ইলিশের দেশে গুজরাটের ইলিশ : সংকেত কী

বাংলাদেশের বাজারে ভারতের গুজরাটের ইলিশ—খবরটি শুধু বাণিজ্যের নয়; জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নের।
এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ইলিশের উৎপাদন কমেছে টানা দুই বছর। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে প্রায় ৫ লাখ ৪ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।
গবেষকরা ইলিশের আকার ও প্রজননসক্ষমতা পরিবর্তনের কথাও বলছেন। চলতি বছরে ধরা পড়া ইলিশের মাত্র ২০-৩০ শতাংশে ডিম মিলছে। দু-তিন বছর আগে এটা ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। অতিক্ষুদ্র ফাঁসের জাল, অতিরিক্ত আহরণ, দূষণ ও নদী-সমুদ্রের পরিবর্তিত পরিবেশকে এর সম্ভাব্য কারণ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় গুজরাট থেকে ইলিশ আমদানি তাৎক্ষণিক বাজার-সমাধান হতে পারে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত দুই-তিন মাসে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ এসেছে। আরও ১৫০-২০০ টন আসার কথা। কিন্তু আমদানিতে ঘাটতি মেটানো আর ইলিশ সংকটের সমাধান তো এক নয়। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—যে দেশ বিপুল ইলিশ আহরণ করত; তাকে কেন ইলিশ আমদানিতে যেতে হচ্ছে?
ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়। এটি নদী, সাগর, জেলে, আড়তদার, পরিবহন খাত, বাজার ও উপকূলীয় অর্থনীতির বড় যোগসূত্র। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে যুক্ত এবং ২০-২৫ লাখ মানুষ নানাভাবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে উৎপাদন কমে গেলে তার অভিঘাত মাছের বাজার ছাড়িয়ে কর্মসংস্থান আর উপকূলীয় অর্থনীতিতেও পড়ে।
ইলিশ সম্পদ বৃদ্ধিতে ‘নিষেধাজ্ঞা’ অবশ্য প্রয়োজনীয়। সামনেই রয়েছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এটা চলাকলে যথারীতি জেলেদের খাদ্য সহায়তা জোগানো হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম করণীয় নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা। শুধু নদীতে অভিযান চালালে হবে না। প্রকৃত জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে সহায়তা পৌঁছাতে হবে সরাসরি। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেরা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়লে আইনের প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়বে।
দ্বিতীয়ত, ইলিশ ব্যবস্থাপনায় তথ্যের ঘাটতি দূর করা চাই। কোথায় কত মাছ ধরা পড়ছে, গড় ওজন কত, কত শতাংশ প্রজননক্ষম, কোন নদী বা মোহনায় জাটকা ও মা ইলিশের ঘনত্ব বেশি—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার।
তৃতীয়ত, ইলিশের জীবনচক্র নদী ও সমুদ্রে বিস্তৃত। এ ক্ষেত্রে নাব্যতা, দূষণ, ডুবোচর, জালের ধরন ও অতিরিক্ত আহরণ—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।
চতুর্থত, ইলিশ আমদানি ও রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ নীতি প্রয়োজন। বাজারে ঘাটতি থাকলে আমদানি হতে পারে। কিন্তু এর পরিমাণ, উৎস, মান এবং বিক্রির সময় পরিচয় স্পষ্ট থাকা দরকার।
সবশেষে প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, পরিমাপযোগ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। লক্ষ্য শুধু ‘উৎপাদন বাড়ানো’ নয়; লক্ষ্য হোক বড় ইলিশের অংশ বাড়ানো, প্রজননসক্ষমতা রক্ষা, জাটকা মৃত্যুহার কমানো, ক্ষতিকর জাল নির্মূল, জেলেদের আয় সুরক্ষা এবং নদী-সাগরের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার।
দেশের বাজারে গুজরাটের ইলিশ আসলে সতর্ক সংকেত। বাজারে এ মুহূর্তে কী পরিমাণ নিজস্ব ইলিশ মিলছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশের নদী ও সাগরে ইলিশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ কিনা। আমদানি সাময়িক ঘাটতি মেটাতে পারে; কিন্তু ইলিশের ভবিষ্যৎ কিনে দিতে পারে না। সেটি নিশ্চিত করতে গবেষণা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, জেলে সুরক্ষা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে এক সুতোয় বাঁধতে হবে।
.png)


