ফানুস—ঐতিহ্যবাহী লণ্ঠন। এই ফানুস শুধু আলোকসজ্জা নয়; এটি আনন্দ, ঐক্য এবং রমজানের উচ্ছ্বাসের প্রতীক।
মিশরের ঐতিহ্য ফানুস। ছবি: সংগৃহীতফানুসের উৎপত্তি নিয়ে একটি জনপ্রিয় কাহিনি রয়েছে। বলা হয়, ৩৫৮ হিজরি সালের রমজানে ফাতেমি খলিফা মুয়িজ্জ লিদীনিল্লাহ প্রথমবারের মতো কায়রো নগরে প্রবেশ করেন। সন্ধ্যার পর তাঁর আগমন উপলক্ষে শহরের মানুষ মোমবাতি হাতে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। বাতাসে মোমবাতির আলো নিভে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে তারা সেগুলো কাঠের ফ্রেমে ঢেকে রাখে। সেই কাঠামোই পরে নকশা করা লণ্ঠনে রূপ নেয়—যা আজকের ফানুস।
তুরস্কে সেহরির ড্রামার
তুরস্কে রমজানের আরেকটি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায় গভীর রাতে। শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ান সেহরি ড্রামাররা। তারা ঢোল বাজিয়ে মানুষকে সেহরির জন্য জাগিয়ে দেন।
এই ড্রামারদের বলা হয় দাভুলজু। তারা সাধারণত উসমানীয় যুগের ঐতিহ্যবাহী পোশাক—ফেজ টুপি ও ভেস্ট পরে থাকে। আধুনিক অ্যালার্ম আর স্মার্টফোনের যুগেও এই প্রথা এখনো টিকে আছে। এমনকি এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে তুরস্কে ড্রামারদের জন্য বিশেষ সদস্যপদ কার্ডও চালু করা হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে শিশুদের মিষ্টি সংগ্রহ
রমজানের মাঝামাঝি সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে দেখা যায় এক আনন্দময় দৃশ্য। রঙিন পোশাক পরে শিশুরা দল বেঁধে মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে গান গেয়ে মিষ্টি সংগ্রহ করে। অঞ্চল ভেদে এই প্রথা ‘হাক আল লায়লা’ বা ‘গারাঙ্গাও’ বা ‘কারকিয়ান’ নামে পরিচিত।
শিশুরা একটি ঐতিহ্যবাহী গান গায়—
‘আতোনা আল্লাহ ইউতিকুম, বাইত মাক্কা ইউদ্দিকুম।’
অর্থাৎ—‘আমাদের কিছু দাও, আল্লাহ তোমাদের প্রতিদান দেবেন এবং তোমাদের বাইতুল্লাহ জিয়ারতের তাওফিক দেবেন।’
এই প্রথার সূচনা হয়েছিল বাহরাইনে, কিন্তু আজ এটি উপসাগরীয় বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি শিশুদের আনন্দের পাশাপাশি সমাজে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
মরক্কোর নাফার
মরক্কোয় রমজানের ভোররাতেও দেখা যায় এক বিশেষ দৃশ্য। একজন ব্যক্তি মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে শিঙ্গা বা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মানুষকে সেহরির জন্য জাগিয়ে দেন। তাকে বলা হয় নাফার।
নাফার সাধারণত ঐতিহ্যবাহী পোশাক—গান্দোরা, স্যান্ডেল ও টুপি পরে থাকেন। এই দায়িত্ব সাধারণত এমন কাউকেই দেওয়া হয়, যিনি সততা ও সহানুভূতির জন্য সমাজে পরিচিত।
ইন্দোনেশিয়ার পাদুসান
ইন্দোনেশিয়ায় রমজান শুরু হওয়ার আগের দিন একটি বিশেষ প্রথা পালিত হয়, যার নাম পাদুসান। শব্দটির অর্থই হলো গোসল করা।
এই দিনে মানুষ নদী বা ঝর্ণায় গোসল করে প্রতীকীভাবে নিজেদের শুদ্ধ করার চেষ্টা করে। জাভা অঞ্চলে ইসলাম প্রচারকারী বিখ্যাত দাওয়াতি দল ওয়ালি সাংগো-এর মাধ্যমে এই প্রথা জনপ্রিয় হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
এটি মূলত রমজানকে পবিত্র মন ও শরীর নিয়ে স্বাগত জানানোর একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক।
ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্য পাদুসান। ছবি: সংগৃহীতইফতারে কামানের ধ্বনি
কিছু মুসলিম দেশে সূর্যাস্তের সময় ইফতারের ঘোষণা দিতে কামানের গোলা ছোড়ার একটি পুরোনো প্রথা রয়েছে, যাকে বলা হয় ইফতার কামান।
ধারণা করা হয়, উসমানীয় আমলে মিশরের শাসক খোশ কাদম নতুন একটি কামান পরীক্ষা করতে গিয়ে সূর্যাস্তের সময় দুর্ঘটনাবশত সেটি ছুড়ে ফেলেন। কায়রোর মানুষ সেই শব্দকে ইফতারের সংকেত মনে করে রোজা ভাঙতে শুরু করে। পরবর্তীতে এটি একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয় এবং সিরিয়া, লেবাননসহ আরও কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
বৈচিত্র্যের মধ্যেও একতা
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রমজান পালনের ধরন ভিন্ন হতে পারে। কোথাও লণ্ঠনের আলো, কোথাও ঢোলের শব্দ, কোথাও শিশুদের গান—সব মিলিয়ে রমজান যেন এক বর্ণিল সাংস্কৃতিক উৎসব।
তবে এই সব বৈচিত্র্যের মধ্যেও একটি বিষয় অপরিবর্তিত—রমজানের মূল চেতনা। সংযম, ইবাদত, দানশীলতা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে দৃঢ় করা—এই মূল্যবোধই বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের এক সুতোয় গেঁথে রাখে।
- মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা