গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে থমকে উৎপাদন, ছাঁটাই আতঙ্ক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নারায়ণগঞ্জ ও সাভার

স্ট্রিম গ্রাফিক

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদন থমকে গেছে। কোথাও উৎপাদন ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ নেমে গেছে। আবার কোথাও বন্ধ রাখতে হচ্ছে কারখানার গ্যাসনির্ভর ইউনিট। এরই মধ্যে কয়েকটি কারখানায় ছাঁটাইয়ের ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বিভিন্ন কারখানা ঘুরে গ্যাস সংকটের কারণে একাধিক কারখানা বন্ধ রাখার তথ্য পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি এসব কারখানার সংশ্লিষ্টরা। একই চিত্র সাভার–আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে। স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ ১০ থেকে ১৫ পিএসআই হলেও, বর্তমানে মিলছে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৮।

গ্যাস সংকটের প্রভাবে গত ৬ আগস্ট সাধারণ কর্মদিবসে নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ গার্মেন্টস কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল স্ট্রিমকে বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ডাইং কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে গেছে। কাপড় রং করা ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি রপ্তানি আদেশও কমেছে। এসব কারণে অনেক কারখানা বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার ছুটি দিয়েছে।

তাঁর দেওয়া তথ্যে, নারায়ণগঞ্জের বিসিক শিল্পনগরীতে মোট ২৫৬টি গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে গত দুই বছরে ১২২টি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু থাকা ১৩৪ কারখানার অধিকাংশ বৃহস্পতিবার বন্ধ ছিল। বিসিকের বাইরের রপ্তানিমুখী ও সাব-কন্ট্রাক্টভিত্তিক অধিকাংশ কারখানা বন্ধ ছিল।

তবে শহরের পুলিশ লাইন এলাকার রহমান গার্মেন্টসের সিনিয়র ডিজিএম শিহাব উদ্দিন দেন কিছুটা ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেন, বুধবার সরকারি ছুটি এবং শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় মাঝে বৃহস্পতিবারেও ছুটি দেওয়া হয়। এজন্য গত শুক্রবার অতিরিক্ত কাজ করিয়ে ছুটি সমন্বয় করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সাভার–আশুলিয়ায় গ্যাসের স্বল্প চাপের কারণে অধিকাংশ কারখানার বয়লার, জেনারেটরসহ বিভিন্ন উৎপাদনযন্ত্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। অন্তত ১০টি কারখানা ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য যেখানে গ্যাসের চাপ ১০ থেকে ১৫ পিএসআই থাকা প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে ৫ থেকে ৮।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশুলিয়ার এক কারখানা মালিক বলেন, বারবার গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বয়লার চালানো যাচ্ছে না। শ্রমিকরা অলস বসে আছেন। বিদ্যুৎ সংকটে আয়রন সেকশনও বন্ধ। গেল সপ্তাহের তুলনায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়েছে। এতে আংশিক কাজ সচল করার চেষ্টা চলছে।

আরেকটি কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বিদ্যুৎ থাকলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সব মেশিন বন্ধ থাকছে। এতে মালিকদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। কেউ কেউ কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়েও ভাবছেন বলে জানান তিনি।

সাভার–আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ২০০ কারখানা রয়েছে। কারখানার বয়লার ও আয়রন সেকশন রয়েছে- এমন কারখানায় সংকট বেশি। তবে ঠিক কতটি কারখানায় সংকট রয়েছে বা কতটি বন্ধ রয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটেও ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। দিনে চারবার লোডশেডিং হলে উৎপাদন শতকরা ১৫ শতাংশ কমে যায় বলে জানান শিল্প মালিকরা। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে দিনে ৮ থেকে ১০ বার লোডশেডিং হচ্ছে। এতে কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানান তাঁরা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ও সাপ্তাহিক ছুটিকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে টানা তিন দিন গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ব্যবহারের ওপর চাপ কমে। লোডশেডিং কমার সুবিধা নিতে ফতুল্লার পঞ্চবটি বিসিক হোসিয়ারি পল্লীর ৪৬৫টি নিটিং কারখানা বন্ধের দিনেও চালু রাখা হয়।

বিসিক হোসিয়ারি পল্লী মালিক সমিতির পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘ছুটির দিনে বিসিকের অধিকাংশ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ওপর চাপ কম থাকে। ফলে লোডশেডিং কম হওয়ার সুযোগে নিটিং কারখানাগুলো উৎপাদন ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।’

তবে এই দুই শিল্পাঞ্চলের মাঠপর্যায়ের চিত্রের সঙ্গে শিল্প পুলিশের বক্তব্যে পার্থক্য চোখে পড়ে। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জে গ্যাসের চাপ কম থাকলেও, কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি বলে দাবি শিল্প পুলিশ-৪-এর পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদের। তবে বেশ কিছু কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি।

আবদুল্লাহ আল মাহমুদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জে ২২টি কারখানা বিভিন্ন পর্যায়ে ৪০, ৫০ এমনকি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত তাদের উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়েছে।’

পুলিশ লাইন এলাকার দুটি কারখানা গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ হয়েছে— এমন একটি অভিযোগের বিষয়ে আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘ওই দুটি কারখানা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে গ্যাস সংকটের সম্পর্ক নেই। মালিকের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বন্ধ হয়েছে।’

শিল্প পুলিশ-৪-এর আওতায় নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জে আরএমজি, নন-আরএমজি ও অন্যান্য সংগঠন মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৭৬৬টি কারখানা রয়েছে। গ্যাস সংকট নিয়ে এসব কারখানা থেকে কোনো অভিযোগ আসেনি বলেও জানান আবদুল্লাহ আল মাহমুদ।

নারায়ণগঞ্জে শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে কিনা প্রশ্নে তিনি জানান, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের তথ্য রয়েছে। তবে এর সঙ্গে গ্যাস সংকটের সম্পর্ক নেই। কিছু কারখানায় অল্পসংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। এর মধ্যে শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, আচরণ, মারামারিসহ বিভিন্ন কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ গার্মেন্টস এলাকা। গার্মেন্টসের কাজ চালিয়ে রাখতে এখানে গ্যাসের প্রয়োজন খুব বেশি। তাই বিশেষ ব্যবস্থায় হলেও এই অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ করা জরুরি।’

নারায়ণগঞ্জ জেলায় রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস, সাব-কন্ট্রাক্ট গার্মেন্টস, ডাইং, নিটিং, প্রিন্টিং, প্রসেসিং, প্যাকেজিংসহ পোশাকশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ২ হাজার ২০০টি কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন।

ছাঁটাই আতঙ্কে কর্মীরা

উৎপাদন সংকটের মধ্যেই সাভার–আশুলিয়ায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। গত ৫ আগস্ট ছুটির দিনে আশুলিয়ার অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিট লিমিটেডের ৫৬৫ শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেওয়া হয়। এর পরপরই শ্রমিকদের মধ্যে চাকরিচ্যুতির শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে।

শ্রমিক ছাঁটাই করা কারখানার কর্তৃপক্ষ বলছে, মারাত্মক ব্যবসায়িক মন্দায় ব্যাংক ঋণসহ প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা না পাওয়া এবং পর্যাপ্ত কার্যাদেশ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত শ্রমিক ছাঁটাইয়ে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

তবে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। ছাঁটাই হওয়া এক শ্রমিক জানান, এই ছাঁটাই আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। গ্যাস বা বিদ্যুতের সংকটের কারণে কারখানায় কাজ বন্ধ ছিল না কিংবা অতিরিক্ত চাপও ছিল না। আমরা নিয়মিত কাজ করেছি।

আরেক তৈরি পোশাক কারখানার এক শ্রমিক বলেন, বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণে যেসব কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সেখানে কমসংখ্যক শ্রমিকদের ওপর কাজের চাপ বাড়িয়ে দিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট চলছে। এর প্রভাব শিল্পকারখানায় পড়ছে। এরই মধ্যে অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিটে ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাস্তবে গ্যাসের সংকট যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু মালিক এই পরিস্থিতিকে ছাঁটাইয়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে ছাঁটাইয়ের পর কম শ্রমিক দিয়ে আগের মতোই উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে।’

শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গ্যাসের কারণে এখন বড় প্রভাব নাই। যেগুলো আছে বিদ্যুতে চলে। তবে যেগুলো গ্যাসভিত্তিক, এরমধ্যে লুসাকা, মুন্নু সিরামিকের মতো কারখানা গ্যাসের প্রভাবে বন্ধ রয়েছে।’

পণ্য শিপমেন্ট নিয়ে অনিশ্চয়তা

বিজিএমইএর সহসভাপতি ও সফটেক্স কটন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজোয়ান সেলিম বলেন, ‘গ্যাস সংকটের প্রভাব সব ধরনের পোশাক কারখানায় সমানভাবে পড়ছে না। একেকটি কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া একেক রকম। যেসব কারখানায় ডাইং, ওয়াশিং বা অন্য কোনো গ্যাসনির্ভর প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। এসব কারখানার অনেক কাজ আপাতত বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’

শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সঙ্গে গ্যাস সংকটের সরাসরি সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের সঙ্গে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে যেসব উৎপাদনপ্রক্রিয়া গ্যাসের অভাবে চালানো যাচ্ছে না, সেসবের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

পণ্য শিপমেন্টের বিষয়ে রেজোয়ান বলেন, ‘অবশ্যই এর প্রভাব পড়বে। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাদের জানানো হয়েছে, এটি কোনো একক কারখানার সংকট নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। তাই শিপমেন্টের সময় বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার জন্যও ক্রেতাদের অনুরোধ করা হয়েছে।’

তিতাস গ্যাসের আশুলিয়া জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রকৌশলী আবু ছালেহ মুহাম্মদ খাদেমুদ্দীন বলেন, ‘মাসের শুরুর দিকের তুলনায় এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আরও উন্নতি হবে। এলএনজি যতটা আমদানি হয় তার এক চতুর্থাংশ ঘাটতি রয়েছে। সারা দেশেই পরিস্থিতি খারাপ।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত