এল নিনোর উত্তাপ/ঝুঁকিতে খাদ্যনিরাপত্তা, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা

দেশে গত কয়েক বছরে তীব্র হয়েছে দাবদাহ। প্রখর তাপে রোজগার হারাচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। পুড়ে যাচ্ছে মাঠের ফসল। চরম এই আবহাওয়াতে ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা। সংস্থান হচ্ছে না প্রয়োজনীয় পুষ্টির। এর মধ্যেই নতুন করে চোখ রাঙাচ্ছে ‘এল নিনো’।
গবেষকরা সতর্ক করছেন, আগামী দুই-এক বছর দেশে এল নিনোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। তাপপ্রবাহে এমনিতেই সংকটে কৃষি ও জনস্বাস্থ্য। এর ওপর এল নিনো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। আর এই নীরব দুর্যোগের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন প্রান্তিক নারীরা।
সম্প্রতি ‘পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক’ (প্রাণ) প্রকাশিত এক নীতিপত্রে এসব আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। ‘তীব্র দাবদাহ: বাংলাদেশে খাদ্যের অধিকারে একটি নতুন দুর্যোগের ঝুঁকি’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা থাকলেও এল নিনো ও দাবদাহের মতো ধীরগতির দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশ অনেকটাই অপ্রস্তুত।
এল নিনোর প্রভাবে হুমকিতে কৃষি
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণ জলবায়ু চক্র। এই মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে সংঘটিত এনসো চক্রের দুটি বিপরীত অবস্থা হলো এল নিনো ও লা নিনা। নিরক্ষীয় পূর্ব উপকূলে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা ও ১২০ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমাংশের মধ্যবর্তী অঞ্চলে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রার মধ্যে অস্থিরতাকে বোঝাতে এনসো শব্দটি ব্যবহার করা হয়। লা নিনা হলো এনসোর শীতল অবস্থা, আর এল নিনো উষ্ণ।
এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে উষ্ণ পানি জমে থাকে এবং শীতল হামবোল্ট স্রোত দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যায়। যেমন ভারতীয় উপমহাদেশে বর্ষা দুর্বল হয়, দক্ষিণ আমেরিকায় অতিবৃষ্টি ঘটে এবং আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে খরা দেখা দেয়। লা নিনার সময় উল্টো প্রক্রিয়া ঘটে—শীতল স্রোতের প্রভাব বাড়ে ও সাগরের পানির তাপমাত্রা কমে যায়। ফলে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পায়।
এল নিনোবাংলাদেশে সাম্প্রতিক তীব্র দাবদাহের পেছনে বড় কারণ হলো এল নিনো। এর কারণে প্রকৃতি আরও রুক্ষ হয়ে উঠেছে। ‘প্রাণ’-এর নীতিপত্রে আশঙ্কা করা হয়েছে, এল নিনো ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। এর প্রভাবে চলতি বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, কম বৃষ্টিপাত ও অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের এই জোড়া আঘাত সরাসরি আমাদের কৃষিতে পড়বে। এতে চলতি আমন ধান, আসন্ন রবি ফসল ও পরবর্তী বোরো মৌসুমের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। একদিকে মাঠে ফসল পুড়বে, পুকুরে অক্সিজেনের অভাবে মাছ মারা যাবে, অন্যদিকে বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়বে। ফলে সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।
কর্মঘণ্টা হারিয়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতি
পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে দেশে দাবদাহের তীব্রতা বেড়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে দেশে দীর্ঘতম দাবদাহ রেকর্ড করা হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে অনুভূত তাপমাত্রা (হিট ইনডেক্স) ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছিল।
শুধু ২০২৪ সালেই দাবদাহের কারণে দেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। কৃষিশ্রমিকরা সে বছর গড়ে ৭৩২ ঘণ্টা কাজ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৭৮ কোটি ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।
‘প্রাণ’ ও ‘খানি বাংলাদেশ’-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সাতক্ষীরার বস্তিতে থাকা ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের কাছে কোনো খাদ্যপণ্য সঞ্চিত থাকে না। ফলে এক দিন কর্মহীন থাকলেই তারা চরম খাদ্যসংকটে পড়ে।
এ বিষয়ে ‘প্রাণ’-এর প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর উম্মে সালমা পপি স্ট্রিমকে বলেন, ‘জরিপে দেখা গেছে, বস্তির পরিবারগুলো মূলত বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কাজ না পেলে তারা দোকান থেকে বাকিতে খাবার কেনে অথবা ধারদেনা করে। সাধারণ শ্রমজীবীদের এক দিন কাজ বন্ধ থাকার অর্থ হলো চুলায় হাঁড়ি না চড়া। বাধ্য হয়ে তাদের ঋণ নিতে হয় অথবা শেষ সম্বল গবাদিপশু বিক্রি করতে হয়। এমনকি টানাটানির সংসারে শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে কাজে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে।’
বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা
দাবদাহে সমাজের সব স্তরের মানুষ ক্ষতির মুখে পড়লেও সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে নারীদের ওপর। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুরুষপ্রধান পরিবারের তুলনায় নারীপ্রধান পরিবারগুলো গড়ে ৮ শতাংশ বেশি আয় হারায়।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে উম্মে সালমা পপি বলেন, ‘এসব পরিবারে নারী একাই সংসারের ভার টানেন। গরমে কাজ বন্ধ থাকলে বিকল্প আয়ের পথ থাকে না। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে সেবার দায়িত্বও পড়ে নারীর ওপর। তখন তারা বাইরে গিয়ে কাজ করার সময় পান না। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়।’
সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য। অতিরিক্ত গরমের কারণে গর্ভবতী নারীদের নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মদান, উচ্চ রক্তচাপ ও মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২-তে দাবদাহকে দুর্যোগ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তবে এটি মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। কাজ হারানো মানুষের জন্য জরুরি কোনো আর্থিক বা খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থাও নেই। ‘প্রাণ’-এর প্রতিবেদনে একটি জাতীয় হিট অ্যাকশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দাবদাহের কারণে আয় বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া এবং কৃষকদের জন্য কৃষিবিমা চালুর কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা স্ট্রিমকে বলেন, ‘আইনে দাবদাহকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তবে মোকাবিলার কোনো কাজ হয়নি। বজ্রপাতে কেউ মারা গেলে দাফনের জন্য অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু দাবদাহের ক্ষেত্রে তেমন কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই। সুনির্দিষ্ট কাঠামো না থাকায় এই আইনি স্বীকৃতি অনেকটা আলংকারিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু জাতীয় পর্যায় থেকে কাজ করলে হবে পরিচয় না। স্থানীয় সরকারকেও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। সর্বোপরি, সুশাসন ছাড়া দাবদাহের মতো ভয়ংকর দুর্যোগের ধাক্কা সামলানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’
.png)








