টুথপেস্টের আগে, টুথপেস্টের পরে

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ২২: ১০
টুথপেস্টের আগে, টুথপেস্টের পরে। স্ট্রিম গ্রাফিক

টেলিভিশন চালু করলেই টুথপেস্টের নানা রকম বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। কোনো বিজ্ঞাপনে জানতে চাওয়া হয় টুথপেস্টে নুন (লবণ) আছে কি না, কোনোটি দাঁতের শিরশির ভাব দূর করার কথা বলে, আবার কোনোটি দেয় নিঃশ্বাসের সতেজতা। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, আমাদের ব্যবহৃত বেশিরভাগ টুথপেস্টেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আছে। আর তা নিয়েই সরব সোশ্যাল মিডিয়া।

প্রতিদিন টুথপেস্ট ব্যবহার না করলে আমাদের দিনই শুরু হয় না। হাজার হাজার বছর আগেও মানুষ দাঁত পরিষ্কার রাখতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টুথব্রাশের আকার ও টুথপেস্টের উপাদান অনেক বদলেছে। মানুষের দাঁত পরিষ্কারের এই দীর্ঘ যাত্রার গল্প তাই বেশ চমকপ্রদ।

মানুষ কবে থেকে দাঁত ব্রাশ করতে শুরু করল

মানুষ ঠিক কবে থেকে দাঁতের যত্ন নেওয়া শুরু করেছিল, তার সঠিক কোনো বছর বা তারিখ জানা নেই। তবে ইতিহাসবিদদের ধারণা, এই চেষ্টা শুরু হয়েছিল অনেক অনেক বছর আগে। স্পেনের উত্তরাঞ্চলে পাওয়া কয়েক হাজার বছরের পুরোনো মানুষের দাঁতের জমাট প্লাক সেই প্রমাণই দেয়। গবেষক কারেন হারডির নেতৃত্বে ওই দাঁতের জমাট প্লাক পরীক্ষা করে শস্য, উদ্ভিদ, মাংস ও কাঠজাত আঁশের চিহ্ন পাওয়া যায়। কাঠজাত আঁশগুলো কীভাবে সেখানে এসেছিল, তা নিশ্চিত নয়। গবেষকদের ধারণা, সম্ভবত দাঁত পরিষ্কার করতেই গাছের ডাল ব্যবহার করা হয়েছিল। অর্থাৎ, অতি প্রাচীনকালের মানুষও দাঁতের যত্ন নিত।

‘ডিম আগে, নাকি মুরগি আগে’? এই ধাঁধার মতো আপনার মনেও কি কখনো প্রশ্ন জেগেছে যে, টুথপেস্ট আগে নাকি টুথব্রাশ আগে এসেছে?

এমনও শোনা যায়, প্রাচীন রোমে ধনী পরিবারের লোকেরা নাকি শুধু দাঁত পরিষ্কার করে দেওয়ার জন্যই আলাদা ভৃত্য বা কর্মচারী রাখত! তবে এই কথার পক্ষে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

দাঁত পরিষ্কারে ডিমের খোসার গুঁড়ো ও গরুর খুরের পোড়া ছাই

প্রাচীন মিশরের কয়েক হাজার বছরের পুরোনো চিকিৎসাবিষয়ক নথিতে দাঁত পরিষ্কারের মিশ্রণের রেসিপি পাওয়া যায়। তবে ঠিক কোন সময় থেকে মিশরীয়রা নিয়মিত এসব মিশ্রণ ব্যবহার শুরু করেছিল, তা নিশ্চিত নয়। প্রাচীন গ্রিস ও রোমেও দাঁত পরিষ্কার করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পেস্ট বা গুঁড়ো ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। তবে সেগুলোর নির্দিষ্ট সময়কাল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশ ও চীনে খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৫০০ বছর থেকে দাঁত পরিষ্কারের জন্য বিশেষ মিশ্রণ ব্যবহারের প্রচলন ছিল। দাঁত ও মাড়ি ভালো রাখা, দাঁত সাদা করা এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর করাই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়, প্রাচীন মিশরীয়দের দাঁত পরিষ্কারের কোনো কোনো মিশ্রণে পোড়া খুরের ছাই, ডিমের খোসার গুঁড়ো ও ঝামা পাথরের মতো খসখসে উপাদান ব্যবহার করা হতো। এই মিশ্রণ দাঁতের ময়লা ঘষে তুলতে সাহায্য করত। পরবর্তী সময়ে গ্রিক ও রোমানরা দাঁত পরিষ্কারের জন্য আরও খসখসে জিনিস ব্যবহার করতে শুরু করে। তারা পশুর হাড়ের গুঁড়োর সঙ্গে ঝিনুক বা শামুকের খোলসের গুঁড়ো মিশিয়ে দাঁত মাজত। মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে রোমানরা এই মিশ্রণে সুগন্ধি গাছ-গাছড়া মিশিয়ে নিত। এ ছাড়া কোনো কোনো এলাকায় কয়লার গুঁড়ো এবং গাছের ছাল ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া গেছে।

পুরোনো দিনের বিজ্ঞাপন। সংগৃহীত ছবি
পুরোনো দিনের বিজ্ঞাপন। সংগৃহীত ছবি

অন্যদিকে চীনারা দাঁত পরিষ্কারের জন্য নানা রকম ভেষজ বা গাছ-গাছড়ার উপাদান ব্যবহার করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা সেই মিশ্রণে জিনসেং, পুদিনা ও লবণ মেশাতে শুরু করে। ফলে দাঁত যেমন পরিষ্কার হতো, তেমনি মুখও অনেকক্ষণ সতেজ থাকত।

টুথক্রিম থেকে টুথপেস্টে

আঠারো ও উনিশ শতকে ইউরোপে দাঁত পরিষ্কারের গুঁড়ো ও ক্রিমজাত মিশ্রণের বিকাশ ঘটে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত টুথপেস্ট সহজলভ্য হতে শুরু করে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, তখনকার টুথপেস্টে পরিষ্কার করার উপাদান হিসেবে সাবান ব্যবহার করা হতো! ইংল্যান্ডের কোনো কোনো কোম্পানি পেস্টে সুপারিও মেশাত বলে ধারণা করা হয়। এরপর ১৮৫০ সালের দিকে পেস্টের উপাদানে যুক্ত হয় চকের গুঁড়ো। ধীরে ধীরে শুকনো গুঁড়ো দিয়ে দাঁত মাজার বদলে নরম ক্রিমের মতো পেস্ট তৈরি হতে থাকে।

১৮৭৩ সালে ‘কোলগেট’ কাচের বয়ামে সুগন্ধিযুক্ত টুথপেস্ট বাজারজাত শুরু করে। এরপর ওয়াশিংটন শেফিল্ড নামের আমেরিকার একজন দাঁতের ডাক্তার পুদিনার রস মিশিয়ে নতুন এক ধরনের টুথক্রিম তৈরি করেন। এটি তাঁর রোগীদের কাছে খুব জনপ্রিয় হওয়ায়, তিনি নরম ধাতব টিউবের ভেতর পেস্ট ভরে বিক্রি করতে শুরু করেন। ধারণা করা হয়, ছবি আঁকার রঙের টিউব দেখেই তাঁর মাথায় এই বুদ্ধি এসেছিল। পরে কোলগেট কোম্পানিও কাচের বয়াম ছেড়ে এই টিউব ব্যবহার করা শুরু করে।

১৯৫০-এর দশকে টুথপেস্টে সবচেয়ে বড় বদল আসে ‘ফ্লুরাইড’ ব্যবহারের মাধ্যমে। যদিও উনিশ শতকের শেষভাগ থেকেই ফ্লুরাইড নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল, তবে সাধারণ মানুষের কাছে ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট জনপ্রিয় হতে ১৯৫০ দশক পর্যন্ত সময় লাগে। এরপর দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে ফ্লুরাইড টুথপেস্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।

টুথব্রাশ নাকি টুথপেস্ট—কোনটি আগে এল?

‘ডিম আগে, নাকি মুরগি আগে’? এই ধাঁধার মতো আপনার মনেও কি কখনো প্রশ্ন জেগেছে যে, টুথপেস্ট আগে নাকি টুথব্রাশ আগে এসেছে?

১৮৫৯ সালের টুথপাউডার। সংগৃহীত ছবি
১৮৫৯ সালের টুথপাউডার। সংগৃহীত ছবি

দাঁত পরিষ্কারের গুঁড়ো বা মিশ্রণ এবং ডালজাত ব্রাশ—দুটোরই ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। কোনটি আগে এসেছে, তা নির্ভর করে ‘টুথপেস্ট’ ও ‘টুথব্রাশ’ বলতে কোন ধরনের উপকরণ বোঝানো হচ্ছে তার ওপর। তাই একটিকে নিশ্চিতভাবে অন্যটির চেয়ে পুরোনো বলা কঠিন।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০-৩০০০ বছর আগে থেকে ব্যাবিলনীয় ও মিশরীয়রা সর্বপ্রথম দাঁত মাজার জিনিসপত্র তৈরি করে বলে ধারণা করা হয়। ছোট ডাল কেটে তার এক মাথা ঘষে বা চিবিয়ে নরম আঁশ বের করত। সেই আঁশ দিয়েই দাঁত ঘষা হতো। এই উপকরণকে চিউ স্টিক বা মিসওয়াক ধরনের ব্রাশ বলা হয়। প্রায় ১৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে চীনে সুগন্ধিযুক্ত গাছের ডাল দিয়ে নতুন ধরনের চিউ স্টিক তৈরি হয়। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই পরে ব্রিসলযুক্ত টুথব্রাশ তৈরি হয়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৪৯৮ সালে চীনের মানুষ শূকরের ঘাড়ের শক্ত লোম দিয়ে প্রথম ব্রিসলযুক্ত টুথব্রাশ তৈরি করে। লোমগুলো বাঁশ কিংবা হাড়ের হাতলের সঙ্গে বসানো হতো।

তবে কিছু গবেষক মনে করেন, টাং রাজবংশের সময়েও এ ধরনের ব্রাশ ছিল। যদিও ১৪৯৮ সালের নকশাকেই আধুনিক টুথব্রাশের ‘পূর্বসূরি’ হিসেবে সবচেয়ে বেশি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই ব্রাশ ইউরোপে পৌঁছানোর পর কিছু পরিবর্তন আসে। ইউরোপীয়রা শূকরের শক্ত লোম খুব একটা পছন্দ করত না। তাই অনেকে শূকরের বদলে ঘোড়ার নরম লোম ব্যবহার করতে শুরু করে। কেউ কেউ আবার পাখির পালক দিয়েও ব্রাশ তৈরি করত।

১৭৮০ সালে ইংরেজ উদ্যোক্তা উইলিয়াম অ্যাডিস বাণিজ্যিকভাবে টুথব্রাশ উৎপাদন শুরু করেন। তাঁর তৈরি ব্রাশের হাতল ছিল বাছুরের হাড় দিয়ে তৈরি আর ব্রিসল বা মাজুনির অংশটা ছিল শূকরের লোমের। এটি আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রথম দিকের টুথব্রাশ হিসেবে পরিচিত। ১৮৪৪ সালে তিন সারির ব্রিসলযুক্ত টুথব্রাশের নকশা জনপ্রিয় হয়। কিন্তু তখনও পশুর লোমই ব্যবহার করা হতো। ১৯৩৫ সালে গবেষক ওয়ালেস ক্যারোদার্সের নেতৃত্বে নাইলন উদ্ভাবিত হয়। ১৯৩৮ সালে বাজারে আসে নাইলন ব্রিসলযুক্ত আধুনিক টুথব্রাশ। এর নাম দেওয়া হয় ‘ডক্টর ওয়েস্টস মিরাকল-টাফট’। ১৯৫০-এর দশকে নাইলন আরও নরম করা হয়। কারণ মানুষ নরম ব্রাশই বেশি পছন্দ করছিল।

অনেকে মনে করেন প্রথম ইলেকট্রিক টুথব্রাশ ১৯৩৯ সালে তৈরি হয়েছিল। তবে বাণিজ্যিকভাবে সফল প্রথম ইলেকট্রিক টুথব্রাশ বাজারে আসে ১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ডে। এটি ১৯৬০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আসে। এরপর ধীরে ধীরে এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

এভাবেই বহু বছরের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রতিদিনের পরিচিত টুথপেস্ট ও টুথব্রাশ আজকের এই আধুনিক রূপ পেয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত