মাছে-ভাতে বাঙালির পাতে কোপ পড়বে? বিজেপি শাসিত রাজ্য কী সংকেত দিচ্ছে

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলার রাজনীতিতে ‘মাছ-মাংস’ যে শুধুই খাদ্যাভ্যাসের বিষয় নয়, বরং সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক বার্তারও একটি শক্তিশালী মাধ্যম, সেটি আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে। একদিকে বাঙালির চিরাচরিত খাদ্যসংস্কৃতি—ভেটকি মাছের পাতুড়ি, মুড়ি ঘন্ট, চিংড়ি মালাইকারি, ইলিশ ভাপা বা পাবদার ঝাল; অন্যদিকে সেই খাবারকেই কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পাল্টা-ন্যারেটিভ। ফলে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটি এখন আর নিছক প্রবাদ নয়, তা হয়ে উঠেছে নির্বাচনী প্রচারের অংশও।

পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির বিরুদ্ধে একটি আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে, তারা ক্ষমতায় এলে নাকি খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ করবে, বিশেষ করে মাছ-মাংসের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনবে। এই ধারণা ভাঙতেই বিজেপি এখন সরাসরি মাঠে নেমেছে খাদ্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় বিজেপি প্রার্থীরা প্রচারে বেরিয়ে মাছ হাতে নিচ্ছেন, মাছ খাচ্ছেন, এমনকি নমিনেশন জমা দিতেও মাছ নিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও আবার তারা ভাতের থালা সাজিয়ে মাছ-মাংসসহ বসে পড়ছেন জনসমক্ষে, যেন প্রমাণ করতে চান, তাঁরা বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির বিরোধী নন।

এই প্রচারের মধ্যেই উঠে এসেছে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক। বিজেপির শীর্ষ নেতা অমিত শাহ, যিনি নিরামিষভোজী হিসেবে পরিচিত, তাঁকে নিয়েও তৈরি হয়েছে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। বাঙালির আতিথেয়তার অংশ হিসেবে মাছ-মাংস পরিবেশনের প্রসঙ্গ উঠতেই বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দ্বন্দ্ব একদিকে নিরামিষভোজী নেতার ভাবমূর্তি, অন্যদিকে মাছে-ভাতে বাঙালির সংস্কৃতি—রাজনীতির ময়দানে একটি সূক্ষ্ম টানাপোড়েন তৈরি করেছে।

তবে এই পুরো বিতর্ককে বোঝার জন্য শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের অন্যান্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলির নীতি ও বাস্তবতাও দেখা জরুরি। কারণ সেখানেই লুকিয়ে আছে এই আশঙ্কার উৎস।

উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, হরিয়ানা, রাজস্থান এবং উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যগুলোতে গরু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রে শুধু জবাই নয়, গরুর মাংস বিক্রি, সংরক্ষণ বা পরিবহনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মহারাষ্ট্রেও বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই আইন আরও কঠোর করেছে।

আবার আসামে বিজেপি সরকার প্রথমে ধর্মীয় স্থানের আশেপাশে বিফ খাওয়া বা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—রাজ্যের হোটেল, রেস্তোরাঁ, পাবলিক প্লেস এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে বিফ পরিবেশন ও খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। আগে যেখানে ৫ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে এই নিয়ম সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা পুরো রাজ্যে প্রযোজ্য হয়েছে।

অন্যদিকে, কিছু রাজ্যে নির্দিষ্ট দিন বা উৎসব উপলক্ষে সাময়িকভাবে মাংস ও মাছ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যেমন উত্তরপ্রদেশে মহাবীর জয়ন্তীর দিনে মাংসের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুজরাট, রাজস্থান বা মহারাষ্ট্রে জৈনদের পর্যুষণ উৎসবের সময়ও কয়েক দিনের জন্য নন-ভেজ বিক্রি বন্ধ রাখা হয়। এই সময়ে মাটন, চিকেন, মাছ—সব ধরনের আমিষ খাদ্য বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

তথ্য বলছে, গত এক দশকে গো-মাংস বা গরু পরিবহণের অভিযোগে অন্তত ৫০ জনের বেশি মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তথাকথিত ‘গো-রক্ষা বাহিনী’ রাতভর টহল দেয়, ট্রাক থামিয়ে তল্লাশি চালায়।

বিহারের মতো রাজ্যে আবার অন্য ধরনের নিয়ন্ত্রণ দেখা যাচ্ছে। সেখানে ২০২৬ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, স্কুল, ধর্মীয় স্থান এবং জনবহুল এলাকার কাছে খোলা অবস্থায় মাংস ও মাছ বিক্রি করা যাবে না। সরকারের যুক্তি, এটি স্বাস্থ্যবিধি ও জনসংবেদনশীলতার প্রশ্ন। তবে সমালোচকদের মতে, এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে খাদ্যাভ্যাসের ওপর চাপ তৈরি করে।

এই নীতিগুলোর পাশাপাশি আরও একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেটি হলো গো-রক্ষার নামে সহিংসতা বা গণপিটুনি। ২০১৫ সালের উত্তরপ্রদেশের দাদরির ঘটনা এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত। ফ্রিজে গো-মাংস রয়েছে, এই গুজব ছড়িয়ে পড়তেই একদল মানুষ বাড়িতে ঢুকে ৫০ বছর বয়সি মোহাম্মদ আখলাককে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে তাঁর পরিবারের দাবি ছিল, সেটি খাসির মাংস।

এরপর একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের ২৭ অগাস্ট হরিয়ানার চরখি দাদরিতে সাবির মালিক নামে এক যুবককে গো-মাংস খাওয়ার সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁকে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে। কয়েকদিন পর তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হয়।

মহারাষ্ট্রের নাসিকেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, ট্রেনে গো-মাংস বহনের সন্দেহে এক বৃদ্ধকে মারধর করা হয়। ছত্তিশগড়ের বিলাসপুরে ২০২২ সালে দুই দলিত যুবককে অর্ধনগ্ন অবস্থায় মারধর করে থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। পরে জানা যায়, তারা মৃত গরুর চামড়া সংগ্রহ করছিল, যা তাদের পেশার অংশ।

তথ্য বলছে, গত এক দশকে গো-মাংস বা গরু পরিবহণের অভিযোগে অন্তত ৫০ জনের বেশি মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তথাকথিত ‘গো-রক্ষা বাহিনী’ রাতভর টহল দেয়, ট্রাক থামিয়ে তল্লাশি চালায়। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘অ্যাকলেড’-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের সহিংসতার সবচেয়ে বড় শিকার মুসলিম সম্প্রদায়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, দলিতদেরও ক্রমশ এই আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে।

এই সমগ্র চিত্রটি দেখলে স্পষ্ট হয়, খাদ্যাভ্যাসের প্রশ্নটি ভারতে এখন আর শুধুই ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়—এটি আইনি, সামাজিক এবং রাজনৈতিক স্তরে জড়িয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বর্তমান প্রচারকে দেখতে হবে। এখানে তারা চেষ্টা করছে একটি ভিন্ন বার্তা দিতে যে তারা বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির বিরোধী নয়। মাছ খাওয়া, মাছ নিয়ে প্রচার করা, এসব আসলে সেই বার্তারই অংশ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই বার্তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? কারণ অন্য রাজ্যগুলোর অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলছে। ফলে বাংলার ভোটারদের একাংশের মধ্যে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই বিষয়টিকে হাতিয়ার করে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে। তারা দেখাতে চাইছে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিও বিপদের মুখে পড়বে।

ফলে ‘নিরামিষ বনাম আমিষ’ এই সরল বিভাজন ছাড়িয়ে বিষয়টি এখন হয়ে উঠেছে পরিচয় রাজনীতির অংশ। একটি বিষয় পরিষ্কার, বাংলায় এখন ভোটের লড়াই শুধু উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বা পরিকাঠামো নিয়ে নয়—ভাতের থালায় কী থাকবে, সেটাও হয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’—এই পরিচয়ই এখন রাজনীতির ময়দানে সবচেয়ে বড় প্রতীক।

সম্পর্কিত