বাংলাদেশের ভালো-মন্দ
স্ট্রিম ডেস্ক

‘মাঝে মাঝে চেষ্টা করে দেখা অন্য সব ধরন বাদ দিলে, গণতন্ত্রই হলো সরকারের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপ।’ ১৯৪৭ সালে উইনস্টন চার্চিল যখন এই বিখ্যাত পরিহাসটি করেছিলেন, তখন তিনি একটি রূঢ় সত্যকেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে, গণতন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ হলেও এটিই এখন পর্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক বিকল্পগুলোর চেয়ে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশের অর্থনীতি তাঁর এই বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। এই পুনরুদ্ধার মোটেও সহজ ছিল না এবং বাস্তব ঝুঁকিগুলো এখনো রয়ে গেছে।
গণতন্ত্র এখনো ত্রুটিপূর্ণ। ১৫ বছরের শাসনে ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের হাল ধরেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের ১৮ মাসের শাসনের পর এখন একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় বসেছে।
কোনো সংকট দেখা দিলেই ‘আগেই ভালো ছিলাম’ বলে আক্ষেপ শোনা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলজুড়েই এই আক্ষেপগুলো শোনা গিয়েছিল।
এই আক্ষেপগুলো কি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, স্মৃতিকাতরতা (নস্টালজিয়া), নাকি ক্ষমতাচ্যুত কোনো শক্তির সমর্থকদের অপপ্রচারের ফসল?
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার সুবাদে এখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপথের দিকে নজর দেওয়াই যায়।
উপাত্তগুলো এমন এক জাতির গল্প বলে, যারা ঘুরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট লক্ষণ দেখাচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে অন্তত ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, তখন তারা ২০২৪ অর্থবছরের শেষে একটি চরম বিধ্বস্ত অর্থনীতি রেখে গিয়েছিল।
বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা, সংকুচিত বৈদেশিক রিজার্ভ এবং অসহনীয় দুই অঙ্কের খাদ্য মূল্যস্ফীতির মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারকে অর্থনৈতিক সংস্কারের এক বিশাল কাজের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
সৌভাগ্যবশত তাদের স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা ২০২৫ ও ২০২৬ অর্থবছরে প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে ইতিবাচক ধারার সূচনা করেছিল। এখন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার তাদের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ করে যখন ২০২৭ অর্থবছরে পা রাখছে, তখন উপাত্তগুলো পুনরুদ্ধারের একটি সুস্পষ্ট পথ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ অর্থবছরের সঙ্গে ২০২৬ অর্থবছরের তুলনা করলে আমরা এমন একটি দেশকে দেখতে পাই যারা সক্রিয়ভাবে তাদের আর্থিক প্রতিরক্ষাকে সুদৃঢ় করছে, কৌশলগতভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করছে এবং আবারও তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দুটি চালিকাশক্তির ওপর নির্ভর করছে—প্রবাসী জনশক্তি এবং তৈরি পোশাক খাত।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্স ইনফ্লো ডেটাসেট অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণ ২০২৪ অর্থবছরে ২৩,৯১২ দশমিক ২২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে ৩৫,৫৯১ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এটি অর্থনীতিতে তারল্য প্রবাহ বাড়িয়েছে এবং ডলারের সংকটকে সহজ করেছে, যা একসময় বাণিজ্যকে স্থবির করে দিয়েছিল।
তৈরি পোশাক খাত এখনো দেশের রপ্তানির মেরুদণ্ড। বিজিএমইএর এক্সপোর্ট পারফরম্যান্স ডেটাসেট অনুযায়ী, রপ্তানি কিছুটা বেড়ে ৩৬,১৫১ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলার থেকে ৩৮,৭০১ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই ডেটাসেট থেকে আরও জানা যায়, একই সময়ে পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট রপ্তানি আয় ৪৪,৪৬৯ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৮,০০০.০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে স্পষ্ট স্বস্তিটি এসেছে বাজারে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্যমতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি যা ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২৬ অর্থবছরে তা ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তবে এর নিম্নমুখী প্রবণতা এটাই নির্দেশ করে, সরকারের মুদ্রানীতি ও উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা কাজ করতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের (বার্ষিক) ডেটাসেট অনুযায়ী, মোট বৈদেশিক রিজার্ভ ২৬,৭১৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৭,৫৭৮ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (বিপিএম৬) অনুযায়ী, রিজার্ভ ২১,৬৮৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২,৯৩০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
এর একটি অংশ এসেছে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক আমদানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে ৭২,৯১৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৬ অর্থবছরে ৭০,৪১০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি মুদ্রাকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করলেও দীর্ঘায়িত আমদানি বিধিনিষেধের ঝুঁকি রয়েছে। যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠলে শিল্প প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনৈতিক উন্নতি সত্ত্বেও জ্বালানি খাতের হিসাব গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের (ইএমআরডি) তথ্যমতে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ২০২৪ অর্থবছরের ৭৪৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ২০২৬ অর্থবছরে ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির মূল ভিত্তি জ্বালানি শিল্প। পেট্রোবাংলার ২০২৩-২৪ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আটটি গ্রাহক শ্রেণি মিলে মোট ৯১৬ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ (৩৬৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছে। এরপর রয়েছে ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ (১৭৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ঘনফুট), শিল্প খাতে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ (১৬৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনফুট), আবাসিক ব্যবহারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ (১০০ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট), সার উৎপাদনে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ (৫০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুট), সিএনজিতে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ (৪৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট) এবং বাণিজ্যিক ও চা বাগান মিলিয়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ (৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুট)।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বেশির ভাগই আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত থেকে। একইভাবে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়।
যেহেতু হরমুজ প্রণালি এসব জ্বালানি পরিবহনের প্রধান পথ, তাই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটে।
বর্তমানে দৈনন্দিন গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে। তবে ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়।
দেশে ২৯,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বর্তমানে প্রকৃত উৎপাদন মাত্র ১৪,০০০ মেগাওয়াটের সামান্য বেশিতে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে গৃহস্থালি, পরিবহন, শিল্প-প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
গ্যাস সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার অর্থ হলো, বেশি দামে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর অধিক নির্ভরতা, যা লেনদেনের ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস) অন্যান্য জায়গা থেকে আসা অর্জনগুলো গ্রাস করে নিতে পারে। তৈরি পোশাক খাতকে যদি তার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হয়, তবে একটি স্থিতিশীল এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য হবে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক অ্যাটলাস অব গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের তথ্যমতে, মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ৩৫ দশমিক ২৫ এমবিপিএস থেকে বেড়ে ৪৩ এমবিপিএস হয়েছে, যেখানে ব্রডব্যান্ডের গতি ৩৮ দশমিক ৬৫ এমবিপিএস থেকে বেড়ে ৬৬ এমবিপিএসে পৌঁছেছে। ইন্টারনেটের এই উল্লম্ফন দেশকে আইটি এবং প্রযুক্তি-নির্ভর সেবায় বহুমুখীকরণের দিকে এগোতে সাহায্য করবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস: মান্থলি আপডেট (জুন ২০২৬)’ বলছে, কৃষিজ উৎপাদন ৪১ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ৪৫ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন টন হবে বলে আশা করা হচ্ছে; যা বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের বিপরীতে একটি ঢাল হিসেবে কাজ করবে এবং এটি মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করার অন্যতম প্রধান কারণ।
সব মিলিয়ে এই পরিসংখ্যানগুলো এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ঝড়ের সবচেয়ে খারাপ সময়টি পার করে এসেছে। প্রবাসীদের ওপর নির্ভর করে, পোশাক রপ্তানি অব্যাহত রেখে এবং সতর্কতার সঙ্গে আমদানি পরিচালনা করে সরকার রিজার্ভ পুনর্গঠন করেছে এবং মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে শুরু করেছে।
এখন কাজ হলো সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে স্বস্তিদায়ক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়া। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়াটা এ কথাই মনে করিয়ে দেয় যে, যদিও তাৎক্ষণিক সংকট হয়তো কমতে শুরু করেছে, একটি মধ্যম আয়ের অর্থনীতিকে চালিত করার আরও কঠিন কাজটি সবেমাত্র শুরু হচ্ছে।

‘মাঝে মাঝে চেষ্টা করে দেখা অন্য সব ধরন বাদ দিলে, গণতন্ত্রই হলো সরকারের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপ।’ ১৯৪৭ সালে উইনস্টন চার্চিল যখন এই বিখ্যাত পরিহাসটি করেছিলেন, তখন তিনি একটি রূঢ় সত্যকেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে, গণতন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ হলেও এটিই এখন পর্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক বিকল্পগুলোর চেয়ে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশের অর্থনীতি তাঁর এই বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। এই পুনরুদ্ধার মোটেও সহজ ছিল না এবং বাস্তব ঝুঁকিগুলো এখনো রয়ে গেছে।
গণতন্ত্র এখনো ত্রুটিপূর্ণ। ১৫ বছরের শাসনে ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের হাল ধরেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের ১৮ মাসের শাসনের পর এখন একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় বসেছে।
কোনো সংকট দেখা দিলেই ‘আগেই ভালো ছিলাম’ বলে আক্ষেপ শোনা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলজুড়েই এই আক্ষেপগুলো শোনা গিয়েছিল।
এই আক্ষেপগুলো কি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, স্মৃতিকাতরতা (নস্টালজিয়া), নাকি ক্ষমতাচ্যুত কোনো শক্তির সমর্থকদের অপপ্রচারের ফসল?
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার সুবাদে এখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপথের দিকে নজর দেওয়াই যায়।
উপাত্তগুলো এমন এক জাতির গল্প বলে, যারা ঘুরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট লক্ষণ দেখাচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে অন্তত ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, তখন তারা ২০২৪ অর্থবছরের শেষে একটি চরম বিধ্বস্ত অর্থনীতি রেখে গিয়েছিল।
বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা, সংকুচিত বৈদেশিক রিজার্ভ এবং অসহনীয় দুই অঙ্কের খাদ্য মূল্যস্ফীতির মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারকে অর্থনৈতিক সংস্কারের এক বিশাল কাজের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
সৌভাগ্যবশত তাদের স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা ২০২৫ ও ২০২৬ অর্থবছরে প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে ইতিবাচক ধারার সূচনা করেছিল। এখন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার তাদের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ করে যখন ২০২৭ অর্থবছরে পা রাখছে, তখন উপাত্তগুলো পুনরুদ্ধারের একটি সুস্পষ্ট পথ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ অর্থবছরের সঙ্গে ২০২৬ অর্থবছরের তুলনা করলে আমরা এমন একটি দেশকে দেখতে পাই যারা সক্রিয়ভাবে তাদের আর্থিক প্রতিরক্ষাকে সুদৃঢ় করছে, কৌশলগতভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করছে এবং আবারও তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দুটি চালিকাশক্তির ওপর নির্ভর করছে—প্রবাসী জনশক্তি এবং তৈরি পোশাক খাত।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্স ইনফ্লো ডেটাসেট অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণ ২০২৪ অর্থবছরে ২৩,৯১২ দশমিক ২২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে ৩৫,৫৯১ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এটি অর্থনীতিতে তারল্য প্রবাহ বাড়িয়েছে এবং ডলারের সংকটকে সহজ করেছে, যা একসময় বাণিজ্যকে স্থবির করে দিয়েছিল।
তৈরি পোশাক খাত এখনো দেশের রপ্তানির মেরুদণ্ড। বিজিএমইএর এক্সপোর্ট পারফরম্যান্স ডেটাসেট অনুযায়ী, রপ্তানি কিছুটা বেড়ে ৩৬,১৫১ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলার থেকে ৩৮,৭০১ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই ডেটাসেট থেকে আরও জানা যায়, একই সময়ে পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট রপ্তানি আয় ৪৪,৪৬৯ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৮,০০০.০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে স্পষ্ট স্বস্তিটি এসেছে বাজারে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্যমতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি যা ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২৬ অর্থবছরে তা ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তবে এর নিম্নমুখী প্রবণতা এটাই নির্দেশ করে, সরকারের মুদ্রানীতি ও উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা কাজ করতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের (বার্ষিক) ডেটাসেট অনুযায়ী, মোট বৈদেশিক রিজার্ভ ২৬,৭১৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৭,৫৭৮ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (বিপিএম৬) অনুযায়ী, রিজার্ভ ২১,৬৮৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২,৯৩০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
এর একটি অংশ এসেছে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক আমদানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে ৭২,৯১৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৬ অর্থবছরে ৭০,৪১০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি মুদ্রাকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করলেও দীর্ঘায়িত আমদানি বিধিনিষেধের ঝুঁকি রয়েছে। যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠলে শিল্প প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনৈতিক উন্নতি সত্ত্বেও জ্বালানি খাতের হিসাব গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের (ইএমআরডি) তথ্যমতে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ২০২৪ অর্থবছরের ৭৪৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ২০২৬ অর্থবছরে ৭০০ বিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির মূল ভিত্তি জ্বালানি শিল্প। পেট্রোবাংলার ২০২৩-২৪ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আটটি গ্রাহক শ্রেণি মিলে মোট ৯১৬ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ (৩৬৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছে। এরপর রয়েছে ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ (১৭৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ঘনফুট), শিল্প খাতে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ (১৬৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ঘনফুট), আবাসিক ব্যবহারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ (১০০ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট), সার উৎপাদনে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ (৫০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুট), সিএনজিতে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ (৪৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট) এবং বাণিজ্যিক ও চা বাগান মিলিয়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ (৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুট)।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বেশির ভাগই আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত থেকে। একইভাবে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়।
যেহেতু হরমুজ প্রণালি এসব জ্বালানি পরিবহনের প্রধান পথ, তাই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটে।
বর্তমানে দৈনন্দিন গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে। তবে ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়।
দেশে ২৯,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বর্তমানে প্রকৃত উৎপাদন মাত্র ১৪,০০০ মেগাওয়াটের সামান্য বেশিতে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে গৃহস্থালি, পরিবহন, শিল্প-প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
গ্যাস সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার অর্থ হলো, বেশি দামে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর অধিক নির্ভরতা, যা লেনদেনের ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস) অন্যান্য জায়গা থেকে আসা অর্জনগুলো গ্রাস করে নিতে পারে। তৈরি পোশাক খাতকে যদি তার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হয়, তবে একটি স্থিতিশীল এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য হবে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক অ্যাটলাস অব গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের তথ্যমতে, মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ৩৫ দশমিক ২৫ এমবিপিএস থেকে বেড়ে ৪৩ এমবিপিএস হয়েছে, যেখানে ব্রডব্যান্ডের গতি ৩৮ দশমিক ৬৫ এমবিপিএস থেকে বেড়ে ৬৬ এমবিপিএসে পৌঁছেছে। ইন্টারনেটের এই উল্লম্ফন দেশকে আইটি এবং প্রযুক্তি-নির্ভর সেবায় বহুমুখীকরণের দিকে এগোতে সাহায্য করবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস: মান্থলি আপডেট (জুন ২০২৬)’ বলছে, কৃষিজ উৎপাদন ৪১ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ৪৫ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন টন হবে বলে আশা করা হচ্ছে; যা বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের বিপরীতে একটি ঢাল হিসেবে কাজ করবে এবং এটি মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করার অন্যতম প্রধান কারণ।
সব মিলিয়ে এই পরিসংখ্যানগুলো এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ঝড়ের সবচেয়ে খারাপ সময়টি পার করে এসেছে। প্রবাসীদের ওপর নির্ভর করে, পোশাক রপ্তানি অব্যাহত রেখে এবং সতর্কতার সঙ্গে আমদানি পরিচালনা করে সরকার রিজার্ভ পুনর্গঠন করেছে এবং মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে শুরু করেছে।
এখন কাজ হলো সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে স্বস্তিদায়ক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়া। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়াটা এ কথাই মনে করিয়ে দেয় যে, যদিও তাৎক্ষণিক সংকট হয়তো কমতে শুরু করেছে, একটি মধ্যম আয়ের অর্থনীতিকে চালিত করার আরও কঠিন কাজটি সবেমাত্র শুরু হচ্ছে।
.png)

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পাবে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সচিবালয়ে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) আলোচনা সমাপ্তের যৌথ ঘোষণা দেন দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী।
১৩ ঘণ্টা আগে
তৈরি পোশাক শিল্পে চীনা বিনিয়োগ বাড়াতে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং ওভারসিজ চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশ (ওকাইব)।
১৫ ঘণ্টা আগে
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পাবে। সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য কোরিয়ার বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।
১৮ ঘণ্টা আগে
নতুন অর্থবছরের (২০২৬-২৭) প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে ৩৮৯ কোটি ডলারের রপ্তানিকে ইতিবাচক সূচনা হিসেবেই দেখছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি।
১৯ ঘণ্টা আগে