মাহবুবুল আলম তারেক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়ালেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
টানা কয়েক সপ্তাহের বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হত্যার পরও তেহরান প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ইরান শুধু হামলা সহ্য করেই থেমে থাকেনি, বরং ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়ে তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
একই সঙ্গে ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ওপর চাপ বেড়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়ার তেল বিক্রির সুযোগ দিয়েছে এবং মিত্র দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব উদ্যোগ খুব একটা কার্যকর হয়নি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে তিনি যুদ্ধ কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যদিকে নতুন করে হামলার হুমকিও দিয়েছেন।
গত শনিবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে না দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেবে। অথচ এর আগের দিনই তিনি জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান ধীরে ধীরে কমিয়ে আনছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন স্পষ্ট কোনো কৌশলগত লক্ষ্য ছাড়াই এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা করেছিলেন। ফলে সংঘাত এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
ওয়াশিংটনের বক্তব্যেও এই দ্বৈততা স্পষ্ট। একদিকে যুদ্ধ শেষ করার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে তা আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করেছে, প্রতিরক্ষা শিল্প ভেঙে দিয়েছে এবং তাদের নৌ ও বিমান শক্তিকে অকার্যকর করে ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, ইরান এখন কোনো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ছাড়াই চুক্তির জন্য আগ্রহী।
তবে ইরান এসব দাবি অস্বীকার করেছে এবং যুদ্ধবিরতির কোনো প্রস্তাব দেয়নি বলে জানিয়েছে। বাস্তবে ইরান এখনও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইরানের উপকূলে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে, এমনকি শক্তিশালী বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমাও ব্যবহার করা হয়েছে। তবুও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি।
একই দিনে ট্রাম্প প্রথমে যুদ্ধ কমানোর কথা বললেও কিছুক্ষণ পরই আবার কঠোর হুমকি দেন। এতে তার অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র আরও তিনটি যুদ্ধজাহাজ এবং প্রায় আড়াই হাজার অতিরিক্ত মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা এই যুদ্ধে মোতায়েন রয়েছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অনিশ্চয়তায় ভরপুর। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান, নাকি আরও বড় সংঘাতের দিকে এগোচ্ছেন—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ কবে শেষ হবে—এই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রশাসনের কাছে এই বিষয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্রুত সমাপ্তির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।
যুদ্ধ শুরুর পরদিন ট্রাম্প জানান, এই অভিযান প্রায় চার সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে। তবে পরদিনই তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে এই যুদ্ধ আরও দীর্ঘ সময় চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
পরবর্তী দিনগুলোতে তার বক্তব্য আরও অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এটি “মাত্র শুরু”। অথচ পরদিনই ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।
৯ মার্চ ট্রাম্প আবার বলেন, এই যুদ্ধকে একই সঙ্গে “শেষ” এবং “শুরুও” বলা যায়। পরে তিনি স্বীকার করেন, অনেক দিক থেকে জয় এলেও এখনও পুরোপুরি লক্ষ্য অর্জিত হয়নি এবং আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১১ মার্চ তিনি আবার জানান, এখনই যুদ্ধ শেষ করার সময় নয় এবং “কাজ শেষ করতেই হবে”।
এই ধারাবাহিক পরিবর্তনশীল বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, যুদ্ধের সময়সীমা ও কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্থির নয়।
যুদ্ধ শুরুর কারণ নিয়েও মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরানের “সম্প্রসারণবাদী নীতি” বন্ধ করা এবং দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটাতেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার আগেই যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে আগাম হামলা চালিয়েছে, যাতে ইরানের পাল্টা আঘাত থেকে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা যায়।
তবে এই বক্তব্যের পর ওয়াশিংটনে বিতর্ক শুরু হয়। সমালোচকরা বলেন, ইসরায়েলের চাপে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। পরে ট্রাম্প নিজেই দাবি করেন, বরং তিনিই ইসরায়েলকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছেন।
পরদিন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র বলেন, ইরান হামলা চালাতে পারে—এমন একটি “ধারণা” থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ চালায়।
এই পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফা আলোচনার প্রস্তুতি চলছিল। মধ্যস্থতাকারীরা তখন বলেছিলেন, একটি সমঝোতা “খুব কাছাকাছি” ছিল। কিন্তু সামরিক হামলার ফলে সেই আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি ছিল। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এই দাবির পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের প্রতিক্রিয়া ও সক্ষমতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। তারা মনে করেন, দ্রুত সাফল্যের প্রত্যাশা থেকেই এই যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল।
কিছু বিশ্লেষক আরও বলেন, ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগের সামরিক সাফল্য এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের সময়সীমা, লক্ষ্য এবং কৌশল—সবকিছুই এখনও অনিশ্চিত।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সাফল্যের দাবি করছে, অন্যদিকে বাস্তবে সংঘাত বিস্তৃত হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত—এই যুদ্ধ কি দ্রুত শেষ হবে, নাকি আরও দীর্ঘ ও জটিল সংঘাতে রূপ নেবে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেশটির কৌশলগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অস্পষ্টতাকে সামনে এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথও খোলা রাখতে চাইছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট এবং সীমিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে এবং প্রতিক্রিয়াগুলো আরও অগোছালো হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক জেইদন আল-কিনানি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হামলা-পাল্টা হামলার ধারা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত পাল্টা আরও বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সম্প্রতি ইরান কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে। এতে কাতারের এলএনজি রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে কাতারের এই ক্ষতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে।
গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট পাওলো ভন শিরাখ বলেন, ‘ট্রাম্প দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং তার পরবর্তী পদক্ষেপ অনুমান করা কঠিন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কৌশল কী—তা স্পষ্ট নয়।’
তিনি বলেন, ‘একদিকে ট্রাম্প যুদ্ধ কমানোর কথা বলছেন, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি না খুললে কঠোর হামলার হুমকি দিচ্ছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ও তা অর্জনের পদ্ধতি—দুটিই অনির্দিষ্ট অবস্থায় রয়েছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এটি দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার কার্যকর কৌশল বা ‘টুলস’ স্পষ্ট নয়।
ভন শিরাখ আরও বলেন, ‘ইরানের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও জনসংখ্যা বিবেচনায় দেশটিকে সামরিকভাবে দমন করা সহজ নয়।’ তিনি উদাহরণ হিসেবে ইরাক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে প্রায় দেড় লাখ মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। তার মতে, ইরানকে নিয়ন্ত্রণে নিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পাঁচ লাখ সেনা প্রয়োজন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান একদিকে চাপ প্রয়োগ এবং অন্যদিকে কৌশলগত অনিশ্চয়তার একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়ালেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
টানা কয়েক সপ্তাহের বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হত্যার পরও তেহরান প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ইরান শুধু হামলা সহ্য করেই থেমে থাকেনি, বরং ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়ে তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
একই সঙ্গে ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ওপর চাপ বেড়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তারা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়ার তেল বিক্রির সুযোগ দিয়েছে এবং মিত্র দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব উদ্যোগ খুব একটা কার্যকর হয়নি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে তিনি যুদ্ধ কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যদিকে নতুন করে হামলার হুমকিও দিয়েছেন।
গত শনিবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে না দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেবে। অথচ এর আগের দিনই তিনি জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান ধীরে ধীরে কমিয়ে আনছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন স্পষ্ট কোনো কৌশলগত লক্ষ্য ছাড়াই এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা করেছিলেন। ফলে সংঘাত এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
ওয়াশিংটনের বক্তব্যেও এই দ্বৈততা স্পষ্ট। একদিকে যুদ্ধ শেষ করার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে তা আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করেছে, প্রতিরক্ষা শিল্প ভেঙে দিয়েছে এবং তাদের নৌ ও বিমান শক্তিকে অকার্যকর করে ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, ইরান এখন কোনো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ছাড়াই চুক্তির জন্য আগ্রহী।
তবে ইরান এসব দাবি অস্বীকার করেছে এবং যুদ্ধবিরতির কোনো প্রস্তাব দেয়নি বলে জানিয়েছে। বাস্তবে ইরান এখনও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইরানের উপকূলে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে, এমনকি শক্তিশালী বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমাও ব্যবহার করা হয়েছে। তবুও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি।
একই দিনে ট্রাম্প প্রথমে যুদ্ধ কমানোর কথা বললেও কিছুক্ষণ পরই আবার কঠোর হুমকি দেন। এতে তার অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র আরও তিনটি যুদ্ধজাহাজ এবং প্রায় আড়াই হাজার অতিরিক্ত মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা এই যুদ্ধে মোতায়েন রয়েছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অনিশ্চয়তায় ভরপুর। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান, নাকি আরও বড় সংঘাতের দিকে এগোচ্ছেন—তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ কবে শেষ হবে—এই প্রশ্ন এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রশাসনের কাছে এই বিষয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্রুত সমাপ্তির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।
যুদ্ধ শুরুর পরদিন ট্রাম্প জানান, এই অভিযান প্রায় চার সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে। তবে পরদিনই তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে এই যুদ্ধ আরও দীর্ঘ সময় চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
পরবর্তী দিনগুলোতে তার বক্তব্য আরও অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এটি “মাত্র শুরু”। অথচ পরদিনই ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।
৯ মার্চ ট্রাম্প আবার বলেন, এই যুদ্ধকে একই সঙ্গে “শেষ” এবং “শুরুও” বলা যায়। পরে তিনি স্বীকার করেন, অনেক দিক থেকে জয় এলেও এখনও পুরোপুরি লক্ষ্য অর্জিত হয়নি এবং আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১১ মার্চ তিনি আবার জানান, এখনই যুদ্ধ শেষ করার সময় নয় এবং “কাজ শেষ করতেই হবে”।
এই ধারাবাহিক পরিবর্তনশীল বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, যুদ্ধের সময়সীমা ও কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্থির নয়।
যুদ্ধ শুরুর কারণ নিয়েও মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরানের “সম্প্রসারণবাদী নীতি” বন্ধ করা এবং দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটাতেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার আগেই যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে আগাম হামলা চালিয়েছে, যাতে ইরানের পাল্টা আঘাত থেকে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা যায়।
তবে এই বক্তব্যের পর ওয়াশিংটনে বিতর্ক শুরু হয়। সমালোচকরা বলেন, ইসরায়েলের চাপে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। পরে ট্রাম্প নিজেই দাবি করেন, বরং তিনিই ইসরায়েলকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছেন।
পরদিন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র বলেন, ইরান হামলা চালাতে পারে—এমন একটি “ধারণা” থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ চালায়।
এই পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফা আলোচনার প্রস্তুতি চলছিল। মধ্যস্থতাকারীরা তখন বলেছিলেন, একটি সমঝোতা “খুব কাছাকাছি” ছিল। কিন্তু সামরিক হামলার ফলে সেই আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি ছিল। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এই দাবির পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের প্রতিক্রিয়া ও সক্ষমতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি। তারা মনে করেন, দ্রুত সাফল্যের প্রত্যাশা থেকেই এই যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল।
কিছু বিশ্লেষক আরও বলেন, ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগের সামরিক সাফল্য এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের সময়সীমা, লক্ষ্য এবং কৌশল—সবকিছুই এখনও অনিশ্চিত।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সাফল্যের দাবি করছে, অন্যদিকে বাস্তবে সংঘাত বিস্তৃত হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত—এই যুদ্ধ কি দ্রুত শেষ হবে, নাকি আরও দীর্ঘ ও জটিল সংঘাতে রূপ নেবে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেশটির কৌশলগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অস্পষ্টতাকে সামনে এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথও খোলা রাখতে চাইছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট এবং সীমিত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে এবং প্রতিক্রিয়াগুলো আরও অগোছালো হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক জেইদন আল-কিনানি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হামলা-পাল্টা হামলার ধারা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত পাল্টা আরও বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সম্প্রতি ইরান কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে। এতে কাতারের এলএনজি রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে কাতারের এই ক্ষতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে।
গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট পাওলো ভন শিরাখ বলেন, ‘ট্রাম্প দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং তার পরবর্তী পদক্ষেপ অনুমান করা কঠিন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কৌশল কী—তা স্পষ্ট নয়।’
তিনি বলেন, ‘একদিকে ট্রাম্প যুদ্ধ কমানোর কথা বলছেন, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি না খুললে কঠোর হামলার হুমকি দিচ্ছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ও তা অর্জনের পদ্ধতি—দুটিই অনির্দিষ্ট অবস্থায় রয়েছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এটি দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার কার্যকর কৌশল বা ‘টুলস’ স্পষ্ট নয়।
ভন শিরাখ আরও বলেন, ‘ইরানের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও জনসংখ্যা বিবেচনায় দেশটিকে সামরিকভাবে দমন করা সহজ নয়।’ তিনি উদাহরণ হিসেবে ইরাক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে প্রায় দেড় লাখ মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। তার মতে, ইরানকে নিয়ন্ত্রণে নিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পাঁচ লাখ সেনা প্রয়োজন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান একদিকে চাপ প্রয়োগ এবং অন্যদিকে কৌশলগত অনিশ্চয়তার একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন

আঞ্চলিক পরাশক্তি ইরান-ইসরায়েলের দ্বৈরথ এখন আর কেবল প্রক্সি যোদ্ধাদের আড়ালে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা এক উন্মুক্ত রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। এর একদিকে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিখুঁত সামরিক কূটনীতি, আর অন্যদিকে হাতছানি দিচ্ছে এক প্রলয়ংকরী পারমাণবিক সংঘাতের কৃষ্ণছায়া।
৭ ঘণ্টা আগে
গত বছর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি “সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি” স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার অঙ্গীকার করে।
১ দিন আগে
ইরানে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার পর এবার বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, আন্তর্জাতিক সার বাজারও বড় ধরনের চাপে পড়েছে।
৩ দিন আগে
স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী একক মেরু বিশ্বব্যবস্থায় আমেরিকার যে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল, তা আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ওয়াশিংটন এখন আর কেবল একটি ফ্রন্টে মনোনিবেশ করে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারছে না।
৩ দিন আগে