জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

‎এক শহরে দুই রমজান

‎ওলিউর রহমান
‎ওলিউর রহমান

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ১৬: ০১
বায়তুল মোকাররমে তারাবির নামাজের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

‎দৃশ্য-১

রাজধানী ঢাকার একটু উন্নত এলাকার আলীশান কোনো মসজিদ। তারাবির দীর্ঘ নামাজেও ভরপুর মুসল্লি। ইমাম সাহেব তেলাওয়াত করেন খুবই ধীরলয়ে। তবুও মুসল্লিদের কোনো বিরক্তি নেই৷ এয়ার কন্ডিশনের আরামদায়ক পরিবেশে সুললিত কণ্ঠের হাফেজ সাহেবের মধুর তেলাওয়াত দামি আর উন্নত মাইক্রোফোনে শুনতে বিরক্তি তো না লাগারই কথা৷

‎দৃশ্য-২

ঢাকার একটু ঘিঞ্জি এলাকার ছোটখাটো কোনো মসজিদ। তারাবির শুরুতে নীচতলা পুরোটা ভরলেও বিশ রাকাত শেষ হতে হতে মুসুল্লি সংখ্যা নেমে আসে এক বা দুই কাতারে৷ এসি হয়তো দু-একটা চলে, হাফেজ সাহেব তেলাওয়াতও মাইক লাগিয়েই করেন। কিন্তু সবকিছুর সমন্বয়ে এখানে আর অপার্থিব আবহ তৈরি হয় না৷

‎ওপরের দুটি চিত্র আমাদের সমাজের দুটি শ্রেণি এবং দুই ধরণের মানুষের জীবন-যাত্রার স্বরূপ তুলে ধরে। শহরের অবস্থাসম্পন্ন মানুষ আর একজন শ্রমিকের জীবনে রমজান সমান আবেদন নিয়ে হাজির হয় না।

‎শহরের অভিজাত মহল্লাগুলোতে ধর্মীয় আয়োজন দৃশ্যমানভাবে বেশি চোখে পড়ে। রমজানে তারা রোজা রাখে। দীর্ঘ সময় নিয়ে ইবাদত করে। দান করে, গরিবদের মধ্যে ইফতার বিতরণসহ অনেক সৎকাজ তারা করে৷ কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির লোকদের বসবাস যে মহল্লায়, সেখানে এসব দেখা যায় না তেমন৷ অনেকেই হয়ত রোজাই রাখতে পারে না।‎

‎অভিজাত মহল্লার বাসিন্দারা সাধারণত সরকারি, বেসরকারি ভাল পদে চাকরি করেন। যেখানে নির্ধারিত বেতনের নিশ্চয়তা আছে। রমজান উপলক্ষে কর্মঘন্টাও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের পক্ষে নিমগ্নতার সঙ্গে রমজানের ইবাদত পালন সম্ভব৷ কিন্তু একজন শ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুরকে উদয়াস্ত গায়ে গতরে খেটে কাজ করতে হয়৷ তাই দিনশেষে ইবাদতে নিমগ্নতা ধরে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

‎একজন চাকরিজীবী যখন বাসায় পরিবারের মানুষদের সঙ্গে বসে ইফতার করেন, একজন অটোচালক তখন কোথাও এক মিনিটের জন্য অটো থামিয়ে এক ঢোক পানি পান করে রোজা ভাঙেন৷ একজন ব্যবসায়ী যখন তারাবির নামাজে দাঁড়িয়ে একাগ্রতার সঙ্গে তেলাওয়াত শোনেন, দোকানের কর্মচারিকে তখন নামাজ বাদ দিয়ে বেচা-বিক্রি চালিয়ে যেতে হয়।

‎ফলে পবিত্র রমজান মাসে একই শহরের দুটি মহল্লায় দুই রকম পরিবেশ হবে, খুবই স্বাভাবিক।

‎রমজান সহমর্মিতার মাস। এ মাসে রাসূলের (সা.) অধিনস্থদের কাজের চাপ কমিয়ে দিতে বলেছেন। ফলে একজন ব্যবসায়ীর জন্য রমজানে নিজে তারাবির নামায পড়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কর্মচারীর কাজের চাপ কমিয়ে দিয়ে তাকে ইবাদতের সুযোগ করে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ৷

‎রমজানে রাসূল (সা.) প্রচুর দান করতেন। এবং অন্যদেরকে দান করতে উৎসাহিত করতেন। ফলে স্বচ্ছল, সামর্থবান লোকদের জন্য একজন রিকশাচালককে একজন সবজিবিক্রেতাকে ন্যায্যমূল্যের সঙ্গে কিছু বখশিশ দিয়ে তাদের খুশি করে দেওয়া পুণ্যের কাজ হবে।

‎রমজানে অন্যদেরকে সামান্য খেজুর, পানি দিয়ে হলেও ইফতার করাতে নির্দেশ দিয়েছেন রসূল (সা.)। ফলে যারা বাসায় মজাদার রেসিপি দিয়ে ইফতার করেন তাদের জন্য কাজের বুয়া, গেটের দারোয়ান নির্মাণের কাজ করতে আসা শ্রমিকদের ইফতারের ব্যবস্থা করা অবশ্য কর্তব্য।

‎আপনি স্বচ্ছল, তাই আরামদায়ক পরিবেশে বেশি বেশি নামাজ-রোজা করছেন৷ আর আপনার চারপাশের মানুষ কাজের তাগিদে ইবাদতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ মনে রাখতে হবে, নামায-রোযাই কেবল ইবাদত নয়। অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের ইবাদতের বন্দোবস্ত করে দেওয়াও অনেক বড় ইবাদত৷

‎হাদীসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ধনীদের চল্লিশ বছর আগে গরিব জান্নাতে যাবে। (সহীহ মুসলিম)

সামর্থবান লোকেরা যদি সস্পদের যথাযথ হিসাব করে গরিবের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় হিসাবের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

‎অভিজাত লোকদের ধর্মচর্চার প্রতি বাড়তি আগ্রহ এবং গরিবদের কম আগ্রহ দেখে বিভ্রান্তির কিছু নেই। ‘অভিজাতদের ধর্মচর্চা বেশি, গরিবদের কম’—এটা বাস্তবতার আংশিক চিত্র। অনেক সময় গরিব মানুষই বেশি আন্তরিক হন, শুধু দৃশ্যমান আয়োজন কম থাকে।

‎রমজানে কেবল মসজিদের কাতারে নয়; ক্লান্ত শ্রমিকদেরও পাশে দাঁড়াতে হবে। যে শহরে তারাবির কাতার লম্বা হয় কিন্তু শ্রমিকের কাজের সময় কমে না, মজুরি বাড়ে না—সে শহর এখনও রমজানের মাহাত্ম্য খুঁজে পায়নি।

সম্পর্কিত