পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শুভেন্দু অধিকারী একটি আলোচিত নাম। একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম সেনাপতি থেকে আজ তিনি রাজ্যের প্রধান বিরোধী মুখ হয়ে উঠেছেন। হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ‘পোস্টার বয়’। তিনি নিজেকে শুধু মেদিনীপুরের গণ্ডির মধ্যে রাখেননি, হয়ে উঠেছেন গোটা রাজ্যের রাজনীতির ‘ফ্যাক্টর’।
রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান মূলত তৃণমূল থেকে। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের সংসদ সদস্য এবং পরে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসায় তরুণ বয়সেই শুভেন্দুর রাজনৈতিক হাতেখড়ি হয়। ১৯৯৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে। এরপর ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ছিলেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সদস্য। ২০২০ সালের শেষের দিকে হঠাৎ করেই তিনি তৃণমূল ছেড়ে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন।
এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাপথে ২০০৭ ছিল শুভেন্দুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। ওই বছর নন্দীগ্রামে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আন্দোলনের তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং গণমানুষের নেতায় পরিণত হন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম লাইভ মিন্টের পলিটিক্যাল ডেস্ক এডিটর গুলাম জিলানি বলেন, নন্দীগ্রামের আন্দোলনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতায় আসার পথ তৈরি করে দিয়েছিল, আর সেই পথের অন্যতম মুখ ছিলেন শুভেন্দু।
তবে মমতা যত ক্ষমতার কাছাকাছি হতে থাকেন, শুভেন্দুর সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তত বাড়তে থাকে। এক সময় মমতার সঙ্গে শুভেন্দুর তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। দলের ভেতর নিজের গুরুত্ব কমতে থাকে। এসব কারণে তিনি একসময় তৃণমূল ছেড়ে দেন এবং বিজেপিতে যোগ দেন।
তৃণমূল ছাড়ার পর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে তিনি সরাসরি মুখোমুখি হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এবং অল্প ব্যবধানে তাঁকে পরাজিত করেন। এই জয় তাকে জাতীয় পর্যায়েও আলোচনায় নিয়ে আসে এবং বর্তমানে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা।
আরও একটি বিধানসভা নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। আগামী ২৩ এপ্রিল প্রথম দফা ভোটগ্রহণ এবং ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে। আসন্ন এই নির্বাচনেও মমতা-শুভেন্দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
ভারতীয় রাজনীতি বিশ্লেষক গুলাম জিলানির মতে, বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে শুভেন্দু অধিকারী হিন্দুত্ববাদী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতি বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে প্রায়ই নিরাপত্তা, সীমান্ত, অনুপ্রবেশ এবং সংখ্যালঘু ইস্যু জোরালোভাবে উঠে আসে। এছাড়া বক্তৃতায় ‘বেগম’ বা ‘সনাতনী’ শব্দের ব্যবহার ভোটারদের একটি বড় অংশকে মেরুকরণ করতে সাহায্য করেছে, যা তাঁকে বিজেপির মূল ভোটব্যাংকের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। এসব কারণেই তিনি তাঁর সমর্থকদের কাছে দৃঢ় ও ‘স্পষ্টভাষী’ নেতা হিসেবে জনপ্রিয়। তবে সমালোচকদের কাছে শুভেন্দু বিভাজনমূলক রাজনীতির প্রতিনিধি।
মূলত জনপ্রিয়তার প্রশ্নে তিনি একটি দ্বৈত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। পূর্ব মেদিনীপুরসহ কিছু অঞ্চলে তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব অনেক শক্তিশালী এবং সংগঠক হিসেবে তাঁর দক্ষতা স্বীকৃত। মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তাঁকে জঙ্গলমহল (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর) এবং উত্তরবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদের মতো কঠিন জেলাগুলোতে সংগঠনের দায়িত্ব দেন, তখন তাঁর মধ্যে সাংগঠনিক দক্ষতা বিকশিত হয়। সেই সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই তাঁকে আজ অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তবে পুরো পশ্চিমবঙ্গে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেকের কাছে তিনি শক্তিশালী বিরোধী কণ্ঠ, আবার অনেকের কাছে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক রাজনীতিবিদ।
বিতর্ক শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিভিন্ন সময়ে তাঁর মন্তব্য রাজনৈতিক শালীনতার সীমা অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশকে নিয়ে তিনি নানা সময়ে নানা আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে হিন্দুবিদ্বেষী বলে গাজায় ইসরায়েলি হামলা টেনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে ইসরায়েলের মতো শিক্ষা দেওয়া উচিত।’ এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ইস্যু তুলে ধরে বাংলাদেশে চাপ সৃষ্টি করতে ভারতের পক্ষ থেকে বাণিজ্য বন্ধ বা সীমান্ত অবরোধের কথাও বলেছেন শুভেন্দু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ভাইরাল একটি বক্তব্য হলো, ‘বাংলাদেশকে শেষ করতে ৭-৮টি ড্রোনই যথেষ্ট।’ তিনি ময়মনসিংহে দীপু দাস হত্যাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন।
সব মিলিয়ে শুভেন্দু অধিকারী এমন একজন রাজনীতিবিদ, যিনি একদিকে সংগঠক হিসেবে সফল, অন্যদিকে বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য সমানভাবে পরিচিত। তাঁর রাজনৈতিক পথচলা দেখায় কীভাবে একজন নেতা দ্রুত উত্থান ঘটাতে পারেন, আবার একই সঙ্গে কট্টরপন্থী অবস্থান ও মন্তব্যের কারণে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রেও চলে আসতে পারেন।
শুভেন্দু যা-ই করুন, তাঁকে উপেক্ষা করা শাসক বা বিরোধী—কোনো গোষ্ঠীর পক্ষেই সম্ভব নয়। একদিকে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই তাঁকে একটি ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, লাইভ মিন্ট, ইকোনমিক টাইমস ও আনন্দবাজার পত্রিকা