হুথি কারা, ইরানের পক্ষে যুদ্ধ করছে কেন

প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ২৩: ০৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে গড়িয়েছে। এরই মধ্যে শনিবার (২৮ মার্চ) ইসরায়েলকে লক্ষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইয়েমেনের হুথিরা। এই হামলার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে প্রবেশের কথা নিশ্চিত করেছে ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠী। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এই হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই হুথিরা জানিয়েছিল, ইরান ও ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর বিরুদ্ধে আগ্রাসন চললে তারা চুপ থাকবে না। এই ঘোষণার পর তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিল।

হুথিদের এই যুদ্ধে সরাসরি প্রবেশের ফলে লোহিত সাগর করিডোর দিয়ে চলাচল করা বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। হুথিদের তথ্য মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি মোহাম্মদ মনসুর মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে এক বার্তায় জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি তাদের আক্রমণ আরও বাড়ায়, তবে ইয়েমেন উপকূলের ‘বাব আল-মানদাব প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়া তাদের জন্য ‘বাস্তবসম্মত বিকল্প’। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে বৈশ্বিক শিপিং রুটের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

হুথি কারা, উত্থান কীভাবে হলো?

হুথিরা ইয়েমেনের একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আনসার আল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’ নামে পরিচিত। ১৯৯২ সালে জাইদি শিয়া মতাদর্শের পুনর্জাগরণ এবং সৌদি আরবের ওয়াহাবি প্রভাব মোকাবিলার জন্য হুসেইন বদরেদ্দীন আল-হুথি 'বিলিভিং ইয়ুথ' নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০৪ সালে ইয়েমেন সরকারের দমন-পীড়নের প্রতিবাদে হুথিরা প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। ১৮ জুন থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে ১০ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর হাতে প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুথি নিহত হন। এরপর তাঁর ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি গোষ্ঠীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

২০১১ সালের ‘আরব বসন্তের’ পর তারা তাদের শক্তি বাড়ায়। এই সময়েই তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে। ২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে হুথিদের চাপে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদি পদত্যাগ করে সৌদি আরবে পালিয়ে যান।

হুথিদের হটাতে ২৬ মার্চ সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ১০টি দেশের জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান ও বিমান হামলা শুরু করে। এখান থেকেই ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী এবং ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। বর্তমানে হুথিরা ইয়েমেনের এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড শাসন করছে। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বাস করে। তবে হুথি সরকার এখন পর্যন্ত কেবল ইরানের স্বীকৃতি পেয়েছে।

হুথি নেতারা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের হুথি উপজাতি থেকে এসেছেন। তারা শিয়া ইসলামের ‘জায়েদি’ মতাদর্শে বিশ্বাসী। একে ‘পঞ্চ-ইমামি’ শিয়া ইসলামও বলা হয়। এর মানে হলো তারা নবী মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম পাঁচজন উত্তরসূরিকে স্বীকৃতি দেয়। ইয়েমেনের তিন কোটি ৪০ লাখ মানুষের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই মতাদর্শের অনুসারী। দেশটির উত্তরাঞ্চলে এর চর্চা বেশি দেখা যায়। সেখানে সুন্নি ইসলামের কিছু উপাদানও এর সঙ্গে মিশে গেছে।

হুথিদের স্লোগান হচ্ছে, ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান, আমেরিকার ধ্বংস হোক, ইসরায়েলের ধ্বংস হোক, ইহুদিদের ওপর অভিশাপ এবং ইসলামের জয় হোক’। যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। উপজাতীয় বাহিনী এবং সাবেক সরকারি সৈন্যদের সমন্বয়ে হুথিদের ২০ হাজার যোদ্ধা রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক কতটা গভীর?

অনেক বিশেষজ্ঞ হুথিদের ইরানের ‘প্রক্সি’ বা ছায়াবাহিনী বলেন। অনেক বিশ্লেষক তাদের ইরানের ‘অংশীদার’ বলতে বেশি পছন্দ করেন। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ২০০৯ সাল থেকেই ইরান হুথিদের সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। তখন ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে হুথিদের প্রথম যুদ্ধ চলছিল। ২০১৪ সালে সানা দখলের সময় থেকে হুথিরা ইরানের কাছ থেকে অস্ত্র পাচ্ছিল বলে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ একমত।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির বিশেষজ্ঞ মাইকেল নাইটসের মতে, ইরান ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবকে ‘রপ্তানি’ করার মডেল অনুসরণ করে। নাইটস জানান, হুথি ও ইরানের মধ্যে একটি আদর্শিক মিল রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের মিল থাকায় হুথিরা ইরানকে সাহায্য করতে উৎসাহী হয়।

বিভিন্ন থিংকট্যাংকের বিশ্লেষণ মতে, ইরান হুথিদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তারা অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেয়। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্র তারা ইরানের কাছ থেকেই পায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে ইরান থেকে হুথিদের কাছে যাওয়া একটি অস্ত্রের চালান মার্কিন বাহিনী আটক করে। সেখানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, মিসাইলের ওয়ারহেড এবং অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল ইউনিট ছিল। ইরানের আধাসামরিক বাহিনী আইআরজিসি এই অস্ত্র সরবরাহ করে। তারা হুথিদের সামরিক পরামর্শও দিয়ে থাকে।

২০২৩ সালে সানাকেন্দ্রিক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক এলেওনোরা আরদেমাগনি এক প্রতিবেদনে দাবি করেন, হুথিদের লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব প্রণালিতে ক্ষমতা প্রদর্শনের পেছনে ইরানের চোরাচালান করা অস্ত্র ও কারিগরি সহায়তার বড় ভূমিকা রয়েছে।

ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাময়িকীতে ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আয়াতুল্লাহি তাবার লিখেন, হুথিরা সৌদি আরবের সীমান্তে ভীতি তৈরি করে এবং লোহিত সাগরে ইরানি জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দেয়। এর মাধ্যমে ইরান তেল পরিবহনের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সুযোগ পায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হুথিরা ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্র এবং লোহিত সাগরে ইরানের তৈরি অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে সাহায্য করে।

তবে হুথিরা লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মতো পুরোপুরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অনুগত নয়। তাদের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। তারা ইরানের মতো ‘টুয়েলভার’ বা বারো-ইমামি শিয়া তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়। তাদের উত্থানের পেছনেও ইরানের সরাসরি হাত ছিল না। হুথিরা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। তারা নিজেদের ইরানের ছায়াবাহিনী মানতে নারাজ। তারা দাবি করে, তারা নিজেদের অস্ত্র নিজেরাই তৈরি করে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে এখন কী কী হতে পারে?

হুথিরা গাজা যুদ্ধের সময় থেকেই ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের কথা বলে লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছিল। তারা ইসরায়েলের দিকেও ড্রোন ও মিসাইল ছুড়েছিল। ইসরায়েলও তাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রও হুথিদের ওপর হামলা করেছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধবিরতির পর হুথিরা হামলা বন্ধ করেছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আবার বদলে গেছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর গত ৫ মার্চ হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি বলেন, সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে তাদের আঙুল ট্রিগারে রয়েছে। পরিস্থিতি দাবি করলেই তারা ব্যবস্থা নেবেন।

হুথিরা প্রথম দিকে যুদ্ধে যোগ দেয়নি, তবে তাদের প্রবেশ অনুমেয় ছিল। ২৮ মার্চের হামলায় তারা ইসরায়েলের স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করার কথা জানিয়েছে। তারা ঘোষণা দিয়েছে, সব ফ্রন্টে আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিযান চলবে।

চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেন, লোহিত সাগর এবং বাব আল-মানদাব প্রণালির মতো বাণিজ্যিক নৌপথের ওপর এর প্রভাব উদ্বেগজনক। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার কারণে বিশ্ব বাণিজ্য এমনিতেই ধুঁকছে। এখন লোহিত সাগরে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হলে জাহাজ চলাচলের খরচ বাড়বে। তেলের দাম বাড়বে এবং একটি ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতি আরও বড় চাপের মুখে পড়বে। উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোও হুমকির মুখে পড়বে।

ফারিয়া আল-মুসলিমি জানান, হুথিরা ইরানের চেয়েও সহজে সৌদি আরবের অবকাঠামো ও পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারে। সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো ইঙ্গিত দেয় এ ধরনের হামলার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি হুথিরা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি ভুক্ত দেশগুলোতে হামলা চালায়, তবে পরিস্থিতি আরও বাজে দিকে মোড় নেবে।

সম্পর্কিত