‘ম্যারেজ অব কনভেনিয়েন্স’ বা ‘রিয়েলপলিটিক’, রাজনীতিতে ‘স্থায়ী বন্ধু’ হয় না কেন

স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজনীতির মঞ্চে নেতাকর্মীরা আজ যার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেন, দুদিন পরই হয়তো তার বিরুদ্ধেই সবচেয়ে কঠিন ভাষায় বক্তৃতা দেন। আবার যিনি একসময় ‘অগ্রহণযোগ্য’ ছিলেন, ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতেই তিনিই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। তাই রাজনীতি নিয়ে বহু পুরোনো একটি কথা আজও প্রচলিত আছে—‘রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই, স্থায়ী থাকে শুধু স্বার্থ ও প্রয়োজন।’

বিশ্ব রাজনীতি থেকে বাংলাদেশ—সবখানেই এই বাস্তবতার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। আদর্শ, মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে রাজনৈতিক লক্ষ্য, ক্ষমতার সমীকরণ এবং সময়ের প্রয়োজনই প্রায়ই নির্ধারণ করে কে কার বন্ধু, আর কে প্রতিপক্ষ।

শেখ মুজিবুর রহমান ও খন্দকার মোশতাক আহমদ ছিলেন দীর্ঘদিন একই রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযোদ্ধা। পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক মতপার্থক্য বাড়তে থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর মোশতাক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলে সেই সম্পর্ক ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়ে পরিণত হয়।

শেখ হাসিনা ও ড. কামাল হোসেন একসময় আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে ছিলেন। সংবিধান প্রণয়নেও ড. কামালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়। পরে তিনি গণফোরাম গঠন করেন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জোটের নেতৃত্বে ভূমিকা রাখেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ছিলেন বিএনপি নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী। কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের খবর বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে। যদিও তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিএনপিতেই ছিলেন, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সম্পর্কও যে সব সময় এক রকম থাকে না, সেটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনেও প্রতিফলিত হয়েছে।

নব্বইয়ে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা একসঙ্গে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন। ছবি: সংগৃহীত
নব্বইয়ে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা একসঙ্গে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন। সে সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে একই লক্ষ্যে আন্দোলনে নামে। তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তারা একই কাতারে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু গণতন্ত্র ফিরে আসার পর সেই ঐক্য দ্রুত ভেঙে যায়। পরবর্তী তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই দলই একে অপরের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়।

আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ পরে নির্বাচনী জোটে পরিণত হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে মহাজোট গঠন করে। অথচ নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই ছিল এরশাদের শাসনের অবসান। এটিই প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার সমীকরণ বদলালে রাজনৈতিক সম্পর্কও বদলে যেতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়েও একই চিত্র দেখা গেছে। বিভিন্ন নতুন রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়ে আবার অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙেও গেছে। নির্বাচনী বাস্তবতা ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশের কারণে দলগুলো কখনো একত্র হয়েছে, আবার পরিস্থিতি বদলাতেই আলাদা পথ বেছে নিয়েছে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, উদাহরণ আছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও

ভারতের নীতীশ কুমার ও নরেন্দ্র মোদি একসময় জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। পরে মতবিরোধে আলাদা হন। আবার কয়েক বছর পর পুনরায় জোটে ফেরেন। বিহারের রাজনীতি এ ধরনের জোট পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় কংগ্রেসে রাজনীতি করলেও পরে নিজস্ব দল গড়ে কংগ্রেসেরই বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।

পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে নওয়াজ শরিফের দল পিএমএলএন এবং বেনজির ভুট্টোর দল পিপিপি ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী। দুই দল একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে, নির্বাচনে লড়েছে এবং ক্ষমতার পালাবদলে কঠোর বিরোধিতা করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের সময় একই টেবিলে বসে সরকার গঠন কিংবা যৌথ রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতেও দেখা গেছে।

মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারাপান বহু বছর ইউএমএনওর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। অথচ ২০২২ সালের ঝুলন্ত পার্লামেন্টের (নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন না পাওয়া) পর সরকার গঠনের স্বার্থে সেই দুই পক্ষই একসঙ্গে জোট সরকার গঠন করে। একসময়ের কট্টর প্রতিপক্ষ মুহূর্তেই রাজনৈতিক অংশীদারে পরিণত হয়।

ইসরায়েলেও ২০২১ সালে ডানপন্থী, মধ্যপন্থী, বামপন্থী এমনকি একটি আরব ইসলামপন্থী দল পর্যন্ত একত্রিত হয়ে সরকার গঠন করেছিল। মতাদর্শে তাদের মিল ছিল খুবই কম। কিন্তু একটি অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান তাদের একই ছাতার নিচে এনেছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ধনকুবের ইলন মাস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একে অপরের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে বিভিন্ন নীতি, কর, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সরকারি ব্যয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্য মতবিরোধও দেখা গেছে। ফলে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক খুব দ্রুত রাজনৈতিক দূরত্বে রূপ নিতে পারে। এটিও সমসাময়িক একটি উদাহরণ।

প্রিন্সিপাল অব রিয়েলপলিটিক। ছবি: অ্যামাজন থেকে নেওয়া
প্রিন্সিপাল অব রিয়েলপলিটিক। ছবি: অ্যামাজন থেকে নেওয়া

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেন, এ ধরনের রাজনৈতিক বন্ধুত্বকে প্রায়ই ‘ম্যারেজ অব কনভেনিয়েন্স’ বা ‘রিয়েলপলিটিক’ বলা হয়। জার্মান বিশ্লেষক লুডভিগ ফন রোশাউ তাঁর ১৮৫৩ সালের গবেষণাগ্রন্থ প্রিন্সিপাল অব রিয়েলপলিটিক-এ এই তত্ত্বটি নিয়ে লিখেছেন। সেখানে আদর্শ বা নৈতিকতার চেয়ে বাস্তব স্বার্থ ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে জোট গঠনকে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। অর্থাৎ আদর্শের চেয়ে বাস্তব রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবই সেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জোট রাজনীতি নিয়ে গবেষণায়ও দেখা যায়, রাজনৈতিক জোট বা বন্ধুত্ব সাধারণত তখনই গড়ে ওঠে যখন অংশীদারদের সামনে কোনো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ বা বড় প্রতিপক্ষ থাকে। সেই লক্ষ্য পূরণ হলে জোট দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বা ভেঙেও যেতে পারে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সব রাজনৈতিক সম্পর্কই কেবল স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে। অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক বন্ধুত্বও টিকে থাকে। তবে নির্বাচনী রাজনীতি, ক্ষমতা ভাগাভাগি কিংবা সরকার গঠনের বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রায়ই কঠিন সমঝোতা করতে হয়। সেই কারণেই ইতিহাসে ঘাঁটলে দেখা যায়, গতকালের প্রতিপক্ষ আজকের মিত্র হয়, আবার আজকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আগামী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীও হয়ে ওঠে।

রাজনীতিতে ‘স্থায়ী বন্ধু’ হয় না কেন

এই ধারণার সবচেয়ে পরিচিত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টন। ১৮৪৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তিনি বলেছিলেন, কোনো জাতির চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই; স্থায়ী হলো তার স্বার্থ।

গবেষক হ্যান্স মরগেনথাউ ও কেনেথ ওয়াল্টজও একই যুক্তি দিয়েছেন। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য নিজের নিরাপত্তা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করা। ফলে স্বার্থের পরিবর্তনের সঙ্গে জোটও পরিবর্তিত হয়।

এ কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধ শেষে ঠান্ডা যুদ্ধে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। আবার একসময়ের যুদ্ধরত যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনাম বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার। একইভাবে কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কও ষাটের দশকে তীব্র অবনতির মুখে পড়ে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিফেন এম ওয়াল্টের ব্যালেন্স অব থ্রেট তত্ত্ব বলছে, রাষ্ট্র শুধু শক্তির ভারসাম্য নয়, সম্ভাব্য হুমকির মাত্রা বিবেচনা করেও রাজনৈতিক বন্ধুত্ব তৈরি হয়। অন্যদিকে অর্থনৈতিক আন্তর্নির্ভরতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবর্তনও রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সব গবেষক অবশ্য এই ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। উদারপন্থী ও রক্ষণশীল তত্ত্বের গবেষকেরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, যৌথ মূল্যবোধ, ইতিহাস, পরিচয় এবং পারস্পরিক আস্থা দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে। তাই সম্পর্ক শুধু স্বার্থ দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায় না।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে স্থায়ী থাকে মূলত স্বার্থ ও পরিবর্তিত বাস্তবতা; বন্ধু বা প্রতিপক্ষের পরিচয় সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়াই স্বাভাবিক।

তথ্যসূত্র: দ্য প্রিন্ট, স্প্রিংগার নেচার, সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি, রিয়েলিস্ট থিওরি অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত