মাহজাবিন নাফিসা

বাংলাদেশে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) চালুর ঘটনাটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎসগুলোর একটি হলো মূসক। প্রতি বছর সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে এই খাত থেকে। কিন্তু এই ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্যাপক বিতর্ক, ব্যবসায়ীদের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
ভ্যাট কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট হলো একটি পরোক্ষ কর। কোনো পণ্য বা সেবা ক্রয়ের সময় ক্রেতা মূল দামের সঙ্গে অতিরিক্ত যে কর পরিশোধ করেন, সেটিই ভ্যাট। যদিও করটি সরকারের কাছে জমা দেয় বিক্রেতা, প্রকৃত অর্থে এর ভার বহন করেন যিনি সর্বশেষ পণ্য বা সেবা গ্রহণ করেন তিনি।
ভ্যাটের মূল ধারণা হলো উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যে অতিরিক্ত মূল্য সংযোজিত হয়, তার ওপর কর আরোপ করা। ফলে এটি একদিকে সরকারের জন্য স্থিতিশীল রাজস্ব উৎস, অন্যদিকে কর ফাঁকি কমানোর একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমানে বাংলাদেশে সাধারণ ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ। তবে বিভিন্ন খাতে ১ দশমিক ৫ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কিংবা ১০ শতাংশের বিশেষ হারও প্রযোজ্য।
বিশ্বে ভ্যাটের সূচনা
ভ্যাটকে আধুনিক করব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন বলা হয়। এর ধারণা প্রথম দেন জার্মান ব্যবসায়ী ভন সিমেন্স ১৯২০ সালে। পরে ১৯২১ সালে অর্থনীতিবিদ এডামসের কার্যকর কাঠামো ব্যাখ্যা করেন।
যদিও করের এই ধারণার শিকড় আরও পুরোনো, আধুনিক অর্থে প্রথম ভ্যাট চালু করে ফ্রান্স ১৯৫৪ সালে। এরপর ইউরোপের অন্যান্য দেশেও দ্রুত এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ প্রচলিত বিক্রয় করের তুলনায় ভ্যাট ছিল বেশি স্বচ্ছ, কার্যকর এবং রাজস্ববান্ধব।
বর্তমানে বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে কোনো না কোনো রূপে ভ্যাট কার্যকর রয়েছে।
বাংলাদেশে ভ্যাটের প্রয়োজন কেন দেখা দিল
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ের প্রধান উৎস ছিল আমদানি শুল্ক, আবগারি শুল্ক এবং বিক্রয় কর। কিন্তু আশির দশকে অর্থনীতির আকার বাড়তে শুরু করলে দেখা যায়, বিদ্যমান করব্যবস্থা দিয়ে পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না।
১৯৭৯ সালে গঠিত করারোপ তদন্ত কমিশন প্রথমবারের মতো বিক্রয় করের বিকল্প হিসেবে ভ্যাট চালুর চিন্তা করে। তবে তখন বিষয়টি নীতিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল।
১৯৮২ সালে বিক্রয় কর অধ্যাদেশ জারি করে পুরোনো বিক্রয় কর আইনের পরিবর্তন আনা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। সরকার বুঝতে পারে, অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আধুনিক করব্যবস্থা প্রয়োজন।
এই সময় বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের রাজস্ব সংস্কারের বিষয়ে আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। বিশেষ করে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
আইএমএফের সম্পৃক্ততা এবং আহসান এইচ মনসুরের ভূমিকা
ভ্যাট চালুর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। সে সময় তিনি আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টে সিনিয়র ইকোনমিস্ট হিসেবে কাজ করছিলেন।
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. ওয়াহিদুল হক ১৯৮৯ সালে আইএমএফকে বাংলাদেশের রাজস্বব্যবস্থা উন্নয়নে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানান। সেই অনুরোধের ভিত্তিতে আইএমএফ একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে পাঠায়, যেখানে আহসান এইচ মনসুরও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
তাদের মূল দায়িত্ব ছিল—বাংলাদেশে ভ্যাট চালু করা সম্ভব কি না, এবং সম্ভব হলে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ প্রদান।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশ পরিদর্শন
বাংলাদেশে এসে আইএমএফের প্রতিনিধিদল শুধু নীতিগত বিশ্লেষণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ভারতের মতো দেশ পরিদর্শন করে ভ্যাটের বাস্তব প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ করে।
সেসব দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পায়, ভ্যাট ব্যবস্থা রাজস্ব বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয় যে বাংলাদেশেও সফলভাবে ভ্যাট চালু করা সম্ভব।
ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতা
ভ্যাট চালু করা মোটেও সহজ ছিল না।
সরকার যখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে, তখন অনেক ব্যবসায়ী এর বিরোধিতা করেন। কারণ ভ্যাট চালু হলে বিক্রয় ও হিসাব ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে হতো, যা অনেকের কাছে অতিরিক্ত প্রশাসনিক বোঝা হিসেবে মনে হয়েছিল।
