সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর: কোনটিতে লাভ কেমন, ঝুঁকি কতটা

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ১৪: ৪০
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আরেক দফা কমানো হবে। গড়ে দশমিক ৫ শতাংশ করে কমতে পারে। স্ট্রিম গ্রাফিক

সরকার আগামী ছয় মাসের জন্য সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৭ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত।

চলতি বছরের শুরুতেও সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে আগের হার বহাল রাখা হয়েছিল। বাজেটের আগেও ধারণা করা হচ্ছিল, ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবারও মুনাফার হার কমানো হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বার্থ বিবেচনায় আগের হারই বহাল রাখা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, সুদহার কমালে সরকারের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতো; কিন্তু অনেক পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল।

কেন সুদ বাড়ানো হলো না

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সরকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ করে। একই বছরের জুলাইয়ে তা কমিয়ে ছয় মাস পরপর মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণের নীতি চালু করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুদহার কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি হলেও তিন দিনের মধ্যে তা প্রত্যাহার করে আগেরটি বহাল রাখা হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারকে একদিকে মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীর স্বার্থ রক্ষা করতে হচ্ছে; অন্যদিকে এর সুদ ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হচ্ছে। তাই মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

তাঁদের মতে, এর পেছনে চারটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, সুদহার বাড়লে সুদ পরিশোধের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এরই মধ্যে জাতীয় বাজেটে সুদ পরিশোধ অন্যতম বড় ব্যয়ের খাত হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত, বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর পর ব্যাংকের আমানতে সুদ বেড়েছে। এতে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার বাড়ানোর চাপ কমেছে। তৃতীয়ত, সঞ্চয়পত্রে বেশি মুনাফা দিলে ব্যাংক থেকে আমানত সঞ্চয়পত্রে চলে যেতে পারে। এটা ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহ এবং বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। চতুর্থত, ট্রেজারি বন্ডের সুদ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতেও সরকার সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার বহাল রেখেছে।

কোন সঞ্চয়পত্রে কত মুনাফা

১. পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে প্রথম ধাপ তথা ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে প্রথম বছর ৯.৭৪%, দ্বিতীয় বছর ১০.২১%, তৃতীয় বছর ১০.৭২%, চতুর্থ বছর ১১.২৬%, পঞ্চম বছরে ১১.৮৩% মুনাফা পাওয়া যাবে।

আর দ্বিতীয় ধাপ তথা ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগে প্রথম বছর ৯.৭২%, দ্বিতীয় বছর ১০.১৯%, তৃতীয় বছর ১০.৭০%, চতুর্থ বছর ১১.২৩%, পঞ্চম বছরে ১১.৮০% মুনাফা পাওয়া যাবে।

২. পরিবার সঞ্চয়পত্রে প্রথম ধাপের বিনিয়োগে প্রথম বছর ৯.৮১%, দ্বিতীয় বছর ১০.২৯%, তৃতীয় বছর ১০.৮০%, চতুর্থ বছর ১১.৩৫%, পঞ্চম বছরে ১১.৯৩% মুনাফা পাওয়া যাবে।

আর দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগে প্রথম বছর ৯.৭২%, দ্বিতীয় বছর ১০.১৯%, তৃতীয় বছর ১০.৭০%, চতুর্থ বছর ১১.২৩%, পঞ্চম বছরে ১১.৮০% মুনাফা পাওয়া যাবে।

৩. পেনশনার সঞ্চয়পত্রে প্রথম ধাপের বিনিয়োগে প্রথম বছর ৯.৮৪%, দ্বিতীয় বছর ১০.৩২%, তৃতীয় বছর ১০.৮৪%, চতুর্থ বছর ১১.৩৯%, পঞ্চম বছরে ১১.৯৮% মুনাফা পাওয়া যাবে।

আর দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগে প্রথম বছর ৯.৭২%, দ্বিতীয় বছর ১০.১৯%, তৃতীয় বছর ১০.৮৪%, চতুর্থ বছর ১১.৩৯%, পঞ্চম বছরে ১১.৯৮% মুনাফা পাওয়া যাবে।

৪. তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে প্রথম ধাপের বিনিয়োগে প্রথম বছর ১০.৬৫%, দ্বিতীয় বছর ১১.২২%, তৃতীয় বছরে ১১.৮২% মুনাফা পাওয়া যাবে।

আর দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগে প্রথম বছর ১০.৬০%, দ্বিতীয় বছর ১১.১৬%, তৃতীয় বছরে ১১.৭৭% মুনাফা পাওয়া যাবে।

৫. পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিটে প্রথম ধাপের বিনিয়োগে প্রথম বছর ১০.৬৫%, দ্বিতীয় বছর ১১.২২%, তৃতীয় বছরে ১১.৮২% মুনাফা পাওয়া যাবে।

আর দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগে প্রথম বছর ১০.৬০%, দ্বিতীয় বছর ১১.১৬%, তৃতীয় বছরে ১১.৭৭% মুনাফা পাওয়া যাবে।

সঞ্চয়কারীরা কি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন

এর উত্তর নির্ভর করছে মূল্যস্ফীতির ওপর। কোনো বিনিয়োগকারী যদি বছরে ১১ শতাংশ মুনাফা পান, কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ থাকে, তাহলে প্রকৃত আয় মাত্র ২ শতাংশ। এ কারণে অর্থনীতিবিদরা নামমাত্র সুদের চেয়ে প্রকৃত সুদের হারকে বেশি গুরুত্ব দেন।

যদি আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কমে আসে, তাহলে বর্তমান সুদহারও হয়তো আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে গেলে একই সুদহার কম লাভজনক হয়ে পড়বে।

সঞ্চয়পত্র নাকি ব্যাংকের এফডিআর—কোনটি বেশি লাভজনক

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অপরিবর্তিত থাকায় বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে—এখন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেশি লাভজনক, নাকি ব্যাংকের স্থায়ী আমানত (এফডিআর)?

বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ব্যাংকে এফডিআরের সুদের হার মেয়াদ, আমানতের পরিমাণ ও ব্যাংকভেদে ৬ থেকে ১০ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে। বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংক ৩ মাস থেকে ৩ বছরের আমানতে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। কিছু বেসরকারি ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি আমানতে ১১ থেকে ১২ শতাংশ সুদের প্রস্তাব দিলেও এসব হার সাধারণত নির্দিষ্ট মেয়াদ, আমানতের পরিমাণ বা বিশেষ শর্তের ওপর নির্ভরশীল।

বিপরীতে সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্রে এখনও অধিকাংশ ব্যাংকের এফডিআরের তুলনায় বেশি মুনাফা মিলছে।

নিরাপত্তার দিক থেকে?

নিরাপত্তার দিক থেকেও সঞ্চয়পত্র এগিয়ে। এটি সরকারের পূর্ণ গ্যারান্টিযুক্ত বিনিয়োগ। অন্যদিকে আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় প্রতি ব্যাংকে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আমানত সুরক্ষিত থাকে। এর বেশি অর্থের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তবে তারল্য বা প্রয়োজনের সময় টাকা ব্যবহারের সুযোগের দিক থেকে এফডিআর সুবিধাজনক। অধিকাংশ ব্যাংকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এফডিআর ভাঙানো যায়; যদিও সুদের হার কিছুটা কমে যেতে পারে। অনেক ব্যাংক এফডিআরের বিপরীতে ঋণও দিয়ে থাকে। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্র দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য তৈরি। নির্ধারিত সময়ের আগে নগদায়ন করলে মুনাফার হার অনেকখানি কমে যায়।

করের বেলায় তফাৎ?

উভয় ক্ষেত্রেই মুনাফার ওপর উৎসে কর কাটা হয়। তবে নতুন বাজেট অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কাটা অগ্রিম কর আর চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হবে না। আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে প্রযোজ্য করের চেয়ে বেশি কাটা অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, যাঁরা ২ থেকে ৫ বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য নিশ্চিত ও তুলনামূলক বেশি মুনাফা চান, তাঁদের জন্য সঞ্চয়পত্র এখনো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। অন্যদিকে যাঁদের স্বল্পমেয়াদে নগদ টাকার প্রয়োজন হতে পারে, তাঁদের জন্য ব্যাংকের এফডিআর বেশি উপযোগী। আর বড় বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাতে এবং প্রয়োজনে অর্থ ব্যবহারের সুবিধা রাখতে সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর—দুই ধরনের বিনিয়োগে সমন্বয় করাই কার্যকর কৌশল হতে পারে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত