বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রতিবেদন /পানিচক্রে চরম বিশৃঙ্খলা, ৩৫ বছরে সবচেয়ে অস্বাভাবিক নদীগুলোর ধারা
স্ট্রিম ডেস্ক

পৃথিবীর পানিচক্রে বিশৃঙ্খলা চলছে, নদীর পানি প্রবাহে অস্বাভাবিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, পুরনো হিমবাহগুলো গলে যাচ্ছে। ক্রমে অবনতির দিকে যাওয়া এমন বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কোথাও চরম খরা, আবার কোথাও তীব্র বন্যা দেখা দিচ্ছে। এক প্রতিবেদনে এসব তুলে ধরে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বলেছে, চলমান এই প্রবণতা ভবিষ্যতে মানবসমাজ ও অর্থনীতির জন্য চরম আশঙ্কাজনক পরিণতি বয়ে আনতে পারে।
১৭ সেপ্টেম্বর ‘স্টেট অব গ্লোবাল ওয়াটার রিসোর্সেস’ নামের প্রতিবেদনে এই শঙ্কা জানিয়েছে ডব্লিউএমও। বার্ষিক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শুষ্ক পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল ২০২৫ সালে। এসময় পৃথিবীর ৩৬ শতাংশ নদী অববাহিকায় পানির প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে কম ছিল। অ্যামাজন, লা প্লাটা, মধ্য ও পূর্ব আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের নদীগুলোতে পানিপ্রবাহের ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে নদীর প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।
ডব্লিউএমও জানিয়েছে, বিগত সাত বছরে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ থাকা নদীর সংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর মধ্যে এশিয়া ও আফ্রিকায় পানিজনিত চরম দুর্যোগ সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। গত পাঁচ বছরে খরা ও বন্যার মতো পানিসংক্রান্ত মৃত্যুর ৮০ শতাংশই ঘটেছে এই দুই অঞ্চলে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলোর মতে- ভূগর্ভস্থ পানি, বরফ ও হিমবাহ সাধারণত পৃথিবীর পানির সঞ্চয় বা ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্টের মতো কাজ করে। এই সঞ্চয় শুষ্ক মৌসুমে সংকট সামলাতে সাহায্য করে।
তিনি শঙ্কার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা পানির এই জমাকৃত সঞ্চয় শেষ করে ফেলছি। ২০১৪-২০১৬ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে, যা এক দশকব্যাপী চলতে থাকা সুস্পষ্ট সংকট। টানা চতুর্থ বছরের মতো পৃথিবীর প্রতিটি প্রধান হিমবাহ অঞ্চল তাদের বরফের ঘনত্ব হারিয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থাও অবনতির দিকে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী নজরদারিতে থাকা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূগর্ভস্থ উৎসের স্তর স্বাভাবিক সীমার নিচে চলে গিয়েছিল। আগের বছরের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতির পরিবর্তে এই ঘাটতি আরও বেড়েছে।’
অন্যদিকে অতিরিক্ত পানির কারণে দুর্যোগের নজীরও তাঁরা দেখছেন জানিয়ে সেলেস্তে বলেন, একই সঙ্গে আমরা পানি সংক্রান্ত দুর্যোগের প্রকোপ আরও বাড়তে দেখছি। শক্তিশালী হতে থাকা ‘এল নিনো’ কিছু অঞ্চলে খরা এবং অন্যান্য অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
বরফ গলার বিষয়ে প্রতিবেদনটিতে আশঙ্কাজনক তথ্য দেওয়া হয়েছে। টানা চতুর্থ বছরের মতো পৃথিবীর প্রতিটি প্রধান হিমবাহ অঞ্চল থেকে বরফ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক হিমবাহগুলো মোট ১,৪০০ গিগাটন বরফ হারিয়েছে, যা প্রায় ৫৬ কোটি অলিম্পিক সুইমিং পুলের পানির সমান। মধ্য ইউরোপ, ককেশাস এবং উত্তর আমেরিকার বেশ কিছু অঞ্চল ইতোমধ্যেই ‘পিক ওয়াটার’ বা হিমবাহ গলনের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জোর দিয়ে জানিয়েছে, নদী বা হিমবাহ কোনো দেশের রাজনৈতিক সীমানা মানে না। একটি দেশের হিমবাহ গলে গেলে তার প্রভাব পড়ে হাজার কিলোমিটার দূরে। ফলে বৈশ্বিক পানি সংকট মোকাবিলায় সব দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার সমন্বয় জরুরি।
.png)






