শর্ট ভিডিও দেখছি অনেক, শিখছি কতটা

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

সন্ধ্যা সাতটা বা রাত সাড়ে বারোটা। বয়স দশ হোক বা চল্লিশ, ফোনের স্ক্রিনে একের পর এক রিল ভেসে আসে। ইতিহাস, বিজ্ঞান, অফিসের টিপস, রান্না কিংবা স্বাস্থ্য; সবই কয়েক সেকেন্ডে। প্রতিটাই এত সহজ, ঝরঝরে যে, মনে হয় অনেক কিছু শিখে ফেললাম। কিন্তু পরদিন সেই বিষয় ব্যাখ্যা করতে বা কাজে লাগাতে গেলে দেখা যায়, নাম-তারিখ বা একটা ক্যাচি লাইন ছাড়া কিছুই মনে পড়ে না। আসলে রিলস আমাদের ‘জানার অনুভূতি’ দেয় দ্রুত, কিন্তু আসল ‘জানা’টা তৈরি হতে যে সময়, মনোযোগ আর গাঁথুনি লাগে, তা দিতে পারে না। তাই রিলস দেখে সত্যিকার জানা বা শেখাটা হয় না, গবেষকরা সেটাই দেখতে পাচ্ছেন।

সম্প্রতি চীনের ইউনান নরমাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মেইতিং ওয়েই ও তাঁর সহকর্মীদের করা একটি গবেষণা সেই প্রশ্নটি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। গবেষণা বলছে, শর্ট ভিডিও মনোযোগ আকর্ষণে সফল হলেও তথ্য দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখার ক্ষেত্রে কম কার্যকর। গবেষকরা একদল শিক্ষার্থীকে একটানা ভিডিও এবং আরেক দলকে একই বিষয়ের খণ্ড খণ্ড ভিডিও দেখান। দেখা যায়, যারা শর্ট ভিডিও দেখেছিল, তারা তাৎক্ষণিক কুইজেও কম নম্বর পেয়েছে এবং পরদিন আরও বেশি তথ্য ভুলে গেছে। পরে আরেকটি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের জানানো হয়, ভিডিওর বিষয়বস্তুর ওপর তাদের পরীক্ষা ও গ্রেড দেওয়া হবে, যাতে তারা আরও মনোযোগ দিয়ে দেখে। তবু ফল একই ছিল, অর্থাৎ শুধু মনোযোগ বাড়ালেই শর্ট ভিডিও থেকে শেখার সীমাবদ্ধতা কাটে না। গবেষণার তৃতীয় পর্যায়ে মস্তিষ্কের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একটানা ভিডিও দেখার সময় মস্তিষ্কের যে অংশ তথ্য সংগঠিত করে আর মনে রাখে, তা সক্রিয়ভাবে কাজ করে; কিন্তু শর্ট ভিডিওর ক্ষেত্রে তা হয় না।

এর কারণ লুকিয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ধরনে। নতুন তথ্য প্রথমে চোখ-কানের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে, তারপর যায় অস্থায়ী স্মৃতিতে। এই তথ্য ধরে রাখতে হলে মনোযোগ দরকার, তবেই সেটি পৌঁছায় ‘কার্যকর স্মৃতি’তে, যেখানে আমরা চিন্তাভাবনা ও বোঝার চেষ্টা করি। আর দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে জায়গা পেতে হলে দরকার আরও এক ধাপ; তথ্যকে আগের জানা কিছুর সঙ্গে যুক্ত করা। পুরো প্রক্রিয়াটির জন্য প্রয়োজন টানা মনোযোগ। বিচ্ছিন্ন, তাড়াহুড়োর দৃশ্যে সেই সুযোগ তৈরি হয় না।

শর্ট ভিডিওর নকশা এর বিপরীত। দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন, একের পর এক নতুন উদ্দীপনা এবং বিচ্ছিন্ন উপস্থাপনা আমাদের মস্তিষ্ককে তথ্য বিশ্লেষণের চেয়ে নতুন কনটেন্টের দিকে মনোযোগ দিতে বেশি উৎসাহিত করে। তথ্য স্মৃতিতে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ পায় না।

এই ফলাফল বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের দেশে শেখার বড় অংশ এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মনির্ভর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বিসিএস ও ব্যাংকে চাকরিপ্রার্থী, এইচএসসি পরীক্ষার্থী, কিংবা দক্ষতা উন্নয়নে আগ্রহী তরুণ অনেকেই নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও শর্ট ভিডিওর মাধ্যমে নতুন বিষয় শেখার চেষ্টা করছে। এই মাধ্যমগুলো জ্ঞানকে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: এই দ্রুতগতির কনটেন্ট কি সত্যিই শেখায়, নাকি শুধু শেখার অনুভূতি তৈরি করে?

শিক্ষামূলক শর্ট ভিডিও বিষয় সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করতে পারে, কঠিন বিষয়কে সহজভাবে পরিচয় করিয়েও দিতে এবং শেখার প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা এই প্রাথমিক পরিচিতিকেই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা বলে ধরে নিচ্ছি। শর্ট ভিডিও দেখে বিষয়টি পরিচিত মনে হলেও বিশ্লেষণ, আলোচনা কিংবা বাস্তবে প্রয়োগের সময় সেই বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩০ শিক্ষার্থীর ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ফেসবুক ও ইউটিউব এখন তাদের পড়াশোনার নিয়মিত অংশ। একই বছরের আরেক জরিপে দেখা যায়, শিক্ষামূলক কনটেন্টের জন্য ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেসবুক ব্যবহার করে, ৫২ শতাংশ তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে সমস্যায় পড়ে আর ৩৭ শতাংশ নিয়মিত যাচাই করে না। এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য শিক্ষামূলক পেইজ ও কনটেন্ট নির্মাতা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। অনেকেই এক মিনিটে সংবিধান, দুই মিনিটে অর্থনীতি অথবা ৩০ সেকেন্ডে ইংরেজি শেখানোর প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু কোনো বিষয় সম্পর্কে দ্রুত ধারণা পাওয়া আর সেটি গভীরভাবে বোঝা এবং সেই বোঝা দীর্ঘস্থায়ী করা এক বিষয় নয়।

এ ধরনের শিক্ষামূলক শর্ট ভিডিও বিষয় সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করতে পারে, কঠিন বিষয়কে সহজভাবে পরিচয় করিয়েও দিতে এবং শেখার প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা এই প্রাথমিক পরিচিতিকেই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা বলে ধরে নিচ্ছি। শর্ট ভিডিও দেখে বিষয়টি পরিচিত মনে হলেও বিশ্লেষণ, আলোচনা কিংবা বাস্তবে প্রয়োগের সময় সেই বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সমস্যাটা শুধু ক্লাসরুমে আটকে নেই। ধরুন, কেউ ৩০ সেকেন্ডের একটা রিলে দেখল—‘এই খাবার খেলেই কমবে ওজন’ কিংবা ‘এই ভিটামিন খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্বিগুণ হবে’। ভিডিওটা আত্মবিশ্বাসী গলায়, সুন্দর গ্রাফিকস দিয়ে বলা। ফলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এর পেছনে কী গবেষণা আছে বা তথ্যটি কতটা নির্ভরযোগ্য, তা যাচাই করার ফুরসত নেই। পরের ভিডিওটা ততক্ষণে চলে এসেছে। স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, আইন, রাজনীতি প্রায় সব বিষয়েই একই প্যাটার্ন চলছে।

আমরা যখন ডিজিটাল সাক্ষরতা নিয়ে কথা বলি, তখন সাধারণত কথা বলি ভুয়া খবর চেনা বা অনলাইনে নিরাপদ থাকার আলোচনায়। গভীরভাবে শেখার সক্ষমতাও এর অংশ হওয়া উচিত। তথ্য পাওয়া, তথ্য বোঝা এবং তা কাজে লাগাতে পারা তিনটি আলাদা দক্ষতা।

এখানেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কনটেন্ট নির্মাতা ও অভিভাবকদের নতুন করে ভাবার সুযোগ রয়েছে। শর্ট ভিডিও আগ্রহ তৈরি ও শেখার শুরু হতে পারে; কিন্তু সেটিকে বিস্তারিত পাঠ, আলোচনা ও নির্ভরযোগ্য উৎসের দিকে নিয়ে যাওয়ার সেতু হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থী ও সন্তানদের পড়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা, নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করা এবং বই বা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎস পড়তে উৎসাহিত করতে হবে। জনপ্রিয়তা আর কার্যকর শিক্ষা এক নয়। যদি পুরো শিক্ষাদানই এক মিনিটের ভিডিওতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানকে দুর্বল করতে পারে। তবে শর্ট ভিডিওকে পুরোপুরি অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। বর্তমান সময়ে মানুষের ব্যস্ত জীবন, তথ্যের বিপুল পরিমাণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তবতায় এগুলোর গুরুত্ব থাকবে।

তবে এগুলোকে শেখার শুরু হিসেবে ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত। বাংলাদেশ এখন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার কথা বলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল দক্ষতা, গবেষণা ও উদ্ভাবন—এমন সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা ও গভীর বোঝাপড়া। এগুলো কয়েক সেকেন্ডের মনোযোগে গড়ে ওঠে না। তাই শর্ট ভিডিওর ক্ষতিকর দিক সামলে কাজে লাগাতে পারলে সেটার একটা জাতীয় গুরুত্ব রয়েছে। আশা করি, শিক্ষার সঙ্গে জড়িত সংস্থাগুলো এই বিষয়ে মনোযোগ দেবেন।

মাধুরী গোস্বামী: ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) কমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েট

*(মতামত লেখকের নিজস্ব)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত