বিউটি পালের প্রতিবাদী দীক্ষায় আমাদের ‘শিক্ষা’ কী?

অর্থী দাস
অর্থী দাস

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১৯: ০২
বিউটি-পাল

কফিল আহমেদের ‘গঙ্গাবুড়ি’ গানের একটি চরণ হলো—‘প্রাণে প্রাণ মেলাবই, বলে রাখি।’ সেই প্রাণের সাথে প্রাণ মিলিয়েছেন দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। গত কদিনে দেশে কিছু অসাধারণ ঘটনা ঘটেছে, যার একটির মধ্যমণি হয়ে গেছেন প্রাথমিকের শিক্ষকেরা।

তাঁরা সহকর্মীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া হেনস্তার প্রতিবাদ করেছেন সহকর্মীর দেখানো পথেই। তাঁদের চমকপ্রদ উপস্থাপনা সাড়া ফেলেছে সকল মহলে। ইতিবাচক এবং অভিনব উপায়ে তারা রীতিমতো ‘বিপ্লব’ করে ফেলেছেন। শিক্ষকরা জাতিকে পথ দেখান, প্রাথমিকের শিক্ষকরা এবার জাতিকে দেখালেন কীভাবে একাত্ম হয়ে ভেঙেচুরে ছারখার করে দিতে হয় আসুরিক মনোভাবের কূপমণ্ডূকদের।

বর্তমান ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কয়েক সেকেন্ডের একটি রিল ভিডিও প্রকাশ করেন। এতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নীলাভ শাড়ি পরা অবস্থায় তাকে হাঁটতে এবং ঘুরতে দেখা যায়।

ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডের শ্রাবণের মেঘ অ্যালবামে আশরাফ বাবুর কথা ও সুরে মেজবাহ্ রহমানের গাওয়া ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটির সঙ্গে ভিডিও প্রকাশ করেন বিউটি পাল। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রতিক্রিয়াশীল পক্ষ সমালোচনা শুরু করে। সেই সুবাদে বিউটি পালকে রীতিমতো সাইবার বুলিং করার জন্য উঠে পড়ে লাগে একটি মহল।

তবে সমালোচনার চেয়ে বরং প্রশংসা কুড়িয়ে মানুষের মন জয় করে নিয়েছে ভিডিওটি। বিষয়টিকে একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন নেটিজেনরা। তবে, নেটিজেনদের চেয়েও বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাঁদের সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানোর অভূতপূর্ব পদ্ধতির কারণে। বলা যায়, এই প্রতিবাদ এতটাই ‘বিউটিফুল’ যে, তা আমাদের নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।

বেশ কিছু বছর ধরে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা অনেকেই যোগদান করেছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক উভয় পদে এই নজির দেখা যাচ্ছে। আজ নিয়োগ প্রক্রিয়া কিংবা সুযোগ সুবিধা নিয়ে কিছুই বলব না। আজ বলব পরিবর্তন নিয়ে।

পুরোনো শিক্ষকদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পাশাপাশি নতুন এই শিক্ষকবৃন্দ শিশুশিক্ষায় এক নবদিগন্ত উন্মোচন করছেন। যোগ করেছেন আধুনিক সব টুলস। তাঁদের মন ও মননের আলোয় শিশুরা মনের আনন্দে পড়তে শিখছে। বন্ধুর মতো মিশতে পারছে শিক্ষকের সঙ্গে।

পুরোনো শিক্ষকদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পাশাপাশি নতুন এই শিক্ষকবৃন্দ শিশুশিক্ষায় এক নবদিগন্ত উন্মোচন করছেন। যোগ করেছেন আধুনিক সব টুলস। তাঁদের মন ও মননের আলোয় শিশুরা মনের আনন্দে পড়তে শিখছে। বন্ধুর মতো মিশতে পারছে শিক্ষকের সঙ্গে। শৈশবে মুক্তচিন্তার শিক্ষকদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম অবশ্যই ভালো কিছু বয়ে আনবে বলে আশা করা যায়। বিউটি পালদের এই ভূমিকাকে সেই নিরিখেই পাঠ করার সুযোগ আছে।

চারদিকে কূপমণ্ডুকদের আচরণে যখন মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত, সেই সময় বিউটি পালের এই উদযাপন এবং তাঁর সহকর্মীদের প্রতিবাদ যেন শীতল পরশ নিয়ে হাজির হয়েছে। একজন রুচিশীল মানুষের খুব সাধারণ একটি রিল ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীলতার এই মাত্রার জন্যই বোধহয় কবীর সুমন তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন ‘প্রাণে গান নাই মিছে তাই রবি ঠাকুর মূর্তি গড়া।’

মুক্তির আলো এই প্রতিক্রিয়াশীলদের মনের আকাশে রঙ ছড়াতে পারছে না। তাদের বাইনারি চিন্তার বাইরে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, যিনি কি না একজন নারী, তাঁর মধ্যে এই প্রাণের উচ্ছ্বাস তারা মেনে নিতেই পারছেন না। শ্রাবণের এই ‘শান্তির বারি’ তাদের মন যখন অশান্ত করছে, তাদের অসুর প্রবৃত্তি তখন সুরের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে।

সুর, তাল ও সংগীতহীনরা মুক্ত প্রাণের বিউটি পালের অনিন্দ্য সুন্দর উদযাপনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তারা নোংরা খেলায় মেতে উঠতে চেয়েছিল। অথচ তাদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন বিউটি পালেরই সহকর্মীরা। এই শিক্ষকদের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন বিভিন্ন স্তর ও পর্যায়ের সচেতন নাগরিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন:

“হাসিকান্না হীরাপান্না দোলে ভালে,

কাঁপে ছন্দে ভালোমন্দ তালে তালে,

নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে,

তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।

কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ

দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ--

সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে

তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ॥

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিবাদের দোলায় চিত্ত দুলে উঠছে অনুভূতিশীল সুকুমার চিত্তের মানুষদের। এমন বাংলাদেশ বহুদিন দেখা যায় না। দেশে যখন প্রতিক্রিয়াশীলদের দোর্দণ্ড প্রতাপ, তখন প্রাথমিক শিক্ষকদের এই সম্মিলিত প্রতিরোধ নিরন্তর প্রেরণার গল্প হয়ে উঠবে দিন বদলের মেলায়। রবীন্দ্রনাথের এই গান তাই প্রাসঙ্গিক হয়ে আবারও প্রতিভাত হয়েছে আমাদের সামনে।

এই বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল মোল্লা বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হিসেবে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের আলোচনা হয়েছে। তদন্ত শেষে দেখা হবে কোনও ধরনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে কিনা। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রায় একই কথা বলেছেন সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশাদ। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। সেখানে সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘিত হয়েছে কিনা- তা খতিয়ে দেখা হবে।

বিউটি পালের আপলোডকৃত ভিডিও কোনোভাবেই চাকরির নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বরং যারা জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত বিউটি পালের মতো মেধাবী এবং প্রতিশ্রুতিশীল নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করতে ষড়যন্ত্র করছেন, তারাই রাষ্ট্রপরিপন্থী হিসেবে গণ্য হবার কথা।

কোনো আচরণ বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে কি না, সেটা বুঝতে ফিরে তাকাতে হবে সরকারি চাকরিজীবী আইন ২০১৮-এর দিকে। ২০২০ সালের ২০ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯ (পরিমার্জিত সংস্করণ)’ অনুসরণ করার বিষয়ে পরিপত্র জারি করে। সেখানে বলা হয়—“সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার বা নিজ অ্যাকাউন্টের ক্ষতিকারক বিষয়বস্তুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হবেন এবং এ জন্য প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপেলোড, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থি কোনো রকম তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে বা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পরিপন্থি কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা যাবে না।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট বা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে এরূপ কোনো পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো সার্ভিস/পেশাকে হেয়প্রতিপন্ন করে এমন কোনো পোস্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

লিঙ্গ বৈষম্য বা এ সংক্রান্ত বিতর্কমূলক কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা যাবে না।

জনমনে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো বিষয় লেখা, অডিও বা ভিডিও আপলোপ, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ভিত্তিহীন, অসত্য ও অশ্লীল তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে।

অন্য কোনো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য সম্বলিত পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড, কমেন্ট, লাইক ও শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

না, বিউটি পালের আপলোডকৃত ভিডিও কোনোভাবেই এই নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বরং যারা জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত বিউটি পালের মতো মেধাবী এবং প্রতিশ্রুতিশীল নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করতে ষড়যন্ত্র করছেন, তারাই রাষ্ট্রপরিপন্থী হিসেবে গণ্য হবার কথা। রাষ্ট্রের একজন নাগরিকের আনন্দ উদযাপনের ভিডিওকে যারা ভিন্ন উদ্দেশ্যে প্রচার করছেন, তারা নারীর অগ্রগতি, মুক্তবাতাসে আনন্দে বাঁচার অন্তরায় বলে ধরে নেয়াই উত্তম।

যেখানে শিশুদের মনের ইতিবাচক বিকাশের লক্ষ্যে সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে সংগীত, চারুকলাকে পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে নানান সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, সেখানে এই পশ্চাৎপন্থীদের কোনো অন্যায় আস্ফালনকে গুরুত্ব প্রদান করা সমীচীন হবে না। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার কারিগরদের হারতে দেয়া যাবে না। এই শিক্ষাগুরুরা আমাদের নতুন শিক্ষা দিলেন না, দীক্ষাও দিলেন তাঁদের সংহতি ও প্রতিবাদের সৌজন্যে। করলেন উজ্জীবিতও।

বিউটি পালের উদযাপন এবং তাঁর সহকর্মীদের সংহতির প্রতি উল্টো সংহতি ও শ্রদ্ধা জানানোই এখন আমাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্য।

লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের শিক্ষণ সহকারী

Ad 300x250

সম্পর্কিত