স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট কেমন ছিল

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ১৬: ২১
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের ইতিহাস শুরু হয়েছিল এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, ভেঙে পড়া অর্থনীতি, খাদ্যসংকট এবং সীমিত রাজস্ব আয়।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা ও পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনার। সেই প্রয়োজন থেকেই ১৯৭২ সালের ৩০ জুন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ।

স্বাধীনতার পর এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক জাতীয় বাজেট। তাজউদ্দিন আহমেদ এই দিনে দুটি অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন। একটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য। অন্যটি ছিল ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেট।

যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। শিল্পকারখানার একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, কৃষি উৎপাদন কমে গিয়েছিল এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল অত্যন্ত সীমিত। এই পরিস্থিতিতে সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন। প্রথম বাজেট তাই কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব ছিল না, এটি ছিল নতুন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের রূপরেখা। এই বাজেট প্রণয়নের মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে সরকারকে পুনর্গঠন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু করার মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল।

কেমন ছিল প্রথম বাজেট

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। বর্তমান সময়ের বাজেটের সঙ্গে তুলনা করলে এই অঙ্ক খুবই ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চাভিলাষী একটি পরিকল্পনা।

এই বাজেটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যয়, পুনর্বাসন কর্মসূচি, কৃষি পুনরুদ্ধার, শিল্প খাত পুনর্গঠন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল। বিদেশি সাহায্য ও অনুদানের ওপরও তখন উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা ছিল।

কেন ঐতিহাসিক এই বাজেট

অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটকে শুধু একটি আর্থিক দলিল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রের অর্থনীতির আত্মপ্রকাশ। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য সরকার কীভাবে সম্পদ সংগ্রহ করবে, কোথায় ব্যয় করবে এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি কী হবে সেই দিকনির্দেশনা এতে উঠে এসেছিল। এই বাজেটের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থা, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী পাঁচ দশকে দেশের বাজেটের আকার শত শত গুণ বৃদ্ধি পেলেও সেই যাত্রার সূচনা হয়েছিল তাজউদ্দিন আহমেদের হাত ধরেই।

১৯৭২ সালে ৭৮৬ কোটি টাকার যে বাজেট দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট তার তুলনায় বহু গুণ বেশি। অর্থনীতির আকার, রাজস্ব সংগ্রহ, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। তবে ইতিহাসের পাতায় প্রথম বাজেটের গুরুত্ব আজও অম্লান। কারণ এটি ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনের যে স্বপ্ন নিয়ে তাজউদ্দিন আহমেদ সংসদে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই স্বপ্নের ভিত্তিতেই পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হয়।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত