এক্সপ্লেইনার

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি: শর্তের বাইরেও বাংলাদেশের জন্য যা জরুরি

লেখা:
লেখা:
‎শাহিনুল ইসলাম সাগর

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫: ৩৫
ছবি: সংগৃহীত

‎আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আবারও আলোচনায় বসেছে বাংলাদেশ। আগের ঋণ কর্মসূচির বেশ কয়েকটি শর্ত পূরণ না হওয়ায় সেটি প্রত্যাশামতো এগোয়নি। এবার আইএমএফের মূল জোর দুটি বিষয়ে—এক. রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি; দুই. সরকারের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা।

‎‎এটি কেবল আইএমএফের শর্ত নয়; বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতাও একই বার্তা দিচ্ছে। কারণ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কম, অথচ সরকারের ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে ঋণ, সুদ পরিশোধ এবং বাজেট ঘাটতির চাপও বাড়ছে।

‎বাজেটের অঙ্ক যা বলছে

‎২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ শুরুতেই প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার অর্থায়নের প্রয়োজন হবে, যা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ থেকে মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

‎বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশই পরিচালন ব্যয়। বেতন-ভাতা, পেনশন, ঋণের সুদ, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস পরিচালনা, জ্বালানি, সরকারি যানবাহন, বিদেশ সফর, সভা-সেমিনার, ভবন রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা খাতে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। উন্নয়ন ব্যয় নতুন সম্পদ তৈরি করে, কিন্তু পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ পুনরাবৃত্ত ব্যয়। ফলে এই খাতে দক্ষতা না এলে রাজস্বের চাপ কমানো কঠিন।

শুধু রাজস্ব বাড়ালেই সমাধান নয়

‎বাংলাদেশে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। তাই কর আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু কর বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্র যদি নিজের ব্যয় কমাতে না পারে, তাহলে ঘাটতি কমবে না।

‎অর্থনীতিবিদদের মতে, জনগণের ওপর নতুন কর আরোপের আগে সরকারের উচিত নিজের ব্যয় ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করা। একটি দক্ষ রাষ্ট্র একই সেবা কম অর্থে দিতে পারে, এটাই আধুনিক জনপ্রশাসনের মূল দর্শন।

‎বাংলাদেশের প্রশাসনে একই ধরনের কাজ নিয়ে একাধিক মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, কর্তৃপক্ষ ও সংস্থা কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি সিদ্ধান্ত নিতে একাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন লাগে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বিলম্ব হয়।

‎সরকার যদি স্বাধীনভাবে একটি পাবলিক এক্সপেনডিচার রিভিউ করে দেখে, কোন কোন প্রতিষ্ঠানের কাজ একে অপরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, তাহলে অনেক সংস্থা একীভূত করা কিংবা দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব হতে পারে। এতে শুধু অর্থই সাশ্রয় হবে না, প্রশাসনের দক্ষতাও বাড়বে।

জনবল নয়, কাঠামোগত সংস্কার

‎সরকারি ব্যয় কমানোর অর্থ গণছাঁটাই নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় শূন্য পদ বিলুপ্ত করা, নতুন নিয়োগে কঠোর প্রয়োজনীয়তা যাচাই, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গড়ে তোলা এবং অবসরের পর স্বাভাবিকভাবে জনবল কমিয়ে আনা, এসবই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি।

‎ডিজিটাল প্রশাসন শুধু নাগরিক সেবাই বাড়ায় না, ব্যয়ও কমায়। ই-ফাইলিং, অনলাইন অনুমোদন, ই-জিপি, ভার্চুয়াল সভা এবং কাগজবিহীন অফিস ব্যবস্থাপনা চালু হলে দাপ্তরিক ব্যয়, সময় ও দুর্নীতির সুযোগ তিনটিই কমে।

‎সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সেবা ক্রয় করে। স্বচ্ছ দরপত্র, কেন্দ্রীয় ক্রয়ব্যবস্থা, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ এবং বাজারদরের সঙ্গে নিয়মিত মূল্য যাচাই করলে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।

‎একইভাবে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বাড়ার প্রবণতা রোধ করাও জরুরি। সময়মতো প্রকল্প শেষ করা গেলে সুদ ব্যয়ও কমবে। ‎অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চলছে এবং নিয়মিত সরকারি সহায়তা নিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, করপোরেট পরিচালনা শক্তিশালী করা এবং প্রয়োজনে পুনর্গঠন করলে সরকারের আর্থিক চাপ কমতে পারে।

এ ছাড়া ‎ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব ভর্তুকি সমান কার্যকর নয়। যেসব ভর্তুকির বড় অংশ প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছায় না, সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। সাশ্রয় হওয়া অর্থ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

‎আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে

‎‎‎ভিয়েতনাম গত এক দশকে প্রশাসনিক সংস্কারকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি করেছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক স্তর কমানোর মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করেছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হওয়ায় দেশটি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সফল হয়েছে। ‎‎ইন্দোনেশিয়া দীর্ঘদিন জ্বালানি ভর্তুকিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করত। পরে ধাপে ধাপে সেই ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস করে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থ স্থানান্তর করে। নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ায় সামাজিক প্রভাবও তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

‎‎মালয়েশিয়া সরকারি ব্যয় মূল্যায়নে আইটকাম বেসড বাজেটিং চালু করেছে। অর্থাৎ শুধু কত টাকা ব্যয় হলো তা নয়, সেই ব্যয়ে কী ফল পাওয়া গেল, সেটিও মূল্যায়ন করা হয়। ফলে অকার্যকর কর্মসূচি চিহ্নিত করা সহজ হয় এবং ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ে।

‎বাংলাদেশের জন্য করণীয়

‎বাংলাদেশের বাস্তবতায় কয়েকটি সংস্কার দ্রুত বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন—একই ধরনের কাজ করা সরকারি প্রতিষ্ঠান একীভূত করা, ডিজিটাল প্রশাসন বাধ্যতামূলক করা, অপ্রয়োজনীয় শূন্য পদ বিলুপ্ত করা। এছাড়া সরকারি ক্রয়ে আরও স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা। লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনও জরুরি। মনোযোগ দেওয়া দরকার সরকারি সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার বৃদ্ধির দিকে। শুধু তা-ই নয়, ভর্তুকিকে হতে হবে আরও লক্ষ্যনির্ভর। পাশাপাশি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ব্যয়কে কর্মদক্ষতার সূচকের সঙ্গে যুক্ত করা দরকার।

সরকারি ব্যয় কমানোর অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কাটছাঁট নয়; বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত অপচয়, অদক্ষতা এবং প্রশাসনিক পুনরাবৃত্তি দূর করা। রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আর্থিক সংস্কারের মূল দর্শন।

‎‎আইএমএফের নতুন কর্মসূচি হয়তো এই সংস্কারের গতি বাড়াতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি কেবল ঋণের শর্ত পূরণের জন্য ব্যয় সংস্কার করবে, নাকি নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজনে একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও সাশ্রয়ী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলবে?

‎‎ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যয় কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো রাষ্ট্রকে আরও দক্ষ করে তোলা। বাংলাদেশের জন্যও এখন সেটিই সবচেয়ে বড় সংস্কার এজেন্ডা হতে পারে।

  • ‎শাহিনুল ইসলাম সাগর: ‎গণমাধ্যমকর্মী
Ad 300x250

সম্পর্কিত