leadT1ad

বাংলাদেশ-তুরস্ক প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব: কী হবে নতুন কৌশলগত অধ্যায়

প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৬, ১৫: ৪৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বর্তমানে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রচলিত সামরিক জোটগুলো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো কৌশলগত স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করছে এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা ক্রমেই ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে দ্রুত সম্প্রসারিত প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

মাত্র কয়েক বছর আগেও ঢাকা ও আঙ্কারার সামরিক সহযোগিতা সীমিত ছিল কিছু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে। কিন্তু বর্তমানে আলোচনার পরিধিতে রয়েছে ড্রোন উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যৌথ উৎপাদন কারখানা, সামরিক আধুনিকায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নানা উদ্যোগ।

একই সঙ্গে কৌশলগত বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে, এসব উন্নয়ন বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং কয়েকটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সমন্বয়ের ইঙ্গিত কি না।

এ ধরনের কোনো জোট শেষ পর্যন্ত বাস্তবে গড়ে উঠবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে বাংলাদেশ-তুরস্ক অংশীদারত্ব ইতোমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিরক্ষা কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বাংলাদেশ–তুরস্ক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিস্তৃত ক্ষেত্র

বায়রাকতার টিবি-২ সশস্ত্র ড্রোন কর্মসূচি

এই অংশীদারত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক হলো বাংলাদেশের তুরস্কের তৈরি বায়রাকতার টিবি-২ সশস্ত্র ড্রোন সংগ্রহ ও পরিচালনা। এই ড্রোন বাংলাদেশের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, পর্যবেক্ষণ এবং নির্ভুল হামলা পরিচালনার সক্ষমতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করে নজরদারি চালানো, তাৎক্ষণিক যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য সরবরাহ এবং সীমিত আঘাত হানার সক্ষমতা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতে সফল ব্যবহারের কারণে টিবি-২ তুরস্ককে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ড্রোন রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে।

যৌথ ড্রোন উৎপাদন কারখানার প্রস্তাব

কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে বাংলাদেশে একটি যৌথ ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনে তুর্কি প্রস্তাব। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত ড্রোন ব্যবস্থার যৌথ উৎপাদন, স্থানীয়ভাবে সংযোজন (অ্যাসেম্বলি), প্রযুক্তি হস্তান্তর, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা এবং দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছে।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্রেতা হিসেবে নয়, বরং উৎপাদক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। এতে দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

আকাশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য মধ্যম ও দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। এসব ব্যবস্থা চালু হলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনা, সমুদ্রবন্দর এবং নগর কেন্দ্রগুলোকে আকাশপথের হুমকি থেকে আরও কার্যকরভাবে সুরক্ষা দিতে পারবে।

বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং নির্ভুল নির্দেশিত অস্ত্রের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে।

প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উৎপাদন

সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় শুধু অস্ত্র কেনার বিষয় নয়, শিল্পভিত্তিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায়। অন্যদিকে তুরস্ক আমদানি নির্ভর সামরিক শক্তি থেকে নিজস্ব প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিরক্ষা রপ্তানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সফল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

এই কারণে তুরস্কের মডেল বাংলাদেশের কাছে আকর্ষণীয়। আলোচনায় অস্ত্র উৎপাদন, গোলাবারুদ তৈরি, সামরিক ইলেকট্রনিকস এবং প্রতিরক্ষা শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ও রয়েছে বলে জানা যায়।

প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং মন্ত্রীপর্যায়ের সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক লেনদেনকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ দেয় এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও লেনদেন

বাংলাদেশ বর্তমানে তুরস্কের চতুর্থ বৃহত্তম প্রতিরক্ষা গ্রাহক। ২০১০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশ অন্তত ১৫ ধরনের তুর্কি সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে এই সম্পর্কের গতি আরও দ্রুত হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রধান প্রকল্পগুলো হলো:

বায়রাকতার টিবি-২ ড্রোন (২০২২ সালে সরবরাহ), টিআরজি-২৩০ ও টিআরজি-৩০০ রকেট ব্যবস্থা (২০২৪–২৫), কোবরা-২ সাঁজোয়া যান ও বোরান হাউইটজার ২৬টি তুলপার হালকা ট্যাংক (২০২৫–২৬ সালে সরবরাহের পরিকল্পনা), কারেল সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা (২০২৫ সালে চুক্তি স্বাক্ষর), হিসার-ও+ ও সিপার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (আলোচনাধীন), বায়কার টিবি-২ যন্ত্রাংশ যৌথ উদ্যোগ ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র এবং চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে প্রতিরক্ষা শিল্প অঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনা।

বৃহত্তর কৌশলগত জোট?

২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব ও পাকিস্তান রিয়াদে স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএমডিএ) স্বাক্ষর করে। এটি মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।

ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর আদলে তৈরি এই চুক্তি অনুযায়ী, এক পক্ষের ওপর হামলাকে অন্য পক্ষের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। এর ফলে পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি পরোক্ষ সুরক্ষা ছাতাও সৌদি আরবের ওপর বিস্তৃত হয়েছে বলে মনে করা হয়।

গত জানুয়ারিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানান, আঙ্কারার এই চুক্তিতে যোগদানের বিষয়ে আলোচনা চলছে। পরে ২০২৬ সালের মে মাসে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) তুরস্ক, সৌদি আরব, মিশর ও পাকিস্তানকে একটি ‘নমনীয় পরামর্শ ও সমন্বয় কাঠামো’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এটি ছিল প্রথমবারের মতো কোনো শীর্ষ পশ্চিমা প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই চার দেশের সমন্বয়কে একটি উদীয়মান প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা হিসেবে উল্লেখ করে।

এই সম্ভাব্য জোটে একদিকে রয়েছে সৌদি আরবের আর্থিক প্রভাব, অন্যদিকে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ও বৃহৎ সেনাবাহিনী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তুরস্কের ন্যাটো-সামঞ্জস্যপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এবং মিশরের বৃহৎ সামরিক শক্তি ও সুয়েজ খালের কৌশলগত অবস্থান।

বাংলাদেশের অবস্থান

এই সমন্বয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখনো আনুষ্ঠানিক নয়, তবে ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ঢাকা ও ইসলামাবাদ পূর্ণাঙ্গ সামরিক যোগাযোগ পুনরায় চালু করেছে। বাংলাদেশ পাকিস্তানের আমান-২৫ নৌ মহড়ায় অংশ নেয়। এছাড়া ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দুই দেশ একটি সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির খসড়া তৈরির জন্য যৌথ কাঠামো গঠন করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে সর্বোচ্চ ৪৮টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে অগ্রসর পর্যায়ের আলোচনা চালাচ্ছে বলেও জানা যায়।

তুরস্ক-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর সঙ্গে এই সম্ভাব্য জোটের সম্পর্ক কী

বাংলাদেশ ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে শুধু একটি বাণিজ্যিক লেনদেন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি মূলত তুরস্কের ‘এশিয়া অ্যানিউ’ নীতির অংশ, যার লক্ষ্য দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিরক্ষা বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়ে কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করা।

বাংলাদেশ-তুরস্ক দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং সম্ভাব্য বৃহত্তর জোটের মধ্যে সম্পর্ক তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে।

পরিকল্পিত আন্তঃকার্যক্ষমতা

তুরস্ক বাংলাদেশকে যে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে, যেমন: টিবি-২ ড্রোন, সিপার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কারেল যোগাযোগ প্রযুক্তি সেগুলোর অনেকটাই পাকিস্তানকেও সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে একই ধরনের সামরিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে তিন দেশের মধ্যে অভিন্ন অপারেশনাল সংস্কৃতি, সামঞ্জস্যপূর্ণ কমান্ড ব্যবস্থা এবং যৌথ মহড়া ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রতিরক্ষা শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি সংযুক্তি

বাইকারের সম্ভাব্য যৌথ উদ্যোগ (জেভি) এবং প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল তুরস্কের এমন একটি কৌশলকে নির্দেশ করে, যার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভবিষ্যতের সঙ্গে নিজেদের গভীরভাবে যুক্ত করতে চায়। কোনো দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা যদি অন্য একটি দেশের প্রযুক্তি ও প্ল্যাটফর্মের ওপর আংশিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই কৌশলগত সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়। পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্কও একই ধরনের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

ভূ-রাজনৈতিক বার্তা

শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য এসব অংশীদারিত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে। ভারতের প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করার পাশাপাশি এসব সম্পর্কের মাধ্যমে ঢাকা ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং রিয়াদকেও জানাতে চায় যে, বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল বা কোনো একটি দেশের ‘ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র’ হয়ে থাকতে চায় না। অর্থাৎ, তুরস্ক ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশের জন্য শুধু সামরিক আধুনিকায়নের সুযোগ নয়, বরং বহুমুখী ও স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বাংলাদেশের জন্য সুবিধা ও সম্ভাব্য লাভ

প্রতিরোধ ক্ষমতা

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ নিজের আকাশসীমা কার্যকরভাবে সুরক্ষিত ও নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এর কৌশলগত গুরুত্ব শুধু মিয়ানমার সীমান্তেই নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি গড়ে তোলা

যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) এবং প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়িত হলে দেশে বিমান ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের একটি নিজস্ব শিল্পভিত্তি তৈরি হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সরবরাহের বৈচিত্র্য ও কূটনৈতিক সুবিধা

তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই ন্যাটো-মানের সামঞ্জস্যপূর্ণ সক্ষমতা দিতে পারে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎস যত বৈচিত্র্যময় হবে, বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতাও তত বাড়বে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন।

সম্ভাব্য ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ

আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতা

প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নজর স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়। তাই বাংলাদেশকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।

কোনো একক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা

বৈচিত্র্যই হওয়া উচিত বাংলাদেশের মূল নীতি। কৌশলগত স্বাধীনতা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন একাধিক দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা যায়। একটি নির্ভরতার জায়গায় আরেকটি নির্ভরতা তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

আর্থিক চাপ

উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শুধু কেনার বিষয় নয়, এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার জন্যও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।

প্রযুক্তি হস্তান্তরের বাস্তবতা

সব প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি বাস্তবে দেশীয় সক্ষমতা তৈরি করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন বলতে কেবল বিদেশি যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানো বোঝায়। তাই বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে, যেন প্রকৃত জ্ঞান ও প্রযুক্তি হস্তান্তর হয় এবং স্থানীয় জনবল দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

সুপারিশ

অস্ত্র কেনার চেয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তরকে অগ্রাধিকার যেসব চুক্তির মাধ্যমে দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হবে, সেগুলোকে শুধু অস্ত্র কেনার চুক্তির তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখা

উদীয়মান এই সম্ভাব্য জোটের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে বাংলাদেশ অস্ত্র সংগ্রহ, আন্তঃকার্যক্ষমতা (ইন্টারঅপারেবিলিটি) এবং কূটনৈতিক প্রভাব এসব সুবিধা পেতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। তাই ঢাকা বাধ্যতামূলক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।

ভারতের সঙ্গে সমান্তরাল কূটনীতি

বাংলাদেশের উচিত তুরস্ক থেকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্য সম্পর্কে নয়াদিল্লিকে স্বচ্ছ বার্তা দেওয়া। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির উদ্যোগও অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তুরস্কের সঙ্গে যে প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো হচ্ছে, সেগুলো কেবল সাধারণ অস্ত্র ক্রয় নয়; বরং একটি নতুন কৌশলগত অবস্থানের ভিত্তি নির্মাণ করছে যেখানে বাংলাদেশ আরও সক্ষম, আরও স্বনির্ভর, কিন্তু একই সঙ্গে আরও জটিল আঞ্চলিক সম্পর্কের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

তুরস্ক-পাকিস্তান-সৌদি আরব ঘনিষ্ঠতা যদি আরও শক্তিশালী রূপ নেয়, তবে তা শীতল যুদ্ধের পর মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক এবং কিছু ক্ষেত্রে লাভজনক বলে মনে হতে পারে।

তবে কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সবসময়ই কিছু মূল্য ও ঝুঁকি জড়িত থাকে। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ পথ হতে পারে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতার সুযোগগুলো দৃঢ়ভাবে কাজে লাগানো, সব গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সতর্কতার সঙ্গে বজায় রাখা এবং আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সংযত থাকা।

বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায়, বড় প্রতিবেশী ও জটিল নির্ভরতার মধ্যে থাকা একটি মধ্যম আকারের রাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত নমনীয়তা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং সেটিই দক্ষ রাষ্ট্রপরিচালনার পরিচয়।

(অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

Ad 300x250

সম্পর্কিত