আহসান এইচ মনসুরের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় হাজার হাজার মানুষ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবন ঘেরাও করে ‘ভ্যাট চলবে না’ স্লোগান দিয়েছিল। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে নতুন করব্যবস্থা তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
তবু সরকার পিছু হটেনি। কারণ নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস ছিল, দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য উপকারী হবে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং আইনি জটিলতা
১৯৯০ সালে ভ্যাট আইন চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। কিন্তু ঠিক তখনই গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।
ডিসেম্বর ১৯৯০-এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে এবং রাষ্ট্রপতি হন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। সে সময় সংসদ না থাকায় ভ্যাট আইন সংসদে পাস করার সুযোগ ছিল না। ফলে সিদ্ধান্ত হয় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটি কার্যকর করা হবে।
প্রথমদিকে শাহাবুদ্দিন আহমেদ এতে অনীহা প্রকাশ করেন। তার যুক্তি ছিল, তিনি একটি অস্থায়ী সরকারের প্রধান, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে এমন আইন জারি করা তার জন্য নৈতিকভাবে অস্বস্তিকর।
তবে রাজস্ব ক্ষতির সম্ভাবনা এবং বাজেট বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত তিনি সম্মতি দেন।
১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা
১৯৯১ সালের ৩১ মে মূল্য সংযোজন কর অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর কিছু ধারা ২ জুন থেকে এবং বাকি অংশ ১ জুলাই ১৯৯১ থেকে কার্যকর হয়।
একই বছরের নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ১ জুলাই জাতীয় সংসদে মূল্য সংযোজন কর বিল উত্থাপন করেন।
৯ জুলাই বিলটি সংসদে পাস হয় এবং পরদিন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়ে আইনে পরিণত হয়। এভাবেই বাংলাদেশে ভ্যাটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
শুরুতে সীমিত, পরে বিস্তৃত
প্রথমদিকে অল্প কয়েকটি পণ্যের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি বাড়ানো হয়।
বর্তমানে উৎপাদন, আমদানি, পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়, বিভিন্ন পেশাগত সেবা, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, হোটেলসহ অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে ভ্যাট প্রযোজ্য। ফলে এটি এখন সরকারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজস্ব উৎসগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও আছে
তিন দশকের বেশি সময় পরও ভ্যাট ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি।
ভোক্তা অধিকারকর্মী ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠান ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করলেও তা পুরোপুরি সরকারি কোষাগারে জমা দেয় না। এখনও দেশের অধিকাংশ দোকানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ব্যবহার হয় না। অনেক দোকান বিল বা রসিদও দেয় না, ফলে প্রকৃত লেনদেন গোপন রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
এছাড়া সংবাদপত্র, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন এবং কিছু সেবাখাতের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে ভ্যাট ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগে অসংগতি ও বৈষম্য রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভ্যাটের প্রভাব
সব বিতর্ক সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করেন, ১৯৯১ সালে ভ্যাট চালুর সিদ্ধান্ত ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার।
কারণ এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি বিস্তৃত হয়েছে, আমদানি শুল্কনির্ভরতা কমেছে এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যয় মেটানোর জন্য একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল আয়ের উৎস তৈরি হয়েছে।
আজ দেশের সড়ক, সেতু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়নের বড় একটি অংশ আসে এই মূসক থেকেই। তীব্র বিরোধিতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে ১৯৯১ সালে শুরু হওয়া ভ্যাট ব্যবস্থা বাংলাদেশের আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) চালুর ঘটনাটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎসগুলোর একটি হলো মূসক। প্রতি বছর সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে এই খাত থেকে। কিন্তু এই ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্যাপক বিতর্ক, ব্যবসায়ীদের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
ভ্যাট কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট হলো একটি পরোক্ষ কর। কোনো পণ্য বা সেবা ক্রয়ের সময় ক্রেতা মূল দামের সঙ্গে অতিরিক্ত যে কর পরিশোধ করেন, সেটিই ভ্যাট। যদিও করটি সরকারের কাছে জমা দেয় বিক্রেতা, প্রকৃত অর্থে এর ভার বহন করেন যিনি সর্বশেষ পণ্য বা সেবা গ্রহণ করেন তিনি।
ভ্যাটের মূল ধারণা হলো উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যে অতিরিক্ত মূল্য সংযোজিত হয়, তার ওপর কর আরোপ করা। ফলে এটি একদিকে সরকারের জন্য স্থিতিশীল রাজস্ব উৎস, অন্যদিকে কর ফাঁকি কমানোর একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমানে বাংলাদেশে সাধারণ ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ। তবে বিভিন্ন খাতে ১ দশমিক ৫ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কিংবা ১০ শতাংশের বিশেষ হারও প্রযোজ্য।
বিশ্বে ভ্যাটের সূচনা
ভ্যাটকে আধুনিক করব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন বলা হয়। এর ধারণা প্রথম দেন জার্মান ব্যবসায়ী ভন সিমেন্স ১৯২০ সালে। পরে ১৯২১ সালে অর্থনীতিবিদ এডামসের কার্যকর কাঠামো ব্যাখ্যা করেন।
যদিও করের এই ধারণার শিকড় আরও পুরোনো, আধুনিক অর্থে প্রথম ভ্যাট চালু করে ফ্রান্স ১৯৫৪ সালে। এরপর ইউরোপের অন্যান্য দেশেও দ্রুত এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ প্রচলিত বিক্রয় করের তুলনায় ভ্যাট ছিল বেশি স্বচ্ছ, কার্যকর এবং রাজস্ববান্ধব।
বর্তমানে বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে কোনো না কোনো রূপে ভ্যাট কার্যকর রয়েছে।
বাংলাদেশে ভ্যাটের প্রয়োজন কেন দেখা দিল
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ের প্রধান উৎস ছিল আমদানি শুল্ক, আবগারি শুল্ক এবং বিক্রয় কর। কিন্তু আশির দশকে অর্থনীতির আকার বাড়তে শুরু করলে দেখা যায়, বিদ্যমান করব্যবস্থা দিয়ে পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না।
১৯৭৯ সালে গঠিত করারোপ তদন্ত কমিশন প্রথমবারের মতো বিক্রয় করের বিকল্প হিসেবে ভ্যাট চালুর চিন্তা করে। তবে তখন বিষয়টি নীতিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল।
১৯৮২ সালে বিক্রয় কর অধ্যাদেশ জারি করে পুরোনো বিক্রয় কর আইনের পরিবর্তন আনা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। সরকার বুঝতে পারে, অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি আধুনিক করব্যবস্থা প্রয়োজন।
এই সময় বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের রাজস্ব সংস্কারের বিষয়ে আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। বিশেষ করে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
আইএমএফের সম্পৃক্ততা এবং আহসান এইচ মনসুরের ভূমিকা
ভ্যাট চালুর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। সে সময় তিনি আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টে সিনিয়র ইকোনমিস্ট হিসেবে কাজ করছিলেন।
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. ওয়াহিদুল হক ১৯৮৯ সালে আইএমএফকে বাংলাদেশের রাজস্বব্যবস্থা উন্নয়নে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানান। সেই অনুরোধের ভিত্তিতে আইএমএফ একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে পাঠায়, যেখানে আহসান এইচ মনসুরও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
তাদের মূল দায়িত্ব ছিল—বাংলাদেশে ভ্যাট চালু করা সম্ভব কি না, এবং সম্ভব হলে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ প্রদান।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশ পরিদর্শন
বাংলাদেশে এসে আইএমএফের প্রতিনিধিদল শুধু নীতিগত বিশ্লেষণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ভারতের মতো দেশ পরিদর্শন করে ভ্যাটের বাস্তব প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ করে।
সেসব দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পায়, ভ্যাট ব্যবস্থা রাজস্ব বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয় যে বাংলাদেশেও সফলভাবে ভ্যাট চালু করা সম্ভব।
ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতা
ভ্যাট চালু করা মোটেও সহজ ছিল না।
সরকার যখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে, তখন অনেক ব্যবসায়ী এর বিরোধিতা করেন। কারণ ভ্যাট চালু হলে বিক্রয় ও হিসাব ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে হতো, যা অনেকের কাছে অতিরিক্ত প্রশাসনিক বোঝা হিসেবে মনে হয়েছিল।
আহসান এইচ মনসুরের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় হাজার হাজার মানুষ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবন ঘেরাও করে ‘ভ্যাট চলবে না’ স্লোগান দিয়েছিল। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে নতুন করব্যবস্থা তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
তবু সরকার পিছু হটেনি। কারণ নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস ছিল, দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য উপকারী হবে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং আইনি জটিলতা
১৯৯০ সালে ভ্যাট আইন চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। কিন্তু ঠিক তখনই গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।
ডিসেম্বর ১৯৯০-এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে এবং রাষ্ট্রপতি হন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। সে সময় সংসদ না থাকায় ভ্যাট আইন সংসদে পাস করার সুযোগ ছিল না। ফলে সিদ্ধান্ত হয় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটি কার্যকর করা হবে।
প্রথমদিকে শাহাবুদ্দিন আহমেদ এতে অনীহা প্রকাশ করেন। তার যুক্তি ছিল, তিনি একটি অস্থায়ী সরকারের প্রধান, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে এমন আইন জারি করা তার জন্য নৈতিকভাবে অস্বস্তিকর।
তবে রাজস্ব ক্ষতির সম্ভাবনা এবং বাজেট বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত তিনি সম্মতি দেন।
১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা
১৯৯১ সালের ৩১ মে মূল্য সংযোজন কর অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর কিছু ধারা ২ জুন থেকে এবং বাকি অংশ ১ জুলাই ১৯৯১ থেকে কার্যকর হয়।
একই বছরের নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ১ জুলাই জাতীয় সংসদে মূল্য সংযোজন কর বিল উত্থাপন করেন।
৯ জুলাই বিলটি সংসদে পাস হয় এবং পরদিন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়ে আইনে পরিণত হয়। এভাবেই বাংলাদেশে ভ্যাটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
শুরুতে সীমিত, পরে বিস্তৃত
প্রথমদিকে অল্প কয়েকটি পণ্যের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি বাড়ানো হয়।
বর্তমানে উৎপাদন, আমদানি, পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়, বিভিন্ন পেশাগত সেবা, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, হোটেলসহ অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে ভ্যাট প্রযোজ্য। ফলে এটি এখন সরকারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজস্ব উৎসগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও আছে
তিন দশকের বেশি সময় পরও ভ্যাট ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি।
ভোক্তা অধিকারকর্মী ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠান ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করলেও তা পুরোপুরি সরকারি কোষাগারে জমা দেয় না। এখনও দেশের অধিকাংশ দোকানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ব্যবহার হয় না। অনেক দোকান বিল বা রসিদও দেয় না, ফলে প্রকৃত লেনদেন গোপন রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
এছাড়া সংবাদপত্র, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন এবং কিছু সেবাখাতের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে ভ্যাট ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগে অসংগতি ও বৈষম্য রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভ্যাটের প্রভাব
সব বিতর্ক সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করেন, ১৯৯১ সালে ভ্যাট চালুর সিদ্ধান্ত ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার।
কারণ এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি বিস্তৃত হয়েছে, আমদানি শুল্কনির্ভরতা কমেছে এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যয় মেটানোর জন্য একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল আয়ের উৎস তৈরি হয়েছে।
আজ দেশের সড়ক, সেতু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়নের বড় একটি অংশ আসে এই মূসক থেকেই। তীব্র বিরোধিতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে ১৯৯১ সালে শুরু হওয়া ভ্যাট ব্যবস্থা বাংলাদেশের আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাধারণত নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পালন করে। তবে এসব সরকারের সামনে শুধু ভোট আয়োজনের চ্যালেঞ্জই ছিল না, একই সঙ্গে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং জনগণের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বও ছিল।
৩ মিনিট আগে
বাংলাদেশে জাতীয় বাজেট রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক ও আইনিপ্রক্রিয়া। একই সাথে এটি আয়-ব্যয়ের একটি বার্ষিক হিসাব। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বিভিন্ন সময়ে বাজেটকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার বার্ষিক প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের ইতিহাস শুরু হয়েছিল এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, ভেঙে পড়া অর্থনীতি, খাদ্যসংকট এবং সীমিত রাজস্ব আয়।
২ ঘণ্টা আগে
চলমান অস্থিরতায় বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়া বেড়েই চলেছে। সাধারণ গ্রাহকের পাশাপাশি এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির ঘনিষ্ঠরা। সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েও তাদের অনেকে আমানত তুলছেন কিংবা হিসাব বন্ধ করছেন।
১৮ ঘণ্টা আগে