প্রশাসনে দলীয় প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন, হতাশ নিয়মিত কর্মকর্তারা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ২৩: ০৯
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ছবি: সংগৃহীত

সরকারের ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে একযোগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও সহযোগী সংগঠনের সাবেক নেতাদের আধিক্য রয়েছে।

একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ মর্যাদার এসব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশাও বেড়েছে। বিশেষ দক্ষতা ও দাপ্তরিক অভিজ্ঞতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় কতটা প্রাধান্য পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) পৃথক ১২টি প্রজ্ঞাপন জারি করে এসব নিয়োগ দেয়। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিবসহ বাকি ১১টি পদই গ্রেড-২ মর্যাদার, যা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর।

নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় অংশই বিএনপির নেতা

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন মো. সামসুল আলম। এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হিসেবে মো. সালাহ্উদ্দিন সরকার, বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মোহাম্মদ রাশেদুল হক, বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেনর বুলবুল, বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব হিসেবে মো. কামরুজ্জামান (কামরুজ্জামান দুলাল), বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে আবদুল খালেক, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মো. শামসুজ্জামান (সুরুজ), বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু), বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে মো. জাকির সিদ্দিকি, বিসিকের চেয়ারম্যান হিসেবে বেনজীর আহমেদ এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মো. মামুন হাসান দায়িত্ব পেয়েছেন।

সরকারি আদেশ অনুযায়ী, যোগদানের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য তাদের নিয়োগ কার্যকর হবে। এই সময়ে তারা অন্য কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশই বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি কিংবা সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বোয়েসেলের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হক বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বিএনপির কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক।

জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব মো. কামরুজ্জামান দুলাল জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক ও সহসভাপতি ছিলেন। বিএসইসির চেয়ারম্যান আবদুল খালেক বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু) বিএনপির কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সহ-সম্পাদক, তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. জাকির সিদ্দিকি যুবদলের সাবেক সহসভাপতি, বিসিকের চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. মামুন হাসান যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন।

পদোন্নতি নিয়ে কর্মকর্তাদের ক্ষোভ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেড-২ ও সমপর্যায়ের পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংখ্যা বাড়ায় নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসন ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের এক অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘একজন কর্মকর্তা ২৫ থেকে ৩০ বছর চাকরি করার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান হওয়ার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু নিয়মিত পদোন্নতির বদলে যদি বাইরের কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি হয়।’

১৭তম ব্যাচের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘পদোন্নতি শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়; এটি পুরো ক্যাডার ব্যবস্থার অনুপ্রেরণা ও পেশাগত মনোবলের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। তবে এবার একসঙ্গে ১২ জনকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অতীতে দু-একজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলেও একসঙ্গে ১২ জনকে নিয়োগ এবারই প্রথম।

অতীতেও ছিল নজির

২০০১-০৬ মেয়াদে চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিএনপি নেতা শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ২০০৪ সালে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। একই সময়ে নারায়ণগঞ্জের বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার ২০০১ সালে বিআরটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়ে টানা পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন।

আইনে সুযোগ, তবে ‘ব্যতিক্রম’ হওয়া উচিত

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারায় বিশেষ দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে এটিকে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করা হলে ক্যাডার প্রশাসনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

জনপ্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর দাবি, নির্দিষ্ট খাতে অভিজ্ঞতা, জনসম্পৃক্ততা, সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা কিংবা বিশেষ দক্ষতার ভিত্তিতেই সরকার এসব নিয়োগ দিয়ে থাকে। সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম গতিশীল করাই এর উদ্দেশ্য।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ব্যতিক্রমী বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হলে তার যৌক্তিকতা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা উচিত। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং বিতর্কও কমবে।

বিশেষজ্ঞদের মত

সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, কেবল দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘদিন প্রশাসনিক বা কারিগরি দায়িত্ব পালনকারীদের অভিজ্ঞতার বিকল্প স্বল্প সময়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে নিয়োগ দিলে ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও পারস্পরিক অবিশ্বাসও বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। তার মতে, অতীতেও রাজনৈতিক বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হয়েছে, তবে এবার সংখ্যাটি বেশি। শেষ পর্যন্ত এসব নিয়োগের সফলতা নির্ভর করবে নিয়োগপ্রাপ্তদের সততা, দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বের ওপর।

Ad 300x250

সম্পর্কিত