ad
ইতিহাসের এই দিনে

বুড়িগঙ্গার সাঁতারু থেকে ইংলিশ চ্যানেলজয়ী প্রথম এশীয় ব্রজেন দাস

আজ ১৮ আগস্ট। ১৯৫৮ সালের এই দিনেই ইতিহাসে নাম লিখিয়েছিলেন ব্রজেন দাস। এক সাঁতারুর ব্যর্থতার খবর থেকে মনে জন্মেছিল যে স্বপ্ন, তা তাঁকে নিয়ে যায় ইংলিশ চ্যানেলে। বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রায় তিনি প্রথম এশীয় হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল জয় করেছিলেন। এরপর আরও পাঁচবার এই কঠিন জলপথ পাড়ি দিয়ে গড়েছিলেন অনন্য কীর্তি।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ২১: ০৬
ব্রজেন দাস। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

বুড়িগঙ্গার পানিতে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, তা একদিন গিয়ে শেষ হলো ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে আলাদা করেছে এই চ্যানেল। কোনো এক সাঁতারুর ব্যর্থতার খবরই একসময় নাড়া দিয়েছিল বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা ব্রজেন দাসের। তাঁর মনে হলো, ইংলিশ চ্যানেল তাঁকে পাড়ি দিতেই হবে। এরপর সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন একবার-দুবার নয়, তিন বছরে মোট ছয়বার।

১৯৮৫ সালে সাফ গেমসে ব্রজেন দাসকে উদ্দেশ্য করে কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলী বলেছিলেন, আমি হচ্ছি ‘কিং অফ রিং’ আর আপনি হচ্ছেন ‘কিং অফ চ্যানেল’, আপনার অর্জন আমার চেয়ে ঢের বেশি গৌরবের।

ব্রজেন দাস জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৭ সালের ৯ ডিসেম্বর বিক্রমপুরের কুচিয়ামোড়া গ্রামে। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ঢাকার কে এল জুবিলি হাইস্কুল থেকে ১৯৪৬ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই সাঁতারের প্রতি তাঁর ছিল দারুণ আগ্রহ। তাঁর সাঁতার শেখার গল্প শুরু হয়েছিল বুড়িগঙ্গায়।

তবে ব্রজেন শুধু ভালো সাঁতারু হতে চাননি। ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে প্রতিযোগিতায় জেতার তীব্র আগ্রহও তৈরি হয়। ১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গে ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের সাঁতার প্রতিযোগিতায় শুরু হয় তাঁর দাপট। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর ১০০, ২০০, ৪০০ ও ১,৫০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে শিরোপা জেতেন। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় প্রতিযোগিতাতেও ১০০ ও ৪০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৫৬ সালের অলিম্পিকে পাকিস্তান সাঁতার দলেও তাঁর নাম ছিল।

ইংলিশ চ্যানেলে সাঁতরাচ্ছেন জেন দাস। সংগৃহীত ছবি
ইংলিশ চ্যানেলে সাঁতরাচ্ছেন জেন দাস। সংগৃহীত ছবি

কিন্তু পুলের ছোট দূরত্বের সাঁতার একসময় তাঁকে আর টানছিল না। তাঁর চোখ চলে গেল আরও দূরে, খোলা সমুদ্রের দিকে।

এক স্মৃতিকথায় ব্রজেন দাস লিখেছিলেন, ১৯৫৬ সালে সংবাদপত্রে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় এক সাঁতারুর ব্যর্থতার খবর পড়েছিলেন। সেই খবর তাঁকে নাড়া দেয়। মনে মনে ঠিক করেন, ইংলিশ চ্যানেল তাঁকে পার হতেই হবে। এরপর শুরু হয় কঠোর প্রস্তুতি। পুলে দীর্ঘ সময় সাঁতার কাটার পাশাপাশি নদীর স্রোত, ঢেউ ও দীর্ঘ দূরত্বের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে থাকেন তিনি। শীতলক্ষ্যা ও মেঘনার উত্তাল পানিতে চলতে থাকে অনুশীলন। একসময় নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত প্রায় ৪৬ মাইল পথও সাঁতরে অতিক্রম করেন।

ইংলিশ চ্যানেলে যাওয়ার আগে আরও একটি বড় পরীক্ষায় অংশ নেন ব্রজেন। ইতালির কাপ্রি দ্বীপ থেকে নেপলস পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরের ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি। এরপর শুরু হয় তাঁর বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত ইংলিশ চ্যানেল অভিযান।

অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ব্রজেন দাসের সামনে ইংলিশ চ্যানেল।ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মাঝের এই জলপথ তখন দীর্ঘ দূরত্বের দক্ষ সাঁতারুদের কাছেও সহজ কিছু ছিল না। ঠান্ডা পানি, তীব্র স্রোত, ঢেউ আর আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা; সবকিছু মিলিয়ে এখানে দক্ষ সাঁতারু হওয়ার পাশাপাশি প্রচুর ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তারও প্রয়োজন ছিল।

১৯৫৮ সালের ১৮ আগস্ট রাতে শুরু হয় সেই সাঁতার। প্রায় ১৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট পর ইংল্যান্ডের উপকূলে পৌঁছান ব্রজেন দাস। তিনি হয়ে ওঠেন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া প্রথম এশীয় সাঁতারু। কিন্তু ব্রজেনের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি।

চ্যানেল অতিক্রম করার পর ব্রজেন দাস। সংগৃহীত ছবি
চ্যানেল অতিক্রম করার পর ব্রজেন দাস। সংগৃহীত ছবি

১৯৫৯ সালে তিনি আবার ইংলিশ চ্যানেলে নামেন। এরপর ১৯৬০ ও ১৯৬১ সালেও চ্যানেল পাড়ি দেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে মোট ছয়বার ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন তিনি। ছয়বার চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার কৃতিত্বও তাঁকে ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে দেয়।

এর মধ্যে ১৯৬১ সালের সাফল্য ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। সেবার ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড পর্যন্ত চ্যানেল পাড়ি দিতে তাঁর সময় লাগে মাত্র ১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট। এই সময়ের মধ্য দিয়ে তিনি ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড পর্যন্ত দ্রুততম চ্যানেল পার হওয়ার বিশ্বরেকর্ড গড়েন, যা ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল।

ব্রজেন দাসের কৃতিত্ব তখন আর শুধু পূর্ব পাকিস্তান বা উপমহাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও তাঁর নাম পরিচিত হয়ে ওঠে। ১৯৬৫ সালে তিনি ইন্টারন্যাশনাল ম্যারাথন সুইমিং হল অব ফেমে সম্মানীয় সাঁতারু হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৮৬ সালে চ্যানেল সুইমিং অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে ‘কিং অব দ্য চ্যানেল’ উপাধিতে সম্মানিত করে।

১৯৯৮ সালের ১ জুন ব্রজেন দাস কলকাতায় মারা যান। মৃত্যুর পর মরদেহ ঢাকায় এনে ১৯৯৮ সালের ৩ জুন ঢাকার পোস্তগোলা শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য ও সৎকার সম্পন্ন করা হয়। পরের বছর ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

বুড়িগঙ্গার সাঁতারু থেকে ইংলিশ চ্যানেলজয়ী প্রথম এশীয় ব্রজেন দাস