রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে হয়, প্রার্থীর যোগ্যতা কী

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ২২: ৩৬
রাষ্ট্রপতির কার্যালয় বঙ্গভবন। ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামী ২০ আগস্ট। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ১৬ আগস্ট। ওইদিন একক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হলে ভোটের প্রয়োজন হবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) একক প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করবেন।

গত ২৪ জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের নিয়োগ দেওয়া ২২তম রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা কে হবেন, তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।

রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর যোগ্যতা

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। তবে ইচ্ছা থাকলেই যে কেউ রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী কে হবেন, তা নির্ধারণ করেন সংসদ সদস্যরা।

সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ৩৫ বছরের কম বয়সী, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য কিংবা অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত কোনো ব্যক্তি নতুন করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারবেন না। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি হতে হলে একজন ব্যক্তির বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।

তবে সংবিধান অনুযায়ী যোগ্য হলেই যে কেউ রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে পারেন না। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তির মনোনয়নপত্র সংসদ সদস্যরা দাখিল করবেন। মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্য প্রস্তাবক এবং আরেকজন সংসদ সদস্য সমর্থক হিসেবে সই করবেন। একইসঙ্গে মনোনীত ব্যক্তির লিখিত সম্মতিও থাকতে হবে।

কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন

নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট হবে। তবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে যদি একক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়, ভোটের প্রয়োজন হবে না। সেক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ওই ব্যক্তিকে নির্বাচিত ঘোষণা করবেন।

অর্থাৎ, একক প্রার্থী থাকলে ১৬ আগস্টই নতুন রাষ্ট্রপতি পাবে বাংলাদেশ। আর একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোট হবে। সেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তার দায়িত্ব পালন করবেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলমান থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে বলা হয়েছে, অধিবেশন না থাকলে স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে ভোটের দিন নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন। এরপর ওইদিনের জন্য সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করা হবে।

আইন অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একজন সংসদ সদস্য একটি ভোট দিতে পারেন। ভোটগ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন ব্যালট পেপার প্রস্তুত করে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাস

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতিশাসিত ও সংসদীয় উভয় পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছে। এই কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় তফসিল মোতাবেক রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতেন সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে। পরবর্তী সময়ে সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী অনুসারে প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান প্রবর্তিত হয়। পরে সংবিধানের ১২তম সংশোধনী আইন ১৯৯১ অনুসারে সংসদীয় পদ্ধতি চালু হলে পরোক্ষ পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান করা হয়। বর্তমানে অনুচ্ছেদ ৪৮ অনুসারে সংসদ-সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মুহম্মদউল্লাহ। তবে এর আগে কোনো ভোট হয়নি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রথমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তারপর আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মোহাম্মদ মুহম্মদউল্লাহর পরে সংবিধান সংশোধন করে আবার রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রবর্তনের ফলে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ভোট ছাড়াই রাষ্ট্রপতি হন শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর তাঁকে হত্যা করার পর ওই বছরের ১৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। মোশতাক আহমদের পর একই বছরের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম।

বিচারপতি সায়েমের পর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। তবে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন বাংলাদেশে প্রথম সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জিয়াউর রহমান। এ নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী পেয়েছিলেন ২১ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমান হত্যার শিকার হলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। ছয় মাসের মতো অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের পর, ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো সরাসরি জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। সে নির্বাচনে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার পান ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ড. কামাল হোসেন পান ২৬ শতাংশ ভোট।

বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের দায়িত্ব পালনের সময়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ, তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। এ সময় আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর নিজেই রাষ্ট্রপতির আসনে বসেন এরশাদ।

এরপর ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর দেশে তৃতীয়বারের মতো সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এই নির্বাচন বর্জন করে। এ সময় এরশাদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ।

এরপর ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতি সরকারের পরিবর্তে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। ফলে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটের পরিবর্তে আবার সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান চালু হয়। এরপর থেকেই এই বিধান চলমান রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সরকার প্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। এ সময় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে হারিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সে সময় আব্দুর রহমান বিশ্বাস পান ১৭২ ভোট এবং বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।

এরপর থেকে আর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ ও মোঃ সাহাবুদ্দিন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হয়েছেন।

ত্রয়োদশ সংসদে বিএনপির দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে বিএনপি যাঁকে প্রার্থী করবে, তিনিই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন- এটা মোটামুটি নিশ্চিত। তবে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী কিংবা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বা অন্য কোনো দল প্রার্থী দিলে নতুন রাষ্ট্রপতির নাম চূড়ান্ত হতে ২০ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